মাত্র কয়েকবছর আগেও উল্লিখিত শিরোনামধারী কোনো প্রবন্ধকে মনে হতো স্রেফ ঐতিহাসিক আগ্রহ থেকে লেখা কিংবা সম্ভবত দ্বিতীয় আন্তর্জাতিক বা রোজা লুক্সেমবার্গের সামাজ্যব্যাদ সংক্রান্ত কোনো তাত্ত্বিক আলোচনার প্রয়াস। কিন্তু ফ্যাসিবাদ আজ আর কোনো প্রত্নতাত্ত্বিক আলোচনার বিষয় নয় বা তেমনটা কখনো ছিলও না। বৈশ্বিকভাবে একচেটিয়া পুঁজিবাদের সংকট ঘনীভূত হওয়ার সাথে সাথে অগ্রসর পুঁজিবাদী সমাজগুলোতে ফ্যাসিবাদ আরো একবার সত্যিকারের রাজনৈতিক বিষয় হয়ে দাঁড়াচ্ছে এবং তার মূলোৎপাটনের জন্য যে রাজনৈতিক কর্মসূচী হাতে নিতে হবে তার জন্যে এর মৌলিক কাঠামোগুলোর বিষয়ে একধরনের ঐতিহাসিক ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। বেশ কয়েকটি কারণে কাজটি খুব একটা সহজ হবে না। তার মধ্যে একটি হলো ফ্যাসিবাদ, একটি যথেষ্ট জটিল প্রপঞ্চ। বাদবাকি অন্য সব কারণের মধ্যে উক্ত কারণেই একটি প্রপঞ্চ হিসেবে ফ্যাসিবাদের একটি দূর্বল ব্যাখ্যার তাত্ত্বিক দেউলিয়াত্ব সরাসরি রাজনৈতিক নপুংসকতার দিকে আমাদেরকে চালিত করে। তাছাড়া স্থানীয় নগর মিলনায়তনে যখন ন্যাশনাল ফ্রন্ট (যুক্তরাজ্যে ১৯৬৭ সালে প্রতিষ্ঠিত একটি উগ্র ডানপন্থী, ফ্যাসিবাদী ও শ্বেতাঙ্গ শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনৈতিক দল— অনুবাদক) একত্র হচ্ছে, এমন পরিস্থিতিতে ফ্যাসিবাদের ইতিহাস ও তত্ত্ব সম্পর্কে সুলুক সন্ধানের মতো যথেষ্ট সময় সদাসর্বদা কারো হাতে নাও থাকতে পারে। একইভাবে ফ্যাসিবাদ মূলত কী তাৎপর্য বহন করে সে সম্পর্কে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখার যে জরুরি কাজ, তার পরিবর্তে উক্ত রাজনৈতিক দলের পেছনে লেগে থাকার ব্যাপারটি একটি লোভনীয় বিকল্পে পরিণত হতে পারে। আবার, এই মুহূর্তে আমাদের সমাজে ফ্যাসিবাদকে আমরা কতটুকু গুরুত্বের সাথে নেব, সেটি জানা যেমন একটি সমস্যা, তেমনিভাবে যে পরিস্থিতির মধ্যে এটি ঐতিহাসিকভাবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে, তাকে খুব সুন্দরভাবে খারিজ করে দেওয়ার এবং বিপ্লবী সর্বহারা নেতৃত্ব গঠনের মাধ্যমে বুর্জোয়া রাষ্ট্রের ধ্বংসসাধন করার মতো বিষয়গুলোকে সামনে নিয়ে আসার জরুরি কার্যক্রমগুলো থেকে কারো রাজনৈতিক শক্তিকে একটি অধিকতর তাৎক্ষণিক কিন্তু বর্তমানে গঠনগত দিক থেকে তুলনামূলকভাবে কম নিয়ামক একটি বিষয়ের দিকে ধাবিত করার মাঝামাঝি একটি রাস্তা বের করাটাও একটি সমস্যা আকারে আমাদের সামনে হাজির হয়েছে। এই দিক থেকে ফ্যাসিবাদের বিষয়টি বরং যৌনতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ। উভয়ের ক্ষেত্রেই মানসিক বিকার ও স্বাভাবিক আচরণের মধ্যে পার্থক্য করা মুশকিল।
টেরি ইগলটন
মোটাদাগে বলা যায়, একচেটিয়া পুঁজিবাদী শাসনকে সবচেয়ে নির্বিঘ্নে ও অনায়াসে নিশ্চিত করার প্রয়াসই হলো ফ্যাসিবাদ। তবে এটা সত্য যে, একচেটিয়া পুঁজিবাদ এই ধরনে কাজ করতে চরমভাবে অনিচ্ছুক। বুর্জোয়া সমাজ তার উদার গণতন্ত্রবাদী মতাদর্শসমূহকে বিবর্তনের মধ্যে দিয়ে নিতে গিয়ে প্রচুর পরিমাণে ঐতিহাসিক শক্তি খরচ করেছে। একই কারণে তারা স্বেচ্ছায় শ্রেণীসংগ্রামের এইসব বিস্তৃত মতাদর্শিক স্থিতাবস্থাকে ভেঙ্গে এমন একদল ছিন্নবস্ত্র সন্দেহবাতিকগ্রস্ত পাতিবুর্জোয়া ডাকাতদের হাতে রাজনৈতিক ক্ষমতা তুলে দিতে চাইবে না, যাদেরকে তারা এমনকি নিজেদের বাড়ির বসার ঘরেও সহ্য করতে রাজি নয়। বুর্জোয়া রাষ্ট্র শুধুমাত্র সর্বশেষ ও মরিয়া প্রচেষ্টা হিসেবে তার ‘মুক্তি’ ও শ্রেণী-ক্ষমতার গঠন প্রক্রিয়ায় অশুভ আঁতাতের মতো সমৃদ্ধ মতাদর্শগুলোকে পরিত্যাগ করে ব্রেখটিয়ান ভাবমূর্তি ধারণ করে সকল গোমর ফাঁস করে দেয়। এটি অবশ্যই বিপ্লবীদের জন্য একটি সুখবর হিসেবে হাজির হয়, কারণ এর মাধ্যমে তারা একটু দম নেওয়ার ফুরসত পায়। একজন বিপ্লবীর শেষ পর্যন্ত শুধুমাত্র একটি জিনিস নিয়েই শঙ্কিত হতে হয়। সেটি হলো সেনাবাহিনী। এছাড়া শেষের দিকে আর সবকিছুই গুরুত্বহীন। কিন্তু বুর্জোয়া রাষ্ট্র নিতান্ত বাধ্য না হলে একে ব্যবহার করে না। কারণ উক্ত কৌশল অবলম্বনের ফলে তার মতাদর্শিক গ্রহণযোগ্যতা যে সম্ভাব্য বিপর্যয়ের মধ্যে পড়ে, তার লোকসান বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই এই স্বল্পমেয়াদী রাজনৈতিক অর্জন দিয়ে পোষানো যায় না। (সেনাবাহিনীর ব্যবহার বলতে আমি স্বাভাবিকভাবেই বুঝিয়েছি পুঁজিবাদের নিজ আবাসভূমিগুলোতে তাদের ব্যবহারকে। মতাদর্শিকভাবে গ্রহণযোগ্য কোনো স্থানে তাদের নিয়োগ- যেমন আইরিশদের মতো ভিনগ্রহবাসীদেরকে নির্যাতনের জন্য তাদের ব্যবহারকে বোঝানো হয়নি)। এর বদলে আমাদের জন্য আছে পুলিশ, যারা খুব বেশি সুখকর না হলেও অন্তত অস্ত্রবিহীন। কিন্তু যদি বুর্জোয়া রাষ্ট্র সেনাবাহিনীকে ব্যবহার করতে বাধ্য হয় তাহলে বিপ্লবীদের জন্য সেই দম নেওয়ার ফুরসতও থাকবে না। একচেটিয়া পুঁজিবাদ তার কর্তৃত্ব বজায় রাখতে এমন কোনো কাজ নেই যা সে করবে না। কেউ যদি এই বক্তব্যকে বামপন্থী সন্দেহবাতিক বলে উড়িয়ে দিতে চায় তবে তাকে বুকেনওয়াল্ডের (জার্মানিক ওয়েমার শহরের নিকটে অবস্থিত অন্যতম বৃহত্তম কনসেন্ট্রেশন ক্যাম্প (১৯৩৭-১৯৪৫)— অনুবাদক) ঘটনা স্মরণে রাখতে হবে।
কোনো ঐতিহ্যবাহী বুর্জোয়া রাজনৈতিক দলই ফ্যাসিবাদকে পুরোপুরি গ্রহণ করেনি। এ সমস্ত রাজনৈতিক দলগুলো শুধুমাত্র ফ্যাসিবাদকে ব্যবহার করে নিজস্ব স্বার্থ চরিতার্থ করার উদ্দেশ্যেই এর সাথে সখ্যতার সম্পর্ক তৈরি করে এবং এক পর্যায়ে আবিষ্কার করে যে পাশার দান উল্টে গেছে। ফ্যাসিবাদ একচেটিয়া পুঁজিবাদী রাষ্ট্রযন্ত্রের সামাজিক গণতন্ত্রবাদী সুশীলতার মুখোশ খুলে দিয়ে রাষ্ট্রের সাথে প্রভাবশালী সামাজিক শ্রেণীর মধ্যস্থতার হাতিয়ার হিসেবে আইনসভা ও রাজনৈতিক দলের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোকে তুলনামূলক স্থূলভাবে ব্যবহার করতে থাকে, ফলে সম্পর্কটি প্রচন্ডভাবে দৃশ্যমান হয়ে পড়ে। বুর্জোয়া উদারবাদী শাসনের অধীনে তুলনামূলকভাবে স্বায়ত্তশাসন উপভোগকারী রাষ্ট্রীয় যন্ত্র হিসেবে পুলিশ ও সেনাবাহিনী ফ্যাসিবাদের কবলে পড়ে বিলুপ্ত হয়ে গিয়ে তারা প্রকৃতপক্ষে খোদ রাষ্ট্রের সাথে কিভাবে মিলেমিশে একাকার হয়ে থাকে তা প্রকাশ করে দেয়। এতকিছুর পরেও ফ্যাসিবাদ সামগ্রিকভাবে সমাজে পুঁজিবাদী কর্তৃত্ববাদের স্রেফ গায়ের জোরে চাপিয়ে দেওয়া কোনো জিনিস নয়। পুঁজিবাদের উদারনৈতিক ধরনটি বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই শাসিতের সম্মতির সাহায্যে শাসন করে থাকে। ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থা কার্যত একটি দাস সমাজ— যা আবার ধ্রুপদী দাস-সমাজ থেকেও পৃথক। অন্তত শুরুর দিকে হলেও ফ্যাসিবাদ ব্যাপকভাবে জনপ্রিয় আন্দোলন হিসেবে আবির্ভূত হয়। সমাজ কাঠামোর প্রত্যেকটি স্তরে এর শেকড় গভীরভাবে বিস্তৃত থাকে। এই দিক থেকে এটি মার্কসবাদে ‘বোনাপার্টবাদ’ (ফ্রান্সে প্রথম ও তৃতীয় নেপোলিয়নের সময়কালে চর্চিত রাজনৈতিক মতবাদ— অনুবাদক) বলে পরিচিত রাজনৈতিক মতবাদের চেয়ে ভিন্ন। ফ্যাসিবাদ মূলত ব্যাপক জনতুষ্টিবাদের সাথে পুশচিবাদের (আচানক সহিংতার উপর ভিত্তি করে সরকার পতনের পদ্ধতিমূলক মতবাদ— অনুবাদক) একটি প্রচন্ড সহিংস তাত্ত্বিক সংস্করণের সমন্বয়ে গঠিত মতবাদ। অন্যভাবে বললে, জার্মান রাষ্ট্রকে উৎখাত করার জন্য নাৎসিদের চর্চিত পদ্ধতি যদি কোনো এক বা একাধিক দিক থেকে জার্মান সাম্যবাদী দলের প্রচন্ড দুর্দিনেও তার উগ্র-বামপন্থী নীতিগুলোর সাথে মিলে যায়, তারপরও বিপরীতক্রমে সমগ্র জার্মান সমাজের চরমপন্থী সম্পৃক্ততা ছিল মূলত বিভিন্ন ধরনের ক্লাব, সমিতি ও সংঘজুড়ে পুরো সামাজিক ও সাংস্কৃতিক বলয়ে তৎকালীন জার্মান সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দলের বিস্তৃত ও শক্তভাবে প্রোথিত সামাজিক কর্পোরেটবাদের অনুরূপ।
সুতরাং, ফ্যাসিবাদ মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে তখনই যখন তার প্রয়োজন হয়। ১৯২৯ সালে জার্মান অর্থনীতি মুখ থুবড়ে পড়ে। ১৯৩০ সালে নাৎসি পার্টির সদস্যসংখ্যা বৃদ্ধি পায় ৮শ শতাংশ। ১৯৩২ সালে ২ কোটি জার্মান খয়রাতির ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। তবে কিনা পুঁজিবাদের একটিমাত্র অর্থনৈতিক সংকটই কেবল ফ্যাসিবাদের জন্ম দেওয়ার জন্য যথেষ্ট নয়। এই সংকটের সাথে সাথে শ্রমিক শ্রেণীর পরাজয় এবং ভেঙ্গে পড়া মনোবল একত্র হয়ে ফ্যাসিবাদের উর্বর জমিন তৈরি করতে পারে। ১৯১৮-১৯১৯ সালে ক্ষণস্থায়ী জার্মান শ্রমিক প্রজাতন্ত্রকে সম্পূর্ণভাবে ধ্বংস করার মাধ্যমে জার্মান ফ্যাসিবাদের গল্প শুরু হয় এবং এই গল্প এগোতে থাকে এসপিডি (সমাজবাদী গণতান্ত্রিক দল) ও চুলচেরা কট্টর বামপন্থী ভাঁড়দের দল কেপিডি (সাম্যবাদী দল) কর্তৃক জার্মান সর্বহারাদের একের পর এক বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়ার মাধ্যমে। ১৯২০ সালে ইতালিতে সর্বহারা বিদ্রোহের ব্যর্থতা এবং তার ফলস্বরূপ শ্রমিক শ্রেণীর প্রচন্ডভাবে ভেঙ্গে পড়া মনোবল শাসনকাঠামোর শূন্যতাকে ফ্যাসিবাদ দিয়ে পরিপূর্ণ করে দেয়, যেটি কিনা পূর্বে ছোট্ট পরিসরে বিস্তৃত থাকলেও পরবর্তীকালে বিপুল বিক্রমে সামনে এগোতে থাকে। ফ্যাসিবাদ হলো বুর্জোয়াদের সর্বহারা বিদ্রোহকে দমন করার ভীতিজনিত বিপরীত প্রতিক্রিয়া থেকে পাওয়া একটি উপজাত— এটি হলো একটি বিপজ্জনক বামপন্থী কুসংস্কার। বিপরীতে, শ্রমিক শ্রেণী যখন একটি বিকল্প বিপ্লবী শক্তির অভাবে সংস্কারপন্থী কোনো নেতৃত্বের দ্বারা বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে অসংগঠিত ও রক্ষণশীল অবস্থায় থাকে, ঠিক সে সময়ে একটি প্রচন্ড বুর্জোয়া আক্রমণের মধ্যেই ফ্যাসিবাদের প্রকৃত তাৎপর্য নিহিত আছে। সুতরাং ফ্যাসিবাদের উপাদান একাধিক। অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক সংকট, সর্বহারাদের পরাজয়, সমাজবাদী গণতন্ত্রের পরাজয়, বিপ্লবী নেতৃত্বের অভাব কিংবা অক্ষমতা।
রাজনৈতিকভাবে ফ্যাসিবাদ কোনো আলোচনা কক্ষ কিংবা কোনো কারখানার বারান্দায় উদ্ভাবিত হয় না। এটি উৎপন্ন হয় পাতিবুর্জোয়া কর্মচারীদের সারি থেকে। সর্বহারা শ্রেণীর সমপর্যায়ে কিংবা তারও নীচে নিক্ষিপ্ত হওয়ার ভয়ে ভীত এবং একইসাথে মাথার উপরে অবস্থিত নির্বিষ শাসকশ্রেণীর বিরুদ্ধে বিদ্রোহরত স্বল্প পুঁজি ও বিনিয়োগের মালিকদের বিভিন্ন দল যারা তাদের সঞ্চয়কে ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যেতে দেখে, বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ফ্যাসিবাদ তাদেরই একটি রাজনৈতিক পণ্য। জাতীয়তাবাদ, কৌলিন্যবাদ, কঠোর পরিশ্রম, মেধাতন্ত্র, শ্রমিক বিদ্রোহের ভীতি, দক্ষতার প্রতি শ্রদ্ধা, যুক্তিবাদ এবং রাষ্ট্রযন্ত্রের অভ্যাস রপ্ত করতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত পাতিবুর্জোয়া শ্রেণী ফ্যাসিবাদী মতাদর্শের আঁতুড়ঘরে পরিণত হয়। বৃহৎ পুঁজির হুমকিতে অস্তিত্ব সংকটে ভোগা এই শ্রেণীটি বুর্জোয়া ও সর্বহারাদের মাঝখানে নিজেদেরকে ‘নিরপেক্ষ’ হিসেবে হাজির করে। বিক্ষিপ্ত অর্থনৈতিক পরিস্থিতিতে নিজেদের কেন্দ্রীভূত স্বভাবের কারণে তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে নিজস্ব বিভিন্ন রাজনৈতিক সংগঠন তৈরি করতে অক্ষম হয়ে নিজেদের শ্রেণী স্বার্থ চরিতার্থ করতে তাদের মধ্যে সমস্ত শ্রেণীবিভাজনের উর্ধে রাখা একটি ‘নিরপেক্ষ’ রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হওয়ার প্রবণতা দেখা যায়।
অর্থনৈতিক মন্দাবস্থা এবং ‘বৃহৎ’ পুঁজির ক্রমবর্ধমান প্রভাবের মধ্যে নিয়তির ফেরে আটকে পড়ে এবং বুর্জোয়া কিংবা সামাজিক গণতন্ত্রবাদী রাজনৈতিক যন্ত্র কোনো কিছুতেই নিজেদের প্রতিনিধিত্ব খুঁজে না পেয়ে নিজেদের চাহিদা বৃদ্ধির জন্যে ফ্যাসিবাদী দলে রূপান্তরিত হওয়া পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর অভ্যন্তরীণ সংকটজাত হলো ফ্যাসিবাদ। অন্যান্য আরো অনেক বিষয়ের সাথে ফ্যাসিবাদের গল্প মূলত পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীকে একটি লম্বা ও ঝুঁকিপূর্ণ রাজনৈতিক ভ্রমণ এবং অস্বস্তিকর ইতিহাসের মধ্যে দিয়ে নিয়ে যাওয়ার গল্প। অর্থনৈতিক সংকটে পড়া একচেটিয়া পুঁজিবাদের সমর্থনে পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর অস্পষ্ট ও মিশ্র মতাদর্শকে কাজে লাগিয়ে সর্বহারাদের সংগঠনগুলোকে দমন করার একটি হাতিয়ার হিসেবে ফ্যাসিবাদ এই শ্রেণীকে ব্যবহার করে। পাতিবুর্জোয়াদের সামনে ফ্যাসিবাদ নিজেকে জনপ্রিয় এবং ‘চরমপন্থী’ শক্তি হিসেবে হাজির করে যারা কিনা ‘অলস ধনী’ ও ‘সম্পদগর্বী’দের বিরুদ্ধে উক্ত শ্রেণীর বৈরিভাবাপন্নতার সাথে একাত্মতা পোষণ করে এবং সত্যিকারের ‘উৎপাদনশীল’ শ্রমিকদের (হোক তারা পুঁজিবাদী কিংবা সর্বহারা) গুণগ্রাহী হিসেবে আবির্ভূত হয়। একইসাথে, ফ্যাসিবাদ নিজেকে শৃঙ্খলা, গৌরব, ধার্মিকতা ও জাতিগত স্বর্ণযুগকালীন দেশজ মূল্যবোধের রক্ষাকারী ঐতিহ্যবাদী আন্দোলন হিসেবেও তুলে ধরে।
অন্তত শুরুর দিকে হলেও ফ্যাসিবাদের ‘চরমপন্থা’ পুরোপুরি ধাপ্পাবাজির বিষয় ছিল না। দলের মধ্যে যারা নেতাদের ধনীদেরকে আঘাত করা বিষয়ক বাগাড়ম্বরকে গুরুত্বের সাথে নিয়ে ফেলেছিল, তাদের আন্দোলনকে নস্যাৎ করার জন্য তথাকথিত ‘নাইট অব দ্য লং নাইভস্’ জাতীয় বেশ কিছু অভিযান পরিচালনা করা নাৎসীদের জন্য জরুরি হয়ে পড়েছিল। তবে ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদের গতানুগতিক প্রক্রিয়া আরো জটিল। শাসক শ্রেণী শুরুর দিকে ফ্যাসিবাদকে ঘেন্না করে এবং খারিজ করে দেয়, পরবর্তীকালে রাজনৈতিক সংকটের সময় মাঝেমধ্যে একে ব্যবহার করে এবং পরিস্থিতির সাময়িক উন্নতি হলেই ছুঁড়ে ফেলে দেয়। সংকট যখন সমাধান হতে চায় না বরং বিপুলাকারে বৃদ্ধি পেতে থাকে, তখন এটি উল্লেখযোগ্য পরিমাণে আর্থিক অনুদানরূপে বৃহৎ পুঁজির গোপন সমর্থন লাভ করতে থাকে। ফ্যাসিবাদের পরবর্তী পদক্ষেপ হলো নিজেকে একচেটিয়া পুঁজি ও পাতিবুর্জোয়াদের মধ্যবর্তী মৈত্রী হিসেবে হাজির করে, কিছুটা হলেও একটা চরমপন্থী চেহারা বানিয়ে, জনগণের প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংসসাধন করে সেগুলোর জায়গায় রাষ্ট্র-নিয়ন্ত্রিত প্রতিষ্ঠান বানানোর কর্মযজ্ঞে তখনো সামান্য কিছু ছাড় দিয়ে রাজনৈতিকভাবে ক্ষমতা দখল করা। পাতিবুর্জোয়ারা শাসক শ্রেণীতে পরিণত হয়ে রাষ্ট্রযন্ত্র তাদের নিজেদের লোকজন দিয়ে ভর্তি করতে থাকলেও একচেটিয়া পুঁজিবাদের প্রভাবশালী স্বার্থের ভিত্তিতেই শাসনকার্য পরিচালনা করতে থাকে। ক্ষমতা পাকাপোক্ত হওয়ার সাথে সাথে একদা পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর একগাদা অভাব অভিযোগে বিক্ষুব্ধ ফ্যাসিবাদ এই শ্রেণীস্বার্থকেই বিকিয়ে দেওয়ার প্রক্রিয়া শুরু করে। শেষপর্যন্ত পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর মতাদর্শকে মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করে একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্বার্থ সংরক্ষণ করতে থাকা ফ্যাসিবাদ যে শ্রেণীর কাঁধে ভর দিয়ে ক্ষমতায় আরোহণ করে, সে শ্রেণীস্বার্থকেই পুরোপুরি জলাঞ্জলি দিয়ে দেয়।
একচেটিয়া পুঁজিবাদের একটি তীব্র সাধারণ সংকট এবং সর্বহারা নেতৃত্বের দ্বৈত সংকটের মতো শাসকচক্রের নিজেদের মধ্যেই একটি বিশেষ ধরণের রাজনৈতিক সংকট হলো ফ্যাসিবাদের উত্থানের পেছনের ধ্রুপদী পূর্বশর্ত। শাসকচক্রের মধ্যে অবস্থানরত কোনো বিশেষ শ্রেণী কিংবা কোনো শ্রেণীর কোনো বিশেষ অংশই যখন একক আধিপত্য বিস্তার করতে পারে না, তখন এদের কোনো একটি পক্ষের একক আধিপত্য কায়েমের ভিত্তিতে এই পরষ্পরবিরোধী অংশগুলোকে একসূত্রে গাঁথার জন্য একটি মধ্যস্থতাকারী শক্তির প্রয়োজন হয় যার যোগান দিতে পারে ফ্যাসিবাদ। এমন একটি পরিস্থিতিতেই ফ্যাসিবাদের উত্থান ঘটে। সমাজে প্রভাবশালী চক্রের মধ্যে একটি বিশেষ ধরনের পুনর্গঠনকে প্রভাবিত করার মাধ্যমে এদেরকে একতাবদ্ধ করাই হলো ফ্যাসিবাদের ঐতিহাসিক অভিপ্রায়। উদাহরণস্বরূপ, ১০২০ এর দশকের জার্মানিতে একচেটিয়া পুঁজিবাদের দ্রুততর বিকাশের ফলে শাসক শ্রেণীর এই অংশের সাথে বিপুলাকার কৃষি-পুঁজির বিভিন্নমুখী দ্বন্দ্বের উদ্ভব ঘটে। সেখানে ফ্যাসিবাদের কাজ ছিল একচেটিয়া পুঁজিবাদের স্বার্থ রক্ষার ভিত্তিতে এইসমস্ত দ্বন্দ্ব-সংঘাত নিরসন করা। ‘বৃহৎ’ ও ‘মাঝারি’ পুঁজির মধ্যে বিদ্যমান দ্বন্দ্ব নিরসনেও ফ্যাসিবাদ পূর্বোক্ত শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করেছিল। বাধ্যতামূলক চক্রায়ণ (কার্টেলাইজেশন), দ্রব্যমূল্যের স্থিতিশীলতা, গণকর্মসংস্থান, যুদ্ধ অর্থনীতি এবং ফ্যাসিবাদের বাদবাকী অন্যসব অর্থনৈতিক কর্মসূচীগুলোর মাধ্যমে শাসক শ্রেণীর মধ্যে বিরাজমান অন্য সকল দল-উপদলের স্বার্থ-সুবিধা জলাঞ্জলি দেওয়ার বিনিময়ে লাভবান হয় বৃহৎ শিল্পপুঁজি। রাষ্ট্রীয় অর্থায়ন এসমস্ত পুনর্গঠনের একমাত্র মাধ্যম হওয়ার কারণে শেষপর্যন্ত একচেটিয়া অর্থায়ননির্ভর পুঁজিবাদই মূলত প্রভাবশালী ‘উচ্চতা’য় উপনীত হয়। ইতালিতে ফ্যাসিবাদ কৃষিপুঁজির উপর শিল্পপুঁজির প্রভাব বিস্তার নিশ্চিত করতে কাজ করেছিল। ইতালির ফ্যাসিবাদী দল ছিল মূলত সে দেশের উন্নত উত্তরাঞ্চলের একটি পণ্য যেটি কিনা কৃষিনির্ভর দক্ষিণাঞ্চলের রাজনৈতিক ক্ষমতাকে ধুলিস্যাৎ করে দিয়েছিল।
জার্মানির মর্তাদর্শিক পরিস্থিতিগুলো ফ্যাসিবাদের জন্য বিশেষভাবে সহায়ক ছিল। বিসমার্কবাদী ‘উপর থেকে উপুড় করে দেওয়া বিপ্লব’ এর মাধ্যমে ক্ষমতায় আসা জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণী কখনোই তাদের নিজস্ব মতাদর্শ উৎপাদন করার মাধ্যমে তাদের শাসনকে পাকাপোক্ত করতে পারেনি। বুর্জোয়া উদারবাদী মতাদর্শের জায়গায় জার্মানরা ফ্যাসিবাদে রূপান্তরযোগ্য জঙ্গিবাদী উপাদানসমেত ঈষৎ পরিবর্তিত একটি সামন্তবাদী মতাদর্শ উৎপাদন করেছিল। জার্মান পাতিবুর্জোয়া শ্রেণী মতাদর্শিকভাবে পিছিয়ে ছিল। ঐতিহ্যগতভাবে কুলীন বুর্জোয়াদের উপর নির্ভরশীল এই শ্রেণী তাদের ফরাসি সঙ্গীসাথীদের জ্যাকববাদের সাথে শক্তিসামর্থ্যের দিক থেকে তুলনীয় কোনো মতাদর্শের জন্ম দিতে পারেনি। তারপরও এইসব মতাদর্শের উপাদানসমূহ খুবই অদ্ভূতভাবে ফ্যাসিবাদের হাতের মুঠোয় চলে যাওয়ার জন্য পুরোপুরি উপযোগী ছিল। রাষ্ট্রপূজা, ‘গুরু’ভক্তি, আক্রমণাত্মক জাতীয়তাবাদ, কৃর্তত্ববাদ এবং ‘যন্ত্রবাদী’ আদর্শবাদসমেত জার্মান পাতিবুর্জোয়া মতাদর্শ বহু দিক থেকেই ধ্রুপদী বুর্জোয়া উদারবাদের চেয়ে একচেটিয়া সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদের মতাদর্শিক চাহিদা মেটানোর জন্য অধিকতর উপযোগী ছিল। উদাহরণস্বরূপ, শ্রেণীগত পরিভাষার বদলে বরং ‘দেশীয়’ পরিভাষায় পরিচিত হতে চাওয়া ব্যক্তিস্বাতন্ত্রবাদী ছিন্ন বিচ্ছিন্ন পাতিবুর্জোয়া শ্রেণীর মতাদর্শিক অবস্থাগুলোর সাথে পরিবার বিষয়ক ফ্যাসিবাদী সংস্কার মিলে যায়। কিন্তু এসমস্ত মতাদর্শগুলো কর্পোরেটবাদ, কর্তৃত্ববাদ ও মর্যাদাক্রমের যে প্রতিচ্ছবি নির্মাণ করেছিল, সেটি খুব পরিষ্কারভাবেই একচেটিয়া পুঁজিবাদের রাজনৈতিক চাহিদাগুলো মেটানোর জন্য উপযুক্ত ছিল। সুতরাং, এটা বলা যায় যে, ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ মূলত নিম্ন মধ্যবিত্তের মতাদর্শের সাথে যূথবদ্ধ এবং সেটি দ্বারা প্রভাবিত একটি বিশেষভাবে রূপান্তরিত একচেটিয়া সাম্রাজ্যবাদী পুঁজিবাদী মতাদর্শ।
পুঁজিবাদ থেকে উত্তীর্ণ হওয়া ‘আমলাতান্ত্রিক যৌথতা’ই হলো ফ্যাসিবাদ— এই ধরনের রক্ষণশীল ও উদারবাদী কিংবদন্তীকে নাকচ করাটা গুরুত্বপূর্ণ। জার্মানি ও ইতালীয় শিল্প-কারখানায় তৎকালীন ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের বিষয়টি বর্তমানে পশ্চিমে যা হচ্ছে তার চেয়ে সম্ভবত ভিন্ন কিছু ছিল না। তৎকালীন জার্মানির বেশিরভাগ শিল্পকেই জাতীয়করণ করা থেকে বিরত ছিল নাৎসিরা। বেসরকারি খাতের তুলনায় তাদের রাষ্ট্রমালিকানাধীন ব্যাবসা-বাণিজ্যের অবস্থারও ব্যাপক অবনতি ঘটেছিল। ফ্যাসিবাদ বিষয়ে ফ্রানজ্ ন্যুমান তার ধ্রুপদী গ্রন্থ বেহেমথ-এ লিখেছেন, ফ্যাসিবাদ হলো ‘একটি সর্বগ্রাসী রাষ্ট্র দ্বারা নিয়ন্ত্রিত একটি বেসরকারি পুঁজিবাদী অর্থনীতি’। জার্মানিতে ওয়েমারের সময়কালে ক্রমবর্ধমান একচেটিয়া পুঁজিবাদ ও চক্রায়ণকে (কার্টেলাইজেশন) যৌক্তিকভাবে অনুসরণকারী এবং সমসাময়িক পুঁজিবাদের পরিকল্পিত কর্পোরেট অর্থনীতির অগ্রদূত হিসেবে একে দেখা যেতে পারে। সমাজকে বিশ্ববাজার থেকে বিছিন্ন করে বৈদেশিক বাণিজ্য এবং পণ্য উৎপাদনের খরচ ও দাম নির্ধারণে রাষ্ট্রের একক আধিপত্য কায়েমের মাধ্যমে একটি বদ্ধ অর্থনীতি নির্মাণের মতলব নিয়ে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র পুঁজিবাদী উৎপাদন ব্যবস্থার নিয়মিত তত্ত্বাবধায়কে পরিণত হয়। এমন সুরক্ষা নীতি গ্রহণের অনিবার্য ফল হিসেবে একদা বিধ্বস্ত অর্থনীতি সেরে ওঠে এবং এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠে যে সেটি তার কঠোর জাতীয় সীমানায় আবদ্ধ থাকতে পারে না। এর ফলে ঘটে সাম্রাজ্যবাদী বিস্তার। কিন্তু এইধরনের বিস্তার অবশ্যই স্রেফ ফ্যাসিবাদী ‘দুর্ঘটনা’ নয়। ফ্যাসিবাদ স্রেফ সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের প্রস্তুতির উদ্দেশ্যে সব জাতীয় বাহিনী, শ্রেণী ও সম্পদগুলোর জঙ্গিবাদী কেন্দ্রীভূতকরণ ছাড়া আর কিছুই নয়।
এই প্রস্তুতি গ্রহণের সাথে ইহুদিবিদ্বেষ ও জাতিবাদের সম্পর্ক ঐতিহাসিকভাবে পরিবর্তনশীল। নাৎসিবাদের ক্ষেত্রে এই সম্পর্কটি সত্য ছিল। সেখানকার অভ্যন্তরীণ শ্রেণীসংগ্রাম থেকে দৃষ্টি সরিয়ে জাতীয় কর্পোরেটবাদ এবং সেখান থেকে আন্তর্জাতিক আগ্রাসনে নিয়ে যাওয়ার মাধ্যম হিসেবে ইহুদি ও বিদেশীদেরকে নির্বাচন করা হয়েছিল। আদর্শিক পর্যায়ে সকল ফ্যাসিবাদেই শ্রেষ্ঠত্ববাদী কর্পোরেটবাদ হাজির থাকলেও অর্থনৈতিক লক্ষ্যসমূহের দিক থেকে ‘ধ্রুপদী’ ফ্যাসিবাদের কাতারভুক্ত না হওয়া আইবেরীয় ফ্যাসিবাদসমূহের এ জাতীয় শ্রেষ্ঠত্ববাদ প্রকাশে জাতিবাদী পরিভাষাগুলো ব্যবহার করতে হয়নি (১৯৩২ সালে ইতালিতে প্রধান ইহুদী ধর্মগুরু ফ্যাসিবাদী দলের সদস্য ছিলেন)।
তবে সকল ফ্যাসিবাদী গঠনই তার আদর্শিক স্তরে ব্যাপকভাবে ‘তুলনামূলক স্বায়ত্ত্বশাসন’ বজায় রাখে। উদাহরণস্বরূপ, নাৎসি জার্মানির যুদ্ধ-অর্থনীতিতে পোলিশ ধাতুশ্রমিকদের সম্ভাব্য গুরুত্বপূর্ণ অবদানকে উপেক্ষা করে মতাদর্শিক কারণে তাদেরকে নির্মূল করা হয়েছিল। একইভাবে সেখানে অতিরিক্ত শ্রমশক্তি যখন প্রচন্ড প্রয়োজন ছিল, সে সময়েও জার্মান গৃহিণীদের গৃহবন্দী রাখার সংস্কার মেনে তাদেরকে কারখানার বাইরে রাখা হয়েছিল। তার উপর ‘শেষ সমাধান’-এ আসার জন্য প্রয়োজনীয় জটিল ও ব্যয়বহুল কলকব্জার মধ্যে যানবাহন ও বিভিন্ন সম্পদ অন্তর্ভূক্ত ছিল, যেগুলোকে বিকল্প হিসেবে ব্যাপকভাবে যুদ্ধের কাজেও ব্যবহার করা যেত। বিভিন্ন ধরনের অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক স্বার্থগুলোকে বৈধতা দেওয়া সংশ্লিষ্ট সকল মতাদর্শিক গঠনের মধ্যে কিছুমাত্রায় তুলনামূলক স্বায়ত্ত্বশাসন বজায় রাখা হয়। কিন্তু ফ্যাসিবাদের ক্ষেত্রে এটি অনেক বেশি সত্য। একই কারণে একটি ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র যে শ্রেণীস্বার্থের মতব্বরি করে তার বিপরীতে এর মতাদর্শিক গঠনের তুলনামূলক স্বায়ত্ত্বশাসন অনেক বেশি থাকে এবং সেটা দরকারও, কারণ এর কাজই হলো শাসকচক্রের মধ্যে হস্তক্ষেপ করে এর অভ্যন্তরীণ বিভিন্ন ‘শ্রেণীসমূহ’-কে পুনর্বিন্যস্ত করা। একচেটিয়া পুঁজিবাদের সরাসরি ‘প্রতিনিধি’ কিংবা স্রেফ একটি ‘হাতিয়ার’ হিসেবে একে ব্যাখ্যা করা যায় না। নাৎসিরা কেবল এসব স্বার্থ রক্ষার হাতিয়ার ছিল না বরং এসকল স্বার্থের জন্য স্বল্পমেয়াদে ক্ষতিকারণ বিভিন্ন নীতিও অনুসরণ করত। কিন্তু শেষপর্যন্ত ফ্যাসিবাদের সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্যগুলোর সাথে একচেটিয়া পুঁজিবাজী মতলবের মধুর মিলন ঘটেছিল।
নাৎসী পোস্টার
ধ্রুপদী ফ্যাসিবাদ থেকে আমরা কোন রাজনৈতিক শিক্ষা লাভ করি? আমরা জানি যে, ফ্যাসিবাদের মৌলিক নীতিই হলো অনুকূল পরিবেশে এটি প্রচন্ড দ্রুততার সাথে বিকশিত হতে পারে। কিন্তু কোন পরিস্থিতিগুলো হিটলারকে ক্ষমতায় এনেছিল সেটি আরো সুনির্দিষ্ট ও নির্ভুলভাবে আমাদেরকে নির্ধারণ করতে হবে। কেউ যদি জার্মান ফ্যাসিবাদের উত্থান কেন ঘটেছিল তার উত্তর একশব্দে জানতে চায়, তাহলে তুলনামূলকভাবে কম খারাপ হবে এই উত্তর দেওয়া যে: স্ট্যালিন। ফ্যাসিবাদ সম্পর্কে সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের উদ্ভট ধরনপ ভুল ব্যাখ্যাই এর সফলতার পেছনে গুরুত্বপূর্ণ নিয়ামক ছিল। ‘কুলীন শ্রমিক শ্রেণী’র তুলনামূলক প্রাচুর্যের মধ্যে জন্ম নেওয়া এবং প্রগতিশীল পুঁজিবাদের পতনের সাথে সাথে ভেঙ্গে খন্ড খন্ড হয়ে যাওয়া একগুচ্ছ দিবাস্বপ্ন বলে আখ্যা দেওয়া সামাজিক গণতন্ত্রবাদ শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে কিভাবে কাজ করে, সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক সেটি বুঝতে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছিল। সংকীর্ণ ‘অর্থনীতিবাদ’ ও ‘আকস্মিকতাবাদ’ দ্বারা আক্রান্ত হয়ে সরল মনের এই ‘তত্ত্ব’টি সামাজিক গণতন্ত্রবাদী দলগুলো (বুর্জোয়া রাজনীতিতে অভ্যস্ত ও শ্রমিক শ্রেণীর সমর্থনপুষ্ট) যে রাষ্ট্র নামক দেহের স্রেফ মলমূত্র নয় বরং সর্বহারা শ্রেণীকে রাজনৈতিক ও মতাদর্শিকভাবে নিয়ন্ত্রণের জন্যে কাঠামোগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ—এই সত্যকে অবহেলা করেছিল। ফ্যাসিবাদ ও সামাজিক গণতন্ত্রবাদকে একচেটিয়া পুঁজিবাদী শাসনের স্রেফ দুটি ভিন্ন হাতিয়ার হিসেবে আখ্যা দিয়ে সাম্যবাদী আন্তর্জাতিক সামাজিক গণতন্ত্রবাদকে ‘সামাজিক ফ্যাসিবাদ’ বলে অভিহিত করেছিল। ফ্যাসিবাদকে একটি মধ্যবর্তী অবস্থা হিসেবে সংজ্ঞায়িত করে তারা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে অন্তর্গত বিরোধসমূহের ফলেই তার পতন ঘটবে এবং ঘটনাক্রমে সেটি পুঁজিবাদের অন্তর্গত বিরোধগুলোকেও শেষ সীমার দিকে ঠেলে দিবে। একইভাবে জার্মান ফ্যাসিবাদ সর্বহারা বিপ্লবকেও ত্বরান্বিত করবে। নাৎসিদের সাথে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করা জার্মান সাম্যবাদীরা সত্যিকারের শত্রু সামাজিক গণতন্ত্রবাদীদেরকে উৎখাতের ঘোষণা দিয়েছিল। নাৎসিদের ক্ষমতা দখলের বিষয়ে ‘সাংবিধানিক’ বিরোধিতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া সামাজিক গণতন্ত্রবাদী নেতৃত্বের বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হওয়া এবং জার্মান সাম্যবাদী দলকে ‘ফ্যাসিবাদী’ সামাজিক গণতন্ত্রবাদীদের সাথে কোনো জোটে না যাওয়ার নির্দেশনা দেওয়া সাম্যবাদী আন্তর্জাতিকের কাছে বিক্রি হয়ে যাওয়া জার্মান সর্বহারা শ্রেণী হিটলারের উত্থানের পূর্বে ক্ষমতাহীন হয়ে পড়েছিল। সামাজিক গণতন্ত্রবাদ বুর্জোয়াদেরকে শ্রমিক শ্রেণীর হাত থেকে রক্ষা করেছিল। পরবর্তীকালে সামাজিক গণতন্ত্রবাদের হাত থেকে বুর্জোয়াদেরকে রক্ষা করেছিল ফ্যাসিবাদ।
এসব কিছু থেকে রাজনৈতিক শিক্ষাটা ছিল পরিষ্কার। শুধুমাত্র একটি সংগঠিত এবং বিপ্লবী শ্রমিক শ্রেণীর আন্দোলনই কেবল ফ্যাসিবাদকে পরাজিত করতে পারে। তবুও আজকের পশ্চিমা সর্বহারা শ্রেণী অন্য যে-কোনো সময়ের তুলনায় গভীরভাবে বুর্জোয়া মতাদর্শিক দূষণের শিকার। ফ্যাসিবাদী আন্দোলনগুলোর শক্তির ব্যাপারে অবশ্য অতিরঞ্জিত ধারণা পোষণ না করাটাও গুরুত্বপূর্ণ। পাতিবুর্জোয়া, কৃষক, বেকার এবং ছিন্নমূল গোষ্ঠী ও শ্রেণীর মতো যে-সকল শ্রেণী ও বর্গকে ফ্যাসিবাদ কাছে টানে, তাদেরকে সংগঠিত করা একটি প্রচন্ড দুঃসাধ্য কাজ। প্রথম পরাজয়েই সংশ্লিষ্ট আন্দোলনের পতন ঘটার জন্য তারা প্রায়শই দায়ী থাকে। অন্যদিকে, কারখানার সুসংগঠিত শ্রমিক শ্রেণীর মধ্যে ফ্যাসিবাদ খুব কম সময়েই সরাসরি প্রবেশ করতে পারে। নিজেদেরকে শ্রমিকদের দল বলে নাৎসিদের যে দাবি, সেটি কোনো নির্বাচনী পরিসংখ্যান থেকে উঠে আসেনি। ১৯২৬ সালের সাধারণ ধর্মঘটে বিশাল বিপর্যয় এবং পরবর্তী বছরগুলোর অর্থনৈতিক মন্দাবস্থায় ভেঙ্গে পড়া মনোবল নিয়েও ১৯৩০ এর দশকে ইংরেজ শ্রমিক শ্রেণী ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে দারুণভাবে লড়ে গেছিল। (প্রকৃতপক্ষে ব্রিটিশ পুঁজিবাদকে ফ্যাসিবাদের আশ্রয় নিতে না হওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ ছিল ইংরেজ সর্বহারাদের এই ভেঙ্গে পড়া মনোবল। সর্বহারাদের রাজনৈতিক দূর্বলতাকে পুঁজি করে ফ্যাসিবাদ দাঁড়িয়ে থাকলেও তাদেরকে অর্থনৈতিক শক্তি যুগিয়ে যাওয়া প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভাঙতে হয় ফ্যাসিবাদের। ব্রিটেনের বিপরীতে জার্মানিতে তখনো বিষয়টি বিবেচনাধীন ছিল)। ন্যাশনাল ফ্রন্টের মতো আজকের ব্রিটিশ ফ্যাসিবাদী দলগুলো এখনো প্রান্তিক, একদিকে কট্টর নাৎসিবাদ, অন্যদিকে নির্বাচনী মর্যাদা নিয়ে অর্ন্তদ্বন্দ্বে দ্বিধাবিভক্ত। এর বিরুদ্ধে সংগ্রাম চালিয়ে যাওয়ার কাজটি অবশ্যই সুনির্দিষ্ট। ফ্যাসিবাদী সংগঠন, সমাবেশ ও প্রচারণাকে অবশ্যই প্রতিরোধ করতে হবে। আমাদের একটি বিষয়ে কৃতজ্ঞ থাকা উচিত যে, আমরা এমন একটি সমাজে বসবাস করি যেখানে জনপরিসরে খোলামেলা যাচ্ছেতাই বলার সুযোগ নাই। জনসম্মুখে কেউ জাতিগত ঘৃণা ছড়ালে সে অপরাধে তার শাস্তি হতে পারে- অন্তত এটি নিয়েও শুরু করা যায়। ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম একইসাথে এই মতাদর্শ উৎপাদনকারী সমাজব্যবস্থার বিরুদ্ধেও সংগ্রাম। বিপ্লবী নেতৃত্ব গঠনের সমস্যার সাথেও এই সংগ্রাম যুক্ত। ফ্যাসিবাদ যেমন প্রধান শত্রু নয়, একইসাথে এটি উপেক্ষণীয়ও নয়। বামপন্থীদের কিছু অংশের মধ্যে ‘ফ্যাসিবাদী’ শব্দের আবেগমূলক এবং অসতর্ক ব্যবহার যদি বিপজ্জনক রাজনৈতিক ধোঁয়াশাও হয়ে থাকে, তবে এটি আমাদের এটাও মনে করিয়ে দেয় যে, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের মুখোশের আড়ালে ফ্যাসিবাদ খুব বেশি অষ্পষ্ট নয়।
[অনূদিত প্রবন্ধটি এমা গোল্ডম্যানের Anarchism and Other Essays গ্রন্থটি থেকে নেয়া হয়েছে। এটিই এমা গোল্পম্যানের প্রথম প্রকাশিত বই। বইয়ের প্রবন্ধগুলো প্রথমে বক্তৃতা আকারে দেয়া হয়, Mother Earth নামক জার্নালের জন্য অর্থ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে। মূল ইংরেজি লেখাটি “The Tragedy of Woman’s Emancipation” শিরোনামে। অরাজের জন লেখাটি অনুবাদ করেছেন তন্বী তরুণীমা চৈতী। – সম্পাদক]
একটি স্বীকারোক্তি দিয়ে আমি আলোচনা শুরু করছি—আমার মতে শ্রেণী, জাতি কিংবা নারী এবং পুরুষ অধিকারের নামে কৃত্রিম বিভক্তি রেখা সৃষ্টিকারী রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক তত্ত্বগুলো মানবজাতির পুর্ণাঙ্গ গল্পটি বলে না। এসব বিভাজনের ঊর্ধ্বে আছে এক অভিন্ন ভিত্তি, যা আমাদের সকলকে একীভূত করে—এমনটাই আমার বিশ্বাস।
এই বিশ্বাসের মাধ্যমে কোনোপ্রকার শান্তিচুক্তির প্রস্তাব উত্থাপনের অভিপ্রায় আমার নেই। আজকের সমাজ স্বার্থের সংঘাত আর বৈষম্যের বেড়াজালে জর্জরিত। তবে এই বৈরিতা চিরস্থায়ী নয়। অর্থনৈতিক ন্যায্যতার ভিত্তিতে নির্মিত নতুন সমাজব্যবস্থায় এসব বিভেদের কোনো অস্তিত্ব থাকবে না।
মানুষে মানুষে সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠার প্রাথমিক শর্ত মানুষের উপরিগত অভিন্নতা কিংবা ব্যক্তির স্বকীয়তা মুছে ফেলা (superficial equalization of human beings) নয়। নিজস্বতা না খুইয়ে সকলের সাথে একাত্বতাবোধ করা, সবার প্রতি সংবেদনশীল হওয়ার পাশাপাশি নিজের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য ধরে রাখাই বর্তমান সময়ের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। এই বিড়ম্বনার মোকাবেলা দ্রুততার সাথে করা প্রয়োজন। কেননা এই জটিলতার সমাধা হলেই সমাজ এবং ব্যক্তি, নারী এবং পুরুষ, গণতন্ত্রবাদী এবং ব্যক্তিস্বাধীনতা বা true individuality-র চর্চাকারীরা একত্রিত হতে পারবে। উপরিউক্ত সমস্যার সমাধানেই বিরোধ আর বিবাদের নিষ্পত্তি নিহিত। আমাদের লক্ষ্য সকলকে ক্ষমা করা নয়; আমাদের লক্ষ্য একে অন্যকে বোঝার চেষ্টা করা। ব্যক্তিগতভাবে আমি মাদাম দে স্তালের (Madame de Staël) উদ্ধৃতি ‘সবকিছু বোঝার অর্থ সবকিছু ক্ষমা করা’–এর সাথে একমত নই। উদ্ধৃতিটি আমার কাছে স্বীকারোক্তিমূলক শোনায়। পুরো বিষয়টির ভেতর একপ্রকার কপট অহমিকা প্রকাশ পায়—ক্ষমাকারী যেনো নিজের আত্মম্ভরিতা জাহির করতে ইচ্ছুক। প্রকৃতপক্ষে, আরেকজন ব্যক্তিকে সত্যিকার অর্থে বোঝাটাই যথেষ্ট। আমার এই বিশ্বাস নারী মুক্তি এবং সকল নারীর উপর এর প্রভাব সম্পর্কে আমার দৃষ্টিভঙ্গির আংশিক প্রতিনিধিত্ব করে।
মুক্তি নারীকে মানুষ হিসেবে যথার্থ জীবনযাপনের সুযোগ তৈরি করে দেবে। নারীরা যা বলতে এবং করতে চায়—তার সবটাই সে করতে পারবে। বাঁধার সকলপ্রকার কৃত্রিম দেয়াল ভেঙে পরবে; শতাব্দীপ্রাচীন বশ্যতা আর দাস্যত্বের চিহ্ন বিলুপ্ত হয়ে উন্মুক্ত হবে স্বাধীনতার পথ। বস্তুত তাঁর পূর্ণ স্বাধিকার নিশ্চিত হবে।
আর এটিই ছিলো নারীমুক্তি আন্দোলনের মূল লক্ষ্য। তবে এই আন্দোলনের বাস্তবিক অর্জন (এখন পর্যন্ত) নারীর বিচ্ছিন্নতা। স্বাধীনতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া এসব আন্দোলন নারীর সব আনন্দ এবং পরিপূর্ণতার উৎস কেড়ে নিয়েছে। নামেমাত্র অধিকার প্রাপ্তি আধুনিক নারীকে পরিণত করেছে কৃত্রিম সত্ত্বায়। তাদের দেখলে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ফরাসি আর্বোরিকালচার (arboriculture) চর্চা; প্রত্যেকে যেনো পরিশীলিত উদ্যানের অদ্ভুত কায়দায় প্যাঁচানো পিরামিড বা চাকা আকৃতির গাছ। কৃত্রিমতার আড়ালে ঢাকা পরে যায় স্বকীয়তা। আমাদের চারপাশে কৃত্রিমতার ধারক ও বাহক এমন নারীর অভাব নেই। কথাটি তথাকথিত বৌদ্ধিক পরিধির ক্ষেত্রে বেশি প্রযোজ্য।
নারীর মুক্তি আর সমতা। আহা! সেসময়ের মহৎ ও সাহসী কিছু ব্যক্তির মুখে উচ্চারিত এসব কথা আমাদের মনে কী আশাই না জাগিয়েছিলো! নারী স্বাধিকারের সূর্যের পূর্ণ গৌরবে উদিত হওয়ার কথা ছিল, আমাদের উদ্ভাসিত করার কথা ছিলো। নিজের ভাগ্য নির্ধারণের অধিকারপ্রাপ্তির এই লক্ষ্যটি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। আর এই লক্ষ্য অর্জনে বহু নারীপুরুষ তাদের সর্বস্ব উৎসর্গ করেছিলো। অজ্ঞতা আর কুসংস্কারকে তারা মোকাবেলা করেছিলো দৃঢ়তা আর সাহসের সাথে।
স্বাধীনতার এই লক্ষ্যে আমিও বিশ্বাস রাখি। কিন্তু আজকের দিনের নারী মুক্তি সম্পর্কিত বোঝাপড়া এবং এর চর্চা সেই মহান লক্ষ্য অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। বর্তমানে সময়ের নারীরা এক অদ্ভুত চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে—প্রকৃত অর্থে স্বাধিকার অর্জনের পূর্বশর্ত স্বাধীনতার আধুনিক ধারণা থেকে নিজেকে মুক্ত করা। পুরো বিষয়টি আপাতবিরোধী শোনালেও এটাই বাস্তবতা।
তথাকথিত এই মুক্তি থেকে নারীর অর্জন কী? গুটিকয়েক রাজ্যে ভোটাধিকার চর্চার সুযোগ। কিন্তু তাতে কি হিতাকাঙ্ক্ষীদের সুন্দর ভবিষ্যতের স্বপ্নের একাংশও বাস্তবায়িত হয়েছে? মোটেই না। অনেকের কথা শুনলে মনে হয় সমাজে বিদ্যমান দুর্নীতির প্রাদুর্ভাবকে স্বীকার করতে তারা অপারগ। বিচার বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষের এরূপ প্রবণতা থেকে বেরিয়ে আসার জন্য এটাই যথাযথ সময়। দুর্নীতি কোনো একক ব্যক্তি বা রাজনীতিবিদের নৈতিকতার অভাবের (laxity of morals) ফলাফল নয়; সমস্যাটির একটি বস্তুগত ভিত্তি রয়েছে। রাজনীতি মূলত ব্যবসা এবং শিল্প (industrial) জগতের প্রতিচ্ছবি। আর এই জগত তার কার্যক্রম চালায় ‘যত দেবে তার চেয়ে বেশি নাও’, ‘ব্যয়কৃত অর্থের সর্বোচ্চ ভোগ করো’, ‘এক অপরাধীই অন্য অপরাধীর দোষ আড়াল করতে পারে’ – এর মতো মন্ত্রগুলোকে কেন্দ্র করে। শুধুমাত্র ভোটাধিকার দিয়েই নারী রাজনীতির এই কলুষতা দূর করতে পারবে—এমন ভাবনা আকাশকুসুম কল্পনা ছাড়া আর কিছুই না।
আর্টওয়ার্ক: ফিয়ার সূত্র: জ্যাঁ কুইক
নারীর স্বাধিকার পুরুষের সাথে তার অর্থনৈতিক সমতা নিশ্চিত করে। অর্থাৎ নারী তার ব্যক্তিগত পছন্দ অনুযায়ী পেশা ও কর্মজীবন বেছে নেওয়ার সুযোগ পায়। কিন্তু কাজের ক্ষেত্রে নিজের লক্ষ্য অর্জনের পথে নারীর বাঁধা হয়ে দাঁড়ায় তার প্রতিপালন (upbringing)। বেড়ে ওঠার সময় শারীরিক সহিষ্ণুতা বৃদ্ধির শিক্ষা তোলা থাকে ছেলেদের জন্য। মেয়েরা এই শিক্ষা বঞ্চিত। ফলত কাজের ক্ষেত্রে পুরুষের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে নারীরা প্রায়শই হিমশিম খায়। পুরুষ অধ্যুষিত কর্মক্ষেত্রে নিজের যোগ্যতা প্রমাণ করতে গিয়ে নারীর সব শক্তি নিঃশেষ হয়ে যায়। তীব্র শারীরিক ও মানসিক চাপ হয়ে ওঠে তার নিত্যসঙ্গী। খুব অল্পসংখ্যক নারীই তাদের কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অর্জনে সক্ষম হন। শিক্ষক, ডাক্তার, আইনজীবী, স্থপতি কিংবা প্রকৌশলী—যত বর্ণাঢ্য পেশা হোক না কেন, একজন নারী কখনোই তার পুরুষ সহকর্মীর সমান মর্যাদা বা পারিশ্রমিক পান না। আর যে গুটিকয়েক নারীর কাছে সেই পরম আরাধ্য সাফল্য ধরা দেয়, শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের কিছুই আর তাদের জীবনে অবশিষ্ট থাকে না। বিপুলসংখ্যক এসব কর্মজীবী নারীদের কাছে আমার প্রশ্ন—ঘরের বন্দি জীবন থেকে বেরিয়ে এসে কারখানা, ডিপার্টমেন্টাল স্টোর কিংবা অফিসের হাড়ভাঙ্গা খাটুনি আপনাদের ঠিক কতটুকু স্বাধীনতা নিশ্চিত করেছে? সারাদিন নিদারুণ পরিশ্রমের পর অধিকাংশ নারীর কাঁধে এসে পরে ঘর সামলানোর দায়িত্ব। দিনশেষে ঘর নারীর জন্য আর সুখের আলোয় থাকে না, পরিণত হয় শীতল, অগোছালো, আর বিষণ্ণ এক অঙ্গনে। মহান স্বাধীনতা, আহা! কাউন্টারের পেছনে কিংবা সেলাই মেশিন বা টাইপরাইটারে সামনে কাজ করতে করতে শ্রান্ত নারী বিয়ের প্রথম প্রস্তাবেই রাজি হয়ে গেলে তাতে অবাক হওয়ার কিছু থাকে না। বাবা মায়ের আগল থেকে মুক্ত হওয়ার জন্য একজন প্রাপ্তবয়স্ক তরুণী যতটা উন্মুখ, ঠিক ততটাই উন্মুখ কারখানার যাঁতাকলে পিষ্ট একজন যুবতী। জীবিকা নির্বাহের জন্য কিছু অর্থ ব্যতীত তথাকথিত স্বাধীনতা এমন কোনো প্রণোদনা সরবরাহ করে না যে একজন নারী এর জন্য সবকিছু ত্যাগ করবে। সর্বোপরি, অতি সমাদৃত এই স্বাধীনতা নারীর নিজের, প্রেমের এবং মাতৃত্বের সত্ত্বা বিলীন করে ফেলার এক ধীর প্রক্রিয়া।
তথাপি একজন কায়িক নারী শ্রমিকের জীবন পেশাগতভাবে যেকোনো ‘সম্ভ্রান্ত’ শিক্ষিকা কিংবা নারী চিকিৎসক, আইনজীবী আর প্রকৌশলীর চাইতে অনেক বেশি মানবিক এবং স্বতঃস্ফূর্ত। বাইরে পরিশীলিত জীবন বজায় রাখলেও রিক্ততা আর শীতলতা এসব অভিজাত নারীর দৈনন্দিন সঙ্গী।
স্বাধীনতার আধুনিক ধারণাগুলো অত্যন্ত সংকীর্ণ; প্রকৃতপক্ষে এগুলো নারীদের বেঁধে ফেলার ফাঁদ ছাড়া কিছুই না। অনেক পেশাজীবী নারীরা মনে করেন নিজের চেয়ে নিচু সামাজিক মর্যাদার কাউকে বিয়ে করা, প্রেম কিংবা মাতৃত্বের ‘বাঁধনে’ জড়ানো তাদের স্বাধীনতা এবং পেশাজীবনের কাল হয়ে দাঁড়াবে। সার্বক্ষণিক এই ভীতি আধুনিক স্বাধীন নারীদের একপ্রকার ব্রহ্মচর্য/ কুমারীত্ব পালনে বাধ্য করে। জীবনের অনেক গভীর অভিজ্ঞতা, হৃদয়ভাঙ্গন, আর অনিন্দ্য সুখের দর্শক হয়েই তার জীবন পার হয়ে যায়; সেগুলো উপভোগ করার সুযোগ আর তার হয়ে ওঠে না।
নারীমুক্তির বর্তমান ধারক ও বাহকেরা স্বাধীনতার মর্মার্থ সম্পূর্ণরূপে অনুধাবনে ব্যর্থ। নারীর জন্য উপলব্ধ সীমাহীন ভালোবাসা আর তীব্র আনন্দের স্থান সমসাময়িক নারীমুক্তির ধারণায় অনুপস্থিত।
স্বনির্ভর বা অর্থনৈতিকভাবে স্বাধীন নারীদের জীবন ঘটনাবহুল নয়; এই জীবন আবর্তিত হয় একটি ছোটো পরিধিকে কেন্দ্র করে। আর এটাই তাদের জীবনের ট্র্যাজেডি। সমকালীন নারীরা বিশ্বসংসার এবং মানুষের মনস্তত্ত্ব বিষয়ে পূর্ববর্তী প্রজন্মের নারীদের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন—এবিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। আর এই সচেতনতার দরুন এসময়ের নারীরা জীবনের নির্যাস খুঁজে পেতে আকুল। প্রাণশক্তি জাগিয়ে তোলা এবং জীবনের সাথে গভীরতর সংযোগ স্থাপনকারী এই নির্যাসের ধরা পাওয়ার মতো আধ্যাত্মিক গভীরতা তার নেই; সে একজন পেশাজীবী কলের পুতুল (professional automatons) মাত্র।
এরূপ পরিস্থিতিই যে এসময়ের বাস্তবতা হবে—এমনটা অনুধাবন করা কঠিন কিছু না। বিশেষত ‘নারী পুরুষের অধস্তন’ –এর মতো মান্ধাতার ধারণা দ্বারা রূপায়িত আধুনিক বাস্তবতা সম্পর্কে সচেতন যেকোনো ব্যক্তির পক্ষে বিষয়টি বোঝা খুবই সহজ। পুরোনো হলেও সমাজ এরকম নারীবিদ্বেষী ধারণা সযত্নে ধারণ করে। আশ্চর্যের বিষয় এই যে, অনেক স্বাধীন, আধুনিক নারীও এসব বস্তাপচা ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারেন না। বিদ্যমান ব্যবস্থা ভেঙে পরিবর্তনের স্বপ্ন দেখা প্রতিটি আন্দোলনকে নেতৃত্ব দেয় র্যাডিকাল ধারণায় বিশ্বাসী/দীক্ষিত কিছু মানুষ। রাজপথের পরিবর্তনকামী এসব ব্যক্তিরা নিজেদের দৈনন্দিন জীবনে এতটা র্যাডিকাল না। যেকোনো সাধারণ সংকীর্ণমনা মানুষের (average Philistine) মতোই তারা সম্ভ্রান্ত হওয়ার ভনিতা করে দিনাতিপাত করে। বিরোধী পক্ষের অনুমোদন তাদের পরম আরাধ্য। এমন অনেক সমাজতন্ত্রী আর নৈরাজ্যবাদীদের কথা আমরা জানি যারা ব্যক্তিগত সম্পদ আহরণকে চুরি মানলেও নিজেদের হিস্যার এক পয়সাও ছাড় দিতে প্রস্তুত নন।
এই একই সংকীর্ণমনা মানুষগুলোকে খুঁজে পাওয়া যাবে নারীমুক্তির আন্দোলনে। ট্যাবলয়েড সাংবাদিক আর দুর্বলচিত্তের লেখকেরা স্বাধীনচেতা নারীর এমন এক চরিত্র রচনা করেছেন যা ছাপোষা ব্যক্তি আর তাদের সঙ্গীদের মনে ভীতির সঞ্চার করে। নারী অধিকার আন্দোলনের সাথে সংশ্লিষ্ট নারীদের বিতর্কিত বিদ্রোহী হিসেবে উপস্থাপন করতো গণমাধ্যমগুলো; আন্দোলনরত প্রত্যেক নারীই যেনো আলোচিত/সমালোচিত লেখিকা জর্জ সান্ড (George Sand)। কোনো পরিস্থিতিতেই তিনি ভীত হতেন না। নারীপুরুষের মধ্যকার ‘আদর্শ’ সম্পর্কের ধারণাকেও খুব একটা তোয়াক্কা করতেন না তিনি। মোটকথা, নারীর স্বাধীনতা চিত্রায়িত হয় কাম আর পাপে পূর্ণ সমাজ বিচ্ছিন্ন বেপরোয়া জীবনের কামনা হিসেবে। স্বাভাবিকভাবেই এরকম উপস্থাপন আন্দোলনের সাথে যুক্ত নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদের ক্ষুব্ধ করে তোলে। গম্ভীর আর রসবোধহীন এই নেতারা এসব ভ্রান্ত দাবিগুলো উপেক্ষা না করে আলিঙ্গন করেন; তাদের সংগ্রাম যে উল্লিখিত চিত্রায়নের সম্পূর্ণ বিপরীত—সকল বিষয়টি বোঝাতে তারা উঠেপড়ে লাগেন।
‘পুরুষের হুকুমের দাস হয়ে থাকা নারী সত্তার বিকাশকে বাধাগ্রস্ত করে’—এই যুক্তিকে কেন্দ্র করে নারী আন্দোলন বিকাশ লাভ করে। তবে বর্তমানের কথা ভিন্ন। নারীরা এখন অনেকটাই মুক্ত এবং স্বাধীন (অন্তত আগের তুলনায় বেশি স্বাধীন)। সমাজ থেকে কলুষতা দূর করায় নারীর সক্ষমতা প্রমাণ করা সমসাময়িক নারীমুক্তি আন্দোলনের প্রাথমিক লক্ষ্য। তবে এটা অস্বীকার করার কোনো অবকাশ নেই যে, নারীর অধিকার আদায়ের আন্দোলন অনেক প্রতিবন্ধকতার দেয়াল ভেঙে ফেললেও নতুন নতুন আগল সৃষ্টি করেছে। স্বাধিকারের এই সংগ্রাম এমন কোনো শক্তিশালী নারীর প্রজন্ম তৈরি করতে পারেনি যারা প্রকৃত ও পূর্ণ স্বাধীনতা সামাল দিতে পারবে। সঙ্কীর্ণ ও গোঁড়া (Puritanical) দৃষ্টিভঙ্গি দ্বারা প্রভাবিত স্বাধীনতাকামী নারীদের অনুভূতির জগতে পুরুষের কোনো স্থান নেই। তাদের এই বিশ্বদর্শন পুরুষকে দেখে অপ্রয়োজনীয় এবং অসহনীয় সত্তা হিসেবে। একমাত্র ব্যতিক্রম ছিলো কেবল বাবা হিসেবে পুরুষের ভূমিকা। সেটাও সম্পূর্ণ জৈবিক কারণে। আশার কথা এই যে, অতি কঠোর বিশুদ্ধতাবাদীরাও মাতৃত্বের আকাঙ্ক্ষাকে কখনো অগ্রাহ্য করতে পারবেন না। নারী স্বাধীনতার সাথে পুরুষের স্বাধীনতা গভীরভাবে সম্পর্কিত। মুক্ত নতুন বিশ্বে ভূমিষ্ঠ শিশুর মায়ের ভালবাসা আর যত্নের যতখানি প্রয়োজন, ঠিক ততটাই দরকার বাবার উপস্থিতি। বিষয়টি মুক্তিকামী নারীরা অনেকসময় অগ্রাহ্য করেন। আধুনিক নারীপুরুষের জীবনের বিপর্যয়ের জন্য দায়ী মানব সম্পর্কের এই সংকীর্ণ ধারণা।
আর্টওয়ার্ক: ওমেন ই এ আর্মচেয়ার শিল্পী: পাবলো পিকাসো সূত্র: আর্টসি
প্রায় পনেরো বছর আগে নরওয়েজীয় লেখিকা লরা মার্হোম (Laura Marholm) Woman, a Character Study নামে একটি বই প্রকাশ করেন। তিনি নারী অধিকারের প্রচলিত ধারণার অগভীরতা ও সঙ্কীর্ণতা চিহ্নিত করা অগ্রদূতদের একজন। তাঁর মতে, স্বাধীনতার প্রথাগত ধারণার সীমাবদ্ধতা নারীর অন্তর্জগতে বিরূপ প্রভাব ফেলে। মার্হোমের লেখায় উঠে আসে অভিনেত্রী এলিওনোরা ডুসে (Eleonora Duse), গণিতবিদ সোনিয়া কোভালেভস্কি (Sonya Kovalevskaia), অকালে প্রাণ হারানো শিল্পী এবং কবি মারি বাশকির্টসেফের (Marie Bashkirtseff) মতো বেশ কয়েকজন বিখ্যাত ও প্রতিভাবান নারীর জীবন পর্যালোচনা। সাফল্যের জন্য তাদের সকলকেই বহু ত্যাগ স্বীকার করতে হয়েছিলো। অসাধারণ মেধাবী এবং সফল হলেও ব্যক্তিজীবনে তারা প্রত্যেকেই ছিলেন নিসঙ্গ। জীবনরস এবং ব্যক্তিগত পূর্ণতা তাদের হাতে ধরা দেয়নি। একাকীত্ব আর অস্থিরতা ছিলো তাদের নিত্যসঙ্গী। এই অসাধারণ চারিত্রিক পর্যালোচনাটি আমাদের সামনে একটি রূঢ় বাস্তবতা তুলে ধরে—নারীর মেধা ও মননের বিকাশের সাথে তাঁর সংবেদনশীল জীবনসঙ্গী খুঁজে পাওয়ার সম্ভাবনা ব্যস্তানুপাতিক। পুরুষেরা নারীকে একজন সঙ্গী, কমরেড ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানুষ হিসেবে কল্পনা করতে পারেনা; নারীর জৈবিক পরিচিতিই তাদের কাছে মুখ্য।
নিজেকে নারীর চেয়ে ঊর্ধ্বতন মনে করা দাম্ভিক পুরুষের পক্ষে লরা মার্হোমের বর্ণিত চারিত্রিক বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন নারীদের বরদাস্ত করা অসম্ভব। ঠিক একইভাবে, নারী ব্যক্তিসত্ত্বাকে উপেক্ষা করে কেবল তার বিচক্ষণতার প্রতি দৃষ্টিপাত করে—এমন পুরুষকে একজন নারীর পক্ষে মেনে নেওয়া কঠিন।
সাধারণত প্রখর বুদ্ধিমত্তা ও গভীর সংবেদনশীলতাকে প্রগাঢ় ব্যক্তিত্বের মাপকাঠি হিসেবে দেখা হয়। তথাপি আধুনিক নারীর বাস্তবতা ভিন্ন—বুদ্ধিমত্তা ও চারিত্রিক গভীরতা জীবনকে উদ্ভাসিত করার বদলে তার জন্য কাল হয়ে দাঁড়ায়। এক শতকেরও বেশি সময় ধরে মানুষ প্রচলিত বিবাহব্যবস্থার সমালোচনা করে আসছে। আমৃত্যু একসাথে থাকার প্রতিজ্ঞার (till death doth part) ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত এই ধর্মীয় বিবাহব্যবস্থা নারীর উপর পুরুষ কর্তৃত্বকে সমর্থন করে। নিজের পরিচিতি ও সামাজিক অবস্থান বিসর্জন দিয়ে স্বামীর আজ্ঞাবহ হয়ে নারী জীবন কাটাবে—এমনটাই আশা করা হয়। এটি বারংবার প্রমাণিত হয় যে, দাম্পত্যের চিরাচরিত সম্পর্কে নারীর ভূমিকা স্বামীর দাস এবং তাঁর সন্তানের ধারক হওয়াতেই সীমাবদ্ধ। এতো ত্রুটি আর অন্যায্যতা সত্ত্বেও বহু মুক্তমনা নারী অবিবাহিত থাকার চাইতে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে বেশি আগ্রহী; কেননা সামাজিক নিয়ম ও নৈতিকতার বেড়াজালে একজন অবিবাহিত নারীর জীবন দুঃসহ হয়ে ওঠে। এই বিদ্বেষপূর্ণ আচরণের বোঝা বহন করা সহজ নয়।
আধুনিক নারীদের আচরণের এমন অসঙ্গতির একটাই ব্যাখ্যা হতে পারে—স্বাধীনতার মর্মার্থ তারা কখনোই সত্যিকার অর্থে উপলব্ধি করতে পারেনি। অফিসের বস কিংবা স্বামীর মতো বাহ্যিক নিপীড়কের আগল ভেঙে ফেললেই মুক্তি অর্জিত হবে—এমনটাই তাদের ধারণা ছিলো। নিপীড়নের এই দেয়াল ভাঙতে গিয়ে তারা নিজেদের জীবন এবং মননে সামাজিক ও নৈতিক রীতিনীতির প্রভাবকে উপেক্ষা করে। বহিস্থ নিপীড়কের সাথে সমঝোতা হলেও নিজের ভেতর বেড়ে ওঠা সামাজিক স্বীকৃতির চাহিদাকে তারা ঘায়েল করতে ব্যর্থ হয়। ফলত তারা যেমন নারীমুক্তি আন্দোলনকারীদের সাথে একাত্মতা প্রকাশ করতে পারে, ঠিক তেমনি প্রৌঢ়া এবং বৃদ্ধ নারীদের সাথে কোনোপ্রকার বাকবিতণ্ডা ছাড়াই সময় কাটাতে পারে।
এই অভ্যন্তরীণ নিপীড়কেরা একজন নারীর চারপাশের মানুষের কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি—মা, বাবা, ভাই বা আত্মীয়রা কী বলবে? পাড়া প্রতিবেশী বা সমাজ কী বলবে? নৈতিকতার ঝান্ডাধারী, মানবীয় সত্ত্বাকে অবরুদ্ধকারীদের মতামতই বা কেমন হবে? অন্তরস্থ এসব কণ্ঠস্বরকে উপেক্ষা করে দৃঢ়তার সাথে নিজের অবস্থান জানান দিতে না পারলে একজন নারী নিজেকে প্রকৃত অর্থে স্বাধীন বলতে পারেনা। জীবনসঙ্গী নির্বাচন, সন্তান জন্মদান থেকে শুরু করে সব ক্ষেত্রে অনুমোদনের অপেক্ষা না করে ব্যক্তিগত অভিরুচি অনুসারে সিদ্ধান্তগ্রহণের ভেতরই প্রকৃত স্বাধীনতা নিহিত। নিজের ভেতর বেড়ে ওঠা ভালোবাসার তীব্র দাবীকে গ্রাহ্য করার সাহস কতজন নারী দেখাতে পারে?
ফরাসি লেখন জঁ রিব্র্যাক (Jean Reibrach) তাঁর লেখা New Beauty গ্রন্থে একজন আদর্শ মুক্তিকামী নারীর বর্ণনা দেন। এই আদর্শ রূপটি একজন সদয় ও মেধাবী তরুণী চিকিৎসকের মধ্য দিয়ে মূর্ত হয়ে ওঠে। মানুষকে শিশুযত্ন এবং পুষ্টি বিষয়ে তিনি পরামর্শ দেন; দরিদ্র মায়েদের বিনামূল্যে ওষুধ দেন তিনি। প্রায়শই তিনি পরিচিত এক যুবকের সাথে উন্নত ও স্বাস্থ্যকর ভবিষ্যতের বিষয়ে আলোচনা করেন। সামনের দিনগুলোতে পর্দা আর শতরঞ্জির পরিবর্তে পাথরের মেঝে আর দেয়ালের ব্যবহার কীভাবে জীবাণু আর ব্যাকটেরিয়াকে দূরে রাখবে—সে বিষয়ে ভবিষ্যদ্বাণী করেন তিনি। তাঁর পোশাক অত্যন্ত সাদামাটা এবং পেশাদার; বেশীরভাগ ক্ষেত্রেই তিনি কালো কাপড় পরিধান করেন। তরুণীর মুক্তমনা স্বভাব আর বুদ্ধিমত্তা সঙ্গী যুবকের মনে প্রথমে ধাক্কা দেয়। তবে ধীরে ধীরে চিকিৎসক তরুণীকে বুঝতে শেখেন তিনি। তারপর আচমকা একদিন যুবক বুঝতে পারেন তিনি সেই তরুণী চিকিৎসকের প্রেমে পরেছেন। তারা দুজনেই তরুণ। পোশাকে কাঠিন্য ধরে রাখলেও তরুণীর কালো পোশাকের কলার আর আস্তিনে জায়গা করে নেয় ধবধবে সাদা রঙ। সবাই হয়তো আশা করবেন যে যুবকটি প্রেম নিবেদন করছিলো। কিন্তু প্রেমের বশবর্তী হয়ে নাটকীয় কিছু করার মতো মানুষ সে নয়। নিখুঁত মাধুর্যের অধিকারী তরুণীর সামনে কবিতাপাঠের মাধ্যমে প্রেম নিবেদন সামঞ্জস্যহীন। হৃদয়ে জেগে ওঠা প্রেমকে যুবক অগ্রাহ্য করে এবং নিজের অনুভূতি লুকিয়ে রাখে। তরুণীও আত্মসংযমী ও যৌক্তিক; নিজের মনের উপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বজায় রাখে সে। পাঠক হিসেবে আমার মনে হয় যে, যদি তারা কখনো একে অন্যকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিতো, তবে যুবকটির জীবন কাটতো কঠিন শীতলতায়। পুরো সম্পর্কটাই হতো শীতল ও নিষ্প্রাণ। স্বাধীনতার নতুন ধারণার ভেতর আশাব্যঞ্জক কোনো কিছু যে আমি দেখতে বা কল্পনা করতে পারছি না—এটা স্বীকার করতে আমার কুণ্ঠা নেই। আধুনিক শীতল যথার্থতার (correctness) চাইতে পুরনো উন্মত্ত ভালোবাসা আমার বেশি প্রিয়; আমি ভালবাসি প্রেমের গান; আমার ভালো লাগে ডন হুয়ান (Don Juan) আর মাদাম ভেনাসের প্রেমের আখ্যান; আধুনিক ভালবাসার কাঠিন্যের চাইতে জ্যোৎস্নাস্নাত রাতে বাড়ি থেকে পালিয়ে যাওয়া প্রেমিক প্রেমিকাকে পরিবারের অস্বীকার, তা প্রতিবেশীদের রটনা আমার কাছে শ্রেয়। নিঃস্বার্থ আদানপ্রদান না হলে তাকে ভালোবাসা বলা যায়না ; তা কেবল পারস্পরিক লেনদেনের হিসাব রাখার খাতা।
শিল্পী: গাজবিয়া শিরি
আজকের দিনের নারী স্বাধীনতার সবচেয়ে বড় সীমাবদ্ধতা এর কৃত্রিম অটলতা ও সংকীর্ণতা। পেশাদারিত্ব আর কঠোর সামাজিক নিয়মনীতি মেনে চলতে গিয়ে নারীদের মন থেকে জীবনরস শুকিয়ে যায়, বিরাজ করে খাঁ খাঁ শূন্যতা। আমি লক্ষ্য করেছি যে, সন্তানদের সুখ স্বাচ্ছন্দ্যকে নিজের সত্তার কেন্দ্রবিন্দু মনে করা সাবেকি মায়েরা হাল ফ্যাশনের মুক্ত নারীদের চাইতে অনেক বেশি স্বাধীনতা উপভোগ করতেন। মুক্তির সাধকেরা আমাকে মোটেই পছন্দ করেন না। তাদের বিশ্বাসের সাথে একমত না হওয়ার দরুন তারা আমার শাস্তি কামনা করতেন। অগ্রগতিতে অতিরিক্ত গুরুত্ব আরোপকারী এসব সমালোচকেরা আমার যুক্তিকে অগ্রাহ্য করেন। অতীত নিখুঁত—এমনটা আমি কখনোই বলিনি। আমি কেবল বলতে চেয়েছি যে আমাদের দিদিমা ঠাকুমারা আমাদের চাইতে অনেক বেশি জীবনীশক্তির অধিকারী ছিলেন। তারা ছিলেন অনুরাগী, তীব্র রসবোধসম্পন্ন। সহজ সুন্দরের প্রতি তারা ছিলেন সহানুভূতিশীল। পেশাদারিত্ব আর কঠোরতা কলেজ আর অফিসগামী আধুনিক নারীদের মন থেকে স্ফূর্ততা শুষে নিয়েছে। তার মানে এই নয় যে আমি চাই নারীরা তাদের আগের জীবনে ফিরে যাক, নিজেদের জীবনকে রান্নাঘর আর বাগানের গণ্ডিতে বেঁধে ফেলুক।
উজ্জ্বল ভবিষ্যতের দিকে উদ্যমী অগ্রযাত্রায় আমাদের মুক্তি নিহিত। আমাদের প্রয়োজন পুরনো ঐতিহ্য আর অভ্যাস থেকে বেরিয়ে এসে অবাধ বিকাশের প্রতি মনোনিবেশ করা। নারীর স্বাধিকার অর্জনের লক্ষ্য অর্জনে নারীমুক্তি আন্দোলনের এখন পর্যন্ত অর্জন অতি সামান্য। তবে এই অর্জন অব্যাহত থাকবে, এমনটাই আশা করি। ভোটাধিকার বা নাগরিক অধিকার অর্জন অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। তবে ব্যালট বক্স কিংবা কোর্টরুম থেকে সত্যিকারের স্বাধীনতা আদায় হয় না; মুক্তির অর্জন শুরু হয় নারীর নিজের সত্তা থেকে। নিপীড়ন থেকে বেরিয়ে আসার প্রথম পদক্ষেপ স্বীয় প্রচেষ্টা। ইতিহাসে এমন অসংখ্য দৃষ্টান্ত রয়েছে। নারীদের অনুধাবন করতে হবে যে, স্বাধীনতা কেউ কারো হাতে তুলে দেয় না; এর জন্য কঠোর সংগ্রাম করতে হয়। একজন যতটা শক্তি আর উদ্যমের সাথে লড়াই করবে, সে ঠিক ততটাই স্বাধীনতা পাবে। সুতরাং, নিজের অন্তর্দ্বন্দ্ব নিরসন আবশ্যকীয়। রীতিনীতি, প্রথা আর সংস্কৃতির বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে আসা নারীর অবশ্যকর্তব্য। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে সমঅধিকারের দাবী তোলা যৌক্তিক এবং ন্যায়সঙ্গত। তবে ভালোবাসা পাওয়া এবং ভালবাসতে পারার অধিকার বেশি তাৎপর্যপূর্ণ। ‘প্রেয়সী বা মায়ের ভূমিকা নারীকে পুরুষের অধস্তন করে’—এই ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতে পারলে নারীরা তাদের আংশিক স্বাধীনতায় পূর্ণতা খুঁজে পাবে। স্বাতন্ত্র্য অর্জনের জন্য নারী—পুরুষের দ্বৈততার ধারণা থেকে বেরিয়ে আসা অপরিহার্য।
সংকীর্ণতা বিভক্ত করে, উদারতা ঐক্যবদ্ধ করে। আসুন আমরা একত্রিত হই। তুচ্ছ বিষয়ের ভিড়ে আমাদের বৃহৎ লক্ষ্যগুলো যেনো হারিয়ে না যায়। মানবসম্পর্কের সম্যক ধারণা লাভ করলে নারী পুরুষের ভেতর ‘কে কাকে নিয়ন্ত্রণ করলো’ আর ‘কে নিয়ন্ত্রিত হলো’—এই প্রশ্নগুলো আমাদের আর বিচলিত করবে না। একে অন্যকে ছাড়িয়ে যাবার প্রচেষ্টার পরিবর্তে আমাদের উচিত সবাইকে নিঃস্বার্থভাবে ভালোবাসা। ভালবাসার ভেতরেই আমরা খুঁজে পাবো পরিপূর্ণতা। এই পূর্ণতাই আমাদের শূন্যতার অনুভূতি দূর করবে; নারীমুক্তির ট্রাজেডিকে পরিণত করবে অসীম সুখের উৎসে।
ফ্যাসিবাদের প্রকৃতি নির্দেশক সবথেকে তাৎপর্যপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো ‘অতিমানবের কূলভক্তি’। এই কূলভক্তির জনক ছিল নিৎসে, যিনি ছিলেন আবার শোপেনহাওয়ারের শিষ্য; এবং শোপেনহাওয়ার ‘উপনিষদের দর্শনে স্বান্তনা’ খুঁজে পেয়েছিলেন। একারণেই সম্ভবত স্থূল বস্তুবাদের এর নিরেট অভিব্যক্তি ও রক্ষণশীল ভারতীয় জাতীয়তাবাদের আধাত্মবাদী ভাবাদর্শের মাঝে ঘনিষ্ঠ জ্ঞাতিত্ব রয়েছে। ফ্যাসিবাদ আসলে পুনরূজ্জীবনবাদী ধ্যানধারণা দ্বারা অনুপ্রাণিত জাতীয়তাবাদ। পুনরূজ্জীবন বাদের পরিণতি কী, তা দেখায় ফ্যাসিবাদের অনুশীলন। অন্যদিকে, ফ্যাসিবাদের ভাবাদর্শিক পটভূমি প্রকাশ করে যে, পুনর্জাগরণবাদ সামাজিক প্রতিক্রিয়াশীলতার আত্মাস্বরূপ; ফ্যাসিবাদ একটি ভাবাদর্শিক অস্ত্র যা প্রগতির (যে প্রগতির একটি পূর্বশর্ত বিপ্লব) বিরুদ্ধে লড়াই করে।
ফ্যাসিবাদের পিতামহ শোপেনহাওয়ার ছিলেন নৈরাশ্যবাদের প্রচারক৷ উপনিষদের “ঐশ্বরিক দর্শন” এর একজন প্রশংসক হিসেবে তিনি সারাজীবন হেগেলীয় দর্শনের বিপ্লবী সত্তার বিরুদ্ধে লড়ে গেছেন। তবে হেগেলীয় দর্শনকে দার্শনিকভাবে মোকাবেলা করা ছিল তার চিন্তাশক্তির বাইরে৷ একারণে প্রতিক্রিয়াশীলতার অক্ষম ক্রোধ অভিব্যক্ত হয় কুকথায়। প্রকৃতপক্ষে, শোপেনহাওয়ারের দর্শন ছিল ১৮৪৮ সালের বিপ্লবে পরাজিত জার্মান বুর্জোয়ার ভাবাদর্শ। পরাজয় থেকে তৈরি হতাশা প্রকাশিত হয়েছিল জীবনের কঠিন বাস্তবতা থেকে পালানোর আকুলতায়।
শোপেনহাওয়ারের মতে, প্রকৃতির অপরিবর্তনীয় ও নিত্য নীতির কারণেই মানুষ বাস করছে সবথেকে নিকৃষ্ট এক দুনিয়াতে। যেহেতু জীবনের এই অসহনীয় পরিস্থিতি গুলোকে পরিবর্তন করা যায় না, তাই এই ধরনের অসহনীয় পরিস্থিতি দ্বারা পূর্ণ এই পৃথিবী থেকে পালানোর আকুলতা অপ্রতিরোধ্য। স্বাভাবিকভাবেই, শোপেনহাওয়ারের পীড়িত আত্মা—যা পরাজিত জার্মান বুর্জোয়ার হতাশাকেই প্রতীকায়িত করতো—উপনিষদের দর্শনে সান্ত্বনা খুঁজে পায়। উপনিষদের দর্শন যুগের পর যুগ ধরে ভারতীয় জনগণকে জীবনের কঠোর বাস্তবতার মুখোমুখি হয়ে সেগুলো পরিবর্তনের সাহসী প্রয়াস থেকে বিরত রেখেছে। শোপেনহাওয়ারের দর্শনের সারবত্তা হলো মানব ইচ্ছাশক্তিকে অবমূল্যায়ন—যে ইচ্ছাশক্তিকে তিনি বর্ণিত করেছেন “সম্পূর্ণরূপে অশুভ ও হীন” হিসেবে। এই দর্শনের তাৎপর্য হলো সকল ধরনের প্রগতির বিরুদ্ধে নেতিবাচক মনোভাব৷ কেননা, প্রগতির বস্তুগত উপাদান সমূহ তাদের বিষষী অভিব্যক্তি খুঁজে পায় ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তিতে৷ এই মতবাদ ধারণ করার মাধ্যমে শোপেনহাওয়ার হিন্দু দর্শনের সাথে একই ভূমিতে দাঁড়ায়; হিন্দু দর্শনও আকাঙ্ক্ষাকে আত্ম-উপলব্ধির (যা প্রকৃত জ্ঞানের উৎস) পথে প্রধান প্রতিবন্ধক মনে করে। শোপেনহাওয়ারের দর্শন এতোটাই অন্তঃদ্বন্দ্বে পরিপূর্ণ যে দর্শনের একজন ক্রিটিকাল দার্শনিক এই মন্তব্যটি করতে বাধ্য হন:
যদি বিশ্ব এমন এক সত্তা হয়, যার অস্তিত্ব না থাকাই শ্রেয়, তবে দার্শনিকের চিন্তাও—যিনি নিজেও সেই বিশ্বের একটি অংশ—চিন্তা না হয়ে ওঠাই অধিকতর শ্রেয়। (ফ্রাঞ্জ মেহেরিং: অন দি হিস্ট্রি অব ফিলোসোফি”)
কিন্তু, একজন দার্শনিকের চিন্তা তার সময়ের প্রয়োজনীয়তা এবং যে সামাজিক ও ঐতিহাসিক অবস্থায় সে জীবন যাপন করেছে, তা দ্বারাই নির্ধারিত হয়। তিনি প্রতিক্রিয়াশীলতার দার্শনিক ছিলেন এবং অবস্থানগত কারণেই তিনি এর বাইরে যেতে পারেননি। শোপেনহাওয়ারের দর্শন এতোটাই প্রতিক্রিয়াশীল ছিল যে, ফ্যাসিস্টদের ঘৃণাপূর্ণ ইহুদিবিদ্বেষ ও নারী প্রশ্নে মধ্যযুগীয় দৃষ্টিভঙ্গির উৎস তার মাঝে খুঁজে পাওয়া যায়।
নিৎসে তার শিক্ষকের দর্শনকে আরো শাণিত করেন এবং ঘোষণা করেন যে, নিজেদের সহজাত “শয়তানি ও হীনতা” নিয়ে মানুষের লজ্জিত হওয়ার কোন কারণ নেই। যেহেতু, মানব ইচ্ছাশক্তি এরকমই, মানুষের উচিত তা অকপটে গ্রহণ করে নেয়া এবং তা নিয়ে গর্বিত হওয়া। শোপেনহাওয়ার জীবনকে দেখতো একটি অপরাধ হিসেবে। নিৎসে জীবনকে সংজ্ঞায়িত করেছেন “ভোগপরায়ণতা, রূঢ়তা, নিষ্ঠুরতা এবং অপরিচিত ও দুর্বলকে পরাভূত করা, অত্যাচার ও শোষণ করার আকাঙ্ক্ষা”-র অভিব্যক্তি হিসেবে। এগুলোই ফ্যাসিবাদের মৌলিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু নিজের শিক্ষকের নৈরাশ্যবাদ থেকে নিৎসে এরকম রণতান্ত্রিক মতবাদ তৈরী করতে পারলেন কিভাবে? প্রতিক্রিয়াশীলতার দর্শনের এরকম পুনঃসংগঠন সম্ভব হয়েছিল জার্মান সামাজিক-রাজনৈতিক জীবনে বুর্জোয়াদের অবস্থানের পরিবর্তনের ফলে।
শোপেনহাওয়ার নৈরাশ্যবাদ প্রচারের পরে জার্মানিতে বহুবিধ ঘটনা ঘটেছিল, যা সেখানকার বুর্জোয়াদের শক্তিশালী করে৷ তখন জার্মান বুর্জোয়ারা নিজেদের মনোভাবকে একটি ভিন্ন ভাষায় প্রকাশ করতে শেখে। নৈরাশ্যবাদ রূপান্তরিত হয় কৌপদর্শনে। জার্মান বুর্জোয়ারা রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলে ব্যর্থ হয়েছিল। ১৮৪৮ সালের বিপ্লব ব্যর্থ হয়, কারণ তারা বিপ্লবের সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল। কিন্তু, এই বিপ্লব ছিল একটি ঐতিহাসিক প্রয়োজনীয়তা; এটা হওয়ার কথাই ছিল। বুর্জোয়ারা বিপ্লবকে সফল করতে ব্যর্থ হলেও এটা পরবর্তীতে উপর থেকে চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল—বিসমার্কের শ্রেষ্ঠ কৃতি হলো একটি দুর্বল ও হতোদ্যম বুর্জোয়া শ্রেণিকে প্রুশীয় ভূমি অভিজাতন্ত্রের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগির অবস্থানে নিয়ে যাওয়া (যদিও এই সম্পর্কে জার্মান বুর্জোয়াদের অবস্থান ছিল অধীনস্ত)। সামাজিক অবস্থানে জার্মান বুর্জোয়াদের এই পরিবর্তন তাদের দর্শনকেও প্রভাবিত করেছিল।
পুঁজিবাদী বিকাশের পথ এখন আর বন্ধ নয়। একই কারণে, নৈরাশ্যবাদের কারণও রইলো না। কিন্তু এই নৈরাশ্যবাদ কোন স্বাস্থ্যকর আশাবাদ দ্বারা প্রতিস্থাপিত হয়নি। কারণ, স্বাস্থ্যকর আশাবাদ বিজয় দ্বারা অর্জিত আত্মবিশ্বাসের ফসল। প্রকৃতপক্ষে, জার্মান বুর্জোয়াদের জীবন তখনও বিশেষ সুবিধাপ্রাপ্ত সামরিক গোষ্ঠী ও ভূমি অভিজাতদের অধীনস্ত ছিল। জীবন তখনও ছিল “অশুভ ও হীন”। তাই, তারা ভাগ্যে যা আছে, সেটার সর্বোত্তম ব্যবহারে মনোনিবেশ করেন। এটার প্রতিফলন আমরা পাই নিৎশের কৌপকেন্দ্রিক দর্শনে।
জীবন একটি ক্ষণস্থায়ী ঘটনা; তাই, জীবন থেকে যতটা সম্ভব আদায় করে নেয়া উচিত। জীবনকে দেখার এই পুনপৌনিক আবর্তনের দৃষ্টিভঙ্গিকেও—যেখানে প্রত্যেকে শুধু নিজেকে নিয়ে ভাবে, পাশেরজন গোল্লায় যাক— একটি আধাত্মিক বাঁক দেয়া সম্ভব। যদি আমরা হিন্দু দার্শনিক মানদণ্ড গ্রহণ করি: “জীবন আমাকে গ্রাস করছে না, বরং আমি এর অধিপতি”। আধুনিক ভারতীয় বুদ্ধিজীবীদের আধ্যাত্মিক গুরু বিবেকানন্দ নিৎসেকেই প্রতিনিধিত্ব করেন, যখন তিনি সগৌরবে বলেন, “আমি মদ পান করি, কিন্তু আমি তা দ্বারা আচ্ছন্ন হই না।” তিনি সম্ভবত ইউরোপীয় প্রতিক্রিয়াশীল দর্শনের সেই নৈরাশ্যবাদী দার্শনিকের (নিৎশে) কাছ থেকে শিক্ষা নেননি। কারণ, বিবেকানন্দ তা শিখেছেন তার পবিত্র, ভারতীয় গুরুর থেকে। নিজস্ব খেয়ালি ভাষায় রামকৃষ্ণ প্রচার করেছেন, “শুকর খাওয়া ব্যক্তি ঈশ্বরের প্রতি অনুগত হতে পারেন। আবার, হবিষ্যি গ্রহণ করা ব্যক্তি হতে পারেন কামিনী-কাঞ্চনের দাস।” এটার মানে হলো, যদি কোন ব্যক্তি আধ্যাত্মিকতার পোশাক পরিধান করতে সক্ষম হয়, তবে স্থুল বস্তুবাদী জীবন যাপনে তার আর কোন বাঁধা নেই৷ বিংশ শতকের এই অবতারের শিক্ষা নিৎশের নৈরাশ্যবাদ থেকে ভিন্ন কিছু নয়। আসলে, রামকৃষ্ণের সমগ্র শিক্ষণী (যা বিবেকানন্দ যৌক্তিক ব্যাখ্যার মাধ্যমে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে চেয়েছে) এই ধারারই অংশ, যা আবার হিন্দুধর্মের মর্মকে প্রতিফলিত করে। যেহেতু, কলিযুগে আধ্যাত্মিকতার সর্বোচ্চ শিখরে পৌছানো সম্ভব নয়, তাই এ সময়ে মানুষের উচিত সংসারী হওয়া; সংসারী হওয়া কোন পাপ বা অন্যায় নয়, যদি তা ঈশ্বর আরাধনার উদ্দেশ্যে কোন মায়া ছাড়া করা হয়। বাস্তব জীবনে এই আধ্যাত্মিক আদর্শ ও মূল্যবোধ সাধারণত উপেক্ষিত হয়। এটা অবশ্য কখনোই বাস্তবতা ছিল না। সুদীর্ঘ কাল ধরে চলা এই বিভ্রমকে শেষ পর্যন্ত অপসারণ করা হয়েছে; তবে তা বিপ্লবী সাহসিকতার মধ্য দিয়ে নয়, বরং ভণ্ডামিপূর্ণ ধর্মধ্বজার মাধ্যমে। ইতিমধ্যে, পোশাকি আধ্যাত্মিকতাহীন স্থুল বস্তুবাদ ঈশ্বরের আশীর্বাদ লাভ করে ফেলেছে। (কিন্তু বস্তুবাদী দর্শন এখনো ট্যাবু হিসেবে রয়ে গেছে।) অনেক পূর্বেই নিজস্ব সামাজিক প্রয়োজনীয়তা নিঃশেষ হয়ে যাওয়ায় (জীবন সম্পর্কিত) ধর্মীয় দর্শন তার অসততা ও দ্বিভাব থেকে বের হতে পারে না।
পূঁজিবাদ সম্পর্কে নিৎশের দর্শন ভাবনা এই ভারতীয় পন্থাকেই অনুসরণ করে। নিৎশের গুরু শোপেনহাওয়ার মনে করতেন, মানবজীবন একটি অপরাধ ও (মানব) ইচ্ছাশক্তি “অশুভ ও হীন”। নিৎশে দ্বিমত না করে যুক্ত করলেন, যদি মানব জীবন অপরাধই হয়, তবে নিজের আধ্যাত্মিক সত্ত্বাকে দুষিত না করেই আপনি এই অপরাধে নিমজ্জিত হতে পারবেন। যতোক্ষণ পর্যন্ত আপনি নিজের ইচ্ছা শক্তির অধিপতি, ততোক্ষণ পর্যন্ত এই ইচ্ছাশক্তির হীনতা আপনার সত্ত্বার পবিত্রতাকে দূষিত করতে পারে না। সুতরাং, আপনি যা ইচ্ছা তা করতে পারেন—লাগামহীন ভোগ-লালসার পেছনে ছোটা, দুর্বলকে নিপীড়ন, পরাভূত ও আঘাত করা; বিবেকের কোন তাড়না ছাড়া নৈতিক বল নিয়েই আপনি তা করতে পারবেন; কেননা, এই দুনিয়াটাই সবথেকে নিকৃষ্ট দুনিয়া, আপনি যা-ই করেন না কেনো, তা এই দুনিয়াকে অধিক নিকৃষ্ট বানাবে না। নিৎশে শোপেনহাওয়ারের উপনিষদীয় দর্শন থেকে যৌক্তিকভাবে এই সিদ্ধান্ত গুলোতে পৌঁছেছেন। জীবনের সংকল্পের নেতিকরণ থেকে জন্ম নিয়েছে ক্ষমতার সংকল্প। জীবনের দুঃখ-দুর্দশা সম্পর্কে সহানুভূতি রূপান্তরিত হয়েছে তার প্রতি তীব্র ঘৃণায়। এভাবেই জন্ম গ্রহণ করেছে অতিমানবের কৌল। এবং এই অতিমান হিসেবে চিহ্নিত হচ্ছিল আধুনিক শিল্পের কাপ্তানরা।
অতিমানবরা “মুক্ত আত্মা”, “ভালো ইউরোপীয়ান”—দুনিয়ার জার্মান রক্ষাকর্তা এবং ‘আর্য আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি’-র গর্বিত অভিভাবক। ব্রিটিশদের সাথে ‘সাদাদের দায়’ বহন করার সভ্যকরণের মিশন গ্রহণে তারা প্রস্তুত। আসলে নিৎশের দর্শনের তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অভিব্যক্তি ছিল জার্মান সাম্রাজ্যবাদের জন্য সুবিধাজনক অবস্থান তৈরী—যার অর্থ ছিল উপনিবেশবাদী সম্প্রসারণ। ক্ষমতা ও লুণ্ঠন কেন্দ্রিক এই দর্শনের সবথেকে স্থুল অভিব্যক্তি হলো ফ্যাসিবাদ। (ফ্যাসিবাদের সবথেকে মৌলিক মতবাদ) অতিমানবের নিৎশীয় কৌলকে যথার্থভাবেই বলা হয়েছে “এটা সেই দর্শন যা বৃহৎ পুঁজিকে মহিমান্বিত করে এবং এভাবেই জনতার মাঝে তার জন্য আবেদন সৃষ্টি করে।” (মেহেরিং, ‘অন দি হিস্ট্রি অব ফিলোসোফি’)
ছবি: নাৎসী ভোটিং ক্যাম্পেইনের পোস্টার
উপনিষদের স্বর্গীয় দর্শন থেকে জার্মান সাম্রাজ্যবাদ এবং পরবর্তীতে, ফ্যাসিবাদের ভাবাদর্শ নির্মিত হয়। এই ভাবাদর্শ উপনিষদের অপব্যবহার কিংবা দূষিত রূপ ছিল না। দুনিয়াতে স্বীয়-ইচ্ছা অনুযায়ী অবাধ ক্ষমতা আরোপের বৈধতা সর্বদাই অধিবিদ্যক প্রাথমিক নীতি থেকে আসে, যে প্রাথমিক নীতি অন্য কোন নীতির অধীনস্ত নয়। এই অনুমিতির উপর নির্মিত ভারতীয় দর্শনও একসময় স্থুল বস্তুবাদের ভাবাদর্শে পরিণত হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন হবে শ্রেণি সম্পর্কের পুনর্বিন্যাস, যা বুর্জোয়াদের বল প্রয়োগের জন্য প্রয়োজনীয় ক্ষমতায় সজ্জিত করতে হবে। ক্ষমতার ভাগ দিলেই দেখা যাবে যে, বুর্জোয়ারা আমাদের আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির সুপ্রাচীন রূপ ও পরিভাষা ঝেড়ে ফেলে নতুন সামাজিক-রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে নিজেদের মানিয়ে নিচ্ছে। প্রকৃতপক্ষে, আমাদের স্বর্গীয় আধ্যাত্মিক দর্শন উঁচু শ্রেণির স্বার্থ রক্ষা ছাড়া কখনোই অন্য কিছু করেনি। তবে, একটি নির্দিষ্ট সময়ের শাসক শ্রেণির সামাজিক গঠন অনুযায়ী এই দর্শনকে তার রূপ ও পরিভাষা পরিবর্তন করতে হয়েছে এবং ভবিষ্যতেও হবে। এমনকি আজও ‘সত্য ও অহিংসা’-র স্বর্গীয় মতবাদ সামাজিক ক্ষোভ ও রাজনৈতিক বিদ্রোহের গতিকে প্রতিহত করার উদ্দেশ্যে ব্যবহৃত হচ্ছে। সাম্রাজ্যবাদ প্রদত্ত সীমাবদ্ধ ক্ষমতার স্বাদ এখনি আমাদের আধ্যাত্মিক জাতীয়তাবাদীদের ফ্যাসিবাদী কার্যক্রমের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। যে দেশের দর্শন (জার্মান) ফ্যাসিবাদের অগ্রদূতদের অনুপ্রাণিত করেছে, সে দেশে সম্ভবত এটা ঘটারই ছিল।
নিৎসের নির্মিত “মুক্ত আত্মা”-দের মাঝে ঈশ্বরের ‘বিভূতি’ রয়েছে। একারণেই স্বভাবতই তারা ‘শাসক’ ও ‘অধিপতি’ হবে; তাদের জন্মগত ‘অধিকার রয়েছে মানব পালকে শাসন ও অধীনস্ত করার’; যে মানুষরা ‘সহজাতভাবেই ক্ষমতাহীন এবং যাদের ভাগ্যই অন্যায্য আচরণের শিকার হওয়া’। মানুষের স্বভাবগত শয়তানি ও হীনতা সম্পর্কে শোপেনহাওয়ারের মতবাদ থেকে যৌক্তিকভাবে উদ্ভুত হয়েছে মানব সম্পর্ক নিয়ে নৈরাশ্যবাদী এই নিৎশীয় দর্শন৷ এই দর্শনের কারণেই নিৎশে ছিল সমাজতন্ত্রের উগ্র বিরোধী। একারণেই মার্ক্সবাদ বিরোধী ফ্যাসিবাদী ক্রুসেডের প্রাথমিক ভাবাদর্শিক গুরু হিসেবে ইতিহাসে আমরা নিৎশেকে খুঁজে পাই।
আর্য-ভারতীয় আধ্যাত্মিক জীবন-দর্শনের একটি কেন্দ্রীয় নীতি হলো আনন্দের সহিত জীবনের দুঃখ-কষ্ট ও দূর্দশাকে গ্রহণ করে নেয়া। নিৎশে এই নীতিতে দৃঢ় বিশ্বাসী ছিলেন এবং এ কারণেই তিনি ধারণা করতেন, শ্রমিক শ্রেণির অবস্থার প্রকৃত উন্নয়ন, কেবল তাদেরকে আনন্দের সহিত দুর্দশাকে মোকাবেলার শিক্ষাদানের মাধ্যমেই আনা সম্ভব। এটা খুব সহজেই বোঝা যায় যে, নিৎশের সমাজতন্ত্র বিরোধী প্রোপাগান্ডা আসলে ছিল গান্ধীবাদের আগাম ছায়া। সুতরাং, যদি গান্ধীবাদকে সংজ্ঞায়িত করা হয় ধর্মীয়-নৈতিক মতবাদের একটি সুসংগঠিত আকর হিসেবে—যা প্রাচীন ভারতীয় সংস্কৃতির সারমর্ম—তবে বলা চলে যে, এর আধুনিক রাজনৈতিক অভিব্যক্তি বিশ্ব ইতিমধ্যে প্রত্যক্ষ করেছে। একটি দার্শনিক ঐতিহ্য হিসেবে গান্ধীবাদ আমাদেরকে চালিত করেছে হিটলারবাদের অভিমুখে। ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের এই সত্যটা মাথায় রাখা উচিত৷ কেননা, ইতিহাসের যুক্তি ভারতেও ততটাই প্রয়োগযোগ্য, যতটা ছিল জার্মানিতে।
ফ্যাসিবাদের আধ্যাত্মিক গুরু (নিৎশে) বিশ্বাস করতেন যে, যা ধনীদের জন্য অসহনীয়, তা গরীবরা (শ্রমিক) বহন করতে সক্ষম; একারণে, তিনি মনে করতেন যে, শ্রমিকদের খুব সহজেই কষ্টভোগের (যা একটি পুণ্যকর্ম) শিক্ষা দেয়া যাবে। গান্ধীবাদও একই স্বরে বলছে, পুঁজিপতি ও শ্রমিক উভয়ই ঈশ্বরের সন্তান; এবং দরিদ্রদের উচিত না তাদের ধনী ভাইদের হিংসা করা। গান্ধীবাদ ত্যাগ ও দুর্দশাকে পূণ্য কর্ম হিসেবে মহামান্বিত করে। যদি এই গান্ধীবাদী মতবাদকে গ্রহণ করেই নেয়া হয়, তবে এই “পূণ্য” গুলোকে (ত্যাগ ও দুঃখ-দুর্দশা) বাস্তব করে তোলার জন্য গৃহীত সকল পদক্ষেপকে নীতি (নৈতিকতা) ও যুক্তি উভয় দিক থেকে বৈধতা দিতে হবে। একটি আদর্শ ধারণ করে লাভই বা কি, যদি না ব্যক্তি সেই আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য ত্যাগ স্বীকারে প্রস্তুত না থাকে? সাম্রাজ্যবাদী রাষ্ট্রের প্রশাসন পরিচালনায় দায়িত্বরত গান্ধীবাদীরা প্রমাণ করছে যে, তারা এই পূণ্য কর্মগুলোর অনুশীলন নিশ্চিতকরণে যেকোনো পদক্ষেপ গ্রহণে প্রস্তুত। কেননা, তাদের বিকৃত দর্শন অনুযায়ী, এই পূণ্যগুলোর অনুশীলনই সক্ষম হবে ভারতীয়দের উন্নত করতে।
শ্রেণি শোষণকে বৈধতা দানকারী নিৎসের দর্শনের সাথে হিন্দু দর্শনে বিদ্যমান ‘কর্ম’ ধারণার লক্ষণীয় সাদৃশ্য রয়েছে। প্রকৃতিপক্ষে, নিৎশের দর্শন যেন ভারতীয় ঈশ্বরেরই প্রতিধ্বনি: “গুন ও যোগ্যতা অনুযায়ী আমি চারটি বর্ণ তৈরী করেছি” (গীতা)। এই বর্ণ প্রথা বিভিন্ন জনগোষ্ঠীকে বিভিন্ন সামাজিক অবস্থায় স্থাপন করেছে। এই প্রথা যদি ঈশ্বর কর্তৃক নির্ধারিত হয়, তবে নিম্নকোটির চিরতরে এই অবস্থানে মানিয়ে নিতে হবে। স্বর্গীয় ইচ্ছা সামাজিক অসমতাকে চিরস্থায়ীত্ব প্রদান করেছে। দাসকে চিরদিনের জন্যই দাস হতে হবে! শাসক শ্রেণি নিজেদের ক্ষমতা ও ক্ষমতা থেকে লব্ধ সুযোগ-সুবিধাকে দেখে ঈশ্বরের উপহার হিসেবে, যা কেবল পাপীরাই তাদের কাছ থেকে কেড়ে নিতে চাইবে। গীতায় ঈশ্বর আরো ঘোষণা করেন যে, সকল পার্থিব ক্ষমতা তার নিজস্ব ক্ষমতারই বহিঃপ্রকাশ। ব্রাহ্মণদের যাজকীয় কর্তৃত্বকে ঈশ্বরের ক্ষমতার সম্প্রসারণ হিসেবে দেখানো হতো; অতীতের রাজা-বাদশাহরাও ঈশ্বরের অবতার হিসেবে শাসন করতেন; এমনকি আজকের দিনের পরজীবী ভূস্বামীরা নিজেদেরকে উপস্থাপন করেন কৃষক জনতার “সহজাত নেতা” বলে (যদিও তারা নিজেরাই এই কৃষক জনতার শোষক)। আবার, দেশীয় রাজারা ঐ সব সনাতনী জাতীয়তাবাদীদের সহায়তায় (নিজ রাজত্বে) স্বৈরতান্ত্রিক বল প্রয়োগ করে, যারা নিজেরা আবার ব্রিটিশ নিয়ন্ত্রিত প্রদেশগুলোতে প্রতিনিধিত্ব সূচক গণতন্ত্রের জন্য গোলমাল করছে।
“মানব পাল”-এর ভাগ্যে কেবল ক্ষমতাহীনতা ও অধীনস্ততা আরোপ করে নিৎশে বলেন: “প্রতিষ্ঠান পরিবর্তন দ্বারা পৃথিবীতে সুখ আসবে না। সুখ আসবে কেবল দুখি, বিষাদগ্রস্ত, করুণা প্রার্থী ও (সবসময় যারা অভিযোগ করায় ব্যস্ত) অভিযোগকারীদের অনুপস্থিতির মাধ্যমে।” এখানে আমরা আবারো খুঁজে পাই ভারতীয় দর্শনের প্রতিধ্বনি—যে ভারতীয় দর্শন আসলে ফ্যাসিবাদেরই দর্শন। পার্থিব বিষয়বস্তু মানুষকে সুখি করতে পারে না: সুখ একটি মানসিক অবস্থা, এবং তা বস্তুগত অবস্থার উপর নির্ভর করে না। সুখ মনন নির্ভর। অর্থ্যাৎ, কেবল নিজেকে সুখি ভেবেই আপনি সুখি হতে পারবেন।
যখন ভারতীয় জনগণকে সামাজিক অসাম্যের কথা বলা হয়, তখন তারা একই হাতে থাকা পাঁচ আঙুলের ভিন্ন ভিন্ন দৈর্ঘ্যের (অর্থ্যাৎ হাতের পাঁচ আঙুল তথা সবাই সমান হয় না) দিকে লক্ষ্য করতে বলেন। এটা তাদেরকে শিখিয়েছে ভারতীয় আধ্যাত্মিক সংস্কৃতি ও দর্শন। আরো শেখানো হয়েছে—নিজেদের সামাজিক অবস্থানকে নিজস্ব মেধা ও যোগ্যতার প্রতিফলন হিসেবে গ্রহণ করে নিতে। অবশ্য কেবল নিজেদের নিষ্ঠুর ভাগ্যকে মেনে নেওয়ার শিক্ষাই তাদের দেওয়া হয়নি, একইসাথে তাদেরকে শেখানো হয়েছে — প্রতিষ্ঠিত সামাজিক ব্যাবস্থাকে স্বর্গীয় ইচ্ছার অভিব্যক্তি হিসেবে দেখতে। নিৎশে আরো যুক্তি দিয়েছিলেন যে, “এতো এতো কঠিন ও কষ্টকর কাজ এখনো বাকি রয়েছে। তাই, কিছু কিছু মানুষকে এমন অবস্থায় রাখা উচিত, যা তাদেরকে এইসব কাজের জন্য উপযুক্ত করে তুলবে।” ভারতীয় প্রতিভার বিশেষ সৃষ্টি—বর্ণ প্রথা, পুরোপুরি এই নীতির উপর দাঁড়িয়ে রয়েছে। ফ্যাসিবাদের এই দার্শনিক (নিৎশে) বর্ণপ্রথা সম্পর্কিত আর্য চেতনা দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়েই সম্ভবত লিখেছিলেন, “এশীয় ও আফ্রিকার বর্বরদের এখানে নিয়ে আসা যেতে পারে, যাতে করে অ-সভ্যরা সর্বদাই সভ্য পৃথিবীর সেবা ও কল্যাণে ব্যবহৃত হতে পারে।” কেন নয়? আর্য ব্রাহ্মণরা কি তাদের ক্ষত্রীয় মিত্রদের সহায়তা নিয়ে ভারতীয় আদিবাসীদের শূদ্র হওয়ার চিরস্থায়ী দাসত্বে বন্দী করেননি? আপনি (অন্যের সাথে) যেমন আচরণ করেছেন, কেউ যদি আপনার সঙ্গে ঠিক তেমনটাই করে, তবে সেটা নিয়ে অভিযোগ করা ভণ্ডামি বা অন্যায়। কৌল সেবাধর্ম ভারতীয় আধ্যাত্মিক সংস্কৃতির একটি অংশ। এটা গান্ধীবাদের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য, আর গান্ধীবাদ সনাতনী জাতীয়তাবাদের ভাবাদর্শ। সেবাকে অধিবিদ্যক গুনের মোড়ক পড়ানো গেলে, দাসত্বকেও সম্মানের মর্যাদায় উন্নীত করা সম্ভব এবং এর পরিসরের উপর কোন যৌক্তিক সীমা আরোপ করা যায় না। তোমার উচিত সেবা করা, যখন কিনা তুমি ঈশ্বরের কৃপায় আশীর্বাদপ্রাপ্ত, যা তাঁর অধিক সৌভাগ্যবান শ্বেতাঙ্গ সন্তানদের মাধ্যমে কার্যকর থাকে।
নিৎশে মুক্ত-আত্মাদের ভালো ও মন্দ সম্পর্কিত নৈতিকতার উপরে স্থাপন করেন। কেননা, নিৎশের মতে, খ্রিস্টধর্মের জন্মলগ্ন থেকে ভালো-মন্দের এই নৈতিকতাকে দুর্বল মানব-পালরা ব্যবহার করেছে মুক্ত-আত্মাদের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের একটি হাতিয়ার হিসেবে। অতিমানবের নৈতিকতা নিয়ে নিৎশের কাজ ফ্যাসিবাদের বাইবেলে রূপান্তরিত হয়েছে। নিৎশে থেকে উদ্ধৃত এই অনুচ্ছেদ তার পরিচয় বহন করে: “ধর্ম শক্তিশালী ও স্বাধীন সত্ত্বাদের জন্য সর্বদাই একটি অস্ত্র। যারা শাসন করতে প্রস্তুত এবং যাদের নিয়তিই শাসন করা; বুদ্ধিমত্তা ও শিল্পের মিশ্রণ যাদেরকে গড়ে তোলে একটি শাসক জাতি হিসেবে, তারাই ধর্মকে ব্যবহার করতে পারবে। শাসন করার ক্ষেত্রে তারা যে প্রতিবন্ধকতার সম্মুখীন হন, তা দূর করার হাতিয়ার ধর্ম। ধর্ম অধীনস্তদের শাসকদের সাথে বেঁধে রাখে, তাদের ভিতরের সেই লুকায়িত ও সুপ্ত বিবেককে দমিয়ে দেয়—যা তাদের শাসকদের অমান্য করতে উদ্বুদ্ধ করতে পারত।
ধর্ম যখন সর্বময় ক্ষমতা অধিকার করতে চায়, নিজেকে একটি লক্ষ্যরূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, অন্যান্য উপায়গুলোর মধ্যে একটি উপায় হিসেবে না থেকে, তখন এর পরিণতি সর্বদা অকল্যাণকর হয়। ধর্ম যদি দার্শনিকদের হাতে গঠন ও লালনের একটি উপায় না হয়ে নিজেই চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে, তবে তা বিপর্যয় ডেকে আনে।
একটি সত্যিকারের সুস্থ ও উৎকৃষ্ট অভিজাত শ্রেণির মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো, তারা পরিস্কার বিবেক নিয়ে এই প্রস্তাব গ্রহণ করতে পারে যে, একটি বৃহৎ জনগোষ্ঠীকে তাদের স্বার্থে নিপীড়িত হতে হবে, মানবিক মর্যাদার নিচে নামিয়ে আনতে হবে, দাসত্বে পরিণত করতে হবে—শুধুমাত্র শ্রমের যন্ত্ররূপে।
অহমভাব হলো উচ্চ আত্মাদের স্বভাব। আমি ‘ঈগোবাদ’ বলতে বুঝি সেই দৃঢ় বিশ্বাস, যেখানে স্বভাবতই ধরে নেওয়া হয় যে, অপরেরা আমাদের মতো সত্তাদের অধীন হবে, নিজেদের উৎসর্গ করবে। এই ধরণের অহমবোধ উচ্চ আত্মাদের অন্তর্গত; এর মধ্যে কঠোরতা, জোরজবরদস্তি কিংবা খামখেয়ালিপনা নেই। বরং এটি হলো জগতের মৌলিক বিধান।
এর জন্য যদি আমি একটি নাম খুঁজতে চাই, তবে একে আমি বলব—ধার্মিকতা। (নিৎশে “Beyond Good and Evil”)
ফ্যাসিবাদের সকল মৌলিক নীতি নিৎশে দ্বারা নির্মিত হলেও, এই রক্তাক্ত আন্দোলনের ভাবাদর্শ উৎপাদনকারী হিসেবে আরো কয়েকজন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে। এদের মধ্যে বার্গসন ও জর্জ সোরেলের অনুসারীরা উল্লেখযোগ্য। এই আধ্যাত্মিক সিলসিলার তাৎপর্য অনুধাবন করতে হলে এটা মনে রাখা জরুরী যে, বার্গসন তার অধিবিদ্যাগত মতবাদের সাথে বস্তুর বিষয়গত বাস্তবতার সামঞ্জস্যবিধান করতে চেয়েছেন। বস্তুবাদী দর্শনকে প্রত্যাখ্যান করলেও, আধ্যাত্মিকতার মোড়কে স্থুল বস্তুবাদের চর্চা করেছেন তিনি। আধ্যাত্মবাদ তথা ভাববাদের প্রাথমিকতা স্বীকার করে তিনি বস্তুবাদ ও আধ্যাত্মিকতার একটি সংযুক্তি নির্মাণ করতে চেয়েছেন। এই প্রচেষ্টা দর্শনকে আবারো দ্বৈতবাদের দুষ্টচক্রে স্থাপন করেছে। অতীতে দ্বৈতবাদী দর্শনের রাজনৈতিক অভিব্যক্তি ছিল সামন্তীয় রাজতান্ত্রিক স্বৈরাচার; আজকের দিনে তা সংসদীয় গণতন্ত্রের অবসান ও ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা। দ্বৈতবাদী দর্শন ধর্মীয় মৌলবাদকে পুনরুত্থিত করে—যে ধর্মীয় মৌলবাদ মানুষ স্বরূপ ঈশ্বর ও তার দ্বারা সৃষ্ট জগতকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠে। এই আদিম ধর্মীয় ভাবনা নিজেই অবাধ (রাষ্ট্রীয়) ক্ষমতা প্রয়োগের একটি ভাবাদর্শিক প্রতিফলন—যা বর্তমান সময়ে ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রের (তথা বুর্জোয়া একনায়কতন্ত্রের) রূপ গ্রহণ করেছে। একটি বিপ্লবী শ্রেণি হিসেবে অতীতে বুর্জোয়ারা রাজাদের ঐশি অধিকারকে অস্বীকার করেছে; বর্তমানে একটি প্রতিক্রিয়াশীল শ্রেণি হিসেবে তারাই আবার ঐ কল্পিত-ঐশি অধিকারের দিকে ঝুঁকছে; নিজেদের ক্ষমতাকে টিকিয়ে রাখার জন্য অতীতে তারা যেসব সামাজিক প্রথার বিরুদ্ধে লড়েছেন, এখন তারা সেগুলোকেই সমর্থন করছে; রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্র, জনগণের উপর বলপ্রয়োগ, অর্থনৈতিক তাণ্ডব ও সামাজিক বর্বরতা সহ যেকোন পদক্ষেপ গ্রহণে তারা রাজি।
অবাধ ক্ষমতার প্রয়োগ এবং সর্বশক্তিমান ইচ্ছার সমর্থনে দার্শনিক-নৈতিক সম্মতি অতিমানবের কৌলিকতার ভিত্তি—এই কৌল অনিবার্যরূপে নিষ্ঠুরতা, সহিংসতা, বল প্রয়োগ ও নিপীড়নের জন্ম দেয় (সবগুলোই ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য)। একজন মুসোলিনি বা হিটলার, এই অতিমানব কৌলিলতারই মূর্তায়ন। অতিমানব হিসেবে তিনি আধ্যাত্মিক ইচ্ছার প্রতিনিধিত্ব করেন এবং পার্থিব বিষয়ে স্বাধীনতা, অধিকার, ন্যায্যতা অথবা নৈতিকতার মতো মানবীয় ধারণা দ্বারা সীমাবদ্ধ নন। একারণে পৃথিবীর এই রক্ষাকর্তা ও পুনর্জীবনদানকারী, কোন রাখডাক না রেখেই ঘোষণা করেন যে— স্বাধীনতা নাগরিকত্বের কোন অপরিহার্য উপাদান নয়; ব্যক্তি নাগরিক কেবল রাষ্ট্রের অবাধ ইচ্ছা ও ক্ষমতার মাঝেই প্রকৃত স্বাধীনতা উপভোগ করতে পারে৷ একইভাবে, বুর্জোয়া স্বার্থ রক্ষাকারী আধুনিক একনায়ক অতীতের সামন্ত প্রভুর মতো ঘোষণা করেন “L’État c’est moi”—”আমি নিজেই রাষ্ট্র”। সামন্ত প্রভুর মতো তিনিও ঐশি অধিকারের দাবি করেন। প্রুশিয়ার প্রধানমন্ত্রীত্ব গ্রহণকালে গোয়েরিং নিজেকে ঐ সব প্রুশীয় রাজাদের “সরাসরি উত্তরাধিকারী” বলে ঘোষণা করেন, যারা একইসাথে ছিলেন সর্বশক্তিমান বিশপ। এই সর্বশক্তিমানরা “পৃথিবীতে ঈশ্বরের প্রতিনিধি” হিসেবে শাসন করতেন; তাদের উত্তরাধিকারী হিসেবে ফ্যাসিবাদী একনায়করাও এই ঐশি অধিকার লাভ করেছেন।
হিটলারের মতে, রাষ্ট্রই সবকিছু এবং সার্বভৌম শক্তি রাষ্ট্রের গুটি হিসেবে বেঁচে থাকা ছাড়া ব্যক্তি নাগরিকের অন্য কোন অধিকার নেই। সার্বভৌম রাষ্ট্র নিজ খেয়াল খুশি অনুযায়ী যেকোন মুহুর্তে তার জীবন নিয়ে বাজি ধরতে প্রস্তুত। সার্বভৌম ক্ষমতার মধ্যযুগীয়-আধ্যাত্মবাদী রাজনৈতিক দর্শন যৌক্তিকভাবেই ফ্যাসিবাদীদের দায়িত্ব-জ্ঞানশূন্য যুদ্ধ-প্রোপাগান্ডার দিকে বাঁক নেয়। সার্বভৌম-সর্বশক্তিমান শাসকের অহমিকা অথবা খাম-খেয়ালিতা যেকোন সময় জনগণকে আহবান করতে পারে মলোখের (কাননবাসীদের ঈশ্বর, যার বেদীতে শিশুদের উৎসর্গ করা হতো) বেদীতে আত্মো-উৎসর্গ করতে। জাতীয় স্বার্থে কাজে লাগুক বা না লাগুক, রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য অথবা দেশপ্রেমের কর্তব্যের কারণে নিজেদেরকে উৎসর্গের জন্য জনগণকে সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হবে৷ জার্মান বুর্জোয়াদের মাঝে হিটলারের (ক্ষমতা গ্রহণের) পক্ষে সম্মতি উৎপাদন করা ভ্যান পাপেন, ফ্যাসিস্ট রাজনৈতিক দর্শনের এই ব্যবহারিক তাৎপর্য অত্যন্ত অকপটে ঘোষণা করেছেন। তার মতে: “নারীদের কাজ হলো ভবিষ্যৎ যোদ্ধা তৈরির জন্য সন্তান জন্ম দেয়া৷ যুদ্ধ ময়দানে প্রাণদানের থেকে উত্তম কোন জীবন-আদর্শ পৃথিবীতে নেই।” রক্তদানের এই ফ্যাসিবাদী কৌলিকতা মাতৃত্বকে অবমূল্যায়িত করে এবং ঠিক এ কারণেই তারা বস্তুবাদী দর্শনের অনুসারীদের সমালোচনা ও বাধার শিকার হয়৷ তখন ফ্যাসিস্টরা ধর্মধ্বজধারী ভন্ডামির পথ গ্রহণ করে। তাদের অভিযোগ বস্তুবাদী দর্শনের অনুসারীরা পবিত্র পরিবারকে ভেঙে ফেলতে চায়। অবশ্য, সনাতনী ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের কানে আত্মউৎসর্গের এই ফ্যাসিবাদী আহবান পরিচিতই শোনাবে—তারা ক্ষত্রীয় গুণাবলির এক মনোরম প্রতিধ্বনিই শুনতে পাবে এই ফ্যাসিবাদী আহবানে।
“জাতীয় সমাজতন্ত্র” বা “হিটলার” উভয়ই মধ্যযুগীয় প্রুশীয়বাদের বিভৎস ভূত। ভারতে এখনো যা ক্ষত্রীয় গুন বলে মহিমান্বিত হয়, তারই প্রতিনিধিত্ব করে প্রুশীয়বাদ। যখন জনগণ ভূমিদাসত্বে বন্দি ছিল, তখন তাদের কাছে এই ক্ষত্রীয় ‘গুন’ প্রচার করা হতো। সামন্ত প্রভুর ভূমিদাসদের (ভারতীয় ও প্রুশিয় উভয়ই) অনেক সময়ই চাষের ক্ষেত ছেড়ে তরবারি ধরতে হতো। এই পেশাগত পরিবর্তন যেহেতু তাদের নয়, বরং সামন্ত প্রভুদের ইচ্ছার উপর নির্ভরশীল ছিল (ঐ সময়ে ক্ষেতে খাটার থেকে ডাকাতি বেশী লোভনীয় পেশা ছিল), সেহেতু, ক্ষত্রীয় গুনের ভাবাদর্শ তথা মহিমা তাদের মাঝে স্থাপন করা প্রয়োজনীয় ছিল। একারণেই, যুদ্ধ ক্ষেত্রে মৃত্যুর আদর্শ মহাকাব্যে মহামান্বিত হয়েছে এবং প্রচারিত হয়েছে বহুবিধ কিংবদন্তি আখ্যানে। প্রকৃতপক্ষে, জনগণের মাঝে বীরত্ব সম্পর্কে এক বিকৃত ধারণা নির্মাণের জন্য এই মহাকাব্য গুলো রচিত হয়েছে; প্রুশীয় জাতীয়তাবাদের মতোই ক্ষত্রীয় বীরত্ববাদের ব্যবহারিক মূল্য ছিল সামন্ত প্রভুর ক্ষমতার সম্প্রসারণ। যদিও কখনো কখনো প্রভুরাও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তবে একে দেখতে হবে এই খেলার অংশ হিসেবে। ফটকাবাজি ও রোমাঞ্চের লাভ-ক্ষতি উভয়ই রয়েছে।
“এটা আমাদের সমাধি ফলকে লেখা হোক: আমরা কঠোর ছিলাম, আমরা নিষ্ঠুর ছিলাম; কিন্তু আমরা ভালো জার্মান ছিলাম” (হিটলার)। অতিমানবের কৌলিকতা হিটলারবাদের আরেকজন নায়ককে সক্ষম করেছিল এটা ঘোষণা করতে: “নিজের তৈরী আইন ভাঙার সাহস রাষ্ট্রের থাকতে হবে”। দুনিয়াতে এই ধরনের অবাধ ও অনিয়ন্ত্রিত ক্ষমতা চর্চার নৈতিক সম্মতি কেবল এমন একটি অতিপ্রাকৃতিক আধ্যাত্মবাদী শক্তি তথা সর্বশক্তিমান স্বর্গীয় ইচ্ছার ছদ্ম-দার্শনিক ধারণার মাঝেই পাওয়া সম্ভব, যা কোন ধরনের প্রাকৃতিক আইন দ্বারা সীমাবদ্ধ হবে না, কিন্তু তার ভূমিকা হবে সকল মানুষের ভাগ্যকে নিয়ন্ত্রণকারী এক সার্বভৌম শক্তির। এটাই ফ্যাসিবাদের দর্শন, যার সারবত্তা হলো অতিমানবের কৌলিকতা । এটা এমন একটি দর্শন, যার সাথে বেদান্ত দর্শনে বিদ্যমান ভারতীয় আধাত্মবাদের লক্ষণীয় মিল পাওয়া যায়। দুনিয়াকে ঈশ্বরের লীলা হিসেবে দেখা ভারতীয় দ্বৈতবাদী দর্শনের সাথেও এর সাদৃশ্য রয়েছে। ঠিক এই দার্শনিক জ্ঞাতিত্বের কারণেই স্পেঙ্গলার, স্প্যান, কেইজারলিং সহ জার্মান ফ্যাসিবাদের অনেক ভাবাদর্শিক নির্মাতা প্রাচ্যের আধ্যাত্মবাদী দর্শনকে প্রশংসা করে—তাদের মতে, প্রাচ্যের বার্তাই পারবে আধুনিক পাশ্চাত্যকে ক্ষয় থেকে রক্ষা করতে।
ফ্যাসিবাদের দর্শন ও ভারতীয় আধ্যাত্মবাদ সারগত ভাবে অভিন্ন। যদি ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদী সভ্যতাকে বাঁচাতে সক্ষম হয়, তখন ভারতের আধ্যাত্ম সম্ভবত একটি প্রতিরূপ গৌরবের দাবি করতে পারে। কিন্তু এর মাধ্যমে বস্তুবাদের দুনিয়া মুক্ত হবে না। বরং, তা স্থুল বস্তুবাদের প্রভুত্বে মানবতাকে বন্দী রাখার প্রক্রিয়া অব্যাহত রাখতে সাহায্য করবে। এই ধরনের ‘গৌরব’ আনা দর্শন নিয়ে আমরা কি গর্বিত হতে পারি? যুগের পর যুগ ধরে একটি মিথ্যা আদর্শ লালন করার জন্য এই গৌরব কি আমাদের লজ্জিত করবে না? এই প্রশ্নগুলো প্রাসঙ্গিক এবং সেই সকল ভারতীয় জাতীয়তাবাদীদের এই প্রশ্নগুলো নিয়ে ভাবা উচিত, যারা চিন্তা করতে জানেন, যারা পূর্ব সংস্কার দ্বারা চালিত নন অথবা যারা সচেতন প্রতিক্রিয়াশীল নন—অর্থাৎ, সম্ভাব্য ফ্যাসিস্ট নন।
ফ্যাসিবাদ অপেক্ষাকৃত নতুন একটি সামাজিক-রাজনৈতিক ঘটনা। এর আবির্ভাব ১৯১৯ সালে ইতালিতে। তারপর থেকে এটি ইউরোপের সমস্ত দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এই দেশগুলোর মধ্যে বেশ কয়েকটিতে ফ্যাসিবাদ পূর্ণ বিজয় অর্জন করেছে। আকস্মিক উপস্থিতি এবং দর্শনীয় অগ্রগতি স্বাভাবিকভাবেই ফ্যাসিবাদকে হাল আমলের অসামান্য আলোচ্য বিষয় করে তুলেছে। এর দ্বারা সংঘটিত নৃশংসতা সমগ্র প্রগতিশীল ও স্বাধীনতাকামী বিশ্বকে হতবাক করেছিল। এর পক্ষে কিংবা বিপক্ষে অনেক কিছু লেখা হয়েছে। কৈফিয়তবাদী আর স্তাবকেরা না চাইলেও ফ্যাসিবাদকে রাজনৈতিকভাবে পশ্চাদগামী এবং সামাজিকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল আন্দোলন হিসাবে নিন্দা করা হয়েছে। ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদকে শক্তিশালী করার জন্য হিংসাত্মক প্রচেষ্টা হিসাবে চিহ্নিত করা হয়েছে একে। মহাযুদ্ধের (প্রথম বিশ্বযুদ্ধের) ধ্বংসাত্মক পরিণতি দ্বারা সৃষ্ট বিশৃঙ্খল পরিস্থিতিতে এর বাড়বাড়ন্ত শনাক্ত করা যায়। জার্মানিতে ফ্যাসিবাদের সাফল্যের যুক্তিসঙ্গত ব্যাখ্যাও দেওয়া হয়েছে।
কিন্তু এসব সত্ত্বেও আমাদের সময়ের এই দানবীয়তা নিয়ে অনুসন্ধান এখনও পর্যাপ্ত পরিমাণে তীক্ষ্ণ নয়। ঐতিহাসিকভাবে, এটি যুদ্ধ-পরবর্তী বিকাশ নয়। এমন ব্যাপক সামাজিক-রাজনৈতিক আন্দোলন হঠাৎ করে ঘটতে পারে না। ইতিহাসের যথেষ্ট দীর্ঘ সময়ব্যাপী দার্শনিক চিন্তাধারার বিকাশের যৌক্তিক পরিণতি এই ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ। ফ্যাসিবাদ যদি একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়, তবে তার আদর্শগত ভিত্তির অবস্থান অবশ্যই এর দার্শনিক প্রতিক্রিয়ায়। বলা হয় ফ্যাসিবাদের কোনো দর্শন নেই। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা যা ঘটনাটি সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে। ফ্যাসিবাদের একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন রয়েছে যা দীর্ঘ সময় ধরে বিকশিত হয়েছে। একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ হিসাবে তার উপস্থিতির নজির অনেক আগের। ফ্যাসিবাদের অবস্থান আধুনিক বৈজ্ঞানিক দর্শনের বিপরীতে যা অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বিপ্লবী সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে আদর্শ প্রদান করেছিল।
ফ্যাসিবাদের দর্শন হেগেল-পরবর্তী অতি-আধুনিক দৃষ্টবাদ, নয়া-বাস্তববাদ এবং অভিজ্ঞতাবাদের ছদ্ম-বৈজ্ঞানিক স্কুলগুলোর [চর্চিত] ভাববাদের যৌক্তিক পরিণতি। এই দর্শন ভাববাদকে প্রত্যাখ্যান করার ভান করলেও এক নতুন ধরনের অধিবিদ্যক রহস্যবাদ পুনঃপ্রতিষ্ঠার চেষ্টা করেছিল। ছদ্ম অথবা অসৎ আদর্শবাদের ওই স্কুলগুলি প্রয়োগবাদ এবং নব্য-হেগেলবাদে এসে তাদের চরম শিখরে পৌঁছেছিল। প্রথমটি (প্রয়োগবাদ) “অর্বাচীন বস্তুবাদের ইন্দ্রীয়সুখ নির্ভর উদরপূর্তির দর্শন” (অধ্যয়ন) কে “ধর্মীয় অভিজ্ঞতার” সাথে সমন্বয় করে; অন্যদিকে দ্বিতীয়টি (নব্য হেগেলবাদ) জঙ্গি প্রতিক্রিয়ার উদ্দেশ্যে হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতার বিপ্লবী অস্ত্রকে বিকৃত করে। নৈতিকতা, ন্যায়বিচার এবং স্বাধীনতার সমস্ত পার্থিব মান লঙ্ঘন করে, ফ্যাসিবাদ দাবি করে, তারা ঈশ্বর-মনোনীত।
ইতালীয় ফ্যাসিবাদের সরকারি দার্শনিক জিওভান্নি জেনতিলে সর্বপ্রথম এই দাবি তোলেন। তিনি লিখেছেন: “মানুষ স্বভাবতই ধর্মীয়। চিন্তা করার মানে ঈশ্বরের আরাধনা করা। যত বেশি চিন্তা করা হয়, তত বেশি মানুষ নিজেকে ঈশ্বরের উপস্থিতিতে অনুভব করে। মানুষের সাপেক্ষে ঈশ্বরই সবকিছু। মানুষ কিছুই নয়।” (“ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি”)। রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া এবং সামাজিক বর্বরতাকে ন্যায্যতা দিতে ফ্যাসিবাদের এই দার্শনিক আধুনিক ইউরোপীয় সংস্কৃতির অন্যতম মৌলিক নীতি মানবতাবাদকে প্রত্যাখ্যান করেন। মানুষকে তার ধর্মীয় কর্তৃত্ব থেকে মুক্তি পেতে হয়েছিল পার্থিব স্বাধীনতার সংগ্রাম শুরু করার আগে। আর মানুষের কঠোর পরিশ্রমে অর্জিত রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও নাগরিক অধিকার কেড়ে নিতে হলে, তাকে রেনেসাঁ যুগ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে প্রাপ্ত আত্মিক মুক্তি থেকে বঞ্চিত করতে হয়।
ফ্যাসিবাদী দর্শনের প্রচারিত মানুষের অতিধার্মিক আত্মবিলোপ অর্বাচীন বস্তুবাদেরই একটি প্রকাশ যা দার্শনিক বস্তুবাদের বিপ্লবী মতবাদগুলোর বিরুদ্ধে বিদ্রোহ আকারে জেগে ওঠে। ফ্যাসিবাদী বিশ্বাসে বিশ্বাসী মরণশীল মানুষ নিজেকে প্রতীকীভাবে সর্বব্যাপী ঈশ্বরত্বে বিলীন করে, যেন সে সর্বশক্তিমানের একটি যন্ত্ররূপে পুনর্জন্ম লাভ করতে পারে—যার (সর্বশক্তিমানের) ইচ্ছা ও কার্যকলাপ পৃথিবীর সকল নীতিনিয়মের ঊর্ধ্বে। বর্বরতা ও হিংসার কার্যাবলীকে যেন একটি সর্বজনীন ঐশ্বরিক উদ্দেশ্য পূরণে সংঘটিত বলে ন্যায়সঙ্গত প্রতিপন্ন করা যায়, সেজন্য যে চিন্তার প্রক্রিয়ায় এইসব কাজ সংঘটিত হয়, তাকে ভণ্ডামিপূর্ণভাবে ‘ঈশ্বরচিন্তা’ হিসেবে কল্পনা করা হয়।”
“এই সকল কার্যকলাপ ঈশ্বরপ্রণোদিত। ঈশ্বর পচে যাওয়া ও বিপর্যস্ত পুঁজিবাদকে তাঁর আশ্রয়ে গ্রহণ করেন, এবং অশালীন বস্তুবাদের এই পরিত্যক্ত ব্যবস্থার প্রতিটি উগ্র রক্ষক হয়ে ওঠে এক এক জন ঈশ্বরপ্রণোদিত, অলৌকিক যন্ত্র। আত্মবিলোপের এই কূটকৌশলের মাধ্যমে সে নিজের জন্য সংরক্ষণ করে সীমাহীন ইচ্ছাশক্তির স্বাধীনতা—যা অন্যদের থেকে কেড়ে নেওয়া হয়। ফ্যাসিবাদী হলো অতিমানব। তবুও, আত্মবিসর্জনের অতির্ধর্মীয় মতবাদ ফ্যাসিবাদের বহুরূপী দার্শনিককে “মানবের অনন্ত ও অমর সারবস্তু” আবিষ্কার করতে বাধা দেয় না।
একটি জীর্ণ-শীর্ণ সামাজিক ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার ঐতিহাসিকভাবে অসম্ভব কাজের জন্য, এই “পবিত্র মিশনে” নিয়োজিত মানুষের সম্ভাবনাকে “অসীম, শর্তহীন এবং স্বাধীন” হতে হবে। আত্মবিসর্জনের মতবাদ এবং ফ্যাসিবাদের সর্বশক্তিমানতাবাদের আরাধনার এই নির্লজ্জ বৈপরীত্যকে “দার্শনিক” ব্যাখ্যা দিতে জেনতিলের কোনো অসুবিধা হয় না। তিনি একজন নব্য-হেগেললীয় এবং জানেন কিভাবে দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির অপব্যবহার করে নিজের উদ্দেশ্য সাধন করতে হয়। প্রয়োগবাদ, অর্থাৎ সুবিধাবাদী “আধ্যাত্মিক” দর্শনও তাকে সাহায্য করে। তিনি যেহেতু শেখান “ভাবনা মানেই ঈশ্বরের ধ্যান”, সেহেতু তিনি যা করেন, তা তিনি সম্ভবত এক অসাধারণ দ্বান্দ্বিক দক্ষতার কৃতিত্ব বলে মনে করেন।
“ঈশ্বর এবং চিন্তা (যথাক্রমে) জীবনের দুটি বিপরীত মেরুর প্রতিনিধিত্ব করে; উভয়ই প্রয়োজনীয় এবং উভয়ই অপরিহার্য, তবুও একে অপরের বিরোধী এবং বিরোধিতাকারী” (“ফ্যাসিবাদ এবং সংস্কৃতি”)। আবার ঈশ্বর ও মানুষকে বলা হয়েছে একটি “নমনীয় ঐক্য, যা আত্ম-উপলব্ধির চিরন্তন গতিতে চলে—একটি জীবন্ত এবং সে কারণেই অস্থির ঐক্য, যা সর্বদা নিজের প্রতি অসন্তুষ্ট” (ঊহ্য)। এই হেগেলীয় দ্বান্দ্বিকতার তদ্ভবরূপে এই নব্য-স্কলাস্টিক দর্শন হিন্দু আধ্যাত্মবাদের সঙ্গে বিস্ময়করভাবে সাদৃশ্যপূর্ণ। আধ্যাত্মবাদ তো শেষমেষ মানসিক বিভ্রান্তিই, যা পরীক্ষামূলকভাবে প্রদর্শিত বৈজ্ঞানিক সত্য এবং যুক্তিসঙ্গতভাবে প্রতিষ্ঠিত দার্শনিক ধারণাগুলিকে প্রত্যাখ্যান করার জন্য অস্পষ্টতার আশ্রয় নেয়। “চিন্তা হলো ঈশ্বরের ধ্যান, অথচ চিন্তার সঙ্গে ধ্যানের বিষয়বস্তুর সম্পর্ক বিরোধের ও বৈপরীত্যের!” ধ্যান যদি হয় নিষ্ক্রিয় অবস্থা, আর বিরোধিতা হয় সক্রিয় কার্যকলাপ—তবে একই বস্তুকে ঘিরে এই দুটি বিপরীত সম্পর্ক কিভাবে একসাথে যুক্ত হতে পারে, তা যুক্তিবোধসম্পন্ন মানসের বোধগম্য নয়।
কিন্তু আধ্যাত্মবাদী ধারণাগুলি যুক্তির পরিধির বাইরের বিষয়। সুতরাং, চিন্তাকে ধ্যানের সঙ্গে একীভূত করার বিষয়টি জ্ঞানতাত্ত্বিক উদ্ভাবন। আমরা যখন কোনো বিষয় নিয়ে চিন্তা করি, তখন আমরা তা নিয়ে জ্ঞান অর্জন করি। ধ্যান আমাদের এমন কোনো ফলাফল দেয় না। ধ্যানের অর্থ হলো—যা ইতিমধ্যে জানা, তাতে মনোযোগ কেন্দ্রীভূত করা। যদি কেউ ধর্মীয় পূর্বধারণা নিয়ে শুরু করে, তবে সে ঈশ্বরকে আরোপ করা গুণাবলী নিয়ে ধ্যান করতে পারে। কিন্তু তার নিজের পূর্বধারণাগুলিই ধ্যানের বিষয়কে এমন এক স্থানে স্থাপন করে, যা ‘চিন্তা’ নামে পরিচিত মানসিক কার্যকলাপের নাগালের বাইরে। অতএব, চিন্তাকে ধ্যানের সঙ্গে এক করে দেখা, হয় চিন্তার নিছক বিভ্রান্তি, নয় তো ইচ্ছাকৃতভাবে জ্ঞানতত্ত্বের মূল নীতিকে বিকৃত করা।
দর্শনের দৃষ্টিকোণ থেকে এই আধ্যাত্মবাদ যতই বিভ্রান্তিকর ও অন্ধকারাচ্ছন্ন হোক না কেন, তার বাস্তব পরিণতি অত্যন্ত স্পষ্ট। এগুলি সবচেয়ে নিম্নমানের অর্থে বিশুদ্ধ বস্তুবাদী। হেগেলীয় রাষ্ট্রতত্ত্ব থেকে অনুপ্রেরণা নিয়ে, জেনতিলে ফ্যাসিবাদী স্বৈরশাসনের জন্য ধর্মতাত্ত্বিক অনুমোদন উদ্ভাবন করেন। “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র ধর্মসহ সমস্ত আধ্যাত্মিক মূল্যবোধকে অন্তর্ভুক্ত ও ধারণ করে… রাষ্ট্র যদি অন্য কোনো সার্বভৌম শক্তিকে সহ্য করে, তবে তা আত্মহত্যার সামিল। যা কিছু আধ্যাত্মিক/ধর্মীয় তা স্বাধীন—কিন্তু সেই স্বাধীনতা রাষ্ট্রের বিপুল ক্ষমতার (যে রাষ্ট্র নিজেই আধ্যাত্মিক) পরিধির মধ্যে।” (ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি ) ফ্যাসিবাদের যে চর্চা, তা অন্য অধ্যায়ে আলোচনা করা হবে। সেখানে দেখা যাবে—এই আধ্যাত্মবাদী ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্রের ঈশ্বরপ্রদত্ত ক্ষমতা কতটা নীচু স্তরের বস্তুগত উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হয়।
“বুর্জোয়া শ্রেণি, তাদের ক্ষয়িষ্ণু ক্ষমতাকে রক্ষা করতে ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের রক্তাক্ত অস্ত্র ব্যবহার করে। তারা রাজাদের ‘ঈশ্বর-প্রদত্ত অধিকার’ উত্তরাধিকারসূত্রে দাবি করে বসে। রাজারা ইতিহাসের অতীত হয়ে থাকতে পারে, কিন্তু যতদিন না পর্যন্ত এই ‘ঈশ্বরতাত্ত্বিক অনুমোদনের অধিকার’ রাষ্ট্রের জন্য সংরক্ষিত থাকে—একটি বিমূর্ত হেগেলীয় দর্শনে রাষ্ট্রকে কল্পনা করে—ততদিন তা দাবি করতে পারবে সেই শ্রেণি, যারা রাষ্ট্র নিয়ন্ত্রণ করে। মধ্যযুগের প্রবাদ—”রাজা কখনো ভুল করেন না”—কে ফ্যাসিবাদী দার্শনিকরা বানিয়ে ফেলেছে আধুনিক প্রবাদ—“রাষ্ট্র কখনো ভুল করে না।”
প্রসঙ্গত, এটা উল্লেখ করা যেতে পারে যে ফ্যাসিবাদের দর্শনের মূল গীতার ঐশ্বরিক দর্শনেও খুঁজে পাওয়া যায়। সেখানে বলা হয়েছে যে পৃথিবীর সমস্ত শক্তি (বিভূতি) ঈশ্বরের শক্তি। সুতরাং, দার্শনিকভাবে, ফ্যাসিবাদ কোনও নতুন ঘটনা নয়; এবং এটা বলাও সঠিক নয় যে ফ্যাসিবাদের কোনও দর্শন নেই। ফ্যাসিবাদী দর্শন জীবনের আধ্যাত্মিক দৃষ্টিভঙ্গির যৌক্তিক ফলাফল। গীতা প্রচারিত মতবাদ এবং রাষ্ট্রের ফ্যাসিবাদী নব্য-হেগেলীয় আধিবিদ্যামূলক ধারণার মধ্যে যৌক্তিক সংযোগ সহজেই অনুমেয়। প্রকৃতপক্ষে, ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের দর্শন সরাসরি আধুনিক রহস্যবাদ/অতিন্দ্রীয়বাদ এবং আধ্যাত্মিকতার স্কুল থেকে উদ্ভূত যা জীবনের বৈজ্ঞানিক দৃষ্টিভঙ্গির বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে। এর ভারতীয় বংশপরিচয় শনাক্ত করা যায় শোপেনহাওয়ারের মাধ্যমে, যার শিষ্য নিৎশে ছিলেন ফ্যাসিবাদী দর্শনের জনক। এর বংশপরিচয় অনুসন্ধানে এগোনোর আগে, চলুন এই আধ্যাত্মিক বিলাসিতার বিভীষিকাময় প্রকাশের সাথে একটু ঘনিষ্ঠভাবে পরিচিত হই। “ফ্যাসিবাদী আন্দোলন একটি গভীর আধ্যাত্মিক প্রেরণায় চালিত। ফ্যাসিবাদের দর্শন হলো তার কার্যকলাপ। এটি কোনো অনড় মতাদর্শ নয়। এটি চিন্তার একটি নতুন রূপ, জীবনের একটি নতুন পদ্ধতি। ফ্যাসিবাদের বৈশিষ্ট্য হলো এর ধর্মীয় অনুভূতি।”— জিওভান্নি জেনতিলে, “ফ্যাসিবাদ ও সংস্কৃতি”। ফ্যাসিবাদের প্রেরণা তার কার্যকলাপের মাধ্যমেই স্পষ্টভাবে প্রকাশিত হয়েছে, যা এর দার্শনিকের মতে, তার দর্শনেরই সংক্ষিপ্ত রূপ।
“ফ্যাসিবাদী আন্দোলন হতাশ ক্ষুদ্র-মধ্যবিত্ত জনগণকে এক উন্মত্ত বাহিনী হিসেবে ঐক্যবদ্ধ করে। তারা তাদের নিজস্ব দাসত্বের শৃঙ্খলকে শক্তিশালী করার জন্য বিপরীতধর্মী ধর্মযুদ্ধের নেতৃত্ব দেয়। দাসদের বিদ্রোহকে সহিংস কায়দায় দমন করার ফ্যাসিবাদী পদক্ষেপ হল পুঁজিবাদ, এবং সেই লজ্জাজনক ভূমিকা পালন করার জন্য; পুজিবাদকে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়াদের দ্বারা পৃষ্ঠপোষকতা করা হয় যাদের একনায়কতন্ত্র ক্ষমতা গ্রহণের প্রয়োজন। ফ্যাসিবাদের “গভীরভাবে প্রোথিত” আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য প্রমাণিত হয় অসংখ্য সহিংস কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে, যা বহু বছর ধরে সংঘটিত হয়েছে পুঁজিবাদকে রক্ষা করার পবিত্র উদ্দেশ্যে। বাস্তবে এটি অশ্লীল বস্তুবাদ। “গভীরভাবে প্রোথিত আধ্যাত্মিক উদ্দেশ্য”-এর সাথে এই ধরনের কর্মকাণ্ড কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ? ফ্যাসিবাদের দার্শনিক উত্তর দেন: ফ্যাসিবাদের কোন নীতি নেই। এটি কোন যুক্তিসঙ্গত মতাদর্শের ব্যবস্থায় আবদ্ধ নয়। আধ্যাত্মিকতা কোন কারণ জানে না, এতে যুক্তির কোন স্থান নেই। ফ্যাসিবাদের আধ্যাত্মিক চরিত্র তার স্বেচ্ছাচারিতার মধ্যে প্রকাশ পায়।
ফ্যাসিবাদের তথাকথিত “গভীর আত্মিক প্রেরণা” প্রকাশ পায় বহু বছর ধরে সংঘটিত নির্মম সহিংসতার মধ্য দিয়ে। এই সহিংসতার সবটাই পুঁজিবাদকে রক্ষা করার “পবিত্র উদ্দেশ্যে”, যার প্রকৃত রূপ (পুঁজিবাদের) কিন্তু আসলে নিতান্তই জড়বাদী ও লোভনীয়। তাহলে এই ধারার নিষ্ঠুরতা কীভাবে ফ্যাসিবাদের ‘গভীর আত্মিক প্রেরণার’ সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? ফ্যাসিবাদের দার্শনিক উত্তর দেন: ফ্যাসিবাদের কোনো নীতি নেই। এটি কোনো যুক্তিবদ্ধ মতাদর্শের ভারে ভারাক্রান্ত নয়। আধ্যাত্মিকতায় যুক্তির স্থান নেই—তাতে কোনো নিয়ম নেই, নেই কোনো কাঠামো । ফ্যাসিবাদের এই তথাকথিত আত্মিক প্রকৃতি প্রকাশ পায় এর স্বেচ্ছাচারিতার মধ্য দিয়ে। এখানে একমাত্র নীতি হলো উপযোগিতা—পুঁজিবাদী আধিপত্য টিকিয়ে রাখার উপযোগিতা। ফ্যাসিবাদ আসলে কোনো সত্যিকারের দার্শনিক তত্ত্ব কিংবা যুক্তিনিষ্ঠ নীতিকে নিজের উপর আরোপ করতে চায় না—কারণ সে তার হাত মুক্ত রাখতে চায়, যেন যেকোনো অস্ত্র ব্যবহার করে সে তার রক্তাক্ত যুদ্ধ চালিয়ে যেতে পারে। এই যুদ্ধ সেই সব শক্তির বিরুদ্ধে যারা সমাজকে পুঁজিবাদী সভ্যতার জড়বাদী দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মুক্ত করতে চায়। ঈশ্বরের রহস্যময় ইচ্ছা, ধর্মীয় অভিজ্ঞতা, আত্মিক প্রেরণা, ধর্মীয় অনুভূতির মতো ধারণাগুলি এই সীমাহীন স্বেচ্ছাচারিতাকে বৈধতা দেওয়ার জন্য খুবই সুবিধাজনক—সবই যেন এক অলৌকিক উদ্দেশ্যের বাস্তবায়ন, যার জন্য মানুষের তৈরি আইন কোনো গুরুত্বই রাখে না।
এমনকী, জিওভান্নি জেনতিলের মতে, ফ্যাসিবাদ হল এমন এক আদর্শ যা “প্রত্যেক ধরনের যুক্তিনিষ্ঠ, ধর্মহীন, বিমূর্ত চিন্তাধারার শত্রু—এমনকি ‘অস্বাভাবিক’ উদারতন্ত্র ও মৌলিকভাবে বস্তুবাদী গুপ্ত ভাতৃসংঘের।” এখানেই আমরা ফ্যাসিবাদের আসল রূপ দেখি। এখানে আধ্যাত্মিকতার উন্মোচন হয় তার প্রকৃত তাৎপর্যে। ফ্যাসিবাদ ধর্মীয়, তাই তা যুক্তিবাদকে বিপজ্জনক ঘোষণা করে এবং উদারতন্ত্রকে অস্বাভাবিক বলে। এটি দার্শনিক বস্তুবাদের বিরোধিতা করে, কারণ সেটিই প্রকৃতপক্ষে সেই বস্তুবাদী পুঁজিবাদী বাস্তবতার বিপরীত ধারা। এটি ধর্মের পক্ষে অবস্থান নেয়, কারণ বিশ্বাস অজ্ঞতাকে উৎসাহিত করে, যা সাধারণ মানুষকে শোষণের পথ সহজ করে তোলে।
জার্মানিতে ফ্যাসিবাদ প্রতারণা ও জনমত্ততাকে ভিত্তি করে “জাতীয় সমাজতন্ত্র” নামটি গ্রহণ করেছে। বাস্তবে, এটি না সমাজতান্ত্রিক, না জাতীয়তাবাদী। রাজনৈতিকভাবে, এটি মূলত পুঁজিবাদী সমাজের অবক্ষয়কালীন শাসনব্যবস্থা। জার্মানিতে ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র ইতালির তুলনায় আরও বেশি সহিংসতা ও বর্বরতা সংঘটিত করেছে, কারণ ফ্যাসিবাদের বিজয়ের পর পুঁজিবাদ আরও তীব্রভাবে অবনমিত হয়েছে এবং তার রক্ষকদের ঠেলে দিয়েছে নৈরাশ্যের উন্মাদনায়।
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হল এমন এক যন্ত্র যা সংসদীয় গণতন্ত্রের ভান বর্জিত পুঁজিপতিশ্রেণির একনায়কতন্ত্রের হাতিয়ার। ফ্যাসিবাদী আন্দোলন ও রাষ্ট্রের একমাত্র উদ্দেশ্য হলো, হিংস্র ও রক্তক্ষয়ী উপায়ে শ্রমজীবী শ্রেণি এবং সেইসব সমাজ-সচেতন শক্তিকে দমন করা, যারা পুঁজিবাদী ব্যবস্থার ধ্বংসস্তূপের উপর নতুনতর এক মানবিক সভ্যতা নির্মাণে নিযুক্ত।
ফ্যাসিবাদের সবচেয়ে করুণ দিক হলো, সামাজিক আন্দোলন হিসেবে তা গঠিত হয়েছে সেই মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে কেন্দ্র করে, যা পুঁজিবাদ দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত। কী এক প্রহসনমূলক বাস্তবতা, যেখানে ধ্বংসযজ্ঞের নির্মম শিকার, পুঁজিবাদের লালসার বলি মানুষরাই উন্মত্ত সেই ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখার নিরর্থক প্রয়াসে আত্মনিয়োগ করছে, যা তাদের বিনাশের কারণ। এমন একটি আন্দোলনের মধ্যে সত্যনিষ্ঠা, সততা, আন্তরিকতার জন্য স্বাভাবিকভাবেই কোনো স্থান থাকে না। এমনকি ন্যূনতম মানবিক মূল্যবোধেরও না।
ফ্যাসিবাদ অবশ্যম্ভাবীভাবে মিথ্যা, প্রতারণা ও ভণ্ডামির উপর প্রতিষ্ঠিত। হিটলারের আত্মজীবনীকে জার্মান লেখক লিওন ফয়েখটভাঙ্গার ব্যঙ্গ করে বর্ণনা করেছেন, একটি এক লক্ষ চল্লিশ হাজার শব্দের গ্রন্থ, যাতে এক লক্ষ ঊনচল্লিশ হাজার ভুল রয়েছে। এই মহান জার্মান সাহিত্যিককে হিটলারের জার্মানি ত্যাগ করতে হয়েছিল, “জার্মান-বিরোধী” মতাদর্শ বহনকারী বলে দাহ করা হয় তাঁর রচনাসমূহকে। বস্তুত, ফ্যাসিবাদের প্রধান অস্ত্রই হলো জনমত্ততা।
পুঁজিবাদী লুন্ঠনের সবচেয়ে পশ্চাৎপদ এবং সবচেয়ে দুর্দশাগ্রস্ত নির্মম শিকার মানুষদের ফ্যাসিবাদী আন্দোলনে সম্পৃক্ত করা হয় এক প্রতারণাধর্মী পুঁজিবাদ-বিরোধী উন্মাদনার মাধ্যমে। ছদ্ম-সমাজতন্ত্রের পতাকার অধীনে, তাদের সংগঠিত করা হয় সংকটগ্রস্ত পুঁজিবাদকে রক্ষার্থে ঝটিকা-সেনারূপে। এই ‘অলৌকিকতা’ সাধিত হতে পারে কেবলই নিরঙ্কুশভাবে নির্লজ্জ মিথ্যাচার, নির্লজ্জ প্রতারণা এবং চরম মাত্রার জনমত্ততাপূর্ণ ধোঁকাবাজির মাধ্যমে।
যে আন্দোলন আপাতভাবে পুঁজিবাদের বিরুদ্ধে পরিচালিত বলে প্রতিভাত, প্রকৃতপক্ষে তা নিশানা করেছিল রাজনৈতিক, নাগরিক ও সাংস্কৃতিক স্বাধীনতাকে, ঐতিহাসিকভাবে যা সংশ্লিষ্ট পুঁজিবাদী গণতন্ত্রের সঙ্গে। অর্থাৎ সেই রাজনৈতিক শাসনব্যবস্থা, যা পুঁজিবাদ প্রতিষ্ঠা করেছিল তার প্রগতিশীল পর্বে।
সংসদীয় গণতন্ত্রকে পুঁজিবাদেরই প্রতিচ্ছবি হিসেবে উপস্থাপন করে ঘোষণা করা হয় যে, পুঁজিবাদী সমাজব্যবস্থার সমস্ত দুর্বিপাকের একমাত্র নিরাময় হলো এর বিলুপ্তি।
ফ্যাসিবাদ সংসদীয় গণতন্ত্রকে ধ্বংস করেছে। কিন্তু পুঁজিবাদ বিদ্যমান থেকেছে, পূর্বের তুলনায় অধিকতর ক্ষমতা সহকারে, এবং শ্রমিক শ্রেণিকে আরও নিষ্ঠুরভাবে শোষণ করে চলেছে। বস্তুত, এই বৈপ্লবিক অস্থিরতার যুগে সংসদীয় গণতন্ত্রের বিলুপ্তি পুঁজিবাদী শাসন রক্ষায় বাড়তি নিশ্চয়তা প্রদান করে।
সংসদীয় শাসনব্যবস্থার দ্বারা প্রাপ্ত আপেক্ষিক স্বাধীনতা শ্রমজীবী শ্রেণিকে সংগঠিত হওয়ার এবং পুঁজিবাদ উৎখাত ও সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার সংগ্রামের জন্য নিজেকে প্রস্তুত করার ক্ষেত্র তৈরি করে দেয়। সুতরাং, নিজেদের গৃহীত অর্জনসমূহ বিলুপ্ত করাই পুঁজিপতি শ্রেণির পক্ষে তাদের ক্ষমতা ও উপরি সুবিধাসমূহ রক্ষার সংগ্রামে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। এই নিকৃষ্ট কর্মটি সম্পাদনের উদ্দেশ্যেই ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের জন্ম হয়, পুঁজিবাদকে রক্ষার জন্য।
বুর্জোয়া দার্শনিকেরা এই আন্দোলনের আদর্শিক ভিত্তি রচনা করে দেয়। যে টাকাওয়ালা ও শিল্পপতি শ্রেণির বিরুদ্ধে আন্দোলনের সূচনালগ্নে প্রচণ্ড ভাষায় আক্রমণ চালানো হয়, তারাই এই আন্দোলনের জন্য উদারভাবে অর্থসাহায্য প্রদান করে। বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র, যার ধ্বংস আহ্বান করে এই আন্দোলন, সেই রাষ্ট্রই একে সহ্য করে। বরং গোপনে উৎসাহ ও সহযোগিতা প্রদান করে।
বুর্জোয়া-গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের পুলিশ ও সামরিক বাহিনী গোপনে এই আন্দোলনের সঙ্গে মৈত্রী গড়ে তোলে সরকার উৎখাতের লক্ষ্যে। চতুর জনমত্তকরণ, সস্তা আবেগ, অতিরঞ্জিত প্রতিশ্রুতি (যার বাস্তবায়নের কোনো ইচ্ছা থাকে না), বিরোধীদের বিরুদ্ধে নির্লজ্জ অপবাদ, উগ্রজাতীয়তাবাদের উসকানি, জাতিগত ঘৃণার উত্তেজনা—এই সব কৌশল এবং অনুরূপ আরও বহু উপায় ব্যবহৃত হয়, অর্থনৈতিকভাবে বিপর্যস্ত এবং বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে দেউলিয়া নিম্নমধ্যবিত্ত জনগণকে বশীকরণের জন্য।
এভাবে জনগণকে গণতন্ত্রের বিরুদ্ধেই লেলিয়ে দেওয়া হয়। ফ্যাসিবাদী একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয় নাটকীয় এক রাষ্ট্রক্ষমতা-দখল (coup d’État)-এর মাধ্যমে, যেমন ইতালিতে হয়েছে; কিংবা “সংবিধানসম্মত” ও “রক্তপাতহীন” পন্থায়, ঘটেছে জার্মানিতে।
যেসব ব্যাঙ্কার ও শিল্পপতি গোষ্ঠী ধ্বংসপ্রাপ্ত ক্ষুদ্র-মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে উগ্র জাতীয়তাবাদের উন্মত্ততায় প্ররোচিত করার জন্য অর্থ সরবরাহ করেছিল, তারাই জার্মানির পরাজয় ও অপমান থেকে বিপুল মুনাফা হাতিয়ে নিয়েছিল। প্রজাতান্ত্রিক সরকারকে ১৯২৩-২৪ সালের নিরঙ্কুশ মুদ্রাস্ফীতিতে বাধ্য করেছিল তারা, যার উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধকালীন সময়ে সৃষ্ট বিপুল অভ্যন্তরীণ ঋণ অবলুপ্ত করা।
“দেশবাদ” যাকে তারা ধারণ করেছিল, তা শেষ পর্যন্ত ক্ষুদ্র-মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে সম্পূর্ণ দেউলিয়া করে দেয়। যদি এই অভ্যন্তরীণ ঋণ প্রতারণামূলক উপায়ে লোপ না করা হতো, তাহলে তার সুদ ও পরিশোধ বাবদ সরকার বাধ্য হতো উচ্চ আয়ের জনগোষ্ঠীর উপর ব্যাপক কর আরোপ করতে। যুদ্ধকালীন কালাবাজারি ও মুনাফাখোরদের ন্যায্য করের বোঝা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার জন্য সরকার একপ্রকারভাবে সেই বিপুল পরিমাণ সঞ্চয় বাজেয়াপ্ত করে নেয়, যা মধ্যবিত্ত শ্রেণি দেশবাদী দায়িত্ববোধ থেকে যুদ্ধ-ঋণে বিনিয়োগ করেছিল।
এই বাজেয়াপ্তি মধ্যবিত্ত শ্রেণিকে ধ্বংস করে এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক (নাজি) আন্দোলনের সামাজিক ভিত্তি নির্মাণ করে দেয়। শেষপর্যন্ত, এই ধ্বংসপ্রাপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণির উত্তরসূরিরাই গায়ে চাপায় ব্রাউন শার্ট, ধারণ করে রহস্যময় স্বস্তিকা চিহ্ন এবং নিজেদের সঁপে দেয় সেইসব শক্তির হাতে, যারা তাদের লুণ্ঠন ও বঞ্চনার মাধ্যমে নিঃস্ব করে দিয়েছিল।
মোটা পুঁজিপতিরা—যারা যুদ্ধকালীন কালোবাজারি ও মুনাফাবাণিজ্যের মাধ্যমে আরও স্ফীত ও বিত্তবান হয়ে উঠেছিল—প্রজাতান্ত্রিক সরকারের সহযোগিতা ও নীরব মদতে কর প্রদান এড়িয়ে যেতে সক্ষম হয়। এর ফলে ভার্সাই চুক্তিজনিত সম্পূর্ণ অর্থনৈতিক বোঝা গিয়ে পড়ে উৎপাদনশীল জনসাধারণের উপর। এর প্রত্যক্ষ ফল ছিল, জনসংখ্যার বৃহৎ অংশের ক্রমাগত দারিদ্র্যকরণ। অপরদিকে, সমাজের একটি ক্ষুদ্র উচ্চবিত্ত গোষ্ঠী ক্রমাগত আরও ধনী হয়ে ওঠে।
এই দারিদ্র্যকরণের ফলে সাধারণ জনগণের কর পরিশোধের সামর্থ্য মারাত্মকভাবে হ্রাস পায়। রাষ্ট্রীয় অর্থব্যবস্থা চরম ভারসাম্যহীনতায় পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে জার্মান সরকার কার্যত দেউলিয়া অবস্থায় ছিল। দৈনন্দিন ব্যয় হ্রাস করার একটি উপায় ছিল, সমাজকল্যাণ খাতের বরাদ্দ এবং সেনাবাহিনী থেকে অবসরপ্রাপ্ত ও আহত সৈনিকদের পেনশন কমিয়ে দেওয়া। কিন্তু যুদ্ধবিধ্বস্ত জার্মানিকে যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণ পরিশোধ করতেই হতো।
যারা যুদ্ধ থেকে বিপুল সম্পদ উপার্জন করেছিল এবং পরাজয়ের দায় এড়াতে নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণিকে নিঃস্ব করেছিল, বিজয়ী শক্তিসমূহের দাবিগুলো পূরণ করা যেত কেবল তাদের কাছ থেকেই অর্থ আদায় করে। এই পরিস্থিতিতে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক (নাজি) আন্দোলনের—যার অর্থায়ন করছিল সেই বিত্তশালী শ্রেণি—এমন প্রচার যে “ভার্সাই চুক্তি জার্মানিকে ধ্বংস করছে”, খুব স্বাভাবিকভাবেই ব্যাপক জনপ্রিয়তা অর্জন করে।
কারণ, প্রজাতান্ত্রিক সরকারই এই চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছিল এবং এর আওতায় উত্থাপিত দাবিগুলো পূরণের চেষ্টা করছিল। তাই এই সরকার জার্মান জনগণের শত্রু— একেঅবশ্যই উৎখাত করতে হবে। এইভাবেই তথাকথিত “জাতীয় বিপ্লব” শুরু হয়, একটি প্রতিবিপ্লব হিসেবে।
শ্রমিক শ্রেণি এবং নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণির অর্থনৈতিক ধ্বংস জার্মানিতে এক চরম বৈপ্লবিক পরিস্থিতির জন্ম দেয়। জনসাধারণ আরও কোনো অতিরিক্ত বোঝা বহন করতে প্রস্তুত ছিল না। অপরদিকে, উচ্চবিত্ত শ্রেণিও তাদের অবৈধভাবে অর্জিত সম্পদের সামান্য অংশ ছাড় দিতেও প্রস্তুত ছিল না। ফলে জার্মানি পড়েছিল দ্বিমুখি সংকটে—অভ্যন্তরে বিপ্লবের ভূত এবং বাইরে থেকে সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কা।
এই দ্বৈত সংকটের মোকাবিলায় শাসক শ্রেণিই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক (নাজি) আন্দোলনের রচনা করে—যাকে তারা উভয় বিপদের বিরুদ্ধে একটি নিরাপত্তার গ্যারান্টি হিসেবে স্থাপন করতে চেয়েছিল। ছলনাপূর্ণ “সমাজতন্ত্র” কথনের মাধ্যমে শ্রমজীবী শ্রেণির পশ্চাৎপদ অংশকে বিভ্রান্ত করা সম্ভব ছিল; অপরদিকে, ভার্সাই চুক্তি বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে উগ্র জাতিবাদী যুদ্ধান্মদনাl জাগিয়ে তুলে একটি কার্যকর প্রতিরোধও গড়ে তোলা যেত।
গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার পর, তথাকথিত “জাতীয় বিপ্লব” পুঁজিবাদকে বিন্দুমাত্র আঘাত করেনি। যদিও ক্ষমতায় আসার পূর্বপর্যন্ত জাতীয় সমাজতন্ত্রীদের ঘোষিত লক্ষ্যগুলোর একটি ছিল পুঁজিবাদের বিনাশ। নাৎসি রাষ্ট্রের প্রথম পদক্ষেপই ছিল শ্রমিক শ্রেণিভিত্তিক রাজনৈতিক দলসমূহের দমন, যা সাময়িকভাবে বিপ্লব বিরোধী বিপদ থেকে একপ্রকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করে। এই কাজটি সম্পন্ন করার পর, নাৎসি সরকার বেপরোয়া জাতীয়তাবাদী উন্মত্ত অভিযানে নেমে পড়ে। জার্মান জনগণের কল্যাণ রক্ষার উদ্দেশ্যে নয়, বরং শিল্পপতি শ্রেণিকে ভার্সাই চুক্তির বাধ্যবাধকতা থেকে মুক্তি দেওয়ার লক্ষ্যে।
যদি বিজয়ী মিত্রশক্তিগুলো যুদ্ধ-ক্ষতিপূরণ আদায় করতে চাইতো, তা আসতে পারত কেবল তাদের কাছ থেকেই, যাদের পক্ষে তা পরিশোধ করা সম্ভব ছিল। জার্মান জনগণের ইতোমধ্যেই শেষ রক্ত বিন্দু পর্যন্ত নিঃশেষ হয়ে গিয়েছিল । “ভার্সাইয়ের দাসত্ব” থেকে মুক্তির একমাত্র পথ ছিল সামরিক প্রতিরোধ প্রদর্শন, যদি মিত্রশক্তিরা দাবির ব্যাপারে কঠোর হতো। এমন উদ্যোগ পাগলামির শামিল, কিন্তু তা কার্যত সফল হয়, কারণ মিত্রশক্তিগুলো তাদের পূর্ব অভিজ্ঞতা থেকে শিখেছিল যে, সামরিক হস্তক্ষেপ লাভজনক নয়।
তদুপরি, তারাও জার্মানিতে বিপ্লবের ভূতের ভয়ে কাঁপছিল। ফলস্বরূপ, নাৎসি জাতীয়তাবাদী উন্মত্ততা কোনো প্রতিবন্ধকতা ছাড়াই এগুতে থাকে। পুঁজিবাদীদের কোনো ক্ষতি তো করেইনি বরং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের এই জাতীয়তাবাদই তাদের অর্থনৈতিক সংকট থেকে মুক্তি পাওয়ার পথ করে দেয়। “জাতীয় সম্মান রক্ষার্থে পুনঃসামরিকায়নের” যে কর্মসূচি গৃহীত হয়, তা শিল্প খাতে এক নতুন বাড়বাড়ন্তর সূচনা করে; যার সমস্ত মুনাফা যায় পুঁজিপতিদের পকেটে।
কিন্তু, একেবারে ফাঁকা কোষাগার নিয়ে সেই অলৌকিক-বাচনধর্মী “মসিহা”র পক্ষেও পুনঃসামরিকায়ন কর্মসূচির ব্যয়ভার বহন করা সম্ভব ছিল না। তখন শিল্পপতি ও অর্থলগ্নিকারকগণ নতুন সরকারের কাছে অস্ত্র ও গোলাবারুদের বিপুল অর্ডারের বিনিময়ে ঋণ প্রদান করে। এর ফলে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র কার্যত তাদের কাছে বন্ধক হয়ে পড়ে।
এই পরিস্থিতিতে সমাজতন্ত্রের কোনো কথাই বলা সম্ভব ছিল না। হিটলারবাদের তাত্ত্বিক পরিণতি ছিল— প্রারম্ভিক পর্যায়ের ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক মুখোশ ত্যাগ এবং জাতীয়তাবাদকে নতুন জার্মান সাম্রাজ্যবাদের কার্যকর হাতিয়ারে রূপান্তর।
জাতীয় সমাজতন্ত্র শব্দযুগল একধারে বিভ্রান্তিকর এবং পরস্পরবিরোধী। সমাজতন্ত্র কোনো ভৌগোলিক সীমারেখা চেনে না; তা জাতীয়তাবাদের সঙ্গে মৌলিকভাবে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। আর ফ্যাসিবাদীদের যুদ্ধবাজ, সাম্রাজ্যবাদী জাতীয়তাবাদের সঙ্গে এর সংশ্লেষের তো কোনো প্রশ্নই ওঠে না। “জাতীয় সমাজতন্ত্র” আসলে একটি প্রতারণাপূর্ণ শিরোনাম, যার আড়ালে আদতে গভীরভাবে সমাজতন্ত্রবিরোধী, শ্রমজীবী শ্রেণিবিরোধী রাজনৈতিক আন্দোলন লুকায়িত।
মার্কসবাদকে ধ্বংস করা হলো ফ্যাসিবাদী আন্দোলনের প্রকাশ্য লক্ষ্য। আজ সর্বজনস্বীকৃত যে, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন—অর্থাৎ পুঁজিবাদী শোষণ থেকে সমাজকে মুক্ত করার সংগ্রাম—কার্ল মার্কস প্রদত্ত দার্শনিক, সামাজিক এবং রাজনৈতিক নীতিমালার ভিত্তি ব্যতীত কল্পনাও করা যায় না। যেমনটি বলা হয়েছে:
নিশ্চয়ই, মার্কসবাদ ব্যতীত সমাজতন্ত্র বলে কিছু নেই এবং বর্তমান সময়ে রাষ্ট্রনায়কদের তা বিবেচনায় নিতেই হয়।
এই মত শুধু উদারনৈতিক অধ্যাপক হ্যারল্ড লাস্কির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং রক্ষণশীল পণ্ডিতদের পক্ষ থেকেও একে অকপটে স্বীকার করা হয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, খ্যাতনামা জার্মান সমাজবিজ্ঞানী অধ্যাপক মুলার লায়ার লিখেছেন:
“অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদের মার্কসীয় তত্ত্ব আজ সামাজিক বিজ্ঞানের এক অক্ষয় সূত্রে পরিণত হয়েছে।”
এই প্রসঙ্গ থেকে এটি পরিষ্কার হয়ে ওঠে, যে আন্দোলন নিজেকে সমাজ সংস্কারের ন্যূনতম রূপের সঙ্গেও সংযুক্ত রাখে না, এবং যা সমাজ অগ্রগতির যেকোনো ধারণার বিরুদ্ধাচরণ করে, সেই আন্দোলনের প্রকৃতি কী ভয়ানকভাবে প্রতিক্রিয়াশীল, যা কিনা আবার মার্কসবাদকে তার প্রধান শত্রু হিসেবে ঘোষণা করে।
মার্কসবাদের প্রতি উগ্র ঘৃণাই এই সত্য প্রমাণে যথেষ্ঠ যে, ফ্যাসিবাদের সমাজতান্ত্রিক পরিচয় কেবলই এক ছলনাপূর্ণ মুখোশ। ফ্যাসিবাদ রাজনৈতিক ক্ষমতা লাভের বহু পূর্ব থেকেই তার প্রধান কার্য ছিল শ্রমিক শ্রেণিকে বিভিন্ন ধরনের সন্ত্রাস ও হিংসার মাধ্যমে আতঙ্কিত করা। লক্ষণীয় যে, এই সমস্ত সন্ত্রাসমূলক কর্মকাণ্ডের অর্থায়ন করেছিল ঠিক তারাই, যাদের সমাজতন্ত্রের সম্ভাবনাকেই সবচেয়ে বেশি আশঙ্কাজনক মনে করার কথা।
ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার পর, ফ্যাসিবাদের প্রথম এবং প্রধান কাজ ছিল রক্তক্ষয়ী নিষ্ঠুরতার মাধ্যমে কেবল কমিউনিস্ট পার্টিগুলোকেই দমন করা নয়, বরং যারা বিপ্লববিরোধী, তেমন সমাজিক-গণতন্ত্রী দলগুলোকেও নির্মমভাবে দমন করা, এমনকি সর্বাধিক সংশোধনবাদী ধাঁচের ট্রেড ইউনিয়নগুলো পর্যন্ত রেহাই পায়নি।
ফ্যাসিবাদ তার দমন-পীড়নের ভারী হাত তুলে দিয়েছিল সেই উদারপন্থী বুদ্ধিজীবীদের ওপরও, যারা শ্রমজীবী শ্রেণির প্রতি সহানুভূতি পোষণ করত এবং তাদের ন্যায্য অধিকারের প্রতি সমর্থন জানাতো।
পুঁজিবাদকে আধ্যাত্মিকীকরণ করার প্রত্যয় ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচির অন্যতম স্পষ্ট ভণ্ডামি। ধ্বংসপ্রাপ্ত নিম্নমধ্যবিত্ত শ্রেণি এবং পশ্চাৎপদ শ্রমজীবী জনগণের কল্পনা জয় করার উদ্দেশ্যে, জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন লিপ্ত হয় এক ধরনের ছলনাপূর্ণ পুঁজিবাদ-বিরোধী জনমত্ততায়।
কিন্তু বাস্তবে, পুঁজিবাদের প্রতি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বৈরী এমন সকল শক্তিকে দমন করার পর, নাৎসিরা ঘোষণা করে যে তাদের তথাকথিত “জাতীয় বিপ্লব” সম্পন্ন হয়েছে।
পুঁজিবাদের সুবিধাসমূহে বিন্দুমাত্র হস্তক্ষেপ না করেই, তার রাজনৈতিক ক্ষমতা নাৎসি একনায়কতন্ত্রের মাধ্যমে কার্যকর করা হবে—এই ছিল জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থার মূলনীতি। প্রতারিত জনসাধারণের প্রতি এই নির্লজ্জ বিশ্বাসঘাতকতাকে ন্যায্যতা দিতে গিয়ে, ফ্যাসিবাদী তাত্ত্বিকরা পুঁজিবাদের দুটি শ্রেণিবিন্যাস আবিষ্কার করে: “শোষণকারী পুঁজিবাদ” এবং “গঠনমূলক পুঁজিবাদ”। প্রথমটিকে দমন করা হবে, আর পরেরটি রক্ষা ও উৎসাহিত করা হবে।
এই শ্রেণিবিন্যাস অর্থনৈতিক তত্ত্বের এক নির্লজ্জ বিকৃতি। অর্থনীতির প্রাথমিক জ্ঞানই দেখায় যে, শোষণ ব্যতীত পুঁজিবাদ কল্পনাতীত। পুঁজিবাদের যেকোনো “গঠনমূলক” সাফল্য শ্রমিকশ্রেণির শ্রমের মূল্য থেকে একটি অংশ ছিনিয়ে নিয়ে নির্মিত হয়। অর্থনৈতিক তত্ত্বকে বিকৃত করে ব্যবহার করা হয়, যাতে পুঁজিবাদ জাতীয় সমাজতন্ত্রের আধ্যাত্মিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বিঘ্নে বিকাশ লাভ করতে পারে।
পুঁজিবাদী শোষণের পুরোধা ব্যক্তি, যেমন: ক্রুপ ফন বোলেন (তার বৃহৎ অস্ত্রকারখানাসমূহসহ), থিসেন (তার বিশাল লোহা ও ইস্পাত শিল্পসমূহসহ), ফ্যোগলার (তার কয়লা-রাজ্যসহ) প্রমুখকে “গঠনমূলক পুঁজি”র প্রতিনিধি হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয় এবং তাঁদের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক আধ্যাত্মিক রাষ্ট্রের দৃঢ় স্তম্ভ হিসেবে গণ্য করা হয়।
বাস্তবত, বৃহৎ শিল্প ও আর্থিক স্বার্থসমূহকে সর্বাত্মক রাষ্ট্রের নিয়ন্ত্রণের বাইরে রাখা হয়, যে রাষ্ট্র অন্যদিকে জাতীয় জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে তার রক্তাক্ত শুঁড় প্রবিষ্ট করেছে, এক সর্বগ্রাসী অক্টোপাসের মতো। জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদ, যার সভাপতি ক্রুপ ফন বোলেন এবং যার সদস্যরা সবাই প্রধান শিল্পপতি এমন এক “অতি-রাষ্ট্র” হিসেবে কাজ করে, যার উপরে এমনকি নাৎসি রাষ্ট্রেরও কার্যকর নিয়ন্ত্রণ নেই।
এই নবরূপী সমাজতন্ত্রে, “ব্যক্তি নাগরিকের জন্য স্বাধীনতা প্রয়োজনীয় নয়, এবং মুক্তিও অপরিহার্য নয়।” এই ভাবেই উচ্চারণ করেছিল আধুনিক জরথুস্ত্র—হিটলার। জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টি পরিণত হয় জার্মান বুর্জোয়া শ্রেণির একমাত্র রাজনৈতিক শক্তিতে, এবং নাৎসি রাষ্ট্র হয়ে ওঠে জার্মান পুঁজিবাদের বিশ্বস্ত রক্ষক।
হিটলার ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হওয়ার অল্প সময়ের মধ্যেই, জার্মান পিপলস পার্টি— যা প্রজাতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর থেকে ভারী শিল্পপতিদের স্বার্থ রক্ষাকারী একটি প্রধান দল হিসেবে কাজ করেছিল—নিজেকে বিলুপ্ত ঘোষণা করে এবং তাদের সদস্যদের জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টিতে যোগ দিতে আহ্বান জানায়।
এমনকি রাজতন্ত্রবাদীরাও জাতীয় সমাজতন্ত্রকে তাদের প্রতিক্রিয়াশীল আদর্শের সঙ্গে সম্পূর্ণরূপে সামঞ্জস্যপূর্ণ মনে করে। তারাও তাদের প্রভাবশালী আধাসামরিক সংগঠন দ্য স্টিল হেলমেট কে নাৎসি স্টর্ম ট্রুপসে সঙ্গে একীভূত করে দেয়।
জাতীয় সমাজতন্ত্রের সামাজিক চরিত্র ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্য তখনই ভণ্ডামি ও জনমত্ততার মুখোশ ছুঁড়ে ফেলে, যখন ১৯৩৩ সালের মার্চে হিটলারের নিয়ন্ত্রিত সংসদ “ফ্রেডারিক দ্য গ্রেট”-এর সমাধিস্থলে সমবেত হয় প্রজাতন্ত্রকে সমাহিত করতে এবং প্রতিক্রিয়াশীল সামন্ততান্ত্রিক সামরিকতন্ত্রের ভূতকে পুনরুজ্জীবিত করতে।
পটসডামের রাজতন্ত্রীয় আবহে, যেখানে চরম প্রতিক্রিয়াশীলতার সমস্ত আনুষ্ঠানিক উপকরণ উপস্থিত ছিল, সেখানে হিটলার বিস্মৃত হন তাঁর প্রতারিত অনুসারীদের—ধ্বংসপ্রাপ্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণি ও পশ্চাৎপদ শ্রমিকদের। নাৎসি সংসদের উদ্দেশ্যে তাঁর বক্তৃতায়, যেখানে তিনি একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা দাবি করেন, হিটলার আবেগঘনভাবে প্রশংসা করেন হোহেনৎসোলার্ন রাজবংশের “গুণাবলীর”, যার অবক্ষয়িত বংশধরগণ ঐ অনুষ্ঠানে উপস্থিত থেকে এই উপলব্ধি করেন যে, তারা স্বস্তিকা চিহ্ন ধারণ করে বৃথা যাননি।
হিটলার একনায়কতান্ত্রিক ক্ষমতা লাভ করেন জার্মান জনগণের ‘উদ্ধারকর্তা’ হিসেবে নয়, বরং সেই সমস্ত ঐতিহাসিক শক্তির প্রতিনিধি হিসেবে, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে এই জনগণকে শোষণ ও নিপীড়নের মাধ্যমে অবদমিত করেছে।
অন্যদিকে, কমিউনিস্ট পার্টিকে নির্মমভাবে দমন করে এবং নিরীহ সমাজতান্ত্রিক গণতান্ত্রী দলকেও বিলুপ্ত করে, নাৎসিরা এমনকি সংশোধনবাদী ট্রেড ইউনিয়নগুলো পর্যন্ত রেহাই দেয়নি। এসব ইউনিয়নকেও ধ্বংস করে দেওয়া হয়, তাদের নেতাদের গ্রেপ্তার করা হয়, এবং তাদের অর্থসম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়। কার্যত, শ্রমিক আন্দোলনের প্রায় সমস্ত নেতা ও সক্রিয় কর্মী—যারা সময়মতো দেশত্যাগ করতে পারেননি—গ্রেপ্তার হন এবং কোনো বিচার তো দূরের কথা, তাদের বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগও গঠন করা হয়নি।
তাদের অনেককে নির্মমভাবে হত্যা করা হয় এবং প্রায় সকলেই কারাগারে অমানবিক নির্যাতনের শিকার হন। শ্রমিক শ্রেণির ওপর এই নিষ্ঠুর আক্রমণের পর, একটি সরকারি ঘোষণা প্রকাশিত হয়, যাতে বলা হয়:
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক সরকারের তিন মাস তোমাদের শ্রমিকদের কাছে প্রমাণ করেছে যে হিটলার তোমাদের বন্ধু, হিটলার তোমাদের স্বাধীনতার সমস্যা নিয়ে লড়াই করছে, এবং হিটলার তোমাদের কাজ ও রুটি দেবে।
জার্মানিতে যখন ফ্যাসিবাদ প্রতারিত ও বিভ্রান্ত জনতার উদ্দেশে ধোঁকাবাজিমূলক প্রতিশ্রুতি দিচ্ছিল, তখন ক্ষমতা গ্রহণের বারো বছর পর ইতালিতে ফ্যাসিবাদ একেবারেই ভিন্ন ভাষায় কথা বলছিল।
১৯৩৪ সালের শেষদিকে ফ্যাসিস্ট পার্টির সাধারণ সম্পাদক আখিলিস স্তারাচে (Achilles Starace), মূলত বেকার শ্রমিকদের এক সমাবেশে ভাষণ দিয়ে ঘোষণা করেন:
মনে রাখো, ফ্যাসিবাদ তোমাদের সম্মান, চাকরি বা মুনাফা প্রতিশ্রুতি দেয় না; বরং কেবল কর্তব্য ও সংগ্রামের আহ্বান জানায়।
এর মাত্র কয়েক ঘণ্টা আগে, দলের সর্বোচ্চ নেতা (মুসোলিনি) মিলানে এক অন্য শ্রমিক সমাবেশে ভাষণ দেন, যেখানে তিনি ফ্যাসিবাদী অর্থনীতির এক ধরনের “আদর্শবাদ” ব্যাখ্যা করেন। তিনি বলেন:
একটি অর্থনৈতিক ব্যবস্থা, যা একমাত্র ব্যক্তিগত লাভ নিয়ে ব্যস্ত ছিল, তা এখন প্রতিস্থাপিত হচ্ছে এমন একটি ব্যবস্থায়, যার প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে সমগ্র সমাজের স্বার্থ রক্ষা করা। শ্রমিকদের উচিৎ উৎপাদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে ক্রমাগত ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত হওয়া এবং এর অপরিহার্য শৃঙ্খলায় অংশগ্রহণ করা। যদি গত শতাব্দী ছিল পুঁজিবাদের শক্তির শতাব্দী, তবে বর্তমান শতাব্দী শ্রমের মহিমা ও গৌরব।
এইরকম একটি ব্যবস্থা, যেখানে সরকারি মুখপাত্ররা একই দিনে ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় কথা বলেন, তার কোন নৈতিক ভিত্তি থাকতে পারে না। এটা শুধুই এক ধরনের কূটাভাস এবং নির্লজ্জতা।
শ্রমিকদের সমস্ত স্বাধীন সংগঠনকে নিষ্ঠুরভাবে ধ্বংস করে, ধর্মঘটের অধিকার বাতিল করে এবং জাতীয় প্রয়োজনের অজুহাতে মজুরি হ্রাস করে মুসোলিনি শ্রমের মহিমা ও গৌরব নিয়ে দম্ভ করে বক্তৃতা দেন!
ছবি: মুসোলিনির সময়কার প্রোপাগান্ডা পোস্টার
বৃহৎ পুঁজিপতি শ্রেণী, যাঁরা আতঙ্কগ্রস্ত ছিলেন কমিউনিজম ও সিন্ডিকালিজমের ভূতের দ্বারা, তাদের সমর্থনে ক্ষমতায় আরোহণকারী মুসোলিনি কখনোই শ্রমিকদের কল্যাণ সংক্রান্ত তাঁর ঘোষণাগুলোর প্রতি আন্তরিক ছিলেন না। তাঁর ফ্যাসিস্ট পার্টির প্রাথমিক কর্মসূচি ছিল সিন্ডিকালিজম ও জাতীয়তাবাদী যুদ্ধবাজ চেতনার একটি অদ্ভুত মিশ্রণ। কিন্তু খুব অল্প সময়ের মধ্যেই এই কর্মসূচি রূপান্তরিত হয় বিপ্লবের উত্থানরোধে পুঁজিবাদের রক্ষাকবচে।
“জাতীয় সংহতির তত্ত্ব” ছিল এই ছদ্ম-বামপন্থা থেকে চরম ডানপন্থায় সরে যাওয়ার আদর্শিক অজুহাত। মুসোলিনির কালো-শার্ট পরিহিত বাহিনী মূলত গঠিত হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণিভুক্ত দাঙ্গাবাজদের দ্বারা; যাঁদের মাসোহারা ও অস্ত্রসজ্জার জন্য অর্থ প্রদান করত বৃহৎ শিল্পপতিরা।
মুসোলিনি ক্ষমতায় আসার আগেই তাঁর ভাড়াটে বাহিনীকে সমাজতন্ত্রী ও শ্রমিক সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধে লেলিয়ে দেওয়া হয়েছিল। ক্ষমতা দখলের পর তাঁর নেতৃত্বাধীন বাহিনী শ্রমিক সংগঠনের কার্যালয়ে হামলা চালায়, এবং প্রায় কুড়ি হাজার শ্রমিক নেতাকে হত্যা, কারাবন্দি কিংবা নির্বাসনে বাধ্য করা হয়।
ফ্যাসিবাদী শাসনের পনেরো বছরেরও অধিক সময় অতিক্রান্ত হওয়ার পর ইতালির শ্রমিক শ্রেণির বাস্তব অবস্থার চিত্র উঠে এসেছে এক ফ্যাসিবাদপন্থী অর্থনীতিবিদের রচিত গ্রন্থে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধকালীন সময়ে ইতালীয় শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি অর্ধেকে নেমে আসে। ১৯১৯-২১ সালের মধ্যে সেই মজুরি যুদ্ধপূর্ব স্তরে ফিরে আসে। এটি ছিল শ্রমিক শ্রেণির বিপ্লবাত্মক কর্মযজ্ঞের প্রত্যক্ষ ফল, যার বিরুদ্ধে ফ্যাসিবাদ পুঁজিবাদের রক্তাক্ত হাতিয়ার হিসেবে আত্মপ্রকাশ করে।
বর্তমানে, প্রকৃত মজুরি পুনরায় যুদ্ধকালীন নিম্ন স্তরে নেমে এসেছে। (দ্রষ্টব্য: ড. পাওলা আর্কারি, Wages and Cost of Living)।
শ্রমিক শ্রেণির ওপর এই বাড়তি শোষণের বিপরীতে, ধনীক শ্রেণির ওপর করের বোঝা ফ্যাসিবাদী নীতির দ্বারা ধারাবাহিকভাবে হ্রাস করা হয়েছে। উত্তরাধিকার কর উল্লেখযোগ্য হারে কমিয়ে দেওয়া হয়েছে, অপরদিকে পরোক্ষ কর ব্যবস্থার পরিধি বিস্তৃত করা হয়েছে। ফলে রাষ্ট্রীয় আয়ের ষাট শতাংশেরও বেশি এখন সংগৃহীত হয় সেইসব কর থেকে, যা প্রধানত শ্রমজীবী ও শ্রমনির্ভর জনসাধারণের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হয়।
ফ্যাসিবাদী সরকারের ভূস্বামী অভিজাত শ্রেণির প্রতি মনোভাবও ছিল সমানভাবে সদয় ও পক্ষপাতদুষ্ট। সরকার সহিংসভাবে দমন করে ক্যাথলিক পপুলার পার্টিকে, যারা দরিদ্র কৃষকদের পক্ষে ভূমি পুনর্বণ্টনের দাবি তুলেছিল।
আজও, ইতালির প্রায় ৪০ শতাংশ কৃষিজমি মাত্র অর্ধ শতাংশ কৃষিজনসংখ্যার হাতে কেন্দ্রীভূত। বাকি ভূমি পাঁচ মিলিয়নেরও বেশি কৃষক পরিবারে বিভক্ত, যাদের মধ্যে প্রায় দুই মিলিয়ন পরিবারই ভাগচাষি বা ইজারাদার। একটি কৃষক পরিবারের গড় জমির পরিমাণ সামান্য দুই একরেরও কিছু বেশি।
কৃষি উৎপাদনের মোট ফসলের কমপক্ষে এক-তৃতীয়াংশই চলে যায় জমিদারদের ভাড়ার খাতে। এর চেয়েও বড় একটি অংশরাজস্ব আকারে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ করের মাধ্যমে সরকার আদায় করে৷
জার্মানিতে, ফ্যাসিবাদ যা আবির্ভূত হয় “জাতীয় সমাজতন্ত্রের’’ ভ্রান্ত মুখোশ পরে, তার শাসনকালের অন্ধকার খতিয়ানও কোনও অংশে কম নয়। স্বনির্ভরতার অতিজাতীয়তাবাদী নীতির ফলে জীবন-যাপন ব্যয় ক্রমাগত বেড়েই চলেছে।
অন্যদিকে, রপ্তানি বাণিজ্য কৃত্রিমভাবে সম্প্রসারিত করার লক্ষ্যে উৎপাদন ব্যয় হ্রাস করতে শ্রমিকদের মজুরি কাটছাঁট করা হয়েছে।
বেকারত্ব সমস্যারব বহুল প্রচারিত “সমাধান” বাস্তবে ছিল, মজুরি অতি নিম্নস্তরে নামিয়ে আনা এবং বেকারদের বলপূর্বকভাবে কুখ্যাত শ্রম শিবিরে পাঠানো, যেখানে কার্যত বিনা পারিশ্রমিকে শ্রম আদায় করা হতো।
“জার্মান জনগণ নিম্ন মজুরি, খণ্ডকালীন কর্মসংস্থান এবং জীবনযাত্রার উচ্চ ব্যয়ের ভারে প্রায় বিপর্যস্ত; এবং সেই নাৎসি শ্রম ফ্রন্ট, যার উদ্দেশ্য ছিল শ্রেণিসংঘর্ষ বিলুপ্ত করে মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে সহযোগিতার সেতুবন্ধন রচনা, সেটিও দ্রুত ভেঙে পড়ছে।”( The New Statesman and Nation, লন্ডন, ৮ সেপ্টেম্বর ১৯৩৪)
এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর থেকে শ্রম ফ্রন্টের এই পতনকে রোধ করা হয়েছে, শ্রমিকদের জন্য দাসত্বের এক নতুন ব্যবস্থায় রূপান্তরিত করে। জাতীয় স্বার্থের নামে ঘোষিত শ্রেণি-সহযোগিতার এই কাঠামোয় শ্রমিকদের ভাগে পড়েছে “শৃঙ্খলা ও আত্মবলি”— অধিকার নয়।
এই রকম এক সংকটপূর্ণ পরিস্থিতির মধ্যেই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টির প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উদ্যাপন করা হয়। সেখানে উপস্থিত স্থানীয় পার্টি নেতৃবৃন্দ, অর্থাৎ তথাকথিত “বিপ্লবের” প্রকৃত বিজয়ী শ্রেণির উদ্দেশ্যে, হিটলার ঘোষণা করেন:
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব জার্মানির সামাজিক কাঠামোকে হাজার বছরের জন্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারিত করেছে।
অতএব, জনগণের জীবনযাত্রার দুর্দশাকে কোনো আমূল পুনর্গঠনের সাময়িক ফল হিসেবে দেখা চলবে না; বরং এটি কমপক্ষে এক হাজার বছর স্থায়ী হওয়ার জন্য নির্ধারিত।
হিটলার আরও উপদেশ দেন:
জনগণকে শিখতে হবে যে বিপ্লবের কাছে অতিরিক্ত কিছু প্রত্যাশা করা অনুচিত এবং কী সম্ভব আর কী অসম্ভব—এই পার্থক্যটা বুঝে নিতে হবে।
এই চমকপ্রদ ঘোষণার উদ্দেশ্য ছিল স্পষ্ট: নাৎসি কর্মসূচির ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক অংশে যে তথাকথিত “দ্বিতীয় বিপ্লব” এর আকাঙ্ক্ষা লালন করা হচ্ছিল, তাকে একবারে কবর দেওয়া।
এক বিশ্লেষকের ভাষায়:
ফ্যাসিবাদের যা কিছু ‘সম্ভব ও বাস্তব’ অর্জন, তা হলো: বন্দিশিবির, চাবুক, স্বাধীনতার ধ্বংস, জনমতের বিকৃতি, সামরিক অনুশীলন, সেনাবাহিনী এবং বর্বরতায় প্রত্যাবর্তন। (প্রাগুপ্ত)
নিজেরই কর্মসূচির ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক দিকগুলোর প্রকাশ্য প্রত্যাখ্যানে হিটলারের উৎসাহে, তৃতীয় রাইখের তৎকালীন অর্থনৈতিক স্বৈরশাসক ড. শাখ্ট (Dr. Hjalmar Schacht) জাতীয় সমাজতন্ত্রের অর্থনৈতিক তত্ত্বের বিরুদ্ধে প্রকাশ্য ও প্রচণ্ড আক্রমণ চালান। তিনি ‘’অর্থনৈতিক তাত্ত্বিকতা’’ কে অবজ্ঞাভরে খারিজ করে বলেন,
আমরা অতীতে সংগৃহীত অভিজ্ঞতাকে প্রতিক্রিয়াশীল বলে উড়িয়ে দিতে পারি না।
এখানে “অতীত অভিজ্ঞতা” বলতে মূলত পুঁজিবাদকেই বোঝানো হচ্ছে, যা এখন থেকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক জার্মানির অর্থনৈতিক জীবনে আধিপত্যশীল ভূমিকা পালন করবে—এই মতই প্রকাশ করেন তিনি।
ড. শাখ্ট আরও যুক্তি দেন,
আমাদের সময়ে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিক তত্ত্বের উপর ভিত্তি করে কোনও কৃত্রিম কাঠামো নির্মাণ করা সমীচীন নয়। জাতীয় সমাজতন্ত্র কেবল ‘কর্ম’ চেনে, পরিকল্পনা নয়। আমরা কোনও অস্পষ্ট তত্ত্বের দ্বারা নিজেদের পরিচালিত হতে দেব না।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক পার্টির অর্থনৈতিক তাত্ত্বিক গটফ্রিড ফেডার (Gottfried Feder) ঠিক সেই সময়ে একটি প্রবন্ধ লেখেন, যেখানে তিনি পার্টির অর্থনৈতিক কর্মসূচির বিভিন্ন ধারার পুনর্বিবেচনা করেন। ক্ষমতায় আসার আগে পার্টির একটি প্রধান অর্থনৈতিক দাবি ছিল— “সুদ দাসত্বের বিলুপ্তি”
ফেডার এই দাবিকে আবার মনে করিয়ে দেন এবং জাতীয় সমাজতান্ত্রিক সরকারকে অনুরোধ করেন যেন তারা ব্যাঙ্কের ডিসকাউন্ট রেট এবং বন্ধকি সুদের হার হ্রাস করার নির্দেশ দেয়।
তিনি জোর দিয়ে বলেন:
জার্মান অর্থনীতি আগের চেয়েও বেশি পরিমাণে উচ্চ পুঁজিপতিদের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত, যারা মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী ও হস্তশিল্পীদেরকে সুদের দাসত্বে আবদ্ধ রেখেছে। বর্তমান পরিস্থিতিতে, এই শ্রেণির কর্মপ্রয়াস কেবল ঋণের সুদ শোধ করতেই নিঃশেষ হচ্ছে।
ড. শাখ্টের এই প্রচণ্ড আক্রমণ সম্ভবত ফেডারের এই দুর্বল “ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক” কণ্ঠস্বরের বিরোধি থেকেই উদ্ভূত। কারণ, শ্রেষ্ঠ পুঁজিপতিদের আশীর্বাদেই ক্ষমতায় আসা হিটলার আর মধ্যবিত্ত ব্যবসায়ী ও হস্তশিল্পীদের দুশ্চিন্তা নিয়ে মাথা ঘামাচ্ছিলেন না।
জাতীয় সমাজতান্ত্রিক অর্থনীতির মূল দর্শন ছিল যে, “সুদের দাসত্বই’’ জার্মান জনগণের সব দুর্ভোগের মূল কারণ। নাৎসি সামাজিক কর্মসূচির কেন্দ্রীয় অঙ্গীকার ছিল, সুদের দায় বিলুপ্তি এবং রাষ্ট্রীয় ঋণ ব্যবস্থার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ।
এই তত্ত্বের জনক ছিলেন গটফ্রিড ফেডার (Gottfried Feder), যিনি হিটলারকে শিখিয়েছেন— “জাতীয় বিপ্লবের প্রয়োজনীয়তা সম্পর্কে যা কিছু আমি শিখেছি, সবই তাঁর কাছ থেকে।”( হিটলারের আত্মজীবনী অনুসারে)
কিন্তু ক্ষমতায় আসার পর অচিরেই হিটলার তাঁর এই অর্থনৈতিক গুরু ফেডারকে জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের সব পদ ও প্রভাব থেকে সরিয়ে দেন। এরপর উচ্চ পুঁজিপতিদের প্রতিনিধি ড. শাখ্ট হয়ে ওঠেন জার্মান অর্থনীতির প্রকৃত স্বৈরশাসক।
১৯৩৪ সালের শেষ নাগাদ, সুদের দাসত্বের জন্য এক ‘নির্দ্বন্দ্ব ও বেদনাহীন সমাধান’ আবিষ্কৃত হলো। এই সমাধানের প্রস্তাবক ছিলেন নতুন এক তথাকথিত অর্থনৈতিক ওঝা—ক্যোহলার (Köhler), যিনি পার্টির অর্থনৈতিক কমিশনের প্রধান হিসেবে নিযুক্ত হন।
তাঁর “ঔষধি পরামর্শ” ছিল:
আপনার ঋণ পরিশোধ করুন, নতুন ঋণ গ্রহণ করবেন না। ঋণ না থাকলে, সুদের দাসত্বও থাকবে না।
রিশার্ড দারে (Richard Darré) ছিলেন জাতীয় সমাজতন্ত্রের শেষ “আদর্শবাদী মোহিকান”।
হিটলারের ক্ষমতায় আসার দুই বছর পরও তিনি এখনো মনে রেখেছিলেন পার্টির কৃষকদের দেয়া প্রতিশ্রুতি—অর্থাৎ ভূমি বিতরণ।
এমন “স্মরণশক্তি” জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দৃষ্টিতে ছিল গুরুতর অপরাধ।
তবে রিশার্ড দারেকে কৃষিমন্ত্রীর পদ থেকে বরখাস্ত করা হয় তুলনামূলকভাবে আরও লঘু অপরাধে। তিনি কেবলমাত্র এই মত প্রকাশ করেছিলেন যে—মার্ক মুদ্রার অবমূল্যায়নের মাধ্যমে কৃষিপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটানো উচিত।
কিন্তু এই অর্থনৈতিক মতাদর্শ, যা ছিল শিল্পপুঁজিপতিদের স্বার্থের পরিপন্থী, চিহ্নিত হয়—একটি আর্থিক ধর্মদ্রোহ হিসেবে।
ফলে তৎকালীন অর্থনৈতিক স্বৈরশাসক ড. শাখ্ট তাঁর অপসারণ দাবি করেন, এবং হিটলার তাঁর অনুগত শিল্পপতিশ্রেণিকে সন্তুষ্ট করতে দ্রুতই সেই দাবিতে সাড়া দেন।
১৯৩৪ সালের শেষদিকে হিটলারের রাজনৈতিক অবস্থান ছিল নিম্নরূপ:
ফিরার হিসেবে হিটলার নিঃসন্দেহে সর্বময় ক্ষমতাসম্পন্ন, কিন্তু তিনি সর্বশক্তিমান নন। তাঁকেও বৃহৎ পুঁজির স্বার্থ রক্ষা করতে হয় এবং জনমতকে দমন করার পরেও জনগণের যে অপ্রতিরোধ্য প্রবৃত্তিগত আবেগ বেঁচে থাকে, সেগুলোর গতিপ্রকৃতি সম্পর্কে তাঁকেও সতর্ক থাকতে হয়।
সাধারণ জনগণের আবেগ এখনো তাঁকে বিশেষভাবে চিন্তিত করে না; কারণ, তিনি আত্মবিশ্বাসী যে, প্রচারের মাধ্যমে তিনি এখনো তা সামাল দিতে পারবেন, এবং আড়ম্বরপূর্ণ প্রদর্শনীর মাধ্যমে তাদের মনোরঞ্জনও করতে পারবেন। সর্বশেষ উপায় হিসেবে, তিনি সেই আবেগকে পিষে ফেলবেন এবং আতঙ্ক সৃষ্টির মাধ্যমে দমন করবেন, যেমন তিনি ইতোমধ্যেই নাৎসি ব্রাউন আর্মির ‘কম নির্ভরযোগ্য অংশ’কে নির্মমভাবে দমন করেছেন।
কিন্তু তাঁর প্রাক্তন অর্থদাতারা, যাঁরা বৃহৎ শিল্পপুঁজির অধিপতি, তাঁদের প্রতি হিটলারের দহরম-মহরম অনেক বেশি।
তাঁর সেই পুঁজিপতি অভিভাবকেরা তাঁকে নির্দেশ দেন, যেন তিনি পার্টির ছদ্ম-বিপ্লবী বামপন্থীদের ‘শৃঙ্খলাবদ্ধ’ করেন। হিটলার নিজেকে সেই নির্দেশের মধ্য দিয়ে তাঁর ব্যক্তিগত কর্তৃত্ব প্রয়োগ করছেন বলে ভেবে আত্মতুষ্ট হন, এবং তাঁদের আদেশ পালন করেন বিনা দ্বিধায়। এবং সম্ভবত, ভবিষ্যতেও তিনি এই পুঁজিবাদী শ্রেণির আদেশ মান্য করে যাবেন।
— (“The New Statesman and Nation”, লন্ডন, ১১ আগস্ট ১৯৩৪)
বারবার, হিটলার এবং তাঁর পার্টির শীর্ষ নেতৃবৃন্দ এই দাবি করেছেন যে, জার্মানিতে জাতীয় সমাজতন্ত্রের বিজয় ইউরোপকে বলশেভিক বিপ্লব থেকে রক্ষা করেছে। তাঁদের ভাষায়:
যদি নাৎসিরা বিজয়ী না হতো, তবে বলশেভিকবাদের কবলে পড়ত শুধু জার্মানি নয়, সমগ্র ইউরোপ। নাৎসি সাফল্যই আমাদের পরিত্রাণ এনেছে বলশেভিক বর্বরতার হাত থেকে।
বাস্তবতা হলো, প্রারম্ভিক পর্যায়ে জার্মান ফ্যাসিবাদ কখনোই নিজেদের সমাজতান্ত্রিক দাবি করেনি। ১৯১৯ থেকে ১৯২০ সালের বিপ্লবী দিনগুলোতেই তারা ঘোষণা করেছিল, তাদের লক্ষ্য হলো—
লাল বিপদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম (Fight against the Red Peril)।
হিটলার ১৯২২ সাল থেকেই নিয়োগকর্তা সংগঠনগুলোর নিকট থেকে আর্থিক সহায়তা চেয়ে আসছিলেন এই যুক্তিতে যে—তার পার্টি একটি স্পষ্টভাবে শ্রমিকবিরোধী নীতি গ্রহণ করেছে।
ক্ষমতায় এসে তিনি শ্রমিকদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করেননি; বরং শুরু থেকেই তিনি তাঁদের বিরোধী ছিলেন।”—(কনরাড হেইডেন, “History of National Socialism”)
শুধুমাত্র ১৯২৬ সালে হিটলারের দল তথাকথিত পুঁজিবাদবিরোধী প্রচারে লিপ্ত হয়। পার্টির কর্মসূচিতে যে ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক ধারা অন্তর্ভুক্ত হয়, সেটি হিটলারের নিজস্ব উদ্যোগে নয়, বরং তাঁর বিরোধিতা সত্ত্বেও স্ট্রাসার ভ্রাতৃদ্বয়ের (Gregor এবং Otto Strasser) উদ্যোগে সংযোজিত হয়।
কিন্তু, যখন নাৎসি পার্টি রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করে, তখনই স্ট্রাসার ভ্রাতৃদ্বয়কে নেতৃত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়। পরিণামে, একজনকে হত্যা করা হয় এবং অপরজন দেশত্যাগে বাধ্য হন।
হিটলার শাসনের দ্বিতীয় বছরে, পার্টির বামপন্থী অংশ স্পষ্টভাবে ক্ষমতাসীন প্রতিক্রিয়াশীল গোষ্ঠীর নীতির প্রতি অসন্তোষ প্রকাশ করতে শুরু করে।
পার্টির অভ্যন্তরে এক বৃহৎ শ্রমজীবী অংশ সক্রিয় ছিল। নাৎসি ব্রাউন আর্মির সাধারণ সদস্যরা ছিল মূলত বেকার তরুণ শ্রমিকদের মধ্য থেকে নিয়োগপ্রাপ্ত।
তাঁরা আশা করেছিল যে পার্টির অর্থনৈতিক মুক্তির উদ্দেশ্যে প্রদত্ত চমকপ্রদ প্রতিশ্রুতিগুলোর কিছু অন্তত বাস্তবায়িত হবে। এই পটভূমিতে ক্রমেই জোরালো হয়ে উঠেছিল— “দ্বিতীয় বিপ্লব” এর দাবি।
কিন্তু হিটলারের মঞ্চের নেপথ্যের শক্তিগুলো, বিশেষত জমিদার ও সামরিকপন্থীরা, এই দাবি দেখে ক্ষুব্ধ এবং শঙ্কিত হয়ে ওঠে। জমিদার ও সামরিক অভিজাতদের পক্ষ থেকে ভন পাপেন (von Papen) একটি হুঁশিয়ারিমূলক ভাষণে বলেন:
হিটলার যেভাবে তাঁর প্রচেষ্টায় জার্মানির চ্যান্সেলর হয়েছেন, তাতে তার বোঝা উচিত, যদি পাপেট তার পোষকের ইচ্ছামতো আচরণ না করে, তবে তাকে সরিয়েও ফেলা যেতে পারে।
একইভাবে, ক্রুপ ভন বোলেন (Krupp von Bohlen), জার্মান শিল্পপতিদের অন্যতম মুখপাত্র,জাতীয় অর্থনৈতিক উপদেষ্টা পরিষদের সভাপতির পদ থেকে পদত্যাগের হুমকি দেন।
এই হুমকি ছিল একপ্রকার ভারী শিল্পপুঁজির পক্ষ থেকে হিটলার সরকারের প্রতি সমর্থন প্রত্যাহারের ইঙ্গিত। অবশেষে আদেশ আসে এবং হিটলার বাধ্য হন তা পালন করতে।
ফলে, ১৯৩৪ সালের ৩০ জুন তিনি নাৎসি পার্টির অভ্যন্তরে নৃশংস “রক্তপাত’’ পরিচালনা করেন, যার উদ্দেশ্য ছিল “দ্বিতীয় বিপ্লবের সম্ভাবনাকে নির্মূল করা”।
(গেরিং-এর ভাষায়—“destroy the danger of a second revolution”)।
ভূস্বামী, সামরিকতন্ত্রী এবং পুঁজিপতিদের নির্দেশে কার্যকরী ভূমিকা পালন করার মধ্যেই, হিটলার ঘোষণা করেন:
“আমাদের কর্মসূচি তাৎক্ষণিক নয়, এটি এক যুগান্তকারী অধ্যায়। আমাদের ব্যবস্থা এক হাজার বছর টিকে থাকবে। আমরা সহস্রাব্দের জন্য কাজ করছি। ধৈর্য ধরো! অপেক্ষা করো!”
শিল্পের সমাজিক মালিকানা, যা তাঁর প্রতারিত অনুসারীরা দাবি করেছিল, সে বিষয়ে হিটলার তাৎপর্যপূর্ণভাবে বিরোধিতা করেন।
তাঁর ভাষ্যে, এই ধরনের পরীক্ষামূলক উদ্যোগ “বিপজ্জনক”, কারণ এগুলো “শিল্প প্রক্রিয়া থেকে সৃষ্টিশীল উপাদান এবং ব্যক্তিত্বের শক্তিকে নির্মূল করে দেয়”।
একইভাবে, তাঁর পার্টির প্রাথমিক ঘোষণাপত্রে বৃহৎ জমিদারির অধিগ্রহণের প্রতিশ্রুতি ছিল। কিন্তু ক্ষমতায় এসে হিটলার মত প্রকাশ করেন যে, “দক্ষ উৎপাদন বজায় রাখতে হলে বৃহৎ জমিদারির কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখা আবশ্যক”।
‘’নতুন জার্মানিতে প্রকৃত ক্ষমতার নাটাই ঘোরান যারা, তারা হলো—ভারী শিল্পপতি, বৃহৎ অর্থিক খাতের পুঁজিপতি এবং জমিদার শ্রেণি। তাঁদের নির্দেশেই হিটলার জাতীয় বিপ্লবের ঘোষিত কর্মসূচি থেকে ছদ্ম-সমাজতান্ত্রিক উপাদানসমূহ বাদ দেন।
পুঁজিবাদ তার অনুচরকে নির্দেশ দেয়—লাভে হস্তক্ষেপ বন্ধ করো। হিটলার সেই আদেশ পালন করে; বিপ্লব শেষ।’’
— (“Hitler Over Europe” থেকে উদ্ধৃত)
এটি হিটলার শাসনামলে জার্মানির বাস্তব পরিস্থিতির একটি যথার্থ বিবরণ। ফ্যাসিবাদের সমাজতন্ত্রের দাবি ছিল একটি ছলনা।
শাসক শ্রেণির দ্বারা ক্ষমতায় প্রতিষ্ঠিত নাৎসিরা, তাদের প্রভুদের লোভ চরিতার্থ করতে গিয়ে জার্মানিকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।
ফ্যাসিবাদের জাতীয়তাবাদ যেমন ছলনাপূর্ণ, তেমনি তাদের সমাজতন্ত্রের দাবিও প্রতারণামূলক। জার্মানির মতো শিল্পোন্নত দেশে প্রকৃত জাতীয় কল্যাণ সম্ভব নয় শ্রমজীবী শ্রেণির অবস্থার উন্নয়ন ব্যতীত; কারণ, সেখানে শ্রমজীবী জনগণ সংখ্যাগরিষ্ঠ, এবং জাতীয় স্বার্থ নির্ধারিত হওয়া উচিত সংখ্যাগরিষ্ঠের কল্যাণের ভিত্তিতে।
তাই শ্রমজীবী শ্রেণির স্বার্থ জাতীয় স্বার্থের বিরোধী হতে পারে না। এই দৃষ্টিকোণ থেকে, শ্রমিক শ্রেণির প্রতি ফ্যাসিবাদীদের তীব্র শত্রুভাবাপন্নতা তাদের তথাকথিত জাতীয় কল্যাণচিন্তার সাথে সম্পূর্ণ বিরোধপূর্ণ।
ছবি: ফিল্ম পোস্টার (১৯৩৯)
নাৎসিরা ভার্সাই চুক্তির বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে পঙ্গু মধ্যবিত্ত শ্রেণির সমর্থন অর্জন করেছিল। তাদের মূল স্লোগান ছিল: জার্মান জাতীয় সম্মান পুনরুদ্ধার। যাঁরা এই অপমানজনক চুক্তি জার্মানির ওপর চাপিয়েছিল, তাদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ নেওয়াই ছিল ফ্যাসিবাদীদের যুদ্ধের আহ্বান।
কিন্তু ক্ষমতায় আসার এক বছরের মধ্যেই, হিটলার এক বক্তৃতায় এই ঘোষণা দেন:
আমাদের জাতির সম্মান পুনরুদ্ধারের জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে যাওয়ার প্রয়োজন নেই। সেখানে কেউ আমাদের সম্মান ছিনিয়ে নেয়নি।
আমাদের কেবল একটিই অপমান সহ্য করতে হয়েছে। তা ছিল না পশ্চিমে, না পূর্বে, তা ঘটেছিল আমাদের নিজ গৃহে। আর এই অপমান আমরা কাটিয়ে উঠেছি।”
(নুরেমবার্গ উৎসবে প্রদত্ত ভাষণ, সেপ্টেম্বর ১৯৩৩)
এখানে হিটলার যে “অপমান”-এর কথা বলছেন, সেটি জার্মান বিপ্লব (নভেম্বর বিপ্লব)— যার সাফল্যই কেবল জার্মান জাতির প্রকৃত কল্যাণ নিশ্চিত করতে পারত।
সোভিয়েত ইউনিয়নের ব্যতিক্রম ছাড়া, ফ্যাসিবাদের যুদ্ধবাজ মনোভাব মূলত জনতাকে প্রতারণা করার কৌশলমাত্র। একটি জনমত্তকরণে ধাপ্পাবাজি ও দম্ভ। ভার্সাই চুক্তির সামরিক ধারাগুলিকে যে নাটকীয়ভাবে হিটলার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন, তা মিত্রশক্তিগুলোর নিঃশব্দ সম্মতির সহায়তা ব্যতিরেকে সফল হতো না।
আজ জার্মানি আবারও একটি শক্তিশালী সেনাবাহিনী গঠন করেছে। কিন্তু চার বছর আগে, যখন ফ্যাসিস্ট সরকার ঘোষণা করল যে তারা ভার্সাই চুক্তি ছিঁড়ে ফেলে জার্মানিকে পুনরায় সশস্ত্র করবে, তখন ইউরোপের রাজনৈতিক সমীকরণ ও সামরিক শক্তির ভারসাম্য এমন ছিল যে যদি মিত্রশক্তিরা চাইত, এই ধাপ্পাবাজিকে যেকোনো সময় প্রতিহত করা যেত।
ফ্রান্সে বহুল উচ্চারিত ও সমর্থিত মত ছিল, একটা প্রতিরোধক যুদ্ধ উদ্ধত নাৎসিদেরকে তাদের পদানত করতে সক্ষম। জার্মান ভূখণ্ডেই যুদ্ধ হতো, এবং মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যে ফ্রাঙ্কো-পোলিশ মৈত্রী বাহিনী বার্লিন দখল করে ফেলত। এই যুদ্ধের ফলে পশ্চিম জার্মানির শিল্পাঞ্চলগুলো অবিলম্বে ফরাসিদের দ্বারা অধিকৃত হতো এবং প্রতিরোধের সম্মুখীন হলে ধ্বংস করা হতো।
স্বাভাবিকভাবেই, নাৎসিদের পৃষ্ঠপোষকেরা এই ধরনের পরিস্থিতি চাননি। তাঁদের লক্ষ্য ছিল, নাৎসি সরকারের যুদ্ধোন্মাদ নাটকীয়তাকে কাজে লাগিয়ে যুদ্ধাস্ত্র বাণিজ্যে বিপুল মুনাফা অর্জন। তাঁরা এই বিপজ্জনক খেলা খেলতে সাহস করেছিল, কারণ তাঁরা জানত, ফ্রান্স আরেকটি যুদ্ধে জড়াতে চায় না।
সুতরাং, পরাজয়ের পর জার্মানির পুনরায় সশস্ত্র হয়ে ‘সূর্যের নীচে’ নিজের স্থান দাবি করে ফিরে আসাটা ফ্যাসিবাদের দর্শনে উজ্জীবিত “জার্মান পৌরষের দুর্জয় চেতনার” কৃতিত্ব নয়। বরং, এই তথাকথিত ‘নবজার্মান সাম্রাজ্যবাদ’ আসলে আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের বিপ্লব-ভীতির বিকৃত সন্তান।
জার্মানিতে বিপ্লবী শক্তিকে দমন করার মাধ্যমে, নাৎসিরা আন্তর্জাতিক পুঁজিবাদের পক্ষে একটি “সেবা” প্রদান করছিল। ফলে, এই কাজে তাঁদের সাহায্য করা উপযুক্ত বিবেচিত হয়।
ভার্সাই চুক্তি ছিঁড়ে ফেলার গৌরব হিটলারকে পঙ্গু মধ্যবিত্ত শ্রেণির এক ধরনের অন্ধ আনুগত্য প্রদান করে, যার মাধ্যমে তিনি অন্তত সাময়িকভাবে বিপ্লবের গতি রোধ করতে সক্ষম হন।
যাঁরা জার্মানির সামরিক শক্তির অলৌকিক পুনরুত্থানে মুগ্ধ, তাঁরা প্রকৃতপক্ষে জানেন না, এই প্রক্রিয়াটি কীভাবে মিত্রশক্তির সহযোগিতা ও সম্মতির মাধ্যমে সংঘটিত হয়েছিল, যারা সে সময় জার্মানিতে বিপ্লব সংগঠিত হওয়ার আশঙ্কায় ছিল।
কথিত ‘জাতীয় সম্মান পুনঃপ্রতিষ্ঠার’ অভিপ্রায় নিয়ে হিটলারের আবির্ভাবের আগেই, ভার্সাই চুক্তির সামরিক ধারাগুলোর ব্যাপকভাবে রদ হয়েছি লোকার্নো চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তিটি স্বাক্ষর করে জার্মানির প্রজাতন্ত্রী সরকার, যাদেরকে নাৎসিরা জার্মানিকে মিত্রশক্তির কাছে বিকিয়ে দেওয়ার অভিযোগে অভিযুক্ত করেছিল।
লোকার্নো চুক্তির একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা ছিল, জার্মান অধিকৃত অঞ্চলসমূহ থেকে মিত্রশক্তির পূর্বনির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই সেনা প্রত্যাহার। আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ছাড় ছিল, মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রণ কমিশনের প্রত্যাহার, যার দায়িত্ব ছিল জার্মানিকে নিরস্ত্রীকরণ নিশ্চিত করা এবং বিশেষত রাইন নদীর বাম তীরের সামরিকীকরণ প্রতিরোধ।
ব্রিটেন ও ফ্রান্স, সেই সময় চেম্বারলেইনের নেতৃত্বাধীন এক সোভিয়েত-বিরোধী বলয় গঠনের কৌশলে বিভোর ছিল। ফলে, তারা জার্মানিকে যে ছাড় দিয়েছিল, তা ব্যবহারিকভাবে পুনঃসশস্ত্রীকরণের অনুমতি প্রদান করে। এই সমস্ত ঘটনা ঘটেছিল বহু বছর আগে, যখন হিটলারের ধামাকা-ভাষণের মাধ্যমে ‘জাতীয় সম্মান পুনরুদ্ধারে’ জার্মান পৌরষ উদ্দীপ্ত করার প্রচেষ্টা শুরুই হয়নি।
ব্রিটিশ কূটনীতি, চেম্বারলেইনের নেতৃত্বে, চেয়েছিল একটি শক্তিশালী জার্মানি— “বলশেভিক বিপদ” প্রতিরোধের একটি দুর্গ। অন্যদিকে, জার্মানিতে বিপ্লব ছড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা, যা সহজেই রাইন নদী অতিক্রম করতে পারত, ফ্রান্সকে আতঙ্কিত করে তোলে। ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী ব্রিয়াঁর ভুলভাবে প্রয়োগকৃত উদারনীতিই ছিল সেই প্রধান কারণ, যার ফলে ভার্সাই চুক্তি দ্বারা প্রতিষ্ঠিত ফ্রান্সের নিরাপত্তা কাঠামো চূর্ণবিচূর্ণ হয়ে পড়ে।
যুক্তরাজ্যের একজন প্রখ্যাত আইনবিদ, জে. এইচ. মরগান, কে.সি., যিনি মিত্রশক্তির নিয়ন্ত্রণ কমিশনের সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। তিনি লেখেন:
এই উভয় চুক্তি (অধিকৃত অঞ্চলসমূহ থেকে সেনা প্রত্যাহার এবং নিয়ন্ত্রণ কমিশনের প্রত্যাহার) যথাযথভাবে ইংল্যান্ড, ফ্রান্স এবং বেলজিয়ামের সরকার কর্তৃক বাস্তবায়িত হয়েছিল। এই দেশে (যুক্তরাজ্যে) খুবই অল্পসংখ্যক মানুষ জানেন যে, ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার এই চুক্তিসমূহ বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে কত দূর পর্যন্ত অগ্রসর হয়েছিল, এমনকি চুক্তির চেয়েও অনেক বেশি কিছু সম্পাদন করেছিল।
এটা শুধু এমন নয় যে, জার্মান সরকার প্রদত্ত অঙ্গীকারেট ওপর আস্থা রেখে নিয়ন্ত্রণ কমিশনকে প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এই বিশ্বাসে যে, জার্মানির অব্যাহত বিচ্যূতি সংশোধন করবে। বরং রাইনল্যান্ডকে নিরস্ত্রীকরণের কাজ, অর্থাৎ ভেরসাই চুক্তির ৪৩ এবং ১৮০ অনুচ্ছেদের বাস্তবায়ন, কার্যত পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছিল।
(“ডেইলি টেলিগ্রাফ”, লন্ডন, এপ্রিল ১৯৩৬ সালের শুরুতে প্রকাশিত।)
এই বিচক্ষণ ও দক্ষ পর্যবেক্ষক আরও সাক্ষ্য দেন যে, এর আগেও নিয়ন্ত্রণ কমিশন জার্মান পুনঃসশস্ত্রীকরণের ব্যাপারে পরোক্ষভাবে সহযোগিতা করেছিল, বেসামরিকায়িত অঞ্চলে কৌশলগত স্থাপনা অক্ষুণ্ণ রেখে। জার্মান পক্ষের তথাকথিত ‘বাণিজ্যিক প্রয়োজনীয়তা’র যুক্তির প্রতি সম্মান দেখিয়ে যুদ্ধোপযোগী স্থাপনাগুলিকে অক্ষত রাখা হয়েছিল। এমনকি রাইন নদীর বাম তীরে অবস্থিত দুর্গ, পরিবহনব্যবস্থা এবং অন্যান্য “স্থায়ী সামরিক অভিযান কাঠামো” মিত্রশক্তির সেনা প্রত্যাহারের সময়ও অক্ষুণ্ণ রাখা হয়, লোকার্নো চুক্তির মর্মের প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে।
বহু বছর ধরেই জানা যাচ্ছিল যে, অধিকৃত অঞ্চলসমূহে জার্মান ‘নিরাপত্তা পুলিশ’ মূলত ছদ্মবেশী রাইখসভেয়ার। কিন্তু এই ক্ষেত্রেও, “জার্মান সংবেদনশীলতার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে,” ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার ১৯২৭ সালে সম্মত হয় যে, এই বাহিনী রাইনল্যান্ডে টিকে থাকবে, এই শর্তে যে তাদের চরিত্র ‘নিরস্ত্রীকৃত’ থাকবে। (প্রাগুক্ত)
আরও একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু ছিল—”ছায়া সেনাবাহিনী” গঠন—যা ব্রিটিশ ও ফরাসি সরকার লোকার্নো চুক্তি স্বাক্ষরের পর কার্যত উপেক্ষা করে। নিয়ন্ত্রণ কমিশনের উপস্থিতিতেই, ১৯২০ থেকে ১৯২৬ সালের মধ্যে, জেনারেল ফন সেক্ট প্রাক্তন সেনাবাহিনীর পুরানো ক্যাডার কাঠামো অক্ষুণ্ণ রাখেন এবং সাধারণ সামরিক নিয়োগ পুনর্বহালের প্রস্তুতি নেন।
ফলে, লোকার্নো চুক্তি, যা অন্তত জার্মান পুনঃসশস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে থামিয়ে দেওয়ার কথা ছিল, তা বাস্তবে এই গোপন প্রক্রিয়াকে বৈধতা দেয়।
সুতরাং, জার্মানির পুনঃসশস্ত্রীকরণের তথাকথিত গৌরবময় বিজয়, যা নাৎসি প্রচারযন্ত্রে হিটলারের কৃতিত্ব হিসেবে উদযাপিত হয়, বাস্তবিক অর্থে হিটলারের অর্জন নয়। এই অধিকার জার্মানিকে প্রদান করা হয়েছিল মিত্রশক্তির পক্ষ থেকে, এবং তা ছিল একটি উপহার— জার্মান জনগণের জন্য নয়। বরং তাদের জন্য, যারা জার্মানিকে প্রথম মহাযুদ্ধের বিপর্যয়ে ঠেলে দিয়েছিল এবং সেই লজ্জাজনক বিপর্যয় থেকেই বিপুল মুনাফা অর্জন করেছিল। এবার তারা সেই “গৌরব” থেকেই নতুন করে মুনাফা অর্জনের কাজে লিপ্ত।
নিয়ন্ত্রণ কমিশন প্রত্যাহারের এক বছরের মধ্যেই জার্মান সরকারের সামরিক বাজেট দশগুণ বৃদ্ধি পায়, যার অর্থ হলো ভারী শিল্পক্ষেত্রে বিপুল সামরিক সরঞ্জামের অর্ডার। নাৎসি উগ্র জাতীয়তাবাদ ছিল মূলত একটি অজুহাত—পুনঃসশস্ত্রীকরণ প্রক্রিয়াকে দ্রুততর করার, যাতে বড় পুঁজিপতিদের অর্থনৈতিক লাভ নিশ্চিত হয়।
হিটলার ক্ষমতায় আসার পরপরই, মাসিক সামরিক ব্যয় বেড়ে দাঁড়ায় ১০০ মিলিয়ন ডলার। পরবর্তী সময়েও এই ব্যয় দ্রুতগতিতে বাড়তে থাকে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র পার্লামেন্টারি পদ্ধতিকে বাতিল করে বাজেট প্রকাশের নিয়মও বাদ দেয়, ফলে সামরিক খাতে আসল ব্যয়ের পরিমাণ নির্ধারণ করা কঠিন হয়ে পড়ে।
তবে দক্ষ সামরিক বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৩৪ সালে এই খাতে ব্যয় হয়েছিল ১,০০০ মিলিয়নেরও বেশি মার্ক, যা ছিল আগের বছরের তুলনায় ৪০ শতাংশ বেশি। পরের বছর বাজেট আবার দ্বিগুণ হয়। হিসাব করে দেখা গেছে, হিটলার শাসনের প্রথম চার বছরে শুধুমাত্র পুনঃসশস্ত্রীকরণে ব্যয় হয়েছিল ১৬,০০০ মিলিয়ন মার্ক। একই সময়কালে গণপূর্ত খাতে খরচ করা হয় আরও ৪,০০০ মিলিয়ন মার্ক, যেগুলোর অধিকাংশই ছিল ছদ্মবেশী সামরিক অবকাঠামো নির্মাণ।
অর্থাৎ, এখন পর্যন্ত ফ্যাসিবাদী সরকার প্রথম মহাযুদ্ধে জার্মানির মোট ব্যয়ের এক-চতুর্থাংশ অর্থ ব্যয় করে ফেলেছে পুনঃসশস্ত্রীকরণে।
এই বিপুল অর্থের অধিকাংশ, যা কার্যত ভারী শিল্পক্ষেত্রের জন্য একটি ভর্তুকি, সংগ্রহ করা হচ্ছে অভ্যন্তরীণ ঋণের মাধ্যমে। জনগণকে এই ঋণে অবদান রাখতে বাধ্য করা হয়।
১৯৩৫ সালে, জার্মানির অভ্যন্তরীণ ঋণের পরিমাণ ছিল জাতীয় সম্পদের এক-তৃতীয়াংশ। যেহেতু পুনঃসশস্ত্রীকরণ কর্মসূচির ব্যয় চলতি আয়ে পূরণ করা সম্ভব নয়, তাই তা পূরণ করতে হবে ভবিষ্যৎ আয়ের মাধ্যমে। অর্থাৎ, জাতির ভবিষ্যৎকে বন্ধক রাখা হয়েছে অস্ত্র উৎপাদনকারীদের হাতে।
কর আদায়ের সক্ষমতা ইতোমধ্যেই চূড়ান্ত সীমায় পৌঁছেছে। এর প্রত্যক্ষ ফলাফল হলো—জনসংখ্যার সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশের জীবনযাত্রার মান ক্রমাগত নিম্নমুখী হচ্ছে।
অন্যদিকে, যারা সহজে পরিশোধ করতে পারতেন, তারা কৌশলে সেই দায়িত্ব এড়িয়ে যাচ্ছেন।
১৯৩৪ সালে এক সরকারি ফরমান জারি হয়, যেখানে বলা হয় যে, সব বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানকে ছয় শতাংশের বেশি লভ্যাংশ সরকারের কাছে জমা রাখতে হবে।
তারপরপরই, বড় বড় শিল্পট্রাস্টের (যেমন: ক্রুপ, টাইসেন, আই.জি. ফারবেন, এ.ই.জি. ইত্যাদি) ব্যালান্স শিটে দেখা গেল, যারা জাতীয়তাবাদী উন্মত্ততা থেকে বিপুল মুনাফা করছিল, তারা দেখাচ্ছে—তাদের মুনাফা ছয় শতাংশের কম।
অন্যদিকে, সঞ্চয় ব্যাংক, ট্রেড ইউনিয়ন, সমবায় ও অন্যান্য সামাজিক বীমা প্রতিষ্ঠানের সকল তহবিল সরকার কর্তৃক অধিগ্রহণ করা হয়েছে, যার বিনিময়ে প্রদান করা হয়েছে তথাকথিত “পুনঃসশস্ত্রীকরণ বন্ড”।
এর ফলে সম্পূর্ণ আর্থিক বোঝা বর্তেছে দরিদ্র মধ্যবিত্ত ও প্রলেতারিয়েত শ্রেণির ওপর, যাদেরকে ভবিষ্যতে “জাতীয় সম্মান পুনরুদ্ধারের যুদ্ধে’’ নিজের জীবন দিয়ে চূড়ান্ত মূল্য দিতে হবে।
এই সময়ে, ধনীরা আরও ধনী হচ্ছে, জাতির মূল খরচের ভার বহন করিয়ে। গরিবদের রক্ত চুষে নেওয়ার সর্বশেষ কৌশল হলো বিক্রয় কর। এটি এক ধরনের মোট আয় ভিত্তিক কর, যা উপার্জনের বিপরীত অনুপাতে করদাতার ওপর বোঝা চাপায়।
উদাহরণস্বরূপ, একজন ব্যক্তি যার মাসিক আয় শত একক, তিনি প্রায় সম্পূর্ণ অর্থ ব্যয় করেন নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য কিনতে—ফলে তাঁর পুরো আয় করযোগ্য হয়ে যায়। অন্যদিকে, যার আয় হাজার একক, তিনি এই একই প্রয়োজনের জন্য ব্যয় করেন মাত্র একটি অংশ—ফলে তাঁর আয়ের কেবল একটি ক্ষুদ্র অংশ করযোগ্য হয়। আয় যত বেশি, করের বোঝা অনুপাতে তত কম।
এটাই হলো “জাতীয় সমাজতন্ত্রের অর্থনীতির’’ বাস্তব প্রয়োগ।
একজন বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদ, যিনি পূর্বে জার্মান সরকারের সাথে যুক্ত ছিলেন, লিখেছেন:
হিটলারের শাসনকালের গত দুই বছরের অভিজ্ঞতা আমাদের দেখিয়েছে যে, একমাত্র লাভবান হবে অস্ত্রশিল্পের উৎপাদকরা। কাঁচামালের ঘাটতির কারণে তাদের ক্ষতির সম্মুখীন হতে হবে না, কারণ সরকারের আমদানি নীতি এমনভাবে পরিচালিত হয়েছে যাতে ভোগ্যপণ্য উৎপাদনের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামালের তুলনায় সামরিক প্রয়োজনীয় কাঁচামালের আমদানিকেই অগ্রাধিকার দেওয়া হয়েছে।
— (পল ক্রসার, দ্য নিউ রিপাবলিক, নিউ ইয়র্ক, ৬ মার্চ ১৯৩৫)
ফলস্বরূপ, জনগণের ভোগের মাত্রা জোরপূর্বক হ্রাস করা হয়েছে।
ভোগের মান নির্ধারণ করে সরকার। খাদ্যপণ্যের সকল মৌলিক উপাদানের মান ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত কমিয়ে আনা হয়েছে। পোশাক-পরিধানের ক্ষেত্রে এই মান অর্ধেকে নামিয়ে আনা হয়েছে। জোরপূর্বকভাবে ভোগের এই হ্রাসকৃত মানকে মজুরি নির্ধারণের মানদণ্ড হিসেবে ব্যবহার করা হচ্ছে। ক্ষুদ্র ব্যবসায়ী, কারিগর ও কৃষকরা শ্রমজীবী জনগণের ক্রয়ক্ষমতা দ্রুত হ্রাস পাওয়ার ফলে চরমভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন।
ছবি: নাজি পোস্টার
নাৎসি নেতারা পরিস্থিতির উন্নতির কোনো প্রতিশ্রুতি দেন না; বরং তার পরিবর্তে জাতীয় সম্মানের নামে আত্মত্যাগ ও আরও আত্মত্যাগের আহ্বান জানান। গোয়েবলস চূড়ান্তভাবে ঘোষণা করেছেন যে, “মজুরি বাড়ানো সম্ভব নয়”। স্বভাবতই, এর কারণ রয়েছে। নাৎসী অর্থনীতিবিদ উইন্ডশু এ বিষয়ে বলেন, বর্তমান মজুরি হার অপরিবর্তিত থাকলে মূল্যবৃদ্ধির অর্থ হবে জীবনের মান আরও নিম্নগামী হওয়া; তথাপি, তিনি অস্ত্রশিল্পের জন্য প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানির খরচ বহনের প্রয়োজনে রপ্তানি বৃদ্ধির আহ্বান জানান এবং নির্দয়ভাবে বলেন, “জীবনের মান সেই লক্ষ্যর অধীন হতে হবে।”
এটি কেবল ব্যক্তিগত মত নয়। নাৎসি শাসনের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বারবার জাতীয় সমাজতন্ত্রের এই স্লোগান উচ্চারণ করেছেন:
যদি জার্মানি স্বাধীন ও ঔদ্ধত্যপূর্ণ হয় এবং যথেষ্ট বন্দুক থাকে, তবে মাখন, ডিম ও কাপড়ের মতো তুচ্ছ বিষয়ে চিন্তা করার কিছু নেই।
এইভাবে জার্মান জনগণের অর্থনৈতিক ধ্বংস সাধন করা হচ্ছে তথাকথিত ‘জাতীয় সম্মান’ পুনরুদ্ধারের নামে। মানুষ যখন রুটির জন্য হাহাকার করছে, তখন তাদের বিনোদনের জন্য সার্কাস পরিবেশন করা হচ্ছে। কিন্তু এমনকি এই সার্কাসও একদিন বিপজ্জনক হয়ে উঠবে, যদি নাৎসি যুদ্ধোন্মত্ততা সত্যিই জার্মানির প্রাক্তন শত্রুদের বিরুদ্ধে পরিচালিত হয়।
শুধুমাত্র সোভিয়েত ইউনিয়নের ক্ষেত্রেই, নাৎসি যুদ্ধোন্মাদরা যা বলে তা-ই বোঝায়। তাদের পররাষ্ট্রনীতি পরিচালিত হয় বিসমার্কের সূত্র—“ড্রাং নাখ্ অস্টেন” —পূর্বাভিমুখে আগ্রাসন—অনুযায়ী। বলশেভিজম ধ্বংস করা এবং রাশিয়ার উর্বর ভূমি জয় করা হল নতুন জার্মান সাম্রাজ্যবাদের স্বপ্ন। ক্ষমতা গ্রহণের সঙ্গে সঙ্গেই হিটলার একটি আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্রে জড়িয়ে পড়েন, যার উদ্দেশ্য ছিল সোভিয়েত ইউনিয়নের ওপর আক্রমণ।
এই তথাকথিত বলশেভিকবিরোধী ‘পবিত্র ক্রুসেডে’ অংশ নিতে নাৎসিরা ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের মতো জার্মান জাতীয় শত্রুদের সঙ্গেও জোট বাঁধতে প্রস্তুত ছিল। ভার্সাই চুক্তির অপমানের প্রতিশোধ নেওয়ার নামে যুদ্ধের জন্য যে আন্দোলন গড়ে তোলা হয়েছিল, তা ছিল নিছক ভণ্ডামি।
১৯৩৩ সালের মার্চ মাসে হিটলার বার্লিনে পোলিশ মন্ত্রীর সঙ্গে একটি গোপন বৈঠক করেন। সেখানে তিনি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যৌথ সামরিক অভিযান চালানোর প্রস্তাব দেন। পোল্যান্ডও জার্মান জাতীয় শত্রুদের অন্যতম ছিল, তবুও সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে যুদ্ধের জন্য হিটলার পুরোনো বিদ্বেষ ভুলে যেতে প্রস্তুত ছিলেন। জানা যায়, তিনি পোল্যান্ডের সঙ্গে রুশ ভূখণ্ড বিভাজনের প্রস্তাবও দেন।
পরবর্তী কূটনৈতিক পদক্ষেপ হিসেবে হিটলার রোজেনবার্গকে বিশেষ দূত হিসেবে লন্ডনে পাঠান, যার মূল লক্ষ্য ছিল ব্রিটেনকে একটি সোভিয়েতবিরোধী জোটে যুক্ত করা। লক্ষ্যণীয় যে, জাতীয় সমাজতন্ত্রের এই প্রধান মতাদর্শিক নেতা লন্ডন সফরকালে রয়্যাল ডাচ পেট্রোলিয়াম কম্বাইনের প্রধান ডেটারডিং-এর আতিথ্য গ্রহণ করেন, যিনি সোভিয়েতবিরোধী চক্রান্তে বরাবরই সক্রিয় ছিলেন।
হিটলার শেষ পর্যন্ত নিজের প্রিয় ‘রাশিয়া-বিরোধী যুদ্ধের’’ পরিকল্পনা স্থগিত রাখতে বাধ্য হন, কারণ এই প্রস্তাব লন্ডন ও প্যারিস, কোনো দিক থেকেই ইতিবাচক সাড়া পায়নি। এটা অবশ্য এমন নয় যে, ব্রিটেন ও ফ্রান্সের শাসকরা এই যুদ্ধের বিরুদ্ধে ছিলেন; বরং তারা হিটলারের চেয়ে অনেক বেশি কৌশলী ও অভিজ্ঞ ছিলেন, এবং তাই এই বিপজ্জনক অভিযানে হুট করে ঝাঁপিয়ে পড়তে রাজি হননি।
বাস্তবিক অর্থেই, নাৎসিরা শুধু ইংল্যান্ডের সঙ্গেই নয়, বরং এমনকি ফ্রান্সের সঙ্গেও আপস করার চেষ্টা করে এসেছে, যাকে তারা বাহ্যত সবচেয়ে বেশি ঘৃণা করে দেখায়। জার্মান সেনাবাহিনী যখন নাটকীয়ভাবে রাইনল্যান্ডে প্রবেশ করে এবং ভার্সাই চুক্তি লঙ্ঘন করে, তার মাত্র কয়েক সপ্তাহ আগেই হিটলার একজন গুরুত্বপূর্ণ ফরাসি সাংবাদিককে একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার দেন।
সেই সাক্ষাৎকারে হিটলার ফ্রান্সের সঙ্গে একটি সমঝোতায় পৌঁছাতে তাঁর আগ্রহ প্রকাশ করেন। যখন ওই সাংবাদিক তাঁর আত্মজীবনীতে প্রকাশিত ফ্রান্স-বিরোধী মন্তব্যগুলোর প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেন, তখন হিটলার ব্যাখ্যা দেন যে, এসব ছিল কেবলমাত্র দেশের অভ্যন্তরীণ জনসাধারণের উদ্দেশ্যে বলা।
যেহেতু রাইনল্যান্ডে সেনা-প্রবেশ ফ্রান্সের বিরুদ্ধে সরাসরি হুমকি হিসেবে উদ্দেশ্যপ্রণোদিত ছিল না এবং তার আগেই ফ্রান্সকে সে ব্যাপারে আশ্বস্ত করা হয়েছিল, তাই ফ্রান্স এ ঘটনার প্রতিক্রিয়ায় কোনো সামরিক পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। অথচ যদি ফ্রান্স সক্রিয়ভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলত, তাহলে নাৎসিদের এই পদক্ষেপ সহজেই থামানো যেত। কারণ তখনো জার্মানি একটি বৃহৎ যুদ্ধের ঝুঁকি নিতে সক্ষম ছিল না। এমনকি জার্মান জেনারেল স্টাফও এই উসকানিমূলক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ছিল বলে জানা যায়।
কিন্তু ফ্রান্স বা ইংল্যান্ড, কেউই এমন কিছু করতে চায়নি যা হিটলারের অভ্যন্তরীণ মর্যাদাকে হানি করতে পারে। কারণ, তা হলে নাৎসি শাসনের পতন ত্বরান্বিত হতো এবং রাইনের পশ্চিম তীরে আবারও বিপ্লবের আশঙ্কা দেখা দিত। তদুপরি, ফ্রান্স পূর্বেই নিশ্চিত হয়েছিল যে জার্মানির এই পদক্ষেপ তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণার উদ্দেশ্যে নয়।
নাৎসি পার্টির “রকশুদ্ধি’র ঘটনার কিছুদিন পরেই, হিটলারের অন্যতম বিশ্বস্ত সহযোগী রুডলফ হেস ফরাসি চরম-জাতীয়তাবাদী যুদ্ধ বীর সমিতির (French War Veteran Association) উদ্দেশ্যে “শান্তি ও শুভেচ্ছা” বার্তা প্রেরণ করেন।
তিনি ফরাসি সৈন্যদের সাহসিকতার জন্য প্রশংসা করেন, এমনকি ফরাসি পররাষ্ট্রমন্ত্রী বার্তুকে শ্রদ্ধা জানান। বার্তু ছিলেন সেই ক্লেমঁসোর অনুসারী, যিনি কুখ্যাত ভার্সাই চুক্তি রচনা করেছিলেন। অথচ সেই চুক্তি ছিন্নভিন্ন করাই ছিল নাৎসি আদর্শের ঘোষিত লক্ষ্য।
হেস অত্যন্ত মোলায়েম ভাষায় শান্তির কথা বলেন। তিনি ফরাসি জাতিকে, যাদের নাৎসিরা এতদিন শত্রু হিসেবে তুলে ধরেছিল, এই ভাষায় সম্বোধন করেন:
একজন গর্বিত সৈনিক হিসেবে আরেকজন গর্বিত সৈনিককে বলছি, যুদ্ধ কি অবশ্যম্ভাবী? আমরা কি একসাথে বসে আলোচনা করতে পারি না? আমরা কি সদিচ্ছার মাধ্যমে মানবজাতিকে যুদ্ধের বিভীষিকা থেকে রক্ষা করতে পারি না?
নাৎসি যুদ্ধোন্মাদনার ফাঁপা প্রচারণা তখনই উদ্ঘাটিত হয়, যখন জানা যায় যে ১৯২৪ সাল থেকে ফ্রান্সবিরোধী ঘৃণা-প্রচারে সবচেয়ে উচ্চকণ্ঠ ছিলেন রুডলফ হেস নিজেই। তাঁর অশ্লীল ঘৃণা প্রকাশ পেয়েছিল একটি কবিতার চরণে:
এই যে ফ্রাঁসি, তোদের মরতেই হবে, যেন আমরা বাঁচতে পারি।
এসব ছিল নিছক জনতাকে উন্মত্ত জাতীয়তাবাদে উসকে দেওয়ার জন্য ব্যবহার করা ভণ্ডামি ও লোকদেখানো প্রচারণা। যার একমাত্র উপকারভোগী ছিল বৃহৎ শিল্পপতিরা, যারা যুদ্ধাস্ত্র বাণিজ্য থেকে বিপুল মুনাফা অর্জন করেছিল। আর এই তথাকথিত ফ্যাসিস্ট জাতীয়তাবাদের এটুকুই ছিল একমাত্র “অর্জন”।
ফ্যাসিবাদীরা ইতালি এবং জার্মানিতে রক্তপাতহীনভাবে বিপ্লবের দাবি করে। তবে প্রাপ্ত নথি কেবল এ দুটি দেশের নয় বরং আরও অনেকগুলো দেশের ক্ষেত্রেই তাদের এই ভণ্ডামির মুখোশ উন্মোচন করে। তবে যাই হোক, এই দেশগুলোতে ‘অতিমানবের’’ উত্থানের পেছনের গল্প পাঠকদের জন্য চিন্তা উদ্রেগকারী হতে পারে।
ইতালিতে মুসোলিনি বিজয়ী জনপ্রিয় সৈন্যদলের প্রধান সেনাপতি হিসেবে রোম দখলের পদযাত্রায় অংশগ্রহণ করে নি। রোম দখলের যাত্রা মঞ্চস্থ হওয়ার সময় ইতিহাসের এই ‘নায়ক’ নিজেকে অনেক দূরে সুরক্ষিত রেখেছিল। তার অর্থের জোগানদার ছিল সেসময়ের পুঁজিবাদীরা। পুঁজিবাদীদের অফুরন্ত অর্থের সাহায্যে সে ভাড়াটে কালো শার্ট বাহিনী জড় করে যারা বিপ্লবী মজুর এবং কৃষকদের বিরুদ্ধে অসংখ্য সন্ত্রাসী হামলা পরিচালনা করে নিজেদের শক্তি প্রদর্শন করছিল। কিন্তু অপেক্ষাকৃত উদারনৈতিক, কিন্তু দুর্বল ও আতঙ্কিত বুর্জোয়া সরকারের হাত থেকে কালো-শার্টধারী ভাড়াটে সৈন্যরা ক্ষমতা দখল করতে পারেনি। বরং নিয়মিত সৈন্যরাই, মুসলিনিকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল। কারণ মুসলিনিই নিজেকে বিপ্লবী গণআন্দোলনের সবথেকে ভয়ঙ্কর এবং নির্মম শত্রু হিসেবে প্রমাণ করতে সক্ষম হয়েছিল। নিয়মিত সেনাদের কাছ থেকে সম্মতি লাভের পরই কেবল রোমের উদ্দেশ্যে ফ্যাসিবাদীদের পদযাত্রা শুরু হয়। নিয়মিত সেনারা যদি ইতোমধ্যে প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রের প্রতি আনুগত্য প্রদর্শন করত তাহলে হয়ত কখনোই এই ‘রক্তপাতহীন বিপ্লব’ সংঘটিত হত না। ইতালির জনগনকেও মুসলিনির মতো একনায়কের শাসনের মত দুর্ভাগ্য সহ্য করতে হত না।
উদারনৈতিক বুর্জোয়া সরকার বিপ্লবী পরিস্থিতি সামাল দিতে ব্যর্থ ছিল। ফলে শোষক শ্রেণি—বিশেষত ভূস্বামী এবং পুঁজিবাদী—এই দুই দল বিপ্লবী আন্দোলনকে দমন করতে পুরাতন সরকারকে নতুন আরেকটি দক্ষ সরকার দ্বারা প্রতিস্থাপিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। একইসাথে তারা এমন একটি সরকারকে ক্ষমতায় বসাতে চেয়েছিল যারা শাসক শ্রেণির আরও বেশি অধীনস্ত হয়। নিয়মিত সৈন্যরা তাদের নিজেদের লোকের তত্ত্বাবধানেই ছিল। কিন্তু একটি বিপ্লবী পরিস্থিতিতে সাধারণ সৈনিকদের উপর ভরসা করা যায় না। এ কারণেই নিয়মিত সৈনিকদের উপর একটি জনপ্রিয় বিপ্লবী আন্দোলন দমনের সম্পূর্ণ দায়িত্ব অর্পণ নির্ভরযোগ্য ছিল না। জনগনের কিছু অংশ অবশ্যই প্রতিবিপ্লবী হয়ে উঠতে পারে। ছদ্ম-সিন্ডিকালিস্ট প্রোপাগাণ্ডা এবং জাতীয়তাবাদী দেশপ্রেম ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্যই পূরণ করছিল। মধ্যবিত্ত বিদ্রোহী এবং প্রান্তিক শ্রমিকেরা মুসলিনির ভাড়াটে কালো-পোশাকের সৈন্যদের তালিকাভুক্ত ছিল। মুসলিনিকে ক্ষমতায় বসানো হয়েছিল কারণ প্রতি-বিপ্লব জনপ্রিয় হয়ে ওঠার সম্ভবনা ছিল। অবশ্যই, সে তার ‘সুপারম্যান’ ইমেজ দ্বারা কোন নোংরা কাজ করাতে আগ্রহী ছিল না। এই কাজের জন্য তো নিয়মিত সৈন্যদেরকেই মজুত রাখা হয়েছিল।
সেই পরিস্থিতিতেই মুসোলিনির পক্ষে ‘ক্ষমতা দখল’ করা সম্ভব হয়েছিল। তখন থেকেই নিয়মিত সেনারা তার রক্ষা এবং পৃষ্ঠপোষকতা করে এসেছে, কখনও কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হতে হয় নি। ক্ষমতা তাঁর পায়ে এসে লুটিয়ে পড়েছে। তবুও শেষ সময়ে এসে প্রচণ্ড ভীতিকর পরিস্থিতিতে পড়েছিল। রোমের পথে পদযাত্রার সময়ও সে প্রত্যক্ষ নেতৃত্ব প্রদানের ঝুঁকি নেয়নি। যখন মহানায়কের বীরত্বগাঁথা মঞ্চস্থ হচ্ছিল তখনও নায়ক মিলানে শান্তিতে ঘুমাচ্ছিলেন। রোম দখলের পর, তাঁর বিশ্বস্ত কিছু লেফটেন্যান্ট টেলিফোনে তাকে সুসংবাদ দেয় এবং দৃশ্যপটে আবির্ভূত হতে বলে। এমনকি তখনও সে নিজেকে ঝুঁকিতে ফেলতে আগ্রহী ছিল না। আসলে সে কোন অলৌকিকতায় বিশ্বাসী ছিল না। অবশেষে, জেনারেল স্টাফের কাছ থেকে খবর পাওয়ার পরই কেবল সে রোমজয়ী হিসেবে একটি ঘুমন্ত গাড়িতে করে পদযাত্রায় অংশ নেয়।
তখন পর্যন্ত বিপ্লব রক্তপাতহীন ছিল। কিন্তু এই করুণ-কৌতুকের পটভূমি যথেষ্ট রক্তাক্ত ছিল। হাজারো শ্রমিক গণহত্যার সম্মুখীন হয়েছিল। শ্রমিকরা সহিংসতা শুরু করেনি। তারা কেবল কাজ হারিয়ে শান্তিপূর্ণভাবে মিছিল করেছিল। কারণ পর্যাপ্ত লাভ করতে ব্যর্থ হয়ে ফ্যাক্টরি মালিকেরা কারখানা বন্ধ করে দেয়। শান্তিপূর্ণভাবে ফ্যাক্টরি চালাতে দিলেই বরং সত্যিকারের রক্তপাতহীন বিপ্লব ঘটানো সম্ভব হত। সেটা করতে দেওয়া হয়নি। বরং শ্রমিকদের উপর সংঘটিত সহিংসতা চালানো হচ্ছিলো যা এমনকি দেশের প্রতিষ্ঠিত আইন কানুনের খেলাপ। শ্রমিকদের শান্তিপূর্ণ কর্মকাণ্ড পরিচালনায় বাঁধা দেওয়া হচ্ছিল, যা কিনা পুঁজিবাদীরাও করতে ব্যর্থ হয়েছিল। তারা দেশের কারখানার চাকা চলমান রাখতে চেয়েছিল যাতে শ্রমিকদের জীবিকা অর্জনের উপায় থাকে। তাহলে হয়ত দেশের অর্থনীতিও পঙ্গু হয়ে পড়বে না।
ক্ষমতা গ্রহণের পর মুসোলিনি নতুন রাজত্বে সকল ভিন্নমত দমনের উদ্দেশ্যে গণহারে সহিংসতা চালায়। ফ্যাসিবাদের বিজয়কে কোনভাবেই বিপ্লব তো বলা যাবেই না, এমনকি তা রক্তপাতহীনও নয়। এটি পূর্বের ধ্বংসপ্রাপ্ত শাসন ব্যবস্থার থেকে কোন প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়নি। সেকারণেই সব সময় রক্ত ঝরানোর প্রয়োজন নাও হতে পারে। অন্যদিকে বিপ্লবী জনগণের প্রতিরোধ ছিল নিরস্ত্র। ফলে সহিংসতা ঘটানোর জন্য অনেক রক্তপাতের প্রয়োজনই হয়নি। কিন্তু অসংখ্য নারী-পুরুষকে সারা জীবনের জন্য জেলে বন্দী করা তলোয়ারের আঘাতে রক্তাক্ত করার চেয়ে কোন অংশেই কম নয়। পাশাপাশি, জনসাধারণের একটি অংশের কথাও মাথায় রাখা জরুরি যারা হত্যা এবং গণহত্যার শিকার হয়েছেন।
ছবি: মুসোলিনির প্রোপাগান্ডা পোস্টার
এবার জার্মানির প্রসঙ্গে কথা বলা যাক। হিটলার ‘সাংবিধানিকভাবে’ ক্ষমতায় এসেছেন এই ভ্রান্তি দূর করা দরকার। কিংবদন্তি চরিত্র সম্পর্কে এ ধরনের বয়ান স্বাভাবিক। প্রজাতান্ত্রিক সংবিধান উচ্ছেদ করার মধ্য দিয়ে হিটলারের ক্ষমতা পাকাপোক্ত করা হয়েছিল। সে সংবিধান লঙ্ঘন করেনি। তার কর্মচারী এবং পৃষ্ঠপোষকেরা তার জন্য এ কাজটি করেছিল। সে ওয়েইমার সংবিধানকে ছুড়ে ফেলে দিয়ে নিজের ক্ষমতা গ্রহণকে উদযাপন করেছিল। যা কিনা ইতোমধ্যেই জুনকার-মিলিটারিস্ট পল ভন হিন্ডেনবার্গ পরিচালিত ‘রিপাবলিকান সরকার’ ধ্বংস করেছিল। জার্মানিতেই ইতালির মতোই পুঁজিবাদীদের মদদপুষ্ট অর্থপ্রাপ্ত এজেন্টদের দ্বারা ফ্যাসিবাদী শক্তি ক্ষমতায় আসে। ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত শাসকদের বিনা প্রতিরোধেই তারা সফল হয়। তারা যে জনপ্রিয় প্রতিরোধের সম্মুখীন হয়েছিল তা রাষ্ট্রীয় দমননীতির দ্বারা মুখ থুবড়ে পড়ে এবং এর মধ্য দিয়ে তাদের ক্ষমতায় যাওয়ার পথ সুগম করে। ক্ষমতায় যাওয়ার এই পন্থার সঙ্গে সহিংসতার গল্প জড়িয়ে রয়েছে। এই সহিংসতা তারা ঘটিয়েছে যারা ইতোমধ্যেই প্রতিষ্ঠিত শাসকদের শত্রু হিসেবে স্বীকৃত, শুধুমাত্র তাদের সাথে যোগসাজশই নয়, বরং তাদের থেকে প্রকৃত সহযোগিতা নেওয়া হয়েছে।
হিটলার নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় বিজয়ী হয়ে সরকার প্রধান হয়। ফলে, সে ছিল জনগণের পছন্দ। সে ক্ষমতায় এসেছে ‘জনপ্রিয় সমর্থন’ পেয়ে। এই সত্য কিভাবে ব্যাখ্যা করা যেতে পারে? এর ব্যাখ্যা পুরো নির্বাচনী প্রক্রিয়ার ভেতরেই রয়েছে। হিটলারকে ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে ১৯৩৩ সালে যে নির্বাচন হয়েছে তা লজ্জাজনক একটি ঘটনা। সে ইতোমধ্যেই হিন্ডেনবার্গের অনুগ্রহে চ্যান্সেলর হয়েছিল, যা কিনা জার্মানির সামরিকতন্ত্রী শাসকের প্রতিনিধিত্বকারী। ফলে এই মহানায়ক এমন সুবিধাজনক অবস্থায় ছিলেন যেখান থেকে তিনি সুকৌশলে নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার পথ তৈরি করতে সক্ষম ছিলেন। তারপরেও সে পরাজিত হয়েছিল।
একমাত্র বিরোধী দল হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল দুটো শ্রমিক পার্টি। এই দুই পার্টি সম্মিলিতভাবে আগের নির্বাচনে প্রায় ৪০ শতাংশ ভোট পেয়েছিল। এই দুই দলকেই ‘আইনি’ দমন এবং বেআইনি সন্ত্রাসের মধ্য দিয়ে নির্বাচনী মাঠ থেকে উধাও করার পরই নতুনভাবে আবার নির্বাচনের আয়োজন করা হয়। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে তখনও ‘সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক’ পার্টিকে নামেমাত্র টিকিয়ে রাখা হয়েছিল এবং কাজ করতে অনুমতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কমিউনিস্ট পার্টিকে পুরোপুরি দমন করা হয়েছিল। এটা সে সময় ঐ দেশের তৃতীয় বৃহত্তম পার্টি যাদের সংসদে ১০০টির মত সিট ছিল। কমিউনিস্ট পার্টির উপর দমনপীড়ন এটাই প্রমাণ করে যে ফ্যাসিস্টদের ‘গণতান্ত্রিক বিজয়’ মঞ্চস্থ করতে গেলে তার পূর্বেই গণতন্ত্র ধ্বংস করতে হবে। সেসময়কার গুরুত্বপূর্ণ কমিউনিস্ট নেতাদের প্রত্যেকে ছিলেন হয় জেলে, নয়তো লুকিয়ে। এই দলের সদস্যরা ফ্যাসিবাদীদের ভয়ঙ্কর সন্ত্রাসের সম্মুখীন হয়েছিল। এমনকি সোশ্যাল-ডেমোক্র্যাটিক পার্টির সদস্যরাও সমান আতঙ্কিত ছিল। পোলিং বুথগুলো ফ্যাসিবাদী গুণ্ডাদের নজরদারির আওতায় ছিল। ফলে, সাধারণ মানুষের জন্য কমিউনিস্ট কিংবা সোশ্যালিস্ট যে কোন পার্টিকে ভোট প্রদানই ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। অনেকে ভোটই দেন নি; অনেকে নিজের পছন্দের দলকে ভোট দিতে পারেন নি। যারা ফ্যাসিবাদিদের ভোট দিয়েছেন তাদের অনেকেই চাপের মুখে বা ভয়ে ভোট দিয়েছেন। অসংখ্য কমিউনিস্ট ভোট দিতে যেতে পারেন নি কারণ তারা লুকিয়ে ছিলেন। অন্যদিকে যারা হিটলারকে ভোট দিতে চাচ্ছিলেন না তাদেরকে নাৎসি সৈন্যবাহিনীর সদস্যরা তাড়িয়ে বেড়াচ্ছিল। বিরোধীদলীয় পত্রিকাগুলোকে দমন করা হচ্ছিল, তাদের প্রচারমূলক লেখাপত্র বাজেয়াপ্ত করা হচ্ছিল, তাদের সভাগুলো ভাড়াটে গুন্ডার দ্বারা পণ্ড করে দেওয়া হচ্ছিল, তাদের সমর্থকদের নিজের পছন্দে ভোট দেওয়া আটকানো হচ্ছিল অথবা ভোটে বিরত রাখার চেষ্টা করা হচ্ছিল। পুরো রাষ্ট্রব্যবস্থাই যেন ফ্যাসিবাদের প্রচারণা যন্ত্রে পরিণত হয়েছিল।
এমতাবস্থায় একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন কোনভাবেই সম্ভব ছিল না। এই পরিবেশে অনুষ্ঠিত ‘নির্বাচনের’ ফলাফল কোনভাবেই জনগণের আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটায় না। এরকম লজ্জাজনক নির্বাচনও হিটলার সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পায়নি। ফ্যাসিবাদীরা ৪০ শতাংশের বেশি ভোট পায় নি। এই ফলাফল আবারও সকল ভোটারদের একটি ক্ষুদ্র অংশেরই কেবল প্রতিনিধিত্ব করে। কারণ আগেই ব্যাখ্যা করা হয়েছে ভোটারদের একটি বড় অংশই কেন ভোট দিতে পারে নি।
অন্যদিকে সীমাহীন নিপীড়ন, কঠোর পরিশ্রম, নানা প্রতিবন্ধকতা মোকাবিলা করেও কমিউনিস্ট পার্টি সংসদে পূর্বের ১০০টির থেকে ৮০টি সিটে বিজয় অর্জন করতে সক্ষম হয়। এ কারণে, এই বিজয়কে প্রকৃত বিজয় হিসেবে আখ্যায়িত করা যায়। স্বাভাবিক অবস্থায় ভোট হলে তারা অনেক বেশি ভোট পেতে পারত। এ থেকে প্রমাণিত হয়, সত্যিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় হিটলারের ভাগ্যে অসম্মানজনক পরাজয়েরই সম্ভবনা বেশি। তুলনামূলক স্বাধীনতায়ও কমিউনিস্ট পার্টি যে অসাধ্য সাধন করেছে তা ধন্যবাদ পাওয়ার যোগ্য, এই অসম প্রতিযোগিতায় সোশ্যাল ডেমোক্র্যাটিক পার্টিও আগের থেকে ভাল ফল করেছিল। এই নির্বাচনের মধ্য দিয়ে কমিউনিস্ট পার্টি, সোশ্যাল-ডেমক্র্যাট এবং অন্যান্য ফ্যাসিবাদ বিরোধী ছোট কতক দল মিলে নতুন সংসদের প্রায় অর্ধেক আসনে বিজয়ী হয়। বিজয়ীরা এরকম সংসদের মুখোমুখি হতে চায়নি। ফলে নতুন উদ্যমে আরও সহিংস পথ তারা বেছে নেয় ভিন্নমত দমন করতে। গণতন্ত্রের সর্বশেষ চিহ্ন বাতিল করে ‘সাংবিধানিক একনায়কত্বের’ পথ বেছে নেয়। সাংবিধানিকভাবে নির্বাচিত ৮০ জন জনপ্রতিনিধিকে সংসদে অনুমতি দেওয়া হয়নি। এই ৮০ জন জনপ্রতিনিধি এমন ৪০ লক্ষ মানুষের প্রতিনিধিত্ব করছিল যারা সংগঠিত সন্ত্রাস মোকাবিলা করেও ভোট দিয়েছিল। আরও অনেকে ইচ্ছে থাকা সত্ত্বেও এই প্রতিনিধিদের ভোট দিতে পারেন নি। সোশ্যাল ডেমক্র্যাটদের একটা বড় অংশের প্রতিনিধিরাও নিপীড়ন থেকে বাঁচতে নিজেদের সংসদে উপস্থিত হওয়া থেকে বিরত রেখেছিল। ফলে যে সংসদ হিটলারকে একনায়ক ক্ষমতা প্রদান করেছিল তা ৭০ শতাংশেরও বেশি নির্বাচকমণ্ডলীর প্রতিনিধিত্ব করে না। এমনকি নির্বাচকমণ্ডলীর যে একটি অংশ ফিরে এসেছিল তাদের অনেকেই হিটলারকে ভোট দেয়নি। ফলে, ফ্যাসিস্টরা তখনই ক্ষমতায় এসেছিল যখন কিনা তারা কোনভাবেই ৩৫ শতাংশ নির্বাচক মণ্ডলীর ভোট পায়নি। এটিই হিটলারের কাল্পনিক ‘সাংবিধানিক’-ভাবে ক্ষমতায় আসার সত্য উদঘাটন করে।
হিটলারের কাল্পনিক ‘সাংবিধানিক’ বিজয়ের সত্য আরও একটি ঘটনার মধ্য দিয়ে উঠে আসে। ১৯২৮ সালের পর থেকেই নির্বাচনে ফ্যাসিস্টদের ভোট ক্রমাগত লাফিয়ে লাফিয়ে বেড়েছে। কিন্তু হিটলারের ‘সাংবিধানিক একনায়কত্ব’ লাভের মাত্র কয়েক মাস আগের নির্বাচনে ফ্যাসিবাদীরা একটি গুরুতর সমস্যার সম্মুখীন হন। হঠাৎ করেই নাৎসিরা প্রায় বিশ লাখ কম ভোট পায়। এটি স্পষ্ট প্রমাণ করে কৃত্রিমভাবে শক্তিশালী করা আন্দোলন তার চূড়ান্তে রূপ লাভ করেছে এবং খাদের কিনারে পৌঁছে গেছে। অপেক্ষাকৃত প্রান্তিক মধ্যবিত্ত শ্রেণিও ফ্যাসিস্টদের প্রতি তাদের বিশ্বাস হারানো শুরু করেছে। তারা নাৎসিদের মিথ্যাচার এবং ধাপ্পাবাজি ধরে ফেলতে সক্ষম হয়েছিল। পূর্ববর্তী নির্বাচনে নাৎসিরা বেশ কিছু প্রদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ আসনে বিজয়ী হয়েছে। তারা মন্ত্রাণালয়ের দায়িত্ব নেওয়ার পর ভোটারদের প্রতিশ্রুত সেবা দিতে ব্যর্থ হয়েছে। অনুসরণীয় নেতাদের আত্মবিশ্বাসে ভাটা পড়েছে, পৃষ্ঠপোষকদের সহযোগিতা না পেলে চলমান আন্দোলন বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে এমন অবস্থা সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে তারা এবং তাদের বেশি কথা বলা লেফট্যান্যান্টরা সমস্যা সমাধানের কোন উদ্যোগ নিতে পারছে না, অন্যদিকে বিপ্লবী শ্রমজীবীরা রাস্তায়। ফলে বুর্জোয়া বুঝতে পারে এখনি সময় তাদের নায়কদের ক্ষমতা থেকে ছুড়ে ফেলার।
বৃদ্ধ হিন্ডেনবার্গকে নির্দেশনা দেওয়া হয় তাঁর সমস্ত বংশ মর্যাদা জলাঞ্জলি দিয়ে এমন একজনের কাছে ক্ষমতা হস্তান্তর করতে যে কিনা নির্বাচনে খুব বেশি ভাল করতে পারেনি, এমনকি সংসদেও খুব অল্প সংখ্যক আসনের প্রতিনিধিত্ব করছে। হিটলারের ক্ষমতায় আবির্ভাব নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় জনগণের সমর্থনের মধ্য দিয়ে ঘটেনি, বরং একজন উদ্ধত ফিল্ড মার্শালের ইচ্ছায় ‘শঠ বোহেমিয়ান ড্রিল সার্জেন্টের’ অনিচ্ছাকৃত অভ্যর্থনার মধ্য দিয়ে ঘটেছে। অতঃপর গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে অগ্রাহ্য করে অধিকাংশের রায়ের বিরুদ্ধে গিয়ে সে ক্ষমতায় গিয়েছে। হিটলার নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার নাটক মঞ্চস্থ করতে সকল ধরনের বৈধ এবং অবৈধ নিপীড়ন কৌশল ব্যবহার করেছেন। সভ্যতার ইতিহাসের সবথেকে ভয়াবহ কাজ রাজনৈতিক কারণে অগ্নিসংযোগ ঘটিয়েছে সে। এই অগ্নিসংযোগ ঘটানো হয়েছিল কমিউনিস্ট পার্টিকে নির্মূল করার পক্ষে বিশ্বাসযোগ্য একটি প্রেক্ষাপট তৈরি করতে। কারণ সেসময় কমিউনিস্ট পার্টিই একমাত্র সংগঠিতভাবে প্রতিরোধ গড়ে তুলতে সক্ষম ছিল। নাৎসিরা রাইখস্টয়াগ ভবন পুড়িয়ে দেয়।১ অগ্নিসংযোগের এই ঘটনাটিই ছিল ‘রক্তপাতহীন বিপ্লবের’ সূচনা সংকেত।
হিটলার রাইখস্ট্যাগ পোড়ানোর ঘটনাকে ঈশ্বরের ইশারা হিসেবে স্বাগত জানিয়েছিল। ঐশ্বরিক অনুমোদনের মাধ্যমে সকল ভিন্নমত দমন করেছিল। তারপরেও, অধিকাংশ মানুষ তাকে ভোট দিতে অস্বীকৃতি জানায়। ঈশ্বর হয়ত এই আধুনিক মোজেসকে সাহায্য না করতেও পারতেন, কিন্তু বুর্জোয়ারা তাদের নায়ককে মহিমান্বিত করতে পাশে ছিল। তাদের কৌশল হিসেবে যে কোন উপায়ে হিটলারকে নিরঙ্কুশ ক্ষমতা প্রদান করতে চেয়েছিল যাতে করে সে তার প্রতি অর্পিত নিষ্ঠুর কর্মকাণ্ডগুলো পরিচালনা করতে পারে। অনিয়ন্ত্রিত সহিংসতার মধ্য দিয়ে ‘রক্তপাতহীন বিপ্লব’ আনা হয়েছিল এবং তার ফলাফল ছিল সবথেকে রক্তক্ষয়ী। বুর্জোয়া পৃষ্ঠপোষকতায় স্বৈরাচারী ক্ষমতা বাড়িয়ে পূর্বসূরি ইতালির মুসলিনির মতোই হিটলার তার প্রভুদের মর্জিমত চলা শুরু করে।
‘রক্তপাতহীন বিপ্লব’ মানবজাতির মহৎ অর্জন ধ্বংস করতে সংকল্পবদ্ধ ছিল। “জার্মানি একটি দুর্দান্ত এবং অবিশ্বাস্য মাত্রায় একটি ভয়ঙ্কর উদাহরণ তৈরি করছে। বিংশ শতাব্দীর জার্মানির জাতীয় সংস্কৃতির বিশুদ্ধতা রক্ষার আকাঙ্ক্ষা দ্বারা অনুপ্রাণিত শিক্ষামূলক পরিবেশনার সমান্তরাল হিসেবে প্রাথমিক মধ্যযুগীয় ইতিহাস অনুসন্ধান করতে হবে”। (Robert Briffault, “The Nationalist Crazee in Culture” in the Curent History”, New York, August 1933)। একইরকমভাবে সাংস্কৃতিক ইতিহাসের আরেকজন বিশিষ্ট চিন্তক লিখেছেন: “সকল বিদেশি সমালোচক ফ্যাসিস্ট ইতালির অনন্য শিল্পকর্ম এবং সাহিত্যের বন্ধাত্ব নিয়ে মত প্রকাশ করেছেন”।
আধুনিক সংস্কৃতির প্রতি ফ্যাসিবাদের শ্ত্রুতা এক কথায় হিংস্র। এটি নিছক বর্বরতার দিকে ধাবিত হওয়াকেই প্রতিনিধিত্ব করে। ফ্যাসিবাদের এই চরিত্র সভ্য সমাজে চরম বিরক্তির উদ্রেক ঘটায়। এটি এমনকি তাদেরকেও হতবাক করে যারা কিনা ফ্যাসিবাদের মৌলিক বিষয়গুলোর ব্যাপারেও আপত্তি জানায় না, যেমন- শ্রমিকশ্রেণির বিপ্লবী আন্দোলনকে প্রতিহত করতে সীমাহীন সহিংসতা ঘটানো। পুঁজিবাদের নড়বড়ে কাঠামোকে মজবুত করতে এই সহিংসতাগুলোই ভিত্তি হিসেবে কাজ করেছিল।
যারা নিজেদের ‘অতিমানব’ রূপে উপস্থাপন করে রক্তপাতহীন বিপ্লব সাধনের অলৌকিক কৃতিত্বের দাবি করে, তাদের প্রসঙ্গে পক্ষপাতহীন প্রামাণ্য উদারপন্থী মতামত উদ্ধৃত করাই যথেষ্ট।
“জার্মানি বর্তমানে মাদকাসক্ত, খুনি, চোর, জালিয়াত এবং নৈতিক স্খলনযুক্ত মানুষ দ্বারা শাসিত হচ্ছে। নিছক গালাগাল করার জন্য এই পরিভাষাগুলো ব্যবহার করা হচ্ছে না; এগুলো বরং নাৎসি আন্দোলনের বেশিরভাগ নেতৃবৃন্দের চারিত্রিক বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে বর্ণনা দিতে সাধারণভাবে ব্যবহৃত শব্দ।” (“The Nation”, New York, August 2, 1933).
“অপরাধের মাত্রা এত বেড়ে গিয়েছিল যে প্রতিরোধ করাও সম্ভব হচ্ছিল না। সভ্য মানুষ অবিশ্বাসে হতবাক হয়ে পড়েছিল। লাখো জার্মানির পরিণতি কল্পনা করাও দুষ্কর, যারা কিনা এই জাতীয় সমাজতান্ত্রিক রাষ্ট্র ব্যবস্থার উন্মাদনার সাথে নিজেদের খাপ খাইয়ে নেওয়ার ক্ষেত্রে অতি সভ্য ও অতি বুদ্ধিমান ছিলেন।” (Harrison Brown, “Six Month of Hitlerism”, Ibid)। এই ইংরেজ সাংবাদিক জার্মানিতে প্রায় চার বছর বসবাস করেছেন। তাঁর মতে, নাৎসিদের যুদ্ধ প্রচারণা মাত্রা ছাড়িয়ে এমন জায়গায় পৌঁছেছিল যে, বৈধভাবে কোন শান্তিবাদী সংগঠনের সদস্য হওয়াও (!) শাস্তিযোগ্য অপরাধে পরিণত করা হয়েছিল—যেমন, দীর্ঘমেয়াদী কারাদণ্ড। জার্মানির বিখ্যাত লেখক কার্ল ভন ওসিয়েটজ্কি কেবল শান্তিকামী হওয়ার কারণেই নির্যাতনের শিকার হয়েছেন এবং কারাভোগ করেছেন। এইতো গেল বছর তিনি শান্তিতে নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। পুরস্কার লাভের পরেও তিনি কারান্তরীণ, প্রকাশ্য আদালতে বিচার পাওয়ার অধিকার থেকেও বঞ্চিত।
একজন উদারপন্থী আমেরিকান সাংবাদিক ভার্সাই চুক্তির ফলে জার্মানির সাধারণ জনগণের উপর চলা অন্যায় এবং দুর্দশা দেখে, সাধারণ জনগণের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করে লিখেছেন: “রাইখস্ট্যাগ ঘিরে ধর্মের মত যুদ্ধ-পূর্ব সামরিকবাদ এবং নৃশংসতার উত্থান ঘটতে দেখা যাচ্ছে। পাশাপাশি একটি জাতিকে ধর্মান্ধ গোষ্ঠীর মধ্যে আধা-ভৌতিকভাবে মিলিয়ে যেতে দেখা যাচ্ছে। ধর্মান্ধ এই গোষ্ঠী অতিমানবের কাছে অপ্রতিরোধ্য বলে মনে হয়। অতিমানবদের কাছে এই ধর্মান্ধ গোষ্ঠী অপ্রতিরোধ্য হিসেবে প্রতীয়মান এবং এদের কাছে ইহুদি, অধ্যাপক, শান্তিবাদী, সমাজতান্ত্রিক, র্যাডিকাল, উদারপন্থী, এবং গণতন্ত্রী প্রত্যেকেই ঊন-মানুষ।” (John Gunther, “The Nation”, New York, June 7, 1933)।
ব্যাভারিয়ার প্রাদেশিক সরকারের সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ড. ফ্রিটজ শেয়ের, যিনি কিনা বর্তমানে একজন ফ্যাসিস্ট প্রো-কন্সুলের দ্বারা স্থানান্তরিত হয়েছেন, তিনি একটি ব্যক্তিগত চিঠিতে তাঁর সাবেক সহকর্মী এবং সাবেক প্রধানমন্ত্রীর বরাবর লিখেছেন: “অধিকার এবং ন্যায়ের কিংবা আইনশৃঙ্খলার কোন চিহ্নই রাখা হয়নি। ঐশ্বরিক এবং মানবিক সকল ধরনের অধিকার পদদলিত হচ্ছে। অধঃপতিতরা নিজেদের জার্মানির নৈতিকতার পুনর্জন্মদাতা বলে দাবি করে, অথচ বাস্তবে তারা কেবল বলপ্রয়োগের মাধ্যমে মানুষের উপর তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিয়েছে এবং বন্য প্রাণীর মতো তাদের অহংকারী প্রবৃত্তি চরিতার্থ করেছে।” ব্যক্তিগত চিঠিপত্রে দৈনন্দিন ঘটনাবলীর উপর ভিত্তি করে মত প্রকাশের জন্য, ড. শেয়েরের বিচার করা হয়েছিল এবং রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছিল।
“এটি একেবারেই স্পষ্ট যে, বর্তমান জার্মান সরকার পাশবিক এবং প্রগতিবিরোধী মানুষের সমন্বয়ে গঠিত। তারা ক্ষমতা কুক্ষিগত করতে সকলের বিরুদ্ধে যুদ্ধ লাগাতে প্রস্তত যা কিনা জার্মান সংস্কৃতিতে স্বাভাবিক এবং মূল্যবান।” (The New Republic”, New York, April 26, 1933)। এই উদ্ধৃতিটি একটি বেনামে প্রকাশিত প্রবন্ধ থেকে নেওয়া হয়েছে। লেখক ভয়ে তার নাম প্রকাশ করতে চাননি। সত্য বলার অপরাধে বর্বর ফ্যাসিস্টদের প্রতিশোধের মুখে পড়তে পারেন এই ভয়ে বৃদ্ধ অধ্যাপক নিজের পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিলেন। সত্যকে এমন সন্ত্রাসী কায়দায় ধামাচাপা দেওয়া হচ্ছিল যে সিস্টেমের নাগালের বাইরে পালিয়ে যাওয়া জার্মানরা পর্যন্ত সত্য বলতে ভয় পাচ্ছিল। কারণ তাদের অনেকের বন্ধু এবং আত্মীয়স্বজন তখনও জার্মানিতে বসবাস করছে। প্রতিশোধের বশবর্তী হয়ে তারা এই মানুষগুলোর উপর অত্যাচার করত। সাধারণত ফ্যাসিবাদ বিরোধী প্রবাসীদের আত্মীয়স্বজনকে জিম্মি করে দেশের বাইরেও তাদের মুখ বন্ধ রাখতে বাধ্য করত।
রক্তপাতহীন বিপ্লবের বর্বর সহিংস অনুশীলন এতটাই তীব্র ছিল যে, ‘অতিমানবদের’ মধ্যেও ব্যতিক্রমী কিছু ব্যক্তি বিচ্ছিন্নভাবে প্রতিবাদ উস্কে দিচ্ছিল। এদের মধ্যে কিছুটা হলেও ভদ্রতা অবশিষ্ট ছিল। কাউন্ট ভন রিভেন্টলো নামের একজন ব্যক্তিকে হিটলারের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে দেখা যায় “ট্রেড ইউনিয়নের কর্মচারীদের টেনে হিছড়ে নাৎসিদের প্রধান কার্যালয়ে নেওয়া হয়। এই কর্মচারীদের ভেতরে নারীও ছিলেন। তাদের মারধর করা হয় এবং নারীদের সাথে এমন খারাপ ব্যবহার করা হয় যা বর্ণনা করা সম্ভব নয়।”
আধুনালুপ্ত প্রজাতন্ত্রের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, এটির প্রথম চ্যান্সেলর, ফিলিপ শেইডম্যান প্রাগে নির্বাসিত অবস্থায় লিখেছিলেন, “হিটলারের বার্লিন হল অগ্নিসংযোগকারী টর্চের মত যেখানে অপরাধী এবং একদল উন্মাদ গানপাওডারের পিপা নিয়ে খেলছে।” (“The Times”, London, end of June 1933)। এই মত প্রকাশের অপরাধে বেশ কয়েকজন নারীসহ শেইডেনের পরিবারের যারা তখনও জার্মানিতে অবস্থান করছিল তাদের সবাইকে গ্রেফতার করা হয়। তাদেরকে কমিউনিকেডো নামের বন্দি শিবিরে রেখে তাদের উপর মধ্যযুগীয় কায়দায় অত্যাচার চালানো হয়। বয়স কিংবা লিঙ্গের বাছ- বিচার ছাড়াই ‘অপরাধী এবং মানসিকভবে উন্মাদ’ ব্যক্তিদের দ্বারা হিটলারীয় কায়দায় এই বর্বরতা চালানো হয়েছিল।
এডলফ হিটলার জীবনীকারদের জন্য হতাশা উদ্রেককারী। একজন জীবিত রাজনৈতিক নেতার জীবন সম্পর্কে বর্ণনা করা সবথেকে কঠিন। কিন্তু সেই নেতা যখন আধা-উন্মাদ, ক্ষমতাধর, সেই ক্ষমতা যখন সে অন্ধ উন্মাদনার দ্বারা আরও বাড়াতে চেষ্টা করে; যখন সে একইসাথে অস্তিত্বহীন এবং ত্রাণকর্তা; তার আচরণ যখন সাধারণ থেকে শুরু করে ভয়ঙ্কর পর্যন্ত বিস্তৃত, একইসাথে বিরক্তিকর এবং মহৎ, অর্বাচীন থেকে শুরু করে আবেগপূর্ণ; যখন সে বাইরের অন্ধকার থেকে উঠে আসা ভুতুড়ে কণ্ঠস্বর শুনতে পায় এবং জ্ঞানী ব্যক্তিদের নিশ্চিহ্ন করে দেয়, তখন জীবনীকারদের কাজ শুধু কঠিন নয় অসম্ভব হয়ে ওঠে।” (The New Republic”, New York, June 10, 1936)।
“যখন কেউ একজন নেতার বক্তব্য শোনে, সে বুঝতে পারে যে রোগাক্রান্ত মনের সান্নিধ্য অনুধাবন করতে পারে। গত জুনের ঘটনা (তাঁর একসময়ের বিশ্বস্ত লেফট্যান্যান্টদের হত্যাকাণ্ড) আমাদের ভাবতে বাধ্য করেছে যে সে নিপীড়নকারী এবং মানসিকভাবে বিকারগ্রস্থ একজন মানুষ। একটি মহান এবং অতি সভ্য একটি জাতি এমন একজন ব্যক্তির করুণা প্রার্থী যে কিনা স্নায়বিক অস্থিরতাক্রান্ত, পরিকল্পিতভাবে ক্রোধের বিস্ফোরণ ঘটাতে পারে। পরামর্শদাতা হিসেবে একজন ব্যক্তিই তার পাশে থেকে তাকে পরিচালিত করতে পারে, সে হল গোয়ারিং। গোয়ারিং তার নিজের রেকর্ডেই হিটলারের থেকে বেশি নিষ্ঠুর এবং আরও বেশি বেপরোয়া।” (The New Statesman and Nation”, London, August 14, 1934)।
“ফ্যাসিবাদ হল যুক্তির বিরুদ্ধে বিদ্রোহ; সহিংসতা, আবেগ এবং গভীর আসক্তির প্রতি আহবান। এর ফলাফল অতি আবশ্যকভাবে নিষ্ঠুরতা, উন্মাদনা এবং গুন্ডাগিরি।” (Robert Dell, “Germany Unmasked”)। বিভিন্ন অফিশিয়াল প্রকাশনার উদ্ধৃতিসমূহ ঘেঁটে লেখক এই গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। মি. ডেল দেখিয়েছেন কিভাবে নাৎসিরা অনেক সময় নিষ্ঠুরতাকে প্রয়োজনীয়তা হিসেবে দেখানোর চেষ্টা করত এবং কখনও কখনও ‘ইহুদি মিথ্যাচার’ হিসেবে নিন্দা করত। সত্যিকার অর্থে নিষ্ঠুরতার ঘটনাগুলো কোন দূর্ঘটনা তো নয়ই বরং যুক্তিসঙ্গত এবং ইচ্ছাকৃতভাবে গৃহীত নাৎসি নীতিরৈ অংশ। রক্তপাতহীন বিপ্লবের সবথেকে জনপ্রিয় গানগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি গান হল: “ছুরি থেকে যদি ইহুদির রক্ত পড়ে, তাহলে আমরা দুইবার করে মার্চ করব”।
হিটলারের জীবনীগ্রন্থে কর্তৃত্বমূলকভাবে ঘোষণা দেওয়া হয়েছে, ফ্যাসিবাদের প্রধান উদ্দেশ্যই হল দূর্বলের ধবংস এবং সবলের জয়। সামাজিক ব্যাধির ফ্যাসিবাদী ঔষধ হল ইহুদিদের ধ্বংস এবং জোরপূর্বক পুঁজিবাদ টিকিয়ে রাখা। এর রাজনৈতিক কর্মসূচি হলো অস্ত্রশস্ত্র বৃদ্ধি এবং বিজয়ের উদ্দেশ্যে যুদ্ধ করা। “উপনিবেশগুলো ক্ষমতার অধিকারে অধিগ্রহন করা হয়েছিল। ইউরোপের দরকার ছিল কাঁচামাল এবং উপনিবেশ। যেখানে জীবনের এক বীরত্বপূর্ণ ধারণা নিয়ে শ্বেতাঙ্গরাই শাসন করার জন্য নির্ধারিত ছিল। কিন্তু শাসক জাতি যদিশান্তির ধারণা প্রতিষ্ঠা করে, উপনিবেশগুলোকে নিজেদের শাসন করতে অনুমতি দেয়, তাহলে তারা বলতে পারে ‘আমাদের এখানে ইউরোপের আর কোন দরকার নেই’।’’ (Hitler at the Conference of university Students, Munich, January 26, 1936)।
নিজের স্বীকারোক্তি অনুসারে, হিটলার ইতিহাসে একজন দক্ষ বাগ্মী জননেতা এবং একজন সুযোগসন্ধানী হিসেবে খ্যাতি অর্জন করবেন, যিনি কোন নীতি জানেন না। তার মতে, জনগনকে শাসন করার সবথেকে কার্যকর পদ্ধতি হল তাদের প্রতারিত করা। তার শাসনের নীতি হল একই স্লোগান বারবার উচ্চারণ করতে থাকা ঠিক ততক্ষণ পর্যন্ত যতক্ষণে জনগণ তা বিশ্বাস করতে শুরু করে। “তার জীবনের দর্শন যুদ্ধের পূর্বে ভিয়েনায় কাটানো তার ভবঘুরে জীবনের আদর্শ দ্বারা পরিচালিত। তারপর আর কোন বিকাশ হয়নি; কেবল নতুন পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নিতে শিখেছে। প্রায় বিশ বছর ধরে তার কোন বুদ্ধিবৃত্তিক পরিচর্যা হয়নি। তার রাজনীতি করার ধরন খুবই অদ্ভুত। অর্থনীতির প্রয়োজনীয়তা অস্বীকার করা, শ্রমিক শ্রেণির মানুষদের বোকা জ্ঞান করা, তাদের বুদ্ধিমত্তাকে ক্ষুদ্র জ্ঞান করাটাই যেন স্বাভাবিক তার কাছে। সাধারণ রাজনীতিবিদদের যে জিনিসগুলো আক্রান্ত করে হিটলারকে তা করে না। অন্যায় কিংবা বৈষম্য নিয়ে তার কোন মাথাব্যাথা নেই। সেনাবাহিনী, পুঁজিবাদী এবং সামন্তপ্রভু এই তিন গোত্রের কাছে সে অত্যন্ত শ্রদ্ধার পাত্র। দুর্বল এবং নিপীড়িত জনগোষ্ঠী নিজেদেরকে সবলের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে এরকম প্রতিটি কাঠামো সে বিলুপ্ত করতে চেয়েছিল। গণতান্ত্রিক সভ্যতার মৌলিক নীতিসমুহ প্রত্যাখ্যান করে সে জার্মানির আদি গৌরব পুনরুদ্ধারের চেষ্টা করছিল যেখানে সবলেরা শাসক আর দুর্বলেরা প্রজা।” (Rudolf Olden, “Hitler”)।
পরিশেষে একটি সাম্প্রতিক বই থেকে কয়েকটি উদ্ধৃতি তুলে ধরা হল। বইটির লেখক ষোল মাস জার্মানিতে অবস্থান করে ‘নিরপেক্ষভাবে’ পরিস্থিতি তদন্ত করেছেন। হিটলারের ব্যক্তিগত জীবন নিয়ে যে গুঞ্জন ছড়িয়েছে সে ব্যাপারে সতর্ক করে তিনি লিখেছেন: “সে নিজেকে একজন ক্রুসেডার মনে করে যে কিনা গোটা মানব জাতিকে রক্ষা করতে এসেছে। ফলে সে যখন বলশেভিকদের হাত থেকে পৃথিবী রক্ষার ব্যাপার নিয়ে কথা বলে নিজেকে মহিমান্বিত মানুষ ভেবে আত্মতুষ্টি পায়।” (Stephen H. Roberts. “The House that Hitler Built”)। হিটলার জনসম্মুখে বক্তৃতা দেওয়ার সময় পাগলের মত আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ত, কাঁদত অথবা শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকত। এ ব্যাপারে বর্ণনা করতে গিয়ে অধ্যাপক রবার্ট, হিটলার সম্পর্কে গোয়ারিং এর করা মন্তব্য উদ্ধৃত করেন: “কোন কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হলেই আমরা হিটলারকে কাঁদতে দেখেছি।” সব ধরনের অসংযত আচরণের কথা মাথায় রেখে রবার্ট গোয়েবলসকে ইউরোপের সবথেকে বিপজ্জনক মানুষ হিসেবে ঘোষণা করতে বাধ্য হয়েছেন তিনি। “কারণ এই লোকটি মানবিকতাকে অগ্রাহ্য করেও সাড়ে ছয় কোটি মানুষের দায়িত্বপ্রাপ্ত। শারীরিক ত্রুটি থেকে সৃষ্ট তীব্র বিরক্তি এবং নির্যাতনের শিকার স্নায়ুতন্ত্রের অসুবিধার কারণেই হয়ত মানবতার প্রতি তার এক ধরনের অবজ্ঞা রয়েছে। সব সময়ই তার মধ্যে তিক্ততা ভর করে থাকত। পুরো জার্মানি জুড়ে কাউকেই তার ব্যাপারে মমতা নিয়ে কথা বলতে শুনিনি”। (প্রাগুক্ত)
এমন ‘অতিমানবেরাই’ আজ জার্মানির ভাগ্য বিধাতা। তাদের মত ইতালি এবং অন্য ইউরোপীয় দেশগুলোতেও শাসন চলছে। সমগ্র ইউরোপ এই বর্বর উন্মাদ ধর্মপ্রচারকদের অধীনে আসবে না, তারও কোন নিশ্চয়তা নেই। আজকের দিনে ফ্যাসিবাদের প্রেতাত্মা ইউরোপীয় সভ্যতাকে হুমকির মুখে ফেলেছে। হিটলার সেই জঘন্য প্রেতাত্মার প্রতিনিধি। “হিটলার এমন একটি প্রপঞ্চ যাকে কেউ হত্যা করে অথবা যার দ্বারা কেউ হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়।” (Konard Heiden, “Hitler”)।
ইতিহাসের যথেষ্ট দীর্ঘ চিন্তাচর্চারই ফল এই মতাদর্শ। ফ্যাসিবাদ যদি একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া হয়, তবে তার আদর্শগত ভিত্তির অবস্থান অবশ্যই এর দার্শনিক প্রতিক্রিয়ায়। বলা হয় ফ্যাসিবাদের কোনো দর্শন নেই। এটি একটি ভ্রান্ত ধারণা যা ঘটনাটি সঠিকভাবে বোঝার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করে।
ফ্যাসিবাদের একটি সুনির্দিষ্ট দর্শন রয়েছে যা দীর্ঘ সময় ধরে বিকশিত হয়েছে। একটি সামাজিক-রাজনৈতিক প্রপঞ্চ হিসাবে তার উপস্থিতির নজির অনেক আগের। ফ্যাসিবাদের অবস্থান আধুনিক বৈজ্ঞানিক দর্শনের বিপরীতে, যে দর্শন অষ্টাদশ ও ঊনবিংশ শতাব্দীর বিপ্লবী সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলনকে আদর্শ প্রদান করেছিল।
প্রখ্যাত রাজনৈতিক তাত্ত্বিক এম এন রায় ফ্যাসিবাদের দর্শন ও অনুশীলনেরই আকর অনুসন্ধানই করেছেন। গেল শতকের তিরিশের দশকে ভারতে ফেরার পর গ্রেপ্তার হন এম এম রায়। কারাগারেই লেখেন ফ্যাসিবাদ নিয়ে লেখেন ‘ফ্যাসিবাদ: প্রতীতি, প্রতিজ্ঞা, প্রয়োগ’ গ্রন্থটি। ১৯৩৮ সালে গ্রন্থটি প্রকাশিত হয় কলকাতার ডি এম লাইব্রেরি থেকে।
গ্রন্থটিতে সাতটি অধ্যায়। পুরো গ্রন্থটি অনুবাদের উদ্যোগ নেয় অরাজ। এরই মধ্যে অনুবাদ শেষ পর্ষায়ে। গ্রন্থটির চারটি অধ্যায় অরাজের পাঠকের জন্য উন্মুক্ত করা হল।
[রাজনৈতিক দর্শন হিসেবে ফ্যাসিবাদের আগমন ঘটে গত শতাব্দীর প্রথমার্ধে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময়ই ইতালিতে ফ্যাসিবাদ একটি স্বতন্ত্র মতাদর্শ হিসেবে আবির্ভূত হয়, এবং জার্মানিসহ অন্যান্য দেশেও এর প্রসার ঘটে। ইতালির স্বঘোষিত ফ্যাসিস্ট নেতা, বেনিতো মুসোলিনির শাসনামলে ফ্যাসিবাদের তাত্ত্বিক ভিত্তি প্রদান করা হয়। তখনকার সাথে বর্তমান দুনিয়ায় ফ্যাসিবাদী শক্তিগুলোর একটি বড় তফাৎ হচ্ছে, এখন আর কোনো ফ্যাসিবাদী শক্তিই নিজেকে ফ্যাসিবাদী বলে ঘোষণা করে না। বরং ফ্যাসিবাদ কথাটিকে বিরোধী শক্তিগুলোই ব্যবহার করে থাকে কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরশাসনকে বোঝানোর জন্য। আবার কেবল কর্তৃত্ববাদী, স্বৈরশাসন হলেই তা ফ্যাসিবাদ নয়। গেল শতাব্দীর ফ্যাসিবাদ বিরোধী আন্দোলন, ফ্যাসিবাদকে ‘ক্ষয়িষ্ণু পুঁজিবাদে প্রতিক্রিয়াশীল বুর্জোয়া একনায়কত্ব’ হিসেবে চিহ্নিত করে। কিন্তু এথেকে ফ্যাসিবাদের চিন্তা-মতবাদের আকর ও পাটাতন বোঝা সম্ভব হয় না। আমাদের দেশেও ফ্যাসিবাদ কী সে ব্যাপারে কোনো স্পষ্ট তাত্ত্বিক বোঝাপড়া তৈরির চেষ্টা সামান্যই হয়েছে। ফলে ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী মতাদর্শ চিহ্নিত করাও সবসময়ই সম্ভবপর হয়ে উঠে না। সে উদ্দেশ্য নিয়েই অরাজ ফ্যাসিবাদের বোঝাপড়ার জন্য গুরুত্বপূর্ণ ঐতিহাসিক ও তাত্ত্বিক দলিলসমূহ লিপিবদ্ধ করার চেষ্টা করছে। তারই অংশ হিসেবে মুসোলিনির ১৯৩২ সালে প্রকাশিত Doctrine Of Fascism রচনাটির অনুবাদ প্রকাশ করছে অরাজ। ইতালীয় ভাষায় এই রচনার শিরোনাম La dottrina del fascismo। কথিত আছে, পুরো রচনাটি মুসোলিনির নামে প্রকাশিত হলেও এর প্রথম অংশটুকু Fundamental Ideas ইতালীয় দার্শনিক জিওভান্নি জেনতিল্লের লেখা। আর Political and social doctrine অংশটুকু মুসোলেনির, যা লিখিত হয় ১৯২৭ সালে। Doctrine Of Fascism রচনাটির ফ্যাসিবাদী সরকারি কর্তৃপক্ষ প্রণীত ইংরেজি সংস্করণের অনুবাদক ব্রিটিশ লেখক জেন সোয়ামস। বর্তমান বাংলা অনুবাদে ফ্যাসিবাদী প্রকাশনার রাষ্ট্রীয় সংস্থা Ardita Publishers কর্তৃক Fascism: Doctrine and Institutions সংকলনে প্রকাশিত সংস্করণকে (১৯৩৫) অনুসরণ করা হয়েছে। অরাজের পাঠকদের জন্য লেখাটি অনুবাদ করেছেন আরিফ রেজা মাহমুদ। — সম্পাদক]
সকল সুস্থিত রাজনৈতিক ধারণার ন্যায়, ফ্যাসিবাদও কর্ম ও চিন্তার সমন্বিত রূপ, যার মধ্যে নিহিত আছে এমন এক মতবাদ, যা একটি নির্দিষ্ট ঐতিহাসিক শক্তিসমূহের অন্তর্গত বলয়ে উদ্ভূত এবং আভ্যন্তরীণভাবে কার্যকরী। সুতরাং, ফ্যাসিবাদের একটি রূপগত বিন্যাস রয়েছে যা কালিক ও স্থানিক ঘটনাপ্রবাহের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ; তবে এর পাশাপাশি একটি আদর্শবাদী অন্তর্বস্তুও বর্তমান, যা একে চিন্তার ইতিহাসের উচ্চতর স্তরে সত্যরূপে ব্যক্ত করে।
বিশ্বে আত্মিক প্রভাব বা প্রভুত্ব বিস্তার, অর্থাৎ একের ব্যক্তিগত ইচ্ছার দ্বারা অপরের ইচ্ছাকে নিয়ন্ত্রণ, কেবলমাত্র তখনই সম্ভব, যখন কর্মক্ষেত্রের স্বল্পস্থায়ী ও বিশেষ বাস্তবতা সম্পর্কে জ্ঞান অর্জিত হয়, এবং সেই স্বল্পস্থায়ী বাস্তবতার অন্তরে নিহিত চিরন্তন ও সার্বজনীন বাস্তবতার উপলব্ধি থাকে। মানুষকে জানার জন্য ‘মানবসত্তা‘কে জানতে হয় এবং মানবসত্তাকে জানার জন্য অপরিহার্য হলো বাস্তবতা ও তার বিধিবিধান সম্পর্কে গভীর বোধ।
রাষ্ট্র বিষয়ক কোনো ধারণাই প্রকৃতপক্ষে অর্থপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে না, যদি তা মৌলিকভাবে জীবন–দর্শনের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে প্রতিফলিত না হয়। সেটা হতে পারে দার্শনিক প্রক্রিয়াজাত ধারণা কিংবা প্রত্যক্ষ অন্তর্দৃষ্টি, যুক্তিনির্ভর কাঠামোর মধ্যে বিবর্তিত একটি ভাবতাত্ত্বিক পদ্ধতি অথবা বিশ্বাসভিত্তিক একটি দৃষ্টিভঙ্গিতে কেন্দ্রীভূত অভিজ্ঞান; কিন্তু সকল ক্ষেত্রেই, অন্তত সম্ভাব্যভাবে, তা বিশ্বের প্রতি একটি সংহত জৈবিক ধারণার প্রকাশমাত্র।
ফ্যাসিবাদের বহু ব্যবহারিক রূপ—যেমন দলীয় সংগঠন, শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো ও শৃঙ্খলার ধারণা—কে সঠিকভাবে অনুধাবন করা সম্ভব কেবল তখনই, যখন সেগুলোকে জীবনের প্রতি এর সাধারণ দৃষ্টিভঙ্গির আলোকে বিচার করা হয়। এই দৃষ্টিভঙ্গি একটি আধ্যাত্মিক মনোভাব। ফ্যাসিবাদ পৃথিবীকে কেবল এমন কোন উপরিতলীয় ও বস্তুবাদী দৃষ্টিকোণ থেকে দেখে না, যেখানে মানুষ একটি স্বতন্ত্র, স্ব–কেন্দ্রিক, প্রকৃতির বিধি–নির্ধারিত সত্তা হিসেবে প্রতিভাত হয় এবং যা জীবনকে পরিচালিত করে ক্ষণস্থায়ী আত্মকেন্দ্রিক সুখের প্রবৃত্তি দ্বারা। ফ্যাসিবাদ কেবল ব্যক্তি নয়, বরং জাতি ও রাষ্ট্রকে দেখে; এমন এক বাস্তবতাকে চিহ্নিত করে, যেখানে ব্যক্তি ও প্রজন্মসমূহ এক নৈতিক বিধানের দ্বারা পরস্পরের সঙ্গে আবদ্ধ; যাদের মধ্যে রয়েছে একটি অভিন্ন ঐতিহ্য এবং একটি নির্ধারিত ঐতিহাসিক মিশন।
এই মিশনের লক্ষ্য হচ্ছে এমন এক উচ্চতর জীবন নির্মাণ, যা বদ্ধ আত্ম–কেন্দ্রিক ক্ষুদ্র জীবনের আকাঙ্ক্ষাকে দমন করে এবং কর্তব্যনিষ্ঠার ভিত্তিতে গঠন করে এমন এক জীবন যা কাল ও স্থানের সীমাবদ্ধতা থেকে মুক্ত। এই জীবনেই ব্যক্তি আত্মত্যাগ, স্বার্থপরতা থেকে সরে আসা, এমনকি মৃত্যুকে আলিঙ্গনের মাধ্যমে এক নিখাদ আধ্যাত্মিক অস্তিত্ব অর্জন করতে সক্ষম হয়, যেখানে তার ‘মানবিক‘ মূল্য নিহিত থাকে।
অতএব, এই ধারণাটি মূলত একটি আধ্যাত্মিক উপলব্ধির প্রকাশ, যা উনবিংশ শতাব্দীর বস্তুবাদী দৃষ্টিবাদের বিরুদ্ধে বিশ শতকের সাধারণ বৌদ্ধিক প্রতিক্রিয়া থেকে উদ্ভূত। দৃষ্টিবাদবিরোধী হলেও অন্তর্দৃষ্টিসম্পন্ন; এটি সংশয়বাদী নয়, নাস্তিক্যবাদীও নয়; আবার তা নি:সঙ্গ নৈরাশ্যবাদী কিংবা নির্বিকার আশাবাদীও নয়—যেমনটি সাধারণত দেখা যায় সেই সকল মতবাদে, যেগুলো জীবনের কেন্দ্রবিন্দুকে মানুষের বাইরে কোথাও স্থাপন করে, ফলে তার চরিত্র হয়ে পড়ে মূলত নেতিবাচক।
ফ্যাসিবাদ বরং বিশ্বাস করে যে মানুষের স্বাধীন ইচ্ছাশক্তির প্রয়োগের মাধ্যমে মানুষ নিজেই তার বিশ্ব গঠনের সক্ষমতা ও কর্তব্য ধারণ করে। অর্থাৎ, জীবনের কেন্দ্রবিন্দু মানুষের অন্তর্নিহিত শক্তি ও নৈতিক সত্তার মধ্যেই নিহিত, বাইরের কোনো বহিরাঙ্গ বাস্তবতায় নয়।
ফ্যাসিবাদ চায় মানুষ হোক সক্রিয় এবং সে যেন তার সমস্ত শক্তি ও সচেতনতাকে কাজে লাগিয়ে কর্মে নিয়োজিত হয়। এটি প্রত্যাশা করে, মানুষ যেন সাহসিকতার সঙ্গে তার পথের প্রতিবন্ধকতাগুলোকে উপলব্ধি করে এবং সেগুলোর মুখোমুখি হতে প্রস্তুত থাকে। ফ্যাসিবাদ জীবনকে একটি সংগ্রাম হিসেবে চিহ্নিত করে—এমন এক যুদ্ধক্ষেত্র, যেখানে একজন মানুষের উচিত নিজেকে প্রকৃত অর্থে একটি মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান অর্জনের যোগ্য করে তোলা। আর তা সম্ভব প্রথমত তখনই, যখন সে নিজেকে শারীরিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক দিক থেকে যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে সক্ষম হয়, যেন সে হয়ে উঠতে পারে সেই ‘উপকরণ‘—যার মাধ্যমে সে উক্ত মর্যাদা অর্জন করতে পারে।
যে নীতি ব্যক্তির ক্ষেত্রে প্রযোজ্য, তা–ই জাতির ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য এবং বিস্তৃত অর্থে সমগ্র মানবজাতির ক্ষেত্রেও। এই দৃষ্টিভঙ্গি থেকেই ফ্যাসিবাদ সকল প্রকার সংস্কৃতিকে (শিল্প, ধর্ম, বিজ্ঞান) উচ্চরূপে মূল্যায়ন করে, এবং শিক্ষার ব্যতিক্রমী গুরুত্বকে স্বীকার করে।
এই দর্শন অনুসারে, শ্রমেরও মৌলিক মূল্য রয়েছে। কারণ এর মাধ্যমেই মানুষ প্রকৃতিকে আয়ত্ত করে এবং অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক মাত্রায় মানবিক জগৎ গড়ে তোলে।
এই ইতিবাচক জীবনচিন্তা মূলত একটি নৈতিক ধারণা। এটি বাস্তবতার সামগ্রিক ক্ষেত্রকেই পরিব্যাপ্ত করে, ঠিক যেমনটি করে সেই সকল মানবিক কার্যকলাপ, যার মাধ্যমে মানুষ বাস্তবতাকে আয়ত্তে আনে। কোনো কার্যই নৈতিক বিচারের আওতার বাইরে নয়; কোনো কর্মপ্রচেষ্টাই এমন নয়, যাতে নৈতিক উদ্দেশ্য একটি অন্তর্নিহিত মূল্য সংযোজনে ব্যর্থ।
ফলে, ফ্যাসিবাদ–অনুসারী যে জীবনচিত্র আঁকে, তা গম্ভীর, সংযমপূর্ণ এবং আধ্যাত্মিকতায় পরিপুষ্ট; জীবনের সকল প্রকাশ ও কর্মকাণ্ড এমন এক বিশ্ববোধের মধ্যে অবস্থিত, যা নৈতিক শক্তিতে প্রতিষ্ঠিত এবং আধ্যাত্মিক দায়িত্ববোধের দ্বারা পরিচালিত।
ফ্যাসিবাদ সেই জীবনধারার প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শন করে, যা কেবলমাত্র স্বাচ্ছন্দ্য ও ভোগ–বিলাসের উপর প্রতিষ্ঠিত।
ফ্যাসিবাদী জীবনচিন্তা একটি ধর্মীয় দর্শন, যেখানে মানুষকে দেখা হয় এমন এক উচ্চতর বিধানের অন্তর্নিহিত সম্পর্কের প্রেক্ষিতে, যা ব্যক্তিসীমার অতীত—একটি বস্তুগত ইচ্ছাশক্তিতে পরিপুষ্ট, যা ব্যক্তি–অস্তিত্বকে অতিক্রম করে এবং তাকে একটি আধ্যাত্মিক সমাজের সচেতন সদস্যরূপে উন্নীত করে।
যাঁরা ফ্যাসিবাদী শাসনব্যবস্থার ধর্মনীতিতে কেবল তাৎক্ষণিক সুযোগসন্ধানী কৌশল ছাড়া আর কিছুই দেখতে পান না, তাঁরা অনুধাবন করতে ব্যর্থ হন যে—ফ্যাসিবাদ কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, বরং সর্বাগ্রে এটি একটি চিন্তাব্যবস্থা, একটি দার্শনিক বিন্যাস।
ফ্যাসিবাদী ইতিহাসবোধে মানুষ কেবলমাত্র তখনই মানুষ, যখন সে একটি আধ্যাত্মিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে—একজন পরিবার সদস্য, সামাজিক গোষ্ঠী, জাতি, ও সমগ্র ইতিহাস–প্রবাহের একটি কার্যকর অংশগ্রহণকারী হিসেবে, যেখানে প্রতিটি জাতি নিজস্ব অবদান রাখে। এই প্রেক্ষাপটে ভাষা, রীতি, সমাজজীবনের বিধিবিধান এবং ঐতিহাসিক দলিলপত্রে নিহিত ঐতিহ্যের গুরুত্ব অপরিসীম। ইতিহাসের বাইরে মানুষ নিছক এক অস্তিত্বহীনতা।
শিল্পী: গিওর্গে ভারতুসু
এই কারণে, ফ্যাসিবাদ সমস্ত ব্যক্তি–স্বাতন্ত্র্যবাদী বিমূর্ততা, যা উনবিংশ শতাব্দীর দৃষ্টিবাদনির্ভর বস্তুবাদ থেকে উদ্ভূত, তার বিরোধিতা করে। একইভাবে, এটি প্রত্যাখ্যান করে ফরাসি বিপ্লব–পরবর্তী জ্যাকোবিন ঘরানার কল্পনাপ্রসূত ইউটোপিয়া ও ছকবদ্ধ সমাজ–নবীকরণ প্রচেষ্টাকে। ফ্যাসিবাদ বিশ্বাস করে না ১৮শ শতাব্দীর অর্থনৈতিক সাহিত্যের সেইসব ভাবনাকে, যেখানে মানুষের ‘পৃথিবীতেই সুখলাভ’–এর সম্ভাবনাকে চিত্রিত করা হয়েছিল। একইসঙ্গে, এটি প্রত্যাখ্যান করে সেই ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্বাসকেও, যেখানে ধারণা করা হয় যে, ভবিষ্যতের কোনো এক সময়ে মানবজাতি তার যাবতীয় সমস্যা ও সংকটের চূড়ান্ত সমাধানে পৌঁছে যাবে।
এই ভাবনা বাস্তব অভিজ্ঞতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক, কারণ অভিজ্ঞতা শিক্ষা দেয়—জীবন একটি অব্যাহত পরিবর্তন ও বিবর্তনের প্রক্রিয়া।
রাজনীতিতে ফ্যাসিবাদ বাস্তববাদে বিশ্বাসী; তার নীতিগত অবস্থান হলো এই যে, কেবল সেই সমস্যাগুলোকেই গুরুত্ব দেওয়া উচিত, যেগুলো ইতিহাস–প্রসূত বাস্তবতার স্বাভাবিক ফসল এবং যেগুলোর সমাধান সেই বাস্তবতার অভ্যন্তরেই নিহিত থাকে কিংবা নিজেই তার সমাধানের ইঙ্গিত প্রদান করে।
মানুষ কেবলমাত্র তখনই প্রকৃত অর্থে মানুষ ও প্রকৃতির উপর প্রভাব বিস্তার করতে পারে, যখন সে নিজেকে এই বাস্তবতার প্রবাহে সম্পৃক্ত করে এবং এর অন্তর্নিহিত কার্যক্ষম শক্তিগুলোকে আয়ত্তে আনতে সক্ষম হয়।
ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদের বিরোধিতা করে, ফ্যাসিবাদী জীবনদর্শন রাষ্ট্রের গুরুত্বকে সর্বোচ্চ মাত্রায় তুলে ধরে এবং ব্যক্তিকে কেবল তখনই স্বীকৃতি দেয়, যখন তার স্বার্থ রাষ্ট্রের স্বার্থের সঙ্গে একীভূত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়। কারণ রাষ্ট্রই হলো ইতিহাসবদ্ধ মানবসত্তার নৈতিক চেতনা ও সর্বজনীন ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ।
ফ্যাসিবাদ সেই ধ্রুপদী উদারতান্ত্রিকতার বিরোধিতা করে, যা এক সময় স্বৈরতন্ত্রের বিরুদ্ধে প্রতিক্রিয়া হিসেবে আবির্ভূত হয়েছিল এবং যার ঐতিহাসিক ভূমিকা শেষ হয়ে গিয়েছিল তখনই, যখন রাষ্ট্র জনগণের চেতনা ও ইচ্ছাশক্তির প্রতিফলনরূপে প্রতিষ্ঠা পায়।
উদারতন্ত্র ব্যক্তি–অধিকারকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রকে অস্বীকৃতি জানায়; পক্ষান্তরে, ফ্যাসিবাদ সেই রাষ্ট্রকেন্দ্রিক আদর্শকেই পুনঃপ্রতিষ্ঠা করে।
রাষ্ট্রের অধিকারকে ফ্যাসিবাদ এমন এক স্বরূপে বিবেচনা করে, যা ব্যক্তিসত্তার প্রকৃত সারবস্তুকে প্রকাশ করে। আর যদি স্বাধীনতা বাস্তব জীবনে মানুষের একটি গুণ হয়ে থাকে— যা কেবল ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদী উদারতন্ত্র কর্তৃক কল্পিত বিমূর্ত মানবপ্রতিমাদের জন্য সংরক্ষিত নয় —তবে ফ্যাসিবাদ স্বাধীনতার পক্ষে অবস্থান নেয়; এবং এমন একমাত্র স্বাধীনতার পক্ষেই যা প্রকৃত অর্থে মূল্যবান: তা হলো রাষ্ট্রের স্বাধীনতা এবং রাষ্ট্রের অভ্যন্তরে ব্যক্তির স্বাধীনতা।
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রধারণা একটি সর্বাঙ্গীন দৃষ্টিভঙ্গি, যার বাইরে কোনো মানবিক কিংবা আধ্যাত্মিক মূল্যবোধের অস্তিত্ব থাকতে পারে না, থাকলেও তা অর্থহীন। এই অর্থে, ফ্যাসিবাদ একটি সর্বাত্মকতাবাদী মতবাদ, এবং ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র একটি একীভূত ও সর্বসমন্বিত সংগঠন—যা সমস্ত মূল্যবোধকে ধারণ করে, ব্যাখ্যা করে, বিকশিত করে এবং জনগণের সামগ্রিক জীবনকে শক্তি ও দিশা প্রদান করে।
রাষ্ট্রের বাইরে কোনো ব্যক্তি কিংবা গোষ্ঠীর (রাজনৈতিক দল, সাংস্কৃতিক সংগঠন, অর্থনৈতিক ইউনিয়ন, সমাজবর্গ) অস্তিত্ব নেই। ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রের বিরোধিতা করে, কারণ সমাজতন্ত্রে রাষ্ট্রীয় ঐক্যের ধারণা অজ্ঞাত এবং যা ইতিহাসকে কেবলমাত্র শ্রেণিসংগ্রামের প্রেক্ষাপটে দেখে।
রাষ্ট্রীয় ঐক্য মানে যেখানে বিভিন্ন শ্রেণি একক অর্থনৈতিক ও নৈতিক বাস্তবতায় মিলিত হয়। একইভাবে, ফ্যাসিবাদ ট্রেড ইউনিয়নবাদকেও শ্রেণি–অস্ত্র হিসেবে প্রত্যাখ্যান করে।
তবে যখন এই সংগঠনসমূহ রাষ্ট্রীয় পরিসরের আওতায় আসে, তখন ফ্যাসিবাদ স্বীকার করে যে সমাজতন্ত্র ও ট্রেড ইউনিয়নবাদের উত্থানের পেছনে বাস্তব প্রয়োজন ছিল। সেই প্রয়োজনগুলোর যথোচিত মূল্যায়ন করা হয় রাষ্ট্রের কর্পোরেত–কাঠামোর মধ্য দিয়ে, যেখানে বিভিন্ন স্বার্থসমূহকে সমন্বিত ও সঙ্গতিপূর্ণ করা হয় রাষ্ট্রীয় ঐক্যের ভিত্তিতে।
নানাবিধ স্বার্থ অনুযায়ী গোষ্ঠীবদ্ধ হয়ে ব্যক্তি শ্রেণি গঠন করে; তারা বিভিন্ন অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ড অনুযায়ী সংগঠিত হলে ট্রেড–ইউনিয়ন তৈরি করে; কিন্তু সর্বাগ্রে তারা রাষ্ট্র গঠন করে—রাষ্ট্র কোনো সংখ্যাগত বাস্তবতার সমষ্টি নয়, কোনো সংখ্যাগরিষ্ঠ ব্যক্তির যোগফল নয়। এই কারণে ফ্যাসিবাদ সেই ধরনের গণতন্ত্রের বিরোধিতা করে, যা একটি জাতিকে কেবল সংখ্যাগরিষ্ঠতার সঙ্গে সমতুল করে দেখে এবং একে বৃহত্তম সংখ্যার অধীনস্ত করে তোলে।
বরং, যদি জাতিকে বিবেচনা করা হয় তার গুণগত দিক থেকে—পরিমাণগত নয়—তাহলে ফ্যাসিবাদই হয় ‘শুদ্ধতম গণতন্ত্র’; একটি ভাবধারা হিসেবে জাতি সবচেয়ে নৈতিক, সবচেয়ে সঙ্গতিপূর্ণ এবং সর্বাধিক সত্যরূপে পরিগণিত হয়, যা ব্যক্তির মধ্য দিয়ে প্রকাশ পায়—কখনো স্বল্পসংখ্যক, কখনো এমনকি এককের বিবেক ও ইচ্ছারূপে—এবং শেষে তা রূপ নেয় জনসাধারণের, একটি জাতির সমগ্র ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক গঠনে গঠিত জনগোষ্ঠীর সম্মিলিত বিবেক ও ইচ্ছারূপে; যারা একক আত্মসচেতনতা ও অভিন্ন উদ্দেশ্য নিয়ে আত্মিক বিকাশ ও গঠনের পথে এগিয়ে চলে।
জাতি এখানে কোনো বর্ণগোষ্ঠী নয়, নয় কোনো ভৌগোলিক সীমানা দ্বারা নির্ধারিত অঞ্চল; বরং এটি হলো একটি জনগোষ্ঠী, যারা ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতায় নিজেকে টিকিয়ে রাখে—একটি ভাবনাতাড়িত ঐক্যবদ্ধ জনসাধারণ, যাদের মাঝে জীবনের ইচ্ছা, ক্ষমতার আকাঙ্ক্ষা, আত্মসচেতনতা ও ব্যক্তিত্বের উদ্ভব ঘটে।
যতদূর পর্যন্ত এই উচ্চতর ব্যক্তিত্ব রাষ্ট্ররূপে রূপায়িত হয়, ততদূর পর্যন্তই তা একটি জাতিতে পরিণত হয়। জাতিই রাষ্ট্র সৃষ্টি করে—এই ধারণা একটি পুরাতন, প্রকৃতিবাদী দৃষ্টিভঙ্গি, যা উনবিংশ শতকে জাতীয় সরকার প্রতিষ্ঠার প্রচারণার আদর্শিক ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছিল। বরং, ফ্যাসিবাদী মতানুসারে, রাষ্ট্রই জাতিকে সৃষ্টি করে; রাষ্ট্র জনগণের মধ্যে নৈতিক ঐক্য সম্পর্কে চেতনা জাগিয়ে তোলে, তাদের ইচ্ছাশক্তি দান করে, এবং সেইসঙ্গে প্রকৃত জীবনের সূচনা ঘটায়।
জাতীয় স্বাধীনতার অধিকার কেবলমাত্র কোনো সাহিত্যিক কিংবা ভাববাদী আত্মসচেতনতা থেকে উদ্ভূত হয় না; বরং এর উৎস কোনো নিস্পৃহ ও অচেতন বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যেও নিহিত নয়। বরং, এই অধিকার গড়ে ওঠে একটি সক্রিয়, আত্মসচেতন, রাজনৈতিক ইচ্ছাশক্তি থেকে—যা কার্যকর কর্মকাণ্ডে নিজেকে প্রকাশ করে এবং সেই অধিকারকে প্রমাণ করার জন্য প্রস্তুত থাকে। সংক্ষেপে, এই অধিকার উদ্ভব হয় একটি রাষ্ট্রের অস্তিত্ব থেকে, অন্ততপক্ষে সম্ভাব্য অবস্থান হিসেবে হলেও। বস্তুত, রাষ্ট্রই হচ্ছে সেই সর্বজনীন নৈতিক ইচ্ছার অভিব্যক্তি, যা জাতীয় স্বাধীনতার অধিকার সৃষ্টি করে।
রাষ্ট্রে উদ্ভাসিত একটি জাতি কেবলমাত্র ততক্ষণই জীবন্ত ও নৈতিক সত্তা, যতক্ষণ পর্যন্ত তা প্রগতিশীল থাকে।
নিষ্ক্রিয়তা মানেই মৃত্যু। অতএব, রাষ্ট্র কেবল কর্তৃত্ব নয়—যা শুধু শাসন করে আর ব্যক্তির ইচ্ছাসমূহের উপর আইনি রূপ ও আত্মিক মূল্য আরোপন করে, বরং রাষ্ট্র এক ধরনের ক্ষমতা যা সীমাহীনভাবে ব্যক্তির ইচ্ছাশক্তিকে অনুভব করায় এবং মান্য করতে শেখায়। এইভাবে রাষ্ট্র তার বিকাশের জন্য অপরিহার্য সিদ্ধান্তগুলোর সার্বজনীনতা কার্যত প্রমাণ করে। এই প্রক্রিয়া স্বয়ং সংগঠন ও সম্প্রসারণের প্রয়োজনীয়তাকে নির্দেশ করে—তা সম্ভাব্য হোক বা বাস্তব। এইভাবেই রাষ্ট্র মানব–ইচ্ছাশক্তির সঙ্গে নিজেকে সমতুল্য করে তোলে, যার বিকাশ বাধাগ্রস্ত করা যায় না এবং যা আত্মপ্রকাশের মধ্য দিয়ে তার অসীমতাকে প্রমাণ করে।
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র হল ব্যক্তিত্বের এক উচ্চতর ও অধিক শক্তিশালী প্রকাশ, তবে তা কেবল বাহ্যিক শক্তি নয়—বরং একটি আত্মিক শক্তি। এটি মানবের নৈতিক ও বৌদ্ধিক জীবনের সকল রূপ ও প্রকাশের সমাহার।
এই কারণে, রাষ্ট্রের কার্যপরিধিকে কেবল আইন–শৃঙ্খলা রক্ষা ও শান্তি প্রতিষ্ঠার মধ্যে সীমাবদ্ধ রাখা যায় না—যেমনটি উদারনৈতিক মতবাদে প্রত্যাশিত। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কোনো যান্ত্রিক ব্যবস্থা নয়, যা কেবল নাগরিকের তথাকথিত অধিকার চর্চার একটি নির্দিষ্ট সীমা নির্ধারণ করে দেয়।
বরং ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র একটি অন্তর্নিহিতভাবে গৃহীত নৈতিক মানদণ্ড ও আচরণবিধি—একটি শৃঙ্খলা, যা ব্যক্তিমানুষের সমগ্র সত্তাকে নিয়ন্ত্রণ করে; এটি যেমন ইচ্ছাশক্তিকে প্রভাবিত করে, তেমনই বুদ্ধিবৃত্তিক ক্ষেত্রকেও অনুপ্রাণিত করে।
এটি একধরনের কেন্দ্রীয় নৈতিক নীতি, যা সভ্য সমাজের নাগরিক হিসেবে মানুষের অস্তিত্বের কেন্দ্রবিন্দুতে স্থান করে নেয়; এটি তার আত্মপরিচয়ের গভীরে প্রোথিত থাকে। এই নীতি কর্মনিষ্ঠ মানুষ ও চিন্তক, শিল্পী ও বিজ্ঞানী—সকলের হৃদয়জুড়ে বাস করে; এটি আত্মারও আত্মা।
সংক্ষেপে, ফ্যাসিবাদ কেবল আইনপ্রণেতা বা প্রতিষ্ঠান–প্রতিষ্ঠাতা নয়, বরং তা একাধারে একজন শিক্ষাগুরু এবং আত্মিক জীবনের উন্নয়নকারী। এর লক্ষ্য কেবল জীবনযাপনের বাহ্যিক রূপকে নয়, বরং তার অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তুকেও পুনর্গঠন করা—অর্থাৎ মানুষ, তার চারিত্রিক গঠন এবং তার বিশ্বাসকে পুনরায় নির্মাণ করা।
এই লক্ষ্য পূরণের জন্য, ফ্যাসিবাদ শৃঙ্খলা আরোপ করে এবং কর্তৃত্ব প্রয়োগ করে, মানুষের আত্মার গভীরে প্রবেশ করে এবং সেখানে অবিসংবাদিত রাজত্ব প্রতিষ্ঠা করে।
এই আদর্শের প্রতীকস্বরূপ, ফ্যাসিবাদ “লিক্টর’স রডস”–কে তার প্রতীক হিসেবে গ্রহণ করেছে—যা ঐক্য, শক্তি এবং ন্যায়বিচারের প্রতীক।
রাজনৈতিক ও সামাজিক মতবাদ
১৯১৯ সালের মার্চ মাসে—যা আজ অনেক দূরবর্তী অতীত— মিলানে আমি Popolo d’Italiaপত্রিকার পাতায় সেই বিপ্লবী হস্তক্ষেপবাদীদের যখন আহ্বান জানিয়েছিলাম— যারা ১৯১৫ সালের জানুয়ারিতে প্রতিষ্ঠিত ফ্যাসিবাদের কার্যক্রমের সূচনালগ্ন থেকেই আমার পদাঙ্ক অনুসরণ করে এসেছেন— তখন আমার মনে কোনো সুস্পষ্ট মতবাদগত কর্মসূচি ছিল না।
আমি একমাত্র যে মতবাদকে ব্যবহারিক অর্থে চিনতাম, তা ছিল সমাজতন্ত্র—যার সঙ্গে আমি ১৯১৪ সালের শীতকাল পর্যন্ত, প্রায় এক দশকব্যাপী, ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত ছিলাম। আমার অভিজ্ঞতা ছিল একজন অনুসারী এবং পরবর্তীকালে একজন নেতা হিসেবে, কিন্তু তা মতবাদগত নয়—বরং ছিল কর্মনির্ভর অভিজ্ঞতা। সেই সময়ে আমার মতবাদ ছিল কর্মতৎপরতার মতবাদ।
১৯০৫ সালের পর থেকে সমাজতন্ত্রের কোনো একক, সর্বজনগ্রাহ্য মতবাদ বিদ্যমান ছিল না। যখন বার্নস্টাইনের নেতৃত্বে জার্মানিতে সংশোধনবাদী আন্দোলন আত্মপ্রকাশ করে, এর পাল্টা প্রতিক্রিয়ায় উদ্ভূত হয় এক বামপন্থী বিপ্লবী প্রবণতা, যা ইতালিতে কেবল প্রবচনের পরিসরে সীমাবদ্ধ থেকেছে, অথচ রাশিয়ান সমাজতন্ত্রের প্রেক্ষিতে সেটিই হয়ে উঠেছিল বলশেভিকবাদের পূর্বভূমিকা।
সংস্কারবাদ, বিপ্লববাদ, মধ্যপন্থা—এই পরিভাষাগুলোর প্রতিধ্বনিও আজ মৃতপ্রায়। অথচ ফ্যাসিবাদের বিশাল প্রবাহে এমন কিছু স্রোত খুঁজে পাওয়া যায়, যেগুলোর উৎস ছিল সোরেল, পেগি, লাগারদেলের মত গণসংগ্রামপন্থী সমাজবাদীদের চিন্তায়, এবং ১৯০৪ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে ইতালীয় সমাজতান্ত্রিক পরিবেশে নতুন স্বরের প্রবর্তক ইতালীয় সিন্ডিক্যালিস্টদের কর্মধারায়।
এই নতুন স্বরটি সেই সময়ের ইতালীয় সমাজতন্ত্রকে দুর্বল ও অচেতন করে দেওয়া জিওলিত্তির দলের সঙ্গে অশুভ মেলবন্ধনের প্রতিক্রিয়া হিসেবে উঠে এসেছিল। এই স্বরের প্রতিধ্বনি শোনা যায় অলিভেত্তির
Pagini Libere, ওরানোর Lupa, এবং এনরিকো লেওনের Divenirs Socials– এ।
১৯১৯ সালে যুদ্ধ–সমাপ্তির পর মতবাদ হিসেবে সমাজতন্ত্র মৃত হয়ে পড়ে। টিকে ছিল কেবল একটি প্রতিহিংসার অনুভূতি হিসেবে—বিশেষত ইতালিতে, যেখানে সমাজতন্ত্রের একমাত্র কৌশল ছিল যুদ্ধ–চাওয়া মানুষদের বিরুদ্ধে প্রতিশোধ স্পৃহা জাগানো এবং তাদের সেই যুদ্ধের দায়ভার বহনের জন্য বাধ্য করা।
The Popolo d’Italiaপত্রিকাটি তার উপশিরোনামে নিজেকে ঘোষণা করেছিল “যোদ্ধা ও উৎপাদকদের দৈনিক মুখপত্র” হিসেবে। এখানে “উৎপাদক” শব্দটি তখনকার এক বিশেষ মানসিক প্রবণতার বহিঃপ্রকাশ। ফ্যাসিবাদ কোনো পূর্বনির্ধারিত মতবাদ থেকে গড়ে ওঠেনি, টেবিলে বসে রচিত তাত্ত্বিক পরিকল্পনার ফল নয়; তা ছিল বাস্তব প্রয়োজন থেকে উদ্ভূত এক কর্মচাঞ্চল্য—নিজেই ছিল কর্ম ও আন্দোলন। প্রাথমিক দুই বছর এটি কোনো দল ছিল না, বরং ছিল “দলবিরোধী” ও একটি আন্দোলন। আমি যে নাম দিয়েছিলাম আমাদের সংগঠনকে, তা–ই এর স্বরূপ নির্ধারণ করে দিয়েছিল।
তবে, কেউ যদি ইচ্ছা করে সেদিনকার সেই ভাঁজপড়া কাগজগুলো আবার পড়ে দেখে—যেখানে Italian Fasci di combattimentoগঠনের বৈঠকের বিবরণ রয়েছে—তাহলে তিনি তাতে কোনো পূর্ণাঙ্গ মতবাদ খুঁজে পাবেন না। বরং তিনি দেখবেন একগুচ্ছ নির্দেশনা, পূর্বাভাস, ইঙ্গিত, যেগুলো সময়ের সাথে সাথে, তাৎক্ষণিক বাস্তবতার আবরণ সরিয়ে, কয়েক বছরের মধ্যেই পরিণত হয়েছিল পরিপূর্ণ মতবাদে—এমন এক রাজনৈতিক মতবাদ যা ফ্যাসিবাদকে অতীত ও সমসাময়িক অন্যান্য সব মতবাদ থেকে স্বতন্ত্র অবস্থানে প্রতিষ্ঠা করেছিল।
যদি বুর্জোয়ারা—আমি তখন বলেছিলাম—ভাবেন যে তারা আমাদেরকে বজ্রনিরোধকের মতো ব্যবহার করতে পারবে, তবে তারা ভুল করছে। আমাদের জনগণের দিকে এগোতে হবে… আমরা চাই শ্রমিক শ্রেণি ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে অভ্যস্ত হোক, যাতে তারা উপলব্ধি করতে পারে যে একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান চালানো মোটেও সহজ কাজ নয়… আমরা লড়ব প্রযুক্তিগত ও নৈতিক পশ্চাদপদতার বিরুদ্ধে… এখন যেহেতু শাসনব্যবস্থার উত্তরাধিকারের পথ উন্মুক্ত, আমাদের সাহস হারালে চলবে না। আমাদের ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে; যদি বিদ্যমান শাসনব্যবস্থাকে প্রতিস্থাপন করতে হয়, তবে সেই স্থান আমাদের নিতে হবে। উত্তরাধিকার লাভের অধিকার আমাদেরই, কারণ আমরাই জাতিকে যুদ্ধে প্রবেশ করতে বলেছিলাম এবং আমরাই তাকে বিজয়ের পথে নেতৃত্ব দিয়েছিলাম… প্রচলিত রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্বের কাঠামো আমাদের সন্তুষ্ট করতে পারে না; আমরা চাই বিভিন্ন স্বার্থের সরাসরি প্রতিনিধিত্ব… কেউ কেউ আপত্তি করতে পারেন যে এই কর্মসূচি গিল্ড ব্যবস্থায় ফিরে যাওয়ারই নামান্তর। তাতে কী! আমি চাই এই সমাবেশ জাতীয় সিন্ডিক্যালবাদের পক্ষ থেকে উত্থাপিত অর্থনৈতিক দাবিসমূহকে গ্রহণ করুক…”
এটা কি আশ্চর্যজনক নয় যে ঠিক প্রথম দিন থেকেই, Piazza San Sepolcro তে, “গিল্ড” শব্দটি উচ্চারিত হয়েছিল—একটি শব্দ যা, ফ্যাসিস্ট বিপ্লব বিকাশ লাভের সঙ্গে সঙ্গে, শাসনব্যবস্থার অন্যতম মৌলিক আইনগত ও সামাজিক সৃষ্টিকে প্রকাশ করতে শুরু করে?
রোম অভিযানের পূর্ববর্তী কয়েক বছর এমন একটি সময়পর্বকে চিহ্নিত করে, যখন কর্মের প্রয়োজনে বিলম্ব ও সুচিন্তিত মতবাদ রচনার সুযোগ ছিল না। শহর ও গ্রামে চলছিল সংঘর্ষ। আলোচনা হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু এর থেকেও পবিত্র এবং গুরুত্বপূর্ণ কিছু ছিল—মৃত্যু। ফ্যাসিস্টরা জানতো কীভাবে মরতে হয়। একটি পূর্ণাঙ্গ মতবাদ—যা অধ্যায় ও অনুচ্ছেদে বিভক্ত, টীকাসহ উপস্থাপিত—অনুপস্থিত ছিল বটে, কিন্তু তার পরিবর্তে উপস্থিত ছিল আরও দৃঢ় কিছু—একটি বিশ্বাস।
তবুও, যদি কেউ বইপত্র, প্রবন্ধ, কংগ্রেসে গৃহীত প্রস্তাব, প্রধান ও গৌণ বক্তৃতার সাহায্যে সেই দিনগুলোর স্মৃতি পুনর্জীবিত করতে চায়, তবে সে দেখবে—যদি তার অনুসন্ধান ও নির্বাচনের যথাযথ দক্ষতা থাকে—যে যুদ্ধের মাঝখানেই মতবাদের ভিত্তি স্থাপিত হচ্ছিল। বাস্তবেই, ওই সময়েই ফ্যাসিবাদী চিন্তাধারা অস্ত্রধারণ করেছিল, নিজেকে পরিশীলিত করেছিল, এবং সংগঠনের দিকে অগ্রসর হয়েছিল।
ব্যক্তি ও রাষ্ট্রের সমস্যা, কর্তৃত্ব ও স্বাধীনতার সমস্যা কিম্বা রাজনৈতিক, সামাজিক, বিশেষত জাতীয় প্রশ্নগুলো তৎকালীন সময়ে আলোচিত হচ্ছিল। একইসঙ্গে, দণ্ডমূলক অভিয়ানের সময় উদারবাদী, গণতান্ত্রিক, সমাজতান্ত্রিক, মাসনিক মতবাদ এবং Partito Popolareএর সঙ্গে দ্বন্দ্ব চলছিল। তথাপি, একটি প্রাতিষ্ঠানিক মতবাদের অভাবকে সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করে কুপ্রবণ বিরোধীরা ফ্যাসিবাদকে মতবাদ গঠনে অক্ষম প্রমাণ করতে চেয়েছিল—ঠিক সেই সময়ে, যখন এই মতবাদই প্রবল উত্থানের সঙ্গে রচিত হচ্ছিল। শুরুতে, প্রতিটি নতুন মতবাদের মতোই, তা প্রকাশ পায় প্রচণ্ড নেতিবাচক ও মতবাদবিরোধী রূপে; পরে, গঠনমূলক তত্ত্বের মাধ্যমে একটি ইতিবাচক আকার গ্রহণ করে, যা পরবর্তীতে ১৯২৬, ১৯২৭ এবং ১৯২৮ সালে ফ্যাসিস্ট শাসনের আইন ও প্রতিষ্ঠানসমূহে সংযুক্ত হয়।
ফ্যাসিবাদ এখন কেবল একটি শাসনব্যবস্থা হিসেবে নয়, একটি মতবাদ হিসেবেও স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত। এর অর্থ হচ্ছে, ফ্যাসিবাদ—নিজস্ব সমালোচনাশক্তিকে আত্মপর্যালোচনা ও অপরের বিশ্লেষণে প্রয়োগ করে—নিজস্ব দৃষ্টিকোণ থেকে সমগ্র বিশ্বের সকল জাতির জন্য দুশ্চিন্তার উৎস হয়ে ওঠা বস্তুগত ও বৌদ্ধিক স্বার্থ–সংক্রান্ত সমস্যাসমূহ অধ্যয়ন করেছে এবং নিজস্ব মানদণ্ডে বিচার করেছে, এবং এখন এসব সমস্যার মোকাবিলায় নিজস্ব নীতির দ্বারা পদক্ষেপ নিতে প্রস্তুত।
প্রথমেই, মানবজাতির ভবিষ্যৎ বিকাশ–সংক্রান্ত বিষয়ে এবং বর্তমান সকল রাজনৈতিক বিবেচনার বাইরে ফ্যাসিবাদ মূলত অনন্ত শান্তির সম্ভাবনা বা কার্যকারিতায় বিশ্বাস করে না। সে কারণে ফ্যাসিবাদ আত্মোৎসর্গের বিপরীতে ভীরু ও আত্মসমর্পণমূলক নির্জীবতা ঢেকে রাখার মাধ্যম হিসেবে শান্তিবাদকে পরিত্যাগ করে। শুধু যুদ্ধই মানবিক শক্তিকে তার চূড়ান্ত উৎকটতায় পৌঁছে দিতে পারে এবং কেবল যুদ্ধই তাদের উপর মহত্ত্বের টীকা এঁকে দেয়, যারা সাহসের সঙ্গে এর মুখোমুখি হতে সক্ষম। অন্য সব পরীক্ষা অমূলক যা কখনোই একজন মানুষকে জীবন অথবা মৃত্যুর বিকল্পের মুখোমুখি দাঁড় করাতে পারে না। এই কারণে, যে সকল মতবাদ বলে ‘শান্তি যেকোনো মূল্যে’—তা ফ্যাসিবাদের সঙ্গে অসঙ্গত।
একইভাবে ফ্যাসিবাদের চেতনার সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ—যদিও কখনো বিশেষ রাজনৈতিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপযোগী মনে হতে পারে—সেই সব আন্তর্জাতিকতাবাদী বা ‘লীগ–ভিত্তিক’ কাঠামো, যেগুলো ইতিহাসে বারবার দেখা গেছে, জনগণের হৃদয় আবেগ, আদর্শবাদ বা বাস্তব বিবেচনায় গভীরভাবে আলোড়িত হলেই ভেঙে পড়ে।
ফ্যাসিবাদ ব্যক্তি–জীবনেও এই যুদ্ধবাদী মানসিকতাকে বহন করে। “আমার কিছু যায় আসে না“—যেটি ছিল ফ্যাসিবাদী স্কোয়াড সদস্যদের অহংকারী মন্ত্র এবং আহত সৈনিকের ব্যান্ডেজে লিখিত—এটি কেবল দার্শনিক স্তোইকবাদের প্রকাশ নয়; বরং এটি একটি জীবনদর্শনের সংক্ষিপ্ত রূপ, যা কেবল রাজনৈতিক নয়, বরং একটি সংগ্রামী আত্মাকে প্রতিফলিত করে—যে আত্মা সকল ঝুঁকিকে গ্রহণ করে। এটি হলো ইতালীয় জীবনের এক নতুন রীতির প্রতীক।
ফ্যাসিবাদী ব্যক্তি জীবনকে গ্রহণ করে এবং ভালোবাসে; আত্মহত্যাকে সে ভীরুতার নিদর্শন হিসেবে প্রত্যাখ্যান ও ঘৃণা করে। তার কাছে জীবন মানে দায়িত্ব, উৎকর্ষ, বিজয়; জীবন হতে হবে মহান এবং পরিপূর্ণ—এটি হবে নিজের জন্য, তবে সর্বাগ্রে হবে অপরের জন্য—নিকটবর্তী ও দূরবর্তী, বর্তমান ও ভবিষ্যতের জন্য।
এই সমস্ত পূর্বধারণার ফলস্বরূপই ফ্যাসিবাদী শাসনের জনসমাজ নীতি গঠিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী ব্যক্তি তার প্রতিবেশীকে ভালোবাসে, তবে ‘প্রতিবেশী‘ শব্দটি কোনো অস্পষ্ট ও দুর্বোধ্য ধারণাকে নির্দেশ করে না। প্রতিবেশীকে ভালোবাসা মানেই এমন কোনো ভালোবাসা নয়, যা প্রয়োজনীয় শিক্ষামূলক কঠোরতাকে বাদ দেয়; আর এর মানে এই নয় যে, তা শৃঙ্খলা ও মর্যাদাগত পার্থক্য অগ্রাহ্য করে । ফ্যাসিবাদ ‘সর্বজনীন আলিঙ্গন’ জাতীয় কোনো মানবতাবাদী বিভ্রমকে গ্রহণ করে না।
জাতিসমূহের একটি বৃহত্তর গোষ্ঠীর সদস্য হিসেবে ফ্যাসিবাদ অন্য জাতিকে চোখে চোখ রেখে সম্মুখীন হয়; সে সদা সতর্ক ও প্রহরায় নিয়োজিত; অন্যদের সমস্ত কর্মকাণ্ড গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করে এবং তাদের স্বার্থের যেকোনো পরিবর্তন লক্ষ্য রাখে; এবং সে কখনোই পরিবর্তনশীল ও প্রতারক বহিঃরূপের দ্বারা বিভ্রান্ত হয় না।
জীবন সম্পর্কে এই ধারণার জন্যই ফ্যাসিবাদ তথাকথিত বৈজ্ঞানিক ও মার্কসীয় সমাজতন্ত্রের ভিত্তিস্বরূপ যে মতবাদ, অর্থাৎ ঐতিহাসিক বস্তুবাদ—তাকে দৃঢ় ও সুস্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে। ঐতিহাসিক বস্তুবাদ মানবজাতির ইতিহাসকে কেবলমাত্র শ্রেণিসংঘর্ষ এবং উৎপাদন প্রক্রিয়া ও উৎপাদন–উপকরণের পরিবর্তনের পরিপ্রেক্ষিতে ব্যাখ্যা করে, এবং অন্যান্য সকল সাংস্কৃতিক, নৈতিক বা আধ্যাত্মিক উপাদানকে উপেক্ষা করে। ফ্যাসিবাদ এই একমাত্রিক ও অর্থনৈতিক নির্ধারণবাদী দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রত্যাখ্যান করে একটি বহুমাত্রিক, নৈতিক–আধ্যাত্মিকভাবে সংগঠিত জীবনের ধারণা প্রতিষ্ঠা করে।
অর্থনৈতিক জীবনের নানা উত্থান–পতন—যেমন কাঁচামাল আবিষ্কার, নতুন কারিগরি পদ্ধতি ও বৈজ্ঞানিক উদ্ভাবন—এসব যে গুরুত্বপূর্ণ, তা কেউ অস্বীকার করে না; কিন্তু এসব উপাদান এককভাবে মানব ইতিহাসকে ব্যাখ্যা করতে পারে—এই ধারণা নিছক অযৌক্তিক। ফ্যাসিবাদ বিশ্বাস করে—এখনও এবং সর্বদা—পবিত্রতা ও বীরত্বে; অর্থাৎ এমন সব কর্মে, যেখানে কোনো প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ অর্থনৈতিক প্রেরণা কাজ করে না।
ফ্যাসিবাদ, ঐতিহাসিক বস্তুবাদকে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ এই মতবাদ মানুষকে কেবলমাত্র ইতিহাসের উপরিতলের পাপেটরূপে বিবেচনা করে, যা ঢেউয়ের তোড়ে কখনো দেখা যায় ও আবার মিলিয়ে যায়। অথচ গভীরে গেলে নির্ধারক শক্তি হিসেবে মানুষই গতিময় ও ক্রীয়াশীল থাকে।
ফলে, ফ্যাসিবাদ শ্রেণিসংঘর্ষের সেই অপরিবর্তনীয় ও অনিবার্য চরিত্রকেও অস্বীকার করে, যা ঐতিহাসিক বস্তুবাদের দৃষ্টিভঙ্গিতে সমাজ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি বলে বিবেচিত। এইভাবে ফ্যাসিবাদ সমাজতন্ত্রের দুটো প্রধান মতাদর্শিক ভিত্তিতে আঘাত হানে।
অবশিষ্ট থাকে কেবল মানবসভ্যতার প্রাচীনতম একটি আবেগ—সমাজে এমন এক সম্পর্ক গড়ে তোলার আকাঙ্ক্ষা, যেখানে নীচু শ্রেণির দুঃখ–দুর্দশা লাঘব পাবে। কিন্তু এখানেও ফ্যাসিবাদ সমাজতান্ত্রিক পন্থায় গঠিত অর্থনৈতিক বিবেচনাধর্মী সুখের ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে—যা মনে করে, ইতিহাসের একটি নির্দিষ্ট স্তরে পৌঁছালে সমাজতান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে সর্বজনের সর্বোচ্চ ভোগ–সুবিধা নিশ্চিত হবে।
ফ্যাসিবাদ এই বস্তুবাদী সুখ–ধারণাকে প্রত্যাখ্যান করে এবং তাকে অষ্টাদশ শতাব্দীর অর্থনীতিবিদদের উপর ছেড়ে দেয়। এর অর্থ, ফ্যাসিবাদ ‘সমৃদ্ধি = সুখ‘ এই সমীকরণকে অস্বীকার করে—যা মানুষকে কেবলমাত্র ভক্ষণে তৃপ্ত জন্তু হিসেবে চিহ্নিত করে এবং জীবনকে নিছক এক প্রকার উদ্ভিদসুলভ অস্তিত্বে রূপান্তরিত করে।
সমাজতন্ত্রের সমালোচনার পর, ফ্যাসিবাদ তার আক্রমণের লক্ষ্যস্থলে নেয় গণতান্ত্রিক মতবাদসমূহের পুরো কাঠামোকে এবং তাদের মৌলিক ভিত্তি ও কার্যকর প্রয়োগ—উভয়কেই প্রত্যাখ্যান করে। ফ্যাসিবাদ অস্বীকার করে যে, সংখ্যাগরিষ্ঠতা স্বয়ং সমাজে নির্ধারক শক্তি হতে পারে; এটি প্রত্যাখ্যান করে সংখ্যার ভিত্তিতে শাসনের অধিকার, যা সাধারণত পর্যায়ক্রমিক নির্বাচনের মাধ্যমে বাস্তবায়িত হয়।
ফ্যাসিবাদ ঘোষণা করে, মানুষের মধ্যে এক অপরিবর্তনীয়, সৃজনক্ষম এবং কল্যাণকর বৈষম্য বিদ্যমান, যেটিকে “সার্বজনীন ভোটাধিকার” নামক যান্ত্রিক ও বাহ্যিক পদ্ধতির মাধ্যমে সমতায় পরিণত করা সম্ভব নয়।
গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাকে বলা যেতে পারে এমন এক পদ্ধতি, যেখানে জনগণকে নিয়মিতভাবে এই বিশ্বাসে ভুলিয়ে রাখা হয় যে, তারা সার্বভৌম ক্ষমতা প্রয়োগ করছে; অথচ প্রকৃতপক্ষে সার্বভৌমত্ব অন্য শক্তির—প্রায়শই অদৃশ্য, জবাবদিহিহীন ও গোপন শক্তির—হাতে কেন্দ্রীভূত থাকে।
গণতন্ত্র হলো এমন এক রাজাহীন শাসনব্যবস্থা, যেখানে একাধিক রাজা সক্রিয়, যারা অনেক সময় একক স্বৈরশাসকের চেয়েও বেশি একচেটিয়া, স্বেচ্ছাচারী এবং বিধ্বংসী।
এই কারণেই ফ্যাসিবাদ—যদিও ১৯২২ সালের আগে তা প্রাসঙ্গিক কারণে প্রজাতন্ত্রপন্থী ছিল—‘রোম অভিযাত্রার আগেই সেই অবস্থান পরিত্যাগ করে। কারণ, ফ্যাসিবাদ তখন বুঝতে শুরু করে যে শাসনব্যবস্থার গঠনমূলক রূপ (রাজতন্ত্র বা প্রজাতন্ত্র) আর মুখ্য বিষয় নয়।
এর কারণ, ইতিহাস ও বাস্তবতার আলোকে স্পষ্ট হয় যে, অতীত ও বর্তমানের রাজতন্ত্র কিংবা প্রজাতন্ত্র—কোনোটিই “শাশ্বততার দৃষ্টিকোণ” থেকে বিচারযোগ্য নয়। বরং প্রতিটি শাসনব্যবস্থা কোনো একটি নির্দিষ্ট জাতির রাজনৈতিক বিবর্তন, ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং মনস্তত্ত্বের বহিঃপ্রকাশমাত্র।
ফ্যাসিবাদ রাজতন্ত্র বনাম প্রজাতন্ত্র—এই দ্বন্দ্বকে অতিক্রম করেছে, যা নিয়ে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থাগুলি দীর্ঘকাল ধরে কালক্ষেপন করেছে। তারা প্রতিটি ব্যর্থতার জন্য রাজতন্ত্রকে দায়ী করেছে এবং প্রজাতন্ত্রকে নিখুঁত শাসনব্যবস্থা হিসেবে প্রচার করেছে।
কিন্তু অভিজ্ঞতা শিক্ষা দেয় যে, কিছু প্রজাতন্ত্র নিজস্ব কাঠামোতেই প্রতিক্রিয়াশীল ও স্বৈরাচারী, আবার কিছু রাজতন্ত্র সবচেয়ে সাহসী রাজনৈতিক ও সামাজিক পরীক্ষা–নিরীক্ষাকেও গ্রহণ করেছে।
রেনান, যিনি ফ্যাসিবাদের পূর্বাভাসপূর্ণ অন্তর্দৃষ্টি প্রদান করেছিলেন, তাঁর একটি দার্শনিক ধ্যান–চিন্তায় মন্তব্য করেন:
“যুক্তি ও বিজ্ঞান মানবজাতির সৃষ্টি, তবে সরাসরি জনতার মাধ্যমে কিংবা জনতার জন্য যুক্তির সন্ধান করা কল্পনাবিলাস মাত্র। যুক্তির অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে সকলের তা জানা অপরিহার্য নয়; আর যদি জানানো আবশ্যকই হয়, তবুও তা গণতন্ত্রের মাধ্যমে সম্ভব নয় — কারণ গণতন্ত্র যেন নির্ধারিত হয়েছে সমস্ত পরিশ্রমসাধ্য সংস্কৃতি ও উচ্চতর জ্ঞানের রূপ বিলুপ্তির পথে নিয়ে যেতে।
সমাজ কেবল ব্যক্তিস্বার্থ ও ব্যক্তিস্বাধীনতার জন্যই বিদ্যমান— এমন নীতিবাক্য প্রকৃতির পরিকল্পনার সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ নয়; কারণ প্রকৃতি কেবল প্রজাতির বিষয়ে চিন্তা করে এবং ব্যক্তিকে ত্যাগ করতেও প্রস্তুত।
তবে আশঙ্কাজনকভাবে গণতন্ত্রের চূড়ান্ত অর্থ দাঁড়ায় (যদিও আমি তৎক্ষণাৎ স্বীকার করছি যে এর ভিন্ন ব্যাখ্যাও সম্ভব) এমন এক সমাজব্যবস্থা, যেখানে অবক্ষয়গ্রস্ত এক জনসমষ্টি চিন্তা বলতে আর কিচ্ছু অবশিষ্ট নেই কেবল জড় প্রবৃত্তিনির্ভর অশ্লীল ভোগ–বিলাস ছাড়া।’’
.
গণতন্ত্রকে অস্বীকার করে ফ্যাসিবাদ প্রত্যাখ্যান করে রাজনৈতিক সমতার সেই অযৌক্তিক প্রচলিত মিথ্যাকে, যা প্রকৃতপক্ষে একটি সামষ্টিক দায়হীনতার অভ্যাস এবং সুখ–সমৃদ্ধি ও অনন্ত অগ্রগতির এক বিভ্রমময় কাহিনি।
কিন্তু যদি গণতন্ত্র বলতে এমন একটি শাসনব্যবস্থাকে বোঝানো হয়, যেখানে জনগণকে রাষ্ট্রে প্রান্তে ঠেলে দেওয়া হয় না, তাহলে এই রচনার প্রণেতা ইতিমধ্যেই ফ্যাসিবাদকে সংজ্ঞায়িত করেছেন একটি “সংগঠিত, কেন্দ্রীভূত, কর্তৃত্ববাদী গণতন্ত্র” হিসেবে।
আর্লি ফিগার্স শিল্পী: অভিনাশ চন্দ্র সূত্র: ফ্রিজি
ফ্যাসিবাদ নিঃসন্দেহে ও সম্পূর্ণভাবে উদারতন্ত্রের মতবাদগুলোর বিরোধী— রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক উভয় ক্ষেত্রে। উনবিংশ শতাব্দীতে উদারতন্ত্রের গুরুত্বকে যেমন সমকালীন বিতর্কের খাতিরে অতিরঞ্জিত করা উচিত নয়; তেমনি, সেই শতকে বিকাশ লাভকারী বহু মতবাদের মধ্যে একটিকে চিরকালের জন্য মানবজাতির ধর্মে পরিণত করাও সমীচীন নয়।
বাস্তবে, উদারতন্ত্র প্রকৃত অর্থে মাত্র পনেরো বছরের জন্য বিকশিত হয়েছিল। এটি জন্ম নিয়েছিল ১৮৩০ সালে, Holy Allianceএর প্রতিক্রিয়ায়, যারা ইউরোপকে ১৭৮৯ সালের চেয়েও পেছনের দিকে ঠেলে দিতে চেয়েছিল। আর শিখর স্পর্শ করেছিল ১৮৪৮ সালে, এমনকি সেই সময়ে পোপ নবম পিয়াসও ছিলেন একজন উদারবাদী। কিন্তু সেই বছর থেকেই এর পতন শুরু হয়। যদি ১৮৪৮ হয় আলো ও কাব্যের বছর, তবে ১৮৪৯ ছিল অন্ধকার ও বেদনার বছর। রোমান প্রজাতন্ত্র ধ্বংস হয়েছিল আরেকটি প্রজাতন্ত্র, ফ্রান্সের হাতে। সেই একই বছরে কার্ল মার্কস তাঁর বিখ্যাত কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টো প্রকাশ করে সমাজতন্ত্রের বাণী প্রচার করেন।
১৮৫১ সালে নেপোলিয়ন তৃতীয় এক ‘অনুদারবাদী’’ অভ্যুত্থান ঘটিয়ে ফ্রান্সের ক্ষমতা দখল করেন এবং ১৮৭০ সাল পর্যন্ত শাসন করেন, যতক্ষণ না এক ভয়াবহ সামরিক পরাজয়ের পর দেশজুড়ে গণ–আন্দোলনের মাধ্যমে তাঁকে ক্ষমতা থেকে অপসারিত করা হয়। বিজয়ী ছিলেন বিসমার্ক, যিনি উদারবাদ এবং এর প্রচারকদের অস্তিত্ব সম্পর্কেও অবহিত ছিলেন না। এটি একটি লক্ষণীয় বিষয় যে, পুরো উনবিংশ শতকে এত উচ্চ সভ্যতাসম্পন্ন জাতি হওয়া সত্ত্বেও জার্মানদের কাছে উদারতন্ত্র একটি অজানা ধর্ম ছিল, শুধু একবারের ব্যতিক্রম—যেটি ‘ফ্রাঙ্কফুর্টের হাস্যকর সংসদ’ নামে খ্যাত, যা মাত্র এক মৌসুম স্থায়ী হয়েছিল।
জার্মানি তার জাতীয় ঐক্য অর্জন করে উদারবাদের বাইরে এবং এর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে। এই মতবাদ একেবারে সেই জার্মান স্বভাবের পরিপন্থী, যাদের রাজতান্ত্রিক মানসিকতা প্রবল, বিপরীতে উদারতন্ত্র ঐতিহাসিক ও যুক্তিসঙ্গতভাবে নৈরাজ্যের আঁতুড়ঘরমাত্র। জার্মান জাতীয় ঐক্যের তিনটি ধাপ ছিল ১৮৬৪, ১৮৬৬ ও ১৮৭০ সালের তিনটি যুদ্ধ, যার নেতৃত্বে ছিলেন ‘মোল্টকে’ ও ‘বিসমার্ক’–এর মতো তথাকথিত ‘উদারবাদী’রা।
ইতালীয় জাতীয় ঐক্য গঠনের ক্ষেত্রে উদারতন্ত্রের ভূমিকা ছিল অত্যন্ত নগণ্য, যা জুসেপ্পে ম্যাজিনি ও গারিবল্ডির অবদানের তুলনায় অনেকটাই কম, যাঁরা কেউই উদারবাদী ছিলেন না। যদি অনুদার নেপোলিয়ন তৃতীয় হস্তক্ষেপ না করতেন, তবে আমরা লম্বার্ডি পেতাম না; এবং অনুদার বিসমার্ক যদি সদোয়া ও সেডানে হস্তক্ষেপ না করতেন, তবে সম্ভবত ১৮৬৬ সালে ভেনিস বা ১৮৭০ সালে রোম দখল আমাদের পক্ষে সম্ভব হতো না।
১৮৭০ থেকে ১৯১৫ সাল পর্যন্ত সময়কালটি এমন এক পর্বকে নির্দেশ করে, যা এমনকি উদারতন্ত্রের নতুন ধর্মের পুরোহিতদের কাছেও ছিল এক ধসযাত্রার কাল—সাহিত্যে ‘দেকাদেন্তবাদ’ এবং বাস্তবতায় ‘সক্রিয়তাবাদ’–এর দ্বারা আক্রমণে পর্যুদস্ত । এই ‘সক্রিয়তাবাদ’ বলতে জাতীয়তাবাদ, ভবিষ্যতবাদ, এবং ফ্যাসিবাদ।
উনবিংশ শতকের উদারতাবাদ, বহু জটিল ও অবিভাজ্য সমস্যার সঞ্চয় ঘটিয়ে, সেগুলোর সমাধান হিসাবে শেষ পর্যন্ত বিশ্বযুদ্ধের রক্তক্ষয়ী পথকেই বেছে নেয়। কোনো ধর্মই এরূপ নিষ্ঠুর আত্মত্যাগ দাবি করেনি। তবে কি উদারতাবাদের দেবতাগণ রক্তের জন্যই এত উদগ্রীব ছিলেন?”
এখন উদারতাবাদ তার মন্দিরের দ্বার রুদ্ধ করার প্রস্তুতি নিচ্ছে—সেই মন্দির, যা জনগণের দ্বারা পরিত্যক্ত হয়েছে। কারণ, জনগণ অনুধাবন করেছে যে অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উদারতাবাদের যে সংশয়বাদ এবং রাজনীতি এবং নৈতিকতার ক্ষেত্রে এর যে উদাসীনতা—তা অতীতে যেমন বিশ্বকে বিপর্যয়ের পথে ঠেলে দিয়েছে, ভবিষ্যতেও তেমনি সর্বনাশ ডেকে আনবে।
এই ব্যাখ্যা থেকেই প্রতীয়মান হয় কেন আমাদের সমসাময়িক কালের সকল রাজনৈতিক অনুশীলন ও প্রয়োগসমূহ উদারবাদবিরোধী। আর এই কারণে তাদের ইতিহাসচ্যুত করার প্রয়াস চরম আজগুবি —যেন ইতিহাস কেবলমাত্র উদারতাবাদ ও তার অনুগতদের জন্য সংরক্ষিত কোনো সীমাবদ্ধ ক্ষেত্র; যেন উদারতাবাদই সভ্যতার চূড়ান্ত পরিণতি, যার গণ্ডি অতিক্রম করার আর কোনো সম্ভাবনাই অবশিষ্ট নেই।
সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র এবং উদারবাদের প্রতি ফ্যাসিবাদী প্রত্যাখ্যানকে এমনভাবে ব্যাখ্যা করা অনুচিত, যা ফ্যাসিবাদকে ১৭৮৯ সালের পূর্ববর্তী কোনো ঐতিহাসিক অবস্থানে বিশ্বকে পুনঃস্থাপনের সমর্থক বলে প্রতিভাত হয়—ঐ বছরটিকে সাধারণত গণতান্ত্রিক–উদারবাদী শতাব্দীর সূচনাবর্ষ হিসেবে গণ্য করা হয়। ইতিহাস কখনও পশ্চাদগামী হয় না। ফ্যাসিবাদী মতবাদ দেমেস্ত্রকে তার পয়গম্বররূপে বিবেচনা করে না। রাজতান্ত্রিক একনায়কতন্ত্র অতীতের বিষয়; তেমনি অন্ধচার্চপূজাও। মৃতপ্রায় এবং বিলুপ্ত হয়েছে সামন্তীয় বিশেষাধিকার ও সমাজের অন্তরীত, পারস্পরিকভাবে বিচ্ছিন্ন বর্ণব্যবস্থার বিভাজন। ফ্যাসিবাদী কর্তৃত্ববাদের ধারণার মধ্যেও পুলিশের দমনমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য নেই।
একটি দল যখন কোনও জাতিকে ‘সর্বাত্মকভাবে‘ শাসন করে, তা ইতিহাসে নতুন এক প্রবাহের সূচনা। পূর্বে এর কোনো তুলনামূলক উদাহরণ পাওয়া যায় না। উদারতন্ত্র, সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্রের মতবাদসমূহের ধ্বংসাবশেষের মধ্য থেকে ফ্যাসিবাদ কেবলমাত্র সেই উপাদানগুলোকে গ্রহণ করে, যেগুলো এখনো প্রাণবন্ত এবং কার্যকর।ইতিহাসের ‘অর্জিত বাস্তবতা’ হিসেবে যেটি টিকে আছে ফ্যাসিবাদ তাকে সংরক্ষণ করে; বাকি সবকিছু প্রত্যাখ্যান করে। অর্থাৎ, এটি এমন কোনো মতবাদের ধারণাকে গ্রহণ করে না, যা সর্বকালীন এবং সর্বজনীনভাবে প্রযোজ্য। যদি মেনে নেওয়া হয় যে উনবিংশ শতাব্দী ছিল সমাজতন্ত্র, উদারতন্ত্র ও গণতন্ত্রের শতাব্দী, তবু তা এই ধারণা দেয় না যে বিংশ শতাব্দীও সেই একই মতাদর্শ দ্বারা চিহ্নিত হবে। রাজনৈতিক মতবাদসমূহ ক্ষণস্থায়ী; জাতিসমূহ টিকে থাকে। এই বাস্তবতার আলোকে আমরা বিশ্বাস করতে পারি যে এটি কর্তৃত্বের শতাব্দী, ডানপন্থিতার দিকে গমনরত একটি ফ্যাসিবাদী শতাব্দী। যদি উনবিংশ শতাব্দী ছিল ব্যক্তির শতাব্দী (যেহেতু উদারতন্ত্র ব্যক্তিবাদকে অনুষঙ্গ করে), তবে আমরা বিশ্বাস করতে পারি এটি ‘সমষ্টির’ শতাব্দী—অতএব রাষ্ট্রের শতাব্দী।
একটি নতুন মতবাদ তার নিজস্ব রচনায় পূর্ববর্তী মতবাদগুলির মধ্য থেকে এখনো কার্যকর উপাদানসমূহ গ্রহণ করাই যৌক্তিক। কোনো মতবাদ সম্পূর্ণ নতুন, দীপ্তিমান ও অভূতপূর্ব রূপে জন্মায় না। কোনো মতবাদই একেবারে মৌলিক বলে দাবি করতে পারে না। প্রতিটি মতবাদই পূর্ববর্তী ও পরবর্তী মতবাদের সঙ্গে ইতিহাসগতভাবে যুক্ত। যেমন, মার্ক্সীয় বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্র সংযুক্ত হয়ে আছে ফুরিয়ে, ওউয়ন এবং সাঁ–সিমঁ–র কাল্পনিক সমাজতন্ত্রের সঙ্গে; যেমন, উনবিংশ শতাব্দীর উদারতন্ত্রের উৎপত্তি নিহিত আছে অষ্টাদশ শতকের আলোকায়ন আন্দোলনে; আবার গণতান্ত্রিক মতাদর্শ উদ্ভূত হয়েছে এনসাইক্লোপেডিস্টদের চিন্তাধারা থেকে। প্রতিটি মতবাদই মানব ক্রিয়াকলাপকে একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে পরিচালিত করতে চায়; কিন্তু এই কার্যকলাপসমূহ আবার বিপরীতমুখে মতবাদকে প্রভাবিত করে, নতুন প্রয়োজন অনুযায়ী তাকে রূপান্তরিত করে কিংবা তাকে অতিক্রম করে যায়। সুতরাং, একটি মতবাদ হতে হবে এক প্রকার ‘জীবন্ত কর্ম’, কেবল শব্দসমূহের প্রদর্শন নয়। এই কারণেই ফ্যাসিবাদে রয়েছে একটি প্রায়োগিক ধারা, রয়েছে তার ক্ষমতার ইচ্ছা, বেঁচে থাকার আকাঙ্ক্ষা, সহিংসতার প্রতি মনোভাব এবং তার নিজস্ব মূল্যবোধ।
ফ্যাসিবাদী মতবাদের কেন্দ্রীয় ভিত্তি হলো রাষ্ট্র সম্পর্কিত তার ধারণা—রাষ্ট্রের স্বরূপ, কার্যাবলি ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে তার দৃষ্টিভঙ্গি। ফ্যাসিবাদের কাছে রাষ্ট্র হল পরম; ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত সত্তাগুলি আপেক্ষিক। ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত অস্তিত্ব কেবল তখনই স্বীকৃত, যতক্ষণ তারা রাষ্ট্রের অন্তর্ভুক্ত থাকে। যেখানে উদারতান্ত্রিক রাষ্ট্র কেবল ফলাফল রেকর্ড করার সীমিত ভূমিকায় নিজেকে আবদ্ধ রাখে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সেখানে সমাজের বস্তুগত ও নৈতিক উন্নতির খেলায় সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করে এবং তার দিকনির্দেশনা প্রদান করে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সজাগ, সক্রিয় ও স্বয়ংসম্পূর্ণ ইচ্ছাশক্তিসম্পন্ন; এই কারণেই তাকে ‘নৈতিক রাষ্ট্র‘ হিসেবে বর্ণনা করা যায়।
১৯২৯ সালে শাসনব্যবস্থার প্রথম পঞ্চবার্ষিক সম্মেলনে আমি বলেছিলাম— “ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কোনো রাত্রি–প্রহরীর মতো নয়, যে কেবল নাগরিকদের ব্যক্তিগত নিরাপত্তার ব্যাপারে উদ্বিগ্ন; কিংবা এটি এমন কোনো কাঠামোও নয়, যার একমাত্র উদ্দেশ্য একটি নির্দিষ্ট মাত্রার ভৌত কল্যাণ ও তুলনামূলকভাবে শান্তিপূর্ণ জীবনের নিশ্চয়তা প্রদান—এই কাজ তো পরিচালনা পর্ষদও করতে পারে। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র কেবলমাত্র রাজনৈতিক নয়, এমনকি বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নাগরিক ও জাতির বহুবিধ কার্যক্রমের প্রতি নির্লিপ্তও নয়। ফ্যাসিবাদ যে রাষ্ট্র ধারণা লালন ও বাস্তবায়ন করে, তা একটি আধ্যাত্মিক ও নৈতিক সত্তা, যার লক্ষ্য জাতির রাজনৈতিক, বিচারিক ও অর্থনৈতিক সংগঠনের রূপায়ন; আর এই সংগঠন আত্মারই প্রকাশ, যার উৎস ও বিকাশ একধরনের আধ্যাত্মিক বিকাশের প্রতিফলন।
রাষ্ট্র কেবল দেশের অভ্যন্তরীণ ও বহিস্থ নিরাপত্তার গ্যারান্টি দেয় না, বরং জাতির আত্মাও সংরক্ষণ করে ও উত্তরাধিকারসূত্রে তা হস্তান্তর করে—যা গঠিত হয় দীর্ঘ ইতিহাসে তার ভাষা, রীতি, বিশ্বাস ও ঐতিহ্যের মাধ্যমে। রাষ্ট্র কেবল বর্তমান নয়; এটি অতীত, এবং সর্বোপরি ভবিষ্যতেরও প্রতীক। ব্যক্তির ক্ষণস্থায়ী জীবনের সীমা অতিক্রম করে রাষ্ট্র জাতির অন্তর্নিহিত নৈতিক চেতনার প্রতিনিধিত্ব করে। রাষ্ট্রের অভিব্যক্তির রূপ বদলাতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের প্রয়োজনীয়তা অক্ষুণ্ণ থাকে।
রাষ্ট্র নাগরিকদের নাগরিকচেতনায় শিক্ষিত করে, তাদের মিশনের প্রতি সচেতন করে, ঐক্যের আহ্বান জানায়; রাষ্ট্রের বিচার তাদের পারস্পরিক স্বার্থকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে তোলে; রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য জ্ঞানের বিজয়—বিজ্ঞান, শিল্প, আইন ও মানবিক সংহতির ক্ষেত্রসমূহে—হস্তান্তর করে; রাষ্ট্র মানুষকে আদিম গোত্র–জীবন থেকে উত্তরণ ঘটিয়ে মানবিক ক্ষমতার সর্বোচ্চ রূপ—সাম্রাজ্যিক শাসনের দিকে নিয়ে যায়।
রাষ্ট্র ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য সংরক্ষণ করে তাদের স্মৃতি, যারা রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বা এর আইন মান্য করতে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন; রাষ্ট্র ভবিষ্যতের জন্য দৃষ্টান্তরূপে তুলে ধরে সেই সকল অধিনায়কের নাম, যারা এর ভূখণ্ড সম্প্রসারণ করেছেন, এবং সেই প্রতিভাবানদের নাম, যারা একে খ্যাতি এনে দিয়েছেন। রাষ্ট্রের প্রতি শ্রদ্ধা যখন কমে যায়, আর ব্যক্তি ও গোষ্ঠীগত বিচ্ছিন্নতা ও কেন্দ্রবিমুখ প্রবণতা যখন আধিপত্য বিস্তার করে, তখন জাতির পতন অনিবার্য হয়ে ওঠে।”
১৯২৯ সালের পর থেকে অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক ঘটনাপ্রবাহ সর্বত্র এই সত্যগুলোকেই তুলে ধরেছে ও জোরদার করেছে। রাষ্ট্রের গুরুত্ব দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে। তথাকথিত যে ‘সঙ্কট’ চলছে, তা কেবলমাত্র রাষ্ট্রীয় হস্তক্ষেপ এবং রাষ্ট্রকেন্দ্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমেই সমাধান সম্ভব। কোথায় গেলেন সেই জুল সিমোঁর ছায়া, যিনি উদারবাদের সূচনালগ্নে ঘোষণা করেছিলেন— “রাষ্ট্রের উচিত নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলা যাতে তা অপ্রয়োজনীয় হয়ে পড়ে এবং ইস্তফা দেওয়ার জন্য প্রস্তুত থাকে”? কিংবা উনবিংশ শতাব্দীর দ্বিতীয়ার্ধের ম্যাককালকরা, যারা বলেছিলেন যে ‘রাষ্ট্রের উচিত শাসন থেকে নিজেকে বিরত রাখা’?
আর ইংরেজ দার্শনিক বেন্থাম, যিনি বিশ্বাস করতেন যে শিল্পের একমাত্র চাহিদা রাষ্ট্রের নিষ্ক্রিয়তা; অথবা জার্মান চিন্তাবিদ হাম্বোল্ট, যিনি মনে করতেন ‘সেরা সরকার’ সেই যা ‘আলসে’? আজকের দিনে রাষ্ট্রের ব্যবসায়িক কার্যক্রমে অবিরাম, অপরিহার্য এবং জোরালো হস্তক্ষেপের প্রেক্ষিতে তাঁরা কী বলতেন?
নিশ্চয়ই একথা সত্য যে দ্বিতীয় প্রজন্মের অর্থনীতিবিদগণ রাষ্ট্রহীনতার প্রশ্নে প্রথম প্রজন্মের মতো কঠোর ছিলেন না, এবং এমনকি অ্যাডাম স্মিথ–ও—যদিও অনেক সতর্কতার সঙ্গে—রাষ্ট্রের হস্তক্ষেপের সম্ভাবনার একটি সামান্য পথ উন্মুক্ত রেখেছিলেন।
যেখানে উদারবাদ ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের প্রতীক, ফ্যাসিবাদ সেখানে শাসনব্যবস্থার প্রতিনিধিত্ব করে। তবে ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র একটি স্বতন্ত্র ও মৌলিক সৃষ্টিরূপে চিহ্নিত; এটি প্রতিক্রিয়াশীল নয়, বরং বিপ্লবাত্মক। কারণ এটি এমন কিছু সার্বজনীন সমস্যার সমাধান পূর্বাভাস দেয়, যেগুলো অন্যান্য স্থানে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও নৈতিক ক্ষেত্রে প্রকট হয়ে উঠেছে।
উদাহারণ স্বরূপ, রাজনৈতিক ক্ষেত্রে—দলগুলোর বিভাজন, সংসদের ক্ষমতা দখল, আইনসভাগুলোর দায়িত্বহীনতা; অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে—বাণিজ্য ইউনিয়ন ও পেশাভিত্তিক সংগঠনগুলোর ক্রমবর্ধমান ও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা, যেগুলোর দ্বন্দ্ব ও সমঝোতা শ্রম ও পুঁজি—উভয় ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলে; এবং নৈতিক ক্ষেত্রে— দেশবাদের নৈতিক আদেশ পালনে শৃঙ্খলা, কর্তব্যপরায়ণতা ও আনুগত্যের প্রয়োজনীয়তাকে প্রতিপন্ন করে।
ফ্যাসিবাদ চায় একটি শক্তিশালী ও জৈবিক রাষ্ট্র, যার ভিত্তি হবে জনগণের বিস্তৃত সমর্থনের ওপর। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও শাসনের দাবি করে, অন্যান্য ক্ষেত্রের মতোই; এটি তার কর্পোরেত কাঠামো, সামাজিক ও শিক্ষাগত প্রতিষ্ঠানসমূহের মাধ্যমে দেশের সর্বত্র প্রভাব বিস্তার করে। জাতির সকল রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও আধ্যাত্মিক শক্তি—যেগুলো নিজ নিজ সংগঠনে সংগঠিত—রাষ্ট্রের অভ্যন্তরেই প্রবাহিত হয়।
একটি রাষ্ট্র, যা লাখো মানুষের ওপর প্রতিষ্ঠিত, যারা তার কর্তৃত্ব স্বীকার করে, তার কার্যকলাপ অনুভব করে এবং তার লক্ষ্যসাধনে আত্মনিয়োগে প্রস্তুত—সে রাষ্ট্র কোনো মধ্যযুগীয় স্বৈরশাসকের অত্যাচারী রাষ্ট্র নয়। এটির সাথে ১৭৮৯ সালের পূর্ববর্তী বা পরবর্তী কোনো একনায়কতান্ত্রিক রাষ্ট্রের মিল নেই। ব্যক্তি–মানুষকে চূর্ণ করার পরিবর্তে, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তার শক্তিকে বহুগুণে বাড়িয়ে তোলে; যেমন একটি রেজিমেন্টে একজন সৈনিক তার সহযোদ্ধাদের মাধ্যমে ক্ষয়প্রাপ্ত না হয়ে বরং বহুগুণে শক্তিশালী হয়ে ওঠে।
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র জাতিকে সংগঠিত করে, তবে ব্যক্তি–মানুষের জন্য যথাযথ কর্মকাণ্ডের পরিসরও বজায় রাখে। এটি অনাবশ্যক বা ক্ষতিকর স্বাধীনতাকে হ্রাস করেছে, কিন্তু যে স্বাধীনতাসমূহ অপরিহার্য, সেগুলিকে সংরক্ষণ করেছে। এ বিষয়ে ব্যক্তি নিজে বিচারক হতে পারে না; কেবল রাষ্ট্রই এই বিচার করার অধিকার রাখে।
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র সাধারণভাবে ধর্মীয় অভিব্যক্তিগুলোর প্রতি নিরাসক্ত নয়, এবং এটি ইতালীয়দের বিশেষ ও ইতিবাচক ধর্ম—রোমান ক্যাথলিক ধর্মের প্রতিও নিরপেক্ষ অবস্থান গ্রহণ করে না। ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্রের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মতত্ত্ব নেই, তবে একটি নৈতিক বিধিব্যবস্থা রয়েছে। ফ্যাসিবাদ ধর্মকে আত্মার গভীরতম প্রকাশগুলোর অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করে, এবং এই কারণেই এটি কেবল ধর্মকে শ্রদ্ধা করে না, বরং তা রক্ষা করে ও সংরক্ষণ করে। ফরাসি বিপ্লবের চরম পর্যায়ে কনভেনশনের সময় রোবসপিয়ের যেভাবে নিজের মতো করে একটি “ঈশ্বর” দাঁড় করানোর চেষ্টা করেছিলেন, ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র তেমন কোনো প্রয়াস গ্রহণ করে না; আবার বলশেভিকপন্থীরা যেভাবে মানুষের আত্মা থেকে ঈশ্বরকে মুছে ফেলতে চায়, তেমন নিষ্ফল প্রচেষ্টাও এটি করে না। বরং ফ্যাসিবাদ আত্মসংযমী সাধক, সাধু এবং বীরদের ঈশ্বরকে যেমন শ্রদ্ধা করে, তেমনি সরল ও আদিম হৃদয়ের সাধারণ জনগণের ঈশ্বরকেও সম্মান জানায়—যাঁর উদ্দেশে তারা প্রার্থনা করে।
শিল্পী: মিম্মো পালাদিনো
ফ্যাসিবাদী রাষ্ট্র শাসন করার এবং ক্ষমতা প্রয়োগ করার আকাঙ্ক্ষার প্রকাশ। এই দৃষ্টিভঙ্গিতে রোমান ঐতিহ্য এক শক্তিশালী চেতনারূপে প্রতিফলিত হয়েছে। ফ্যাসিবাদী মতবাদের দৃষ্টিকোণ থেকে সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতা কেবল ভূখণ্ডগত, সামরিক বা বাণিজ্যিক নয়; বরং তা একাধিক মাত্রায় আত্মিক ও নৈতিকও বটে। একটি সাম্রাজ্যবাদী জাতি—অর্থাৎ যে জাতি সরাসরি বা পরোক্ষভাবে অন্য জাতিগুলোর নেতৃত্ব দেয়—সে এক বর্গমাইল ভূখণ্ড দখল না করেও অস্তিত্বশীল হতে পারে। ফ্যাসিবাদ সাম্রাজ্যবাদী চেতনার মধ্যে—অর্থাৎ জাতির সম্প্রসারণমূলক প্রবণতার মধ্যে—তাদের প্রাণশক্তির প্রকাশ দেখতে পায়। বিপরীত প্রবণতা, যা জাতীয় স্বার্থকে কেবলমাত্র স্বদেশের সীমায় সীমাবদ্ধ রাখতে চায়, তাকে ফ্যাসিবাদ অবক্ষয়ের লক্ষণ হিসেবে গণ্য করে। যে জাতিগুলো পুনরুত্থিত হয়, তারা স্বভাবতই সাম্রাজ্যবাদী মনোভাব ধারণ করে; পক্ষান্তরে, যে জাতিগুলো পতনের পথে, তাদের বৈশিষ্ট্য হলো ত্যাগের মনোভাব। ফ্যাসিবাদী মতবাদই এমন একটি মতবাদ, যা এমন এক জাতির প্রবণতা ও অনুভূতির সাথে অধিক সামঞ্জস্যপূর্ণ—যেমন ইতালীয় জাতি, যারা শতাব্দীর পর শতাব্দী বিদেশি দাসত্বে নিষ্ক্রিয় থাকার পর এখন বিশ্বমঞ্চে নিজেদের পুনরুজ্জীবিত করে প্রতিষ্ঠা করছে।
কিন্তু সাম্রাজ্যবাদ মানেই শৃঙ্খলা, প্রচেষ্টার সমন্বয়, দায়িত্ববোধের গভীরতা এবং আত্মত্যাগের মানসিকতা। এই বাস্তবতা ব্যাখ্যা করে শাসনব্যবস্থার বহু ব্যবহারিক কার্যক্রম, রাষ্ট্রের বিভিন্ন শক্তির গতিপথ এবং সেই কঠোরতাকেও, যা প্রয়োগ করতে হয় তাদের বিরুদ্ধে—যারা বিংশ শতকের ইতালির এই স্বতঃস্ফূর্ত ও অনিবার্য অভিযাত্রাকে প্রতিহত করতে চায়, উনবিংশ শতকের পরিত্যক্ত মতাদর্শকে উসকে দিয়ে। এই মতাদর্শসমূহ আজ সর্বত্র বর্জিত, যেখানে বৃহৎ রাজনৈতিক ও সামাজিক রূপান্তরের সাহসী পরীক্ষাগুলো পরিচালিত হচ্ছে।
কোনো যুগেই মানুষ আজকের মতো কর্তৃত্ব, দিকনির্দেশনা ও শৃঙ্খলার জন্য এত গভীর তৃষ্ণা প্রকাশ করেনি। যদি প্রতিটি যুগেরই একটি নিজস্ব মতবাদ থাকে, তবে অসংখ্য লক্ষণ এটিই নির্দেশ করে যে আমাদের যুগের মতবাদ হলো ফ্যাসিবাদ। এর প্রাণশক্তির প্রমাণ হলো—এটি এক বিশ্বাসকে উদ্দীপিত করেছে; এবং সেই বিশ্বাস যে মানুষের আত্মাকে জয় করেছে, তার প্রমাণ হলো—ফ্যাসিবাদ আজ দেখাতে পারে তার আত্মোৎসর্গকারী বীর ও শহিদদের।
ফ্যাসিবাদ এখন বিশ্বব্যাপী সেই সর্বজনীনতা অর্জন করেছে, যা প্রতিটি মতবাদ লাভ করে, যখন তা আত্মপ্রকাশের মাধ্যমে মানব চিন্তার ইতিহাসে একটি বিশেষ মুহূর্ত হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করে।
[মানবেন্দ্র নাথ রায় বা এম এন রায়, উপমহাদেশের বিশিষ্ট মার্ক্সবাদী রাজনীতিবিদ ও তাত্ত্বিক। তার হাত ধরেই ম্যাক্সিকান কমিউনিস্ট পার্টির প্রতিষ্ঠা হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালেই এম এন রায় প্রথাগত মার্ক্সবাদী চিন্তা থেকে বের হয়ে নতুন রাস্তা অনুসন্ধানের চেষ্টায় ব্রতী হন, যার নাম দেন তিনি নয়া মানবতাবাদ। ১৯৪৭ সালে প্রকাশিত হয় তার New Humanism: A Manifesto। বর্তমান লেখাটি এ বইয়েরই অনূদিত সংস্করণের একটি অধ্যায় থেকে নেয়া হয়েছে। পুরো বইটির অনুবাদ করেন স্বদেশরঞ্জন দাস, যেখানে Radical Democracy-এর বাংলা তিনি করেন আমূল গণতন্ত্র। বর্তমান লেখাটি বই থেকেই হুবহু তুলে দেয়া হলো। – সম্পাদক]
শিল্পী: গণেশ পাইন
এ যুগের মানুষকে যে-দর্শন নতুন আশা ও নতুন বিশ্বাসে উদ্বুদ্ধ করতে পারবে সেই দর্শনকে অবশ্যই মুক্তির অর্থ স্পষ্ট করে জানিয়ে দিতে হবে; মুক্তিলাভ করলে, মানুষের দাবীর কতটা কী পূরণ হবে তা সুস্পষ্ট ভাষায় ব্যক্ত করতে হবে। সমাজের রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক প্রতিষ্ঠান সমূহ ব্যক্তি মানুষকে, তার ব্যক্তিত্বকে বিকশিত করে তুলতে কতখানি সাহায্য দেবে তার বিচার যদি বর্তমানের নানা পরস্পরবিরোধী মতবাদের গোঁড়ামি ও অন্ধ সংস্কার ও অনুশাসন দিয়ে করতে হয় তা হলে কেবল বিভ্রান্তিরই সৃষ্টি করবে এবং ইতিহাসের বৃহত্তম এই সংকট থেকে মানুষকে উদ্ধার করে প্রগতির পথে এগিয়ে নিয়ে যাবার জন্য সকল মানুষের ঐক্যবদ্ধ প্রচেষ্টাও সম্ভব হবে না এবং সংকট ত্রাণের আদর্শ আকাশকুসুমের মতই অলীক থেকে যাবে। সর্বজনকাম্য এক মুক্তির আদর্শের জন্যই এক সার্বজনীন প্রচেষ্টা সম্ভব হতে পারে।
মানুষের মুক্তি আকাঙ্ক্ষার উদ্ভব হয়েছে তার জীবন সংগ্রাম থেকে। এই মুক্তি আকাঙ্ক্ষাই তাকে জীবন ধারণের প্রয়োজন মেটবার পরও প্রকৃতির ওপর নিজের আধিপত্য স্থাপন করতে উদ্বুদ্ধ করেছে। এই মুক্তির আকাঙ্ক্ষাকে ভিত্তি করেই চলেছে মানুষের নব নব জ্ঞানান্বেষণ প্রচেষ্টা। এর ফলেই সে প্রাকৃতিক ঘটনা, ভৌগোলিক ও সামাজিক পরিবেশের অত্যাচার ও শাসন থেকে ক্রমে ক্রমে মুক্তি পেতে পেতে এগিয়ে চলেছে। মানুষ তার জীবন সংগ্রাম চালাতে চালাতে যখন বিবর্তনের উন্নত স্তরে উঠেছে তখন সেই সংগ্রাম ক্রমে বুদ্ধি ও সুকুমার আবেগের স্তরে উন্নীত হয়েছে এবং সেটাই তখন উচ্চ মূল্যমানের পর্যায়ে এসে মানুষের এই মুক্তি আকাঙ্ক্ষায় রূপ নিয়েছে। আধুনিক সমাজে ব্যক্তি মানুষকে যদি মুক্ত জীবনযাপন করতে হয় তবে তার শুধু অর্থনৈতিক প্রাচুর্য ও নিরাপত্তা থাকলেই চলবে না, তার অন্তর্নিহিত সকল বৃত্তি ও শক্তি সমূহের বিকাশ সাধনের অনুকূল এক মানসিক পরিবেশ ও এক মুক্ত আবহাওয়ার প্রয়োজন হবে, যেখানে কোন প্রকার বাঁধাধরা মতবাদের অন্ধ অনুশাসন থাকবে না। সমাজের অন্তর্গত প্রতিটি ব্যক্তি মানুষ এই প্রকারের ব্যাপক অর্থে স্বাধীনতা ও মুক্ত পরিবেশ কতটা অর্জন করেছে তাই দিয়ে সমাজ ও রাষ্ট্রের গুণাগুণ বিচার হবে। “মানুষই সব কিছুর মাপকাঠি” এই প্রাচীন ঋষি বাক্য অনুসরণ করে ভবিষ্যতের দর্শনকে ঘোষণা। করতে হবে, ব্যক্তি মানুষ কতখানি স্বাধীনতা পেল কিংবা পেল না, সেই মাপকাঠি দিয়েই কোন সামাজিক প্রতিষ্ঠান বা রাষ্ট্রের গুণাগুণ বিচার হবে।
জাতিই হোক আর শ্রেণীই হোক সব রকম সমষ্টি সত্তাই গড়ে ওঠে ব্যষ্টিরূপ ব্যক্তিকে নিয়ে। মানুষ[mfn] এখানে মানবেন্দ্রনাথ আদিম মানবকে “Man” এক বচনে ব্যবহার[/mfn] আরো অধিক মাত্রায় নিজ সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য ও এ সবের নিশ্চয়তা ও নিরাপত্তার জন্যই সমাজবদ্ধ হয়েছিল সমাজ গড়েছিল। আদিম যুগে পারিবারিক মানুষ[mfn] যেহেতু মানুষ যুক্তিপরায়ণ জীবও বটে, সেইহেতু সে নিজ নিজ বুক্তি বুদ্ধি দিয়ে নিজের এবং নিজ পরিবার পরিজনের জীবন সংগ্রামের কষ্ট লাঘবের জন্যই সমাজবদ্ধ হয়েছে এবং প্রতিবেশীর ওপর কোন স্বাভাবিক আতের টান না থাকার জন্য সদব্যবহার না করলে সমাজবদ্ধতা থাকবে না সেইজন্য পরস্পরের বাঁধনের সিমেন্ট স্বরূপ সর্বজনগ্রাহ্য নৈতিক অনুশাসন প্রবর্তন করেছে, দণ্ডবিধি রচনা ক’রে সমাজে ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থা করেছে। “মানুষ”কে একবচনে ব্যবহার করলে পাছে ভুল বোঝার সম্ভাবনা থাকে সেইজন্য আমি Man. এর স্থানে “পারিবারিক মানুষ” লিখেছি (অনুবাদক )।[/mfn] তার পারিবারি জীবন সংগ্রামকে শক্তিশালী করার উদ্দেশ্য নিয়েই অন্যান্য পরিবারের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সমাজ সম্পর্কের প্রবর্তন করে; এবং আদি মানুষের এই সমাজ গড়ে তোলার চেষ্টা সে ব্যক্তি মানুষ হিসাবেই শুরু করে। এই যে মানুষের জীবন সংগ্রামের বাধাবিপত্তি থেকে মুক্তির আকাঙ্ক্ষা তা কেবল তার জীবন সংগ্রামের কষ্ট লাঘবের ইচ্ছ থেকেই উদ্ভূত। কাজেই দেখা যাচ্ছে মুক্তিলাভের আকাঙ্ক্ষাই হচ্ছে মানব সমাজের গতি প্রগতির মূল প্রেরণা। মানুষের অন্তর্নিহিত যুক্তিশীলতা, নীতিবোধ ও অন্যান্য সৃজনশীল সম্ভাবনাগুলি বিকাশের পথে যে সব প্রাকৃতিক, সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক বাধা আছে তার ক্রমঃ করেছেন, কিন্তু তার অর্থ নয় যে আদিম মানব সমাজবদ্ধ হবার পূর্বে একা একাই থাকত। মানুষ কোনদিনই তা থাকত না। মানুষ প্রথম থেকেই পারিবারিক। কারণ মানুষের জননীকে জীবিকার্জনের কষ্টকর দায়িত্ব থেকে অবসর দিতে হয় এবং মানব শিশুকে বেশ কয়েক বছর পর্যন্ত মাতার ওপর নির্ভরশীল থাকতে হয়, সেইজন্য মানুষ প্রথম থেকেই পারিবারিক প্রাণী জগতকে তিন ভাগে ভাগ করা যায়। যে-সব জীব একা একাই থাকে, কেবল বংশ রক্ষার সময় স্ত্রী পুরুষ ক্ষণিকের জন্য মিলিত হয়, স্ত্রী-প্রাণ সুবিধামত স্থানে ডিম পেডেই ছুটি নেয়-সন্তান পালনের দায়িত্ব থাকে না, আপনিই ডিম ফোটে – বাচ্ছারা নিজেরাই প্রকৃতি থেকে খাদ্য আহরণ করে বেঁচে থাকে; যেমন কীট পতঙ্গ জাতীয় প্রাণী। যে সব প্রাণী দল বেঁধে থাকে : যেমন পিঁপড়ে, মৌমাছি, উইপোকা।
যে সব প্রাণী পারিবারিক, স্ত্রী পুত্র কন্যা নিয়ে পরিবার বেঁধে বাস করে যেমন–সিম্পঞ্জি, ওরাং, গিবন ও মানুষ। মানুষ স্বভাবতঃ পারিবারিক জীব সেই হেতু সে পিঁপড়ে মৌমাছির মত সামাজিক মনোবৃত্তি সম্পন্ন জীব নয়। তাই আতের টান নিজ নিজ স্ত্রী ও সন্তানের ওপর প্রতিবেশীর প্রতি নয়। কিন্তু অপসরণই হচ্ছে মুক্তি। সমাজের নানা আইন কানুন ও বিধি নিষেধের দ্বারা ব্যক্তির সঙ্গে ব্যক্তির যে সম্পর্ক গড়ে ওঠে তার একমাত্র উদ্দেশ্য হওয়া উচিত ব্যক্তি মানুষের জন্য সর্বাধিক স্বাধীনতা লাভের ব্যবস্থা করা। সমাজের অন্তর্গত প্রতিটি ব্যক্তি যে পরিমাণ স্বাধীনতা ভোগ করে তার সমষ্টি দিয়েই যে কোন সমাজ ব্যবস্থার স্বাধীনতা ও প্রগতিমূলক মূল্যের বিচার করতে হবে। নতুবা সামাজিক অন্যায় অবিচার থেকে মুক্তি ও উন্নতির আদর্শ মিথ্যা হয়েই থাকবে।
শিল্পী: গণেশ পাইন
কোন রাজনৈতিক দর্শন বা সামাজিক পুনর্গঠন পরিকল্পনায় ব্যক্তিব স্বাধীনতার আদর্শ যদি শূন্যগর্ভ অবাস্তব ও কাল্পনিক বলে পরিত্যক্ত হয় তবে তার বৈপ্লবিক গুরুত্ব খুবই কম না হয়ে পারে না। যে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় (রাষ্ট্রে) ও অর্থ নৈতিক প্রচেষ্টায় রক্ত-মাংসের ব্যক্তি মানুষকে কাল্পনিক সমষ্টি সত্তাব যূপকাষ্ঠে বলি দেওয়া হয়, সম্ভবতঃ ত দিয়ে ব্যক্তি মানুষের মুক্তি অর্জন করা যায় না। স্বাধীনতা কেড়ে নিলে অর্থাৎ একনায়কত্ব স্থাপন করলে মানুষ স্বাধীনতার পথে এগিয়ে চলবে, এ কথা বলা অর্থহীন ৷ মানুষের ব্যক্তিগত ও সামাজিক সকল প্রচেষ্টার যুক্তিসম্মত লক্ষ্য হওয়া উচিত অধিক থেকে অধিকত মাত্রায় ব্যক্তির স্বাধীনতা লাভ। একমাত্র ব্যক্তির স্বাধীনতা রূপেই স্বাধীনতা বা মুক্তির আদর্শ বাস্তব হয়ে উঠতে পারে।
কেবলমাত্র অর্থনীতির পুনর্গঠন করলেই কোন সমাজ আপন থেকেই মুক্ত সমাজ হয়ে ওঠে না; অথবা শোষিত ও নিপীড়িত শ্রেণীর প্রতিনিধিত্বের দাবীদার কোন রাজনৈতিক পার্টি রাজনৈতিক ক্ষমত দখল করলেই যে সকল ব্যক্তি সঙ্গে সঙ্গে মুক্ত ও স্বাধীন হয়ে যাবে এমন কোন নিশ্চয়তা নেই। ব্যক্তিগত সম্পত্তির লোপ, উৎপাদনের উপায় সমূহের ওপর রাষ্ট্রের মালিকানা প্রতিষ্ঠা, অর্থ নৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার সাহায্যেই শ্রমিক শোষণের অবসান বা ধনের সমবণ্টন হয় না। যন্ত্র-বিজ্ঞানের পরিপূর্ণ সুযোগ নেওয়ার অজুহাতে কখনও বা কর্ম কুশলতা বাড়াবার জন্য সমষ্টিগত প্রচেষ্টার দোহাই দিয়ে ব্যক্তির ভাল-মন্দকে অস্বীকার করা হয়৷ এর ফলে অর্থ নৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার উদ্দেশ্য যে ব্যক্তির উন্নতি সেটাই ব্যর্থ হয়ে যায়। এই জোর করে ওপর থেকে চাপানে৷. অর্থ নৈতিক পরিকল্পনার দ্বার সামাজিক ন্যায়নীতি ও অর্থ নৈতিক সাম্যের ওপর প্রতিষ্ঠিত উন্নততর গণতন্ত্রের পরিবর্তে একনায়কশাসিত রাষ্ট্রের উদ্ভব হয়! অর্থ নৈতিক গণতন্ত্র ছাড়া রাজনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব হলেও হতে পারে কিন্তু রাজনৈতিক গণতন্ত্র ছাড়া অর্থনৈতিক গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা একেবারেই সম্ভব নয়! অর্থনৈতিক উন্নয়ন পরিকল্পনার ওপর ধারা অত্যধিক গুরুত্ব আরোপ করেন, এটা তাঁদের স্মরণ রাখা দরকার।
সর্বপ্রধান প্রশ্ন হল: কী জন্য পরিকল্পনা? ধরে নেওয়া হয়, পরিকল্পিত অর্থনীতিব দ্বারা সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক কল্যাণ সাধিত হবে। অন্য কথায়, এর দ্বারা ধনের সমবণ্টনের সাহায্যে সমাজে ন্যায়-নীতির প্রতিষ্ঠা হবে। তা যদি হয় তা হলে অবশ্য ব্যক্তি স্বাধীনতার সঙ্গে পরিকল্পনার সামঞ্জস্য বিধান হতে পারে। আধুনিক যন্ত্র-বিজ্ঞান যে স্তরে এসে পৌঁছেছে তাতে ব্যক্তি স্বাধীনতার সম্যক স্ফূর্তির পক্ষে যদি তা বাধা হয়ে দাঁড়ায় তবে মানুষের কল্যাণের জন্য যন্ত্র-বিজ্ঞানের অধিক উন্নতি খর্ব করতে হবে। ডাঃ ফ্রাঙ্কেনষ্টাইন সৃষ্ট রাক্ষস যেমন তার স্রষ্টাকেই হত্যা করেছিল, তেমন যন্ত্র যেন তার স্বষ্টা বর্তমান সভ্যতাকেই ধ্বংস না করে সেটা দেখতে হবে। যন্ত্র যখন মানুষই সৃষ্টি করেছে তখন সে মানুষেরই সেবা করবে—মানুষের মুক্তি লাভে, মনুষ্যত্বের বিকাশে সাহায্য করবে।[mfn] যন্ত্র ইতিমধ্যে মানুষকে যন্ত্রে পরিণত করতে শুরু করেছে। তারপর যন্ত্রের মালিকানা ব্যক্তির হাতে থাকায় এবং তা লাভ খাওয়ার উদ্দেশ্যে নিযুক্ত হওয়ায় ক্রমেই মানুষকে পুতুল-নাচের পুতুলে পরিণত করা হচ্ছে। আমেরিকার বর্তমান সমাজ তার জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত এবং পৃথিবীব্যাপী তারই অনুকরণ চলছে।। মানবেন্দ্রনাথ এখানে সেই বিপদের কথাই স্মরণ করিয়ে প্রতিবিধানের ব্যবস্থা করছেন বর্তমান নগরকে ও যন্ত্রশিল্পকে গ্রাম অঞ্চলেও বিকেন্দ্রিত করে মানুষের মনুষ্যত্ব বিকাশের পক্ষে যে পর্যন্ত সহায়ক হবে সে পর্যন্ত তা গ্রহণ-যোগ্য হবে, কিন্তু যখনই তা মনুষ্যত্বের পক্ষে হানিকর হয়ে উঠতে থাকবে তখনই সেখানে সীমারেখা টানতে হবে। আমূল গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র ও সমবায়মূলক অর্থনীতির দ্বারা সেটা সম্ভব হবে। ( অনুবাদক)[/mfn]
একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠাব অজুহাত যেমনই কেন হোক না, সমাজ উন্নয়ণের ব্যাডিক্যাল হিউম্যানিষ্ট পরিকল্পনায় তার স্থান নেই। বাজনীতি থেকে যদি ন্যায়-নীতিকে বিসর্জন দেওয়া হয় তবে রাজনীতির উদ্দেশ্য যে সমাজে ব্যক্তির স্বাধীনতা রক্ষ। সেই উদ্দেশ্যই ব্যর্থ হয়েযায়। এটা অভিজ্ঞতালব্ধ সত্য যে, নীতিবিরুদ্ধ অসৎ উপায়ের দ্বারা সৎ উদ্দেশ্যে পৌঁছান যায় না, অসৎ উপায়ই সম্প্রসারিত হয়ে চলতে থাকে। এই সত্য অনুসারে সোভিয়েট ইউনিয়ানে মানুষের মুক্তি আনার উপায় স্বরূপ সর্বহারার একাধিপত্যই চিরস্থায়ী ব্যবস্থার রূপ নিয়েছে। এই সর্বহারার একাধিপত্যই কমিউনিজমের সঙ্গে সমার্থক হয়েছে—উপায়ই লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে। রাষ্ট্রের (মার্কসবাদ অনুসারে ) বিলুপ্ত হবার কোন লক্ষণই দেখা যাচ্ছে না।” সোভিয়েট ইউনিয়ানে যদি বাস্তবিকই সমাজতান্ত্রিক সমাজ প্রতিষ্ঠা হয়ে থাকে তবে এই পরিবর্তনের জন্য যে মধ্যবর্তীকালের প্রয়োজন ছিল তার নিশ্চয় অবসান ঘটেছে। এবং এতদিনে একাধিপত্যের শেষ হওয়া উচিত ছিল। যতদিন না রুশিয়াতে একাধিপত্য শাসনের অবসান হচ্ছে এবং অন্যান্য দল ও মতের অস্তিত্ব স্বীকার করা হচ্ছে, ততদিন সেখানে উচ্চ পর্যায়ের গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বলাও অর্থহীন।
শিল্পী: গণেশ পাইন
পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের কাজ কর্মও তেমনি নৈরাশ্যজনক। সেই জন্য গতানুগতিক “গণতান্ত্রিক-সমাজতন্ত্রের” সাফল্য সম্পর্কেও ভরসা কর যায় না। গণতন্ত্রকে নব-রূপ গ্রহণ করতে হবে ৷ গণতন্ত্রকে মানবতাবাদী ঐতিহ্যে পুনরায় ফিরিয়ে নিয়ে যেতে হবে। বর্তমানের মত গণতন্ত্রকে কেবল মাথাগুণতির হিসাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ-লঘিষ্ঠের মধে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না, বিশেষতঃ মানুষ যখন তাদের সার্বভৌম রাজক্ষমতা প্রয়োগ করার জন্য উপযুক্ত মর্যাদা নিয়ে মাথা তুলে দাঁড়াবার কোন সুযোগ পায় না ৷ প্রত্যক্ষ গণতন্ত্রের দ্বারা বর্তমানের প্রতিনিধি মারফৎ পরোক্ষ শাসনতন্ত্রকে পরিবর্তিত করতে হবে। রাজনৈতিক পার্টির চরিত্র বিচার করতে হবে তার ঘোষিত নীতি ও কর্মসূচী দিয়ে ভোট ধরবার ক্ষমতা দিয়ে নয়। শুধু মাত্র মুখের কথা বা প্রতিজ্ঞার দ্বারা জনগণের নিকট ভোট ভিক্ষা করলে চলবে না, সেই পার্টির বাষ্ট্র শাসনের পূর্বতন নজির দেখিয়েই তা করতে হবে ৷ পরিচালন ব্যাপারে ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছা প্রকাশের বা মতামত জানাবার কোন ব্যবস্থা নেই, আছে কেবল ব্যালট বাক্সে মাথা গুণতির ব্যবস্থা। বিচার করে দেখলে দেখা যায় যে, ব্যক্তি সত্তার পরিবর্তে এও সমষ্টিসত্তার নিকট আত্মসমর্পণ। এই ব্যবস্থার ফলে ব্যক্তিব ইচ্ছা-অনিচ্ছা জানাবার বা বুদ্ধি-বিবেচনা প্রকাশের কোন সুযোগই থাকে না।[mfn] ফলে জনসাধারণের করার কিছু থাকে না বলে জনসাধারণের বুদ্ধি বৃত্তি অনুশীলনের অভাবে কোন দিনই বাড়তে পায় না। নেতাদের, পার্টির, ডেমাগগির যারাই চালিত হতে হয়। (অনুবাদক)[/mfn] পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে নীতিবোধ শুন্য বাক্যবীরেরা জনগণকে তাদের বাক্যজাল বিস্তারের দ্বারা অভিভূত করে রাষ্ট্রপ্রধান হয়ে বসতে পারে। প্রজ্ঞা, সততা, জ্ঞান, নীতি ইত্যাদির কোন মূল্যই সেখানে থাকে না ৷ অথচ মানব সভ্যতার এইসব মূল্যবান গুণাবলীর সাহায্যে সমাজের রাষ্ট্রীয় সংগঠন ও শাসন ব্যবস্থাকে প্রতিনিয়ত শোধন করার ব্যবস্থা না করলে সমাজে গণতান্ত্রিক জীবন কোন দিনই গড়ে উঠতে পারে না।
বর্তমান জগতে মানব সভ্যতার ঐ সব মূল্যবান গুণাবলীর ধারক ও বাহক নরনারীর অভাব নেই। কিন্তু যতদিন এই অবাঞ্ছিত বাক্যবীর ডেমাগগরা ক্ষমতায় বসে থাকবে ততদিন এইসব গুণীদের নেতৃত্ব লাভের কোন আশা নেই ৷ এই তো গেল পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রের দিক ।
অন্যদিকে, একাধিপত্যশাসিত রাষ্ট্রও যদি একবার জেঁকে বসে—তা সে যে কোন মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের ঘোষণা করলেও—তবে সেও এইরূপ গুণ সম্পন্ন নাগরিকের উদ্ভবে বাধা দেবে৷ এইভাবে পার্লামেন্টারি ডেমোক্র্যাসিতেই হোক আর একাধিপত্য শাসিত রাষ্ট্রেই হোক মানব সমাজ এই সব মুক্তবুদ্ধি ধীমান প্রজ্ঞাসম্পন্ন ব্যক্তির নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হয়ে ক্রমোন্নতির পথে মুক্তির উদ্দেশ্যে এগিয়ে যেতে পারে না।
বর্তমানের পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার তথাকথিত গণতন্ত্রে যদি এইসকল মূল্যবান গুণ-সমূহের দ্বারা রাজনীতিকে বিশুদ্ধ ও প্রভাবিত করার সুযোগ সুবিধা না থাকে, তাহলে একাধিপত্য শাসিত রাষ্ট্র এইসব মানবিক গুণসমূহ বিকাশে বাধা দেয় বলে তার নিন্দা করা এদের মুখে সাজে না। একাধিপত্যের দ্বারা সকল দুঃখের রাতারাতি সমাধানের আপাতঃ মধুর প্রলোভনের হাত থেকে জনসাধারণকে বাঁচাতে হলে গণতন্ত্রকে আধুনিক সভ্যতা ও সংস্কৃতির মধ্যে যে মানবতাবাদী ঐতিহ্য ছিল তা পুনরাবিষ্কার করতে হবে।
পুনরায় ব্যক্তি মানুষকেই সকল উন্নতি-অবনতির মাপকাঠি করতে হবে। প্রজ্ঞা, সততা, বুদ্ধি-বিবেচনা ও নীতিপরায়ণতার উৎকর্ষ দিয়েই নেতৃত্বের বিচার করতে হবে। একটা অন্তসারশূন্য আকার সর্বস্ব কাঠামোটা থাকলেই দেশে যে গণতন্ত্র আছে তা ধরে নেওয়া যাবে না। আজ প্রতিটি স্বাধীনতাকামী চিন্তাশীল ব্যক্তি এক কঠিন প্রশ্ন সমাধানের জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠেছেন: গণতন্ত্র কী সম্ভব? পার্লামেন্টারি গণতান্ত্রিক উপায়ে সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করায় ধার। বিশ্বাসী, তারা একনায়কতন্ত্রকে পরিহার করেছেন বটে কিন্তু তাঁরাও আজ এই প্রশ্নটির সন্তোষজনক উত্তর দিতে পারেননি। গণতন্ত্রের মূলনীতি যে, সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক কল্যাণ সাধন, তা সম্ভব হতে পারে যখন রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব মুক্তবুদ্ধি, বিবেকবান ব্যক্তিদের হাতে ন্যস্ত হবে, কারণ এঁরাই নিজেদের বিবেকের নির্দেশকে সর্বাপেক্ষা বেশী মূল্য দিয়ে থাকেন।
নৈতিক প্রেরণাই মানুষের কাছে সবচেয়ে বড় প্রেরণা। পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রে যে সু-শাসন চলবে তার নিশ্চয়তা আইন দেয় না, দেয় ক্ষমতাপ্রাপ্ত সংখ্যাগরিষ্ঠ দলের নীতিজ্ঞান ও বিবেকবুদ্ধি। ভাল করে বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, একনায়কতন্ত্রও ঐ নৈতিক প্রেরণা থেকেই অনুপ্রাণিত। সেই জন্যেই তারা বলে, সমগ্র জনসাধারণের মঙ্গল সাধনের মহৎ উদ্দেশ্য সাধনের জন্যই একনায়কতন্ত্র উপায় মাত্র। কিন্তু ক্ষমতার লোভ থেকে উর্ধ্বে উঠে সমগ্র দলটাই যে নীতিপরায়ণ থাকবে এ সম্বন্ধে সন্দেহ আছে। সৎ অসৎ মূল্যমানের প্রকাশ ব্যক্তির মাধ্যমেই ঘটে। সুতরাং একমাত্র মুক্তবুদ্ধি বিবেকবান ব্যক্তি পরিচালিত শাসন ব্যবস্থাতেই সর্বাধিক লোকের সর্বাধিক কল্যাণ সাধিত হতে পারে। কারণ সর্বাগ্রে তারা তাদের নিজ নিজ বিবেকের নিকট দায়ী থাকে। বর্তমান সংকট থেকে ত্রাণ পেতে গেলে ও একনায়কতন্ত্রের প্রবল আক্রমণ থেকে আত্মরক্ষা করতে হলে গণতন্ত্রের এইরূপ দার্শনিক রূপায়ণই একান্ত প্রয়োজন।
শিল্পী: গণেশ পাইন
যা বলা হ’ল তার অর্থ এই নয় যে, “জ্ঞাণী-গুণী”দের রাজ প্রতিষ্ঠিত হোক। এখানে মাত্র বলা হল যে, সমাজকে এমন ভাবে পুনর্গঠিত করা হোক যাতে প্রতিটি মানুষ তার অন্তর্নিহিত সৃজনশীল শক্তিকে বিকশিত করে তোলার অফুরন্ত সুযোগ পায়। এটি সম্ভব হয়ে উঠবে তখনই যখন মানুষ সর্বপ্রকার কায়েমী স্বার্থের প্রভাব মুক্ত হবে, যখন তার| আর লোক ক্ষ্যাপানে৷ ডেমাগগ নেতাদের জাতীয় স্বার্থ বা শ্রেণী স্বার্থের কাল্পনিক সত্তার দোহাই-পাড়া বক্তৃতায় পূর্বের মত সহজে মোহগ্রস্ত হবে না এবং এইসব মোহ-মুক্ত মানুষের হাতে বাষ্ট্রের শাসন পরিচালন ক্ষমতা ন্যস্ত হবে। কয়েক বছর অন্তর একদিন ভোটপত্র প্রদান মাত্রের মধ্যেই গণতন্ত্রকে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না। নির্বাচন যদি সার্বজনীন ভোটের দ্বারাও হয়, কিংবা নির্বাচিত সদস্যের মধ্য থেকেই মন্ত্রীসভা গঠিত হয়, তথাপি গণতন্ত্র শূন্যগর্ভ আকার সর্বস্বই থেকে যায়। সার্বভৌম ক্ষমতার স্বত্ব ত্যাগ করে তা প্রতিনিধির হাতে তুলে দেওয়া, তা সে যত কম সময়ের জন্যই হোক, গণতন্ত্র বিরোধী এক বেকুবি ব্যবস্থা। এই হস্তান্তরিত সার্বভৌম ক্ষমতার স্বত্বে স্বত্ববান হয়ে, প্রতিনিধিরা যখন সরকার গঠন ক’রে বলে, ভ্রুন- সাধারণের “জন্য” সরকার গঠন করলাম, তখন যুক্তিসঙ্গত ভাবেই বলা চলে, যে-সরকার জনগণের “জন্য” ( for ) গঠিত হয়, সে-সরকারের “উপাদান” ( of ) জনগণ হতে পারে না৷ এবং তা জনগণের “দ্বারাও” ( by ) পরিচালিত হতে পারে না।
গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে সংগঠিত স্থানীয় গণ-সভা সমূহের ওপর ভিত্তি করে যদি এক পিরামিড আকারের রাষ্ট্র গড়ে তোলা হয় একমাত্র তখনই রাষ্ট্র পরিচালন ব্যাপারে জনসাধারণ প্রত্যক্ষভাবে অংশগ্রহণের সুযোগ পাবে।[mfn] উলটো পিরামিড। কারণ এসব রাষ্ট্রে সব ক্ষমতা ওপরে, আর তলায় একেবারে শূন্য। মানবতন্ত্রী রাষ্ট্রকে সে তুলনায় সিধা পিরামিড বলা হচ্ছে। কারণ এখানে সকল ক্ষমতা তলায়, মাথায় একেবারে শূন্য। এখানে সার্বভৌম ক্ষমতা লোক- সভায় কেন্দ্রীভূত থাকবে না, তা গ্রামে গ্রামে ও নগরের পাড়াতে পাড়াতে ছড়িয়ে থাকবে। অনধিক ১০০০ মানুষ বাস করেন এমন অঞ্চলকে নিয়ে এক একটি গণ-সভা গঠিত হবে এবং সকল পূর্ণবয়স্ক মানুষ সেই গণ-সভার সদস্য হবে। রাষ্ট্রের সার্বভৌম ক্ষমতা এই সকল গণসভা সমুহের সকল গণ-সভা সমূহের দৈনন্দিন কার্য পরিচালনের (পঞ্চায়েত) থাকবে। তারা গণ-সভার দ্বারা দায়ী থাকবে ৷[/mfn]
পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র বা একাধিপত্য শাসিত রাষ্ট্রকে বলা যেতে পারে, এইসব গণ-সভা সমূহের সর্বপ্রধান কাজ হবে জন-সাধারণকে তাদের সার্বভৌম ক্ষমতা সম্বন্ধে সচেতন করে তোলা এবং সুবিবেচনা ও বিবেকের নির্দেশ অনুযায়ী সে অধিকার ব্যবহার করতে শেখান। সমগ্র সমাজ জুড়ে গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের এই যে ব্যাপক ভিত্তি সেগুলি হবে জনগণকে হাতে-কলমে রাজনীতি শিক্ষা দেবার যেন এক একটি বিদ্যাপীঠ। আইনসভা সমূহের প্রতিনিধিরা অনাস্থা ভাজন হলে তাদের ফিরিয়ে আনার ক্ষমতা ও আইন-কানুন সমূহের ওপর মতামত দেবার ক্ষমতা থাকার ফলে এই সব গণ-সভাগুলি সমগ্র রাষ্ট্রের ওপরই প্রত্যক্ষ ও কার্যকরী প্রভাব বিস্তার করতে সক্ষম হবে। নির্বাচনে প্রার্থী মনোনয়ন করার অধিকার থাকবে একমাত্র এদেরই। এই ব্যবস্থার দ্বারা রাজনৈতিক পার্টি সমূহের দলাদলির উর্ধে গণতন্ত্রকে স্থাপন করা হবে। গুণী মানুষ তখন নিজ গুণেই জনগণের নিকট স্বীকৃতি লাভের সুযোগ পাবে। পার্টির স্বার্থরক্ষার জন্য বা পার্টির নিকট আনুগত্যের জন্য বা তার পৃষ্ঠপোষকতা লাভের জন্য বা অন্য কোনরূপ পক্ষপাতিত্ব মূলক আচরণ পাবার প্রত্যাশায় তখন আর কাকেও চিন্তার স্বাধীনতা, নৈতিক নিষ্ঠা, নিরপেক্ষ জ্ঞানবুদ্ধিকে বিসর্জন দিতে বাধ্য হওয়ার মত অবস্থা থাকবে না ।
এই গণসভা সমূহের নিম্নলিখিত ক্ষমতা থাকবে : (১) লোকসভা ও রাজ্য বিধান সভার নির্বাচনে অংশ গ্রহণ করার জন্য প্রার্থী মনোনয়ণ। (পল্লী অঞ্চলে নির্বাচনের সময় বা অন্য কোন কারণে মত বিরোধ দেখা দিলে সে মতবিরোধ মনোমালিন্যে দাঁড়ায় এবং বহুদিন ধরে চলতে থাকে। এই বিপদ এড়াবার জন্য বহু প্রার্থীর মধ্য থেকে ক্রমশঃ ছাঁটাই পদ্ধতিতে (process of elimination এই মনোনয়ন কার্য চলতে পারে। যথা, যিনি বা যাঁহারা শতকরা নির্ধারিত সংখ্যার চেয়ে কম ভোট পাবেন এবং যিনি সবচেয়ে কম ভোট পাবেন তিনি বাদ পড়বেন। তার পরে যারা থাকবেন, তাঁদের নিয়ে পুনরায় ভোট হবে। এই ভাবে বাদ পড়তে পড়তে মাত্র দু’জনের মধ্যে যিনি সর্বাধিক ভোট পাবেন তিনিই সেই অঞ্চলের সকল গণ-সভার মনোনীত প্রার্থী হবেন এবং সার্বজনীন ভোটে প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতিতে নির্বাচিত হবেন।)
(১) প্রতিনিধিগণ যাতে লোকসভায় ও রাজ্য বিধান সভায় জনগণের প্রক্ক” ইচ্ছা প্রকাশ করতে সক্ষম হয় সেই জন্য তাদের অনুক্ষণ সচেতন ও ওয়াকিবহাল রাখা;
(৩) লোকসভায় ও রাজ্যবিধান সভায় আলোচ্য আইন-কানুন সম্বন্ধে আলোচনা ও সে সম্বন্ধে মতামত জ্ঞাপন;
(৫) লোকসভা বা বিধানসভায় আলোচনার জন্য যে কোন আইনে খসড়া রচনা ও প্রেরণ;
(৬) লোকসভা, বিধানসভা বা শাসন পরিচালন বিভাগ কর্তৃক আ কোন কাজ সম্বন্ধে মতামত জ্ঞাপন;
(৭) স্থানীয় জনস্বাস্থ্য, শিক্ষা (মাধ্যমিক পর্যন্ত), পথ ঘাট, উৎপাদক ক্রেতা সমবায়, নিয়ম শৃঙ্খলা রক্ষা, ছোটখাট অপরাধের বিচার প্রভৃতি।
এই সকল গণ-সভা হবে জাতীয় রাষ্ট্রের ভিত্তি এবং সমন্বয় সাধনের জন্য এ দেশব্যাপী লক্ষ লক্ষ গণ-সভার ওপর থাকবে পিরামিডের চূড়ার মত লোকস বা পার্লামেন্ট ।
গণতন্ত্রকে সম্ভব করে তোলার জন্য যে অবস্থা সৃষ্টি করা প্রয়োজন সে সম্বন্ধেই উপরি উক্ত কথাগুলি বলা হল। গণতন্ত্রকে সার্থক করে তুলতে হলে সর্বাগ্রে প্রয়োজন সচেতন ও সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টার দ্বারা নিজ নিজ বৃত্তি ও সম্ভাবনা সমূহকে বিকশিত ও সম্ভোগ করার জন্য ইচ্ছা জাগিয়ে তোলা; এবং সেই ইচ্ছা পূরণের পথে যে সব বাধা-বন্ধন দেখা দেবে সেই সব বাধা-বন্ধন মুক্তির জন্য মানুষকে উদগ্র করে তোলা; এই সকল বাধা-বন্ধন মুক্ত হতে মানুষ যে নিজের চেষ্টাতেই পারে, মানুষ নিজেই যে নিজের জীবন ইচ্ছামত গড়ে তুলতে পারে এই প্রত্যয় জাগিয়ে তোলা; সংস্কার মুক্ত হয়ে স্বাধীন চিন্তা করার জন্য মানুষের মনে সাহস ও শক্তি সঞ্চারিত করা; এবং নিজেদের স্বাধীনতা পরের হাতে তুলে দিয়ে (পার্টি বা ডিকটেটরের হাতে ) দাসত্বের নিরাপদ নিশ্চিন্ত জীবনের ওপর ঘৃণা জাগিয়ে তোলা। গণতন্ত্রকে যদি মানুষের জীবনে রূপায়িত করে তুলতে হয় এবং তা প্রতিরক্ষার জন্য সামর্থ্য লাভ করতে হয়, তা হলে যুক্তিবাদ, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যবাদ ও বিশ্বজনীন মানবতাবাদের ওপর ভিত্তি করে এক নতুন রেনেসাঁস আন্দোলন জাগিয়ে তুলতে হবে।[mfn] স্থানীয় স্বায়ত্তশাসনের জন্য অনেক ক্ষেত্রেই দু’দশখানি গ্রাম বা মহকুমা, এমনকি জেলা পর্যায়ে সহযোগিতার মাধ্যমে কাজ করতে হয়। সেইজন্য পরোক্ষ নির্বাচনের দ্বারা তিনটি স্তরে (অঞ্চল পঞ্চায়েত, ব্লক পঞ্চায়েত, জেলা পঞ্চায়েত) এই সংগঠনটি থাকবে। এইখানে উল্লেখযোগ্য যে বর্তমান পঞ্চায়েত-রাজ আইন মানবেন্দ্রনাথের গণ-সভার আদর্শেই রচিত হয়েছে। কিন্তু ক্ষমতা কেবলমাত্র স্বায়ত্ত শাসনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ আছে। এর ফলে অতি সহজেই জনগণকে রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা সম্বন্ধে সচেতন করে রাষ্ট্রকে মানবতন্ত্রী রাষ্ট্রে পরিবর্তিত করার সম্ভাবনা দেখা দিয়েছে। (অনুবাদক)[/mfn]
শিল্পী: গণেশ পাইন
এই রূপ পরিবেশ গড়ে তোলার সঙ্গে সঙ্গে মানুষের মনে যে স্বাধীন যুক্তিসঙ্গত চিন্তার স্ফুরণ হতে থাকবে তার ফলে মানুষের উচ্চতর গুণাবলীসমূহ সার্থকতার পথে পদক্ষেপ করবে। সভ্যতার আদিকাল থেকে মনুষ্য সমাজ যে সকল সর্বজনগ্রাহ্য নৈতিক অনুশাসন অনুসরণ করে আসছে সেই সব নৈতিক অনুশাসন মেনে চললেই সমাজের সংহতি ও ভারসাম্য রক্ষিত হবে এবং মানুষও সুখ শান্তি প্রগতির পথে এগিয়ে চলতে পারবে। তখন এর জন্য আর শ্রেণী বা জাতির কল্যাণে ব্যক্তিকে আত্মত্যাগ করতে বাধ্য ক’রে সমাজের ভারসাম্য রক্ষার চেষ্টার প্রয়োজন হবে না। যে সকল ব্যক্তি এইরূপ নৈতিক জীবন যাপনে উৎকর্ষ লাভ করতে পারবেন তাঁরাই চিন্তাশীল মানুষের নিকট সম্মানিত হতে থাকবেন এবং সমাজের নেতৃস্থানীয় রূপে গণ্য হবেন। তখন লোক ক্ষ্যাপানো ডেমাগগদের দিন ফুরিয়ে যাবে। তখন কিছুদিন অন্তর নির্বাচনের সময় এক খণ্ড কাগজ ব্যালট বাক্সে ফেলেই গণতন্ত্রের সকল অধিকার ফুরিয়ে যাবে না—রাষ্ট্রের দৈনন্দিন কার্যাবলী নিয়ন্ত্রণে অধিকারও থাকবে। তখন জনগণ আর কেবল মাত্র “জনতা” মাত্রই থাকবে না—সংহত হয়ে উঠবে।
নবরূপায়িত গণতন্ত্র বাস্তবে রূপ নিয়ে গড়ে উঠতে অবশ্যই দেরী হবে। কিন্তু যতদিন না গণতন্ত্রের সে রূপায়ণ হচ্ছে ততদিন সেই পরিবর্তন কালের জন্য পার্লামেন্টারি গণতন্ত্রেই এমন একটি সংবিধান রচনা করতে হবে যাতে রাষ্ট্র পরিচালন ব্যবস্থায় দেশের সৃজনশীল প্রতিভা, মুক্ত বুদ্ধি এবং নীতিপরায়ণ ব্যক্তিদের স্থান হয়, যার ফলে তাঁরা মন্ত্রী প্রমুখ শাসনকার্য পরিচালকবর্গকে তাদের পরামর্শ ও প্রভাবের সাহায্যে পথ প্রদর্শন করতে পারেন। এই পরিবর্তন কালের জন্য পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র একদিকে যেমন জনগণের দ্বারা নির্বাচন ভিত্তিক হবে, অন্য দিকে তেমনি উচ্চ গুণসম্পন্ন ব্যক্তিকে বেছে রাষ্ট্র কাঠামোর মধ্যে স্থান দেবার ব্যবস্থাও রাখতে হবে। যতদিন না সমগ্র সমাজের জ্ঞান-বুদ্ধি ও নৈতিক মান যথেষ্ট পরিমাণে উন্নত হয়ে উঠছে ততদিন হয়তো কেবল নির্বাচনের মাধ্যমেই সমাজের গুণীজ্ঞানী ব্যক্তিদের আইন সভা সমূহের মধ্যে আনা সম্ভব হবে না। অথচ জনসাধারণের বর্তমান অনগ্রসর অবস্থায় রাষ্ট্রের ওপর এ সব মুক্তবুদ্ধি ধীমান নীতি-নিষ্ঠ ব্যক্তির প্রভাব বিস্তারের ব্যবস্থা করতে না পারলে গণতন্ত্র সার্থক হয়ে উঠবে না ৷
এই পরিবর্তন কালের জন্য পার্লামেন্টে যে রাজ্য সভা (Council of State) থাকবে তা গঠিত হবে বৈজ্ঞানিক, ধীমান, চরিত্রবান, জ্ঞানী ও নীতিনিষ্ঠ ব্যক্তিদের নিয়ে এবং এই রাজ্যসভাই মন্ত্রীবর্গকে জরুরি সব রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও শাসনকার্য পরিচালন ব্যাপারে উপদেশ দিয়ে চলবে। খাদের নিয়ে এই রাজ্যসভা গঠিত হবে তাঁরা সাধারণত: দলগত রাজনীতির উর্ধে থাকতেই ভালবাসেন। তাই তাঁদের পেশাদার রাজনীতিকদের মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। অতএব রাষ্ট্রব্যবস্থায় তাদের মূল্যবান অবদান যদি পেতে হয় তা হলে নিম্নলিখিত ব্যবস্থা অবলম্বন করা যেতে পারে: এঞ্জিনিয়ার, অর্থনীতিক, বৈজ্ঞানিক, চিকিৎসক, আইনজীবী, ঐতিহাসিক এবং দর্শন, সাহিত্য, শিল্পকলা প্রভৃতি অন্যান্য সৃজনশীল কাজে নিযুক্ত ব্যক্তিদের সংঘ তাদের প্রতিনিধি স্বরূপ নির্দিষ্ট সংখ্যক ব্যক্তির নাম রাজ্যসভার সদস্যপদের জন্য সুপারিশ করতে পারবেন। রাষ্ট্রপতি তাঁদের রাজ্যসভায় মনোনয়ন করবেন। রাষ্ট্রপতি ইচ্ছা করলে এই সকল সংঘের সহিত যুক্ত নন অথচ অনুরূপ গুণের অধিকারী এইরূপ কয়েকজনকেও মনোনীত করতে পারবেন। ধনী ও কায়েমী স্বার্থের প্রভাব এড়াবার জন্য বেতনভোগী কর্মচারী ছাড়া ব্যবসায়ী প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে অংশীদার হিসাবে বা অন্যভাবে যারা প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষ ভাবে স্বার্থজড়িত থাকবেন তাঁরা যেন এই রাজ্যসভার সদস্য হতে না পারেন, সেইরূপ ব্যবস্থা থাকবে। এই রাজ্য সভার ওপরই অর্থ নৈতিক শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও সাংস্কৃতিক বিষয়ক উন্নয়ন পরিকল্পনা রচনার ভার থাকবে এবং সেই পরিকল্পনা কার্যকরী করে তোলার জন্য কাজকর্ম তদারকী করার অধিকারও এদের থাকবে।
প্রারম্ভেই সমাজের অর্থ নৈতিক জীবন যেন ধনীদের দুর্নীতিপূর্ণ ও সর্বগ্রাসী প্রভাব থেকে ক্রমে ক্রমে মুক্ত হয়ে উঠতে পারে সেই রূপ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। তার ফলে আরো বেশী সংখ্যক মানুষ স্বাধীন ভাবে চিন্তা করতে সক্ষম হবে। দ্বিতীয়তঃ এই সব স্বাধীন- চিন্তাশীল ব্যক্তিদের তখন জন স্বার্থের বিশ্বস্ত রক্ষক রূপে পাওয়া সম্ভব হবে এবং তাঁরাও এই সব কায়েমী স্বার্থবানদের প্রভাবমুক্ত হয়ে জনকল্যাণকে বাস্তবে রূপায়িত করতে সক্ষম হবেন। গণতন্ত্রের পূর্ণ বিকাশের পূর্বে এই মধ্যবর্তী সময়ে যদি মাথা-গুণতির দ্বারাই গণতন্ত্রের প্রতিনিধি নির্বাচন চলতে থাকে তা হলে সমাজ জ্ঞানী-গুণীর নেতৃত্ব থেকে বঞ্চিত হবে। অথচ এই সকল জ্ঞানী-গুণীরাই কেবল সমাজকে সত্যকার গণতান্ত্রিক মুক্তির দিকে পরিচালিত করে নিয়ে যেতে পারে।
র্যাডিক্যাল গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য সমাজের অর্থনীতিকে এরূপভাবে পুনর্গঠন করা প্রয়োজন যাতে মানুষের দ্বারা মানুষকে শোষণের সম্ভাবনা না থাকে। মানুষের মানসিক ও সুকুমার শক্তি ও বৃত্তি সমূহের বিকাশ নির্ভর করে ব্যক্তির জীবনধারণের পক্ষে প্রয়োজনীয় দ্রব্যের অভাব পূরণের ওপর। জীবনযাত্রার ক্রমবর্ধমান মানের উদ্দেশ্যে রচিত পুনর্গঠিত অর্থনীতিই হবে আমূল গণতন্ত্রের ভিত্তি (র্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাসি)।
এই নতুন সমাজের অর্থনীতির ভিত্তি হবে মানুষের ব্যবহারের জন্য উৎপাদন ও প্রয়োজন অনুসারে তা বণ্টন৷[mfn]১৮শ সূত্র দ্রষ্টব্য। বর্তমানের মত কেবল বাজারে বিক্রী করে মাত্র লাভের উদ্দেশ্যেই উৎপাদন হবে না; অর্থাৎ প্রত্যেক কর্মক্ষম মানুষের জীবিকার্জনের জন্য কাজ দিয়ে তাদের প্রয়োজন মেটাবার উদ্দেশ্যে উৎপাদনের ব্যবস্থা থাকবে। (অনুবাদক)[/mfn]
এই সমাজের রাজনৈতিক সংগঠনে ব্যক্তির সার্বভৌম ক্ষমতা- হস্তান্তরের ব্যবস্থা থাকবে না। কারণ তাতে জনগণকে সবপ্রকার কার্যকরী ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত কবা হয়। স্থানীয় গণ-সভা সমূহের নাধ্যমে রাষ্ট্র পরিচালন কার্যে জনসাধারণের প্রত্যক্ষ অংশ গ্রহণেব ব্যবস্থাই হবে এই নতুন সমাজেব রাষ্ট্রীয় ভিত্তি।
জনসাধারণের মধ্যে জ্ঞান-বিদ্যা চর্চার ব্যাপক ব্যবস্থা এবং বিজ্ঞান ও অন্যান্য সৃজনমূলক কাজে উৎসাহ দানই হবে এই নতুন সমাজের সাংস্কৃতিক ভিত্তি।
যে হেতু এই নতুন সমাজ যুক্তিবাদ ও জ্ঞানের ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে সেই হেতু এই সমাজের সব কিছু সুপরিকল্পিতই হবে। কিন্তু এই পূর্ব-পরিকল্পনাতেও মানুষের স্বাধীনতা যাতে সম্পূর্ণরূপে বজায় থাকে সে দিকে লক্ষ্য রাখা হবে। এই নতুন সমাজ রাজনৈতিক, অর্থ নৈতিক ও সাংস্কৃতিক সব দিক দিয়েই গণতান্ত্রিক হবে এই গণতন্ত্র প্রত্যেকটি মানুষের প্রত্যক্ষীভূত বাস্তব গণতন্ত্র হবে এবং স্বকীয় শাসনের মধুস্বাদ ব্যক্তিগত অনুভূতির দ্বারাই পেতে থাকবে সেই হেতু আপৎকালে প্রত্যেকটি মানুষই এই গণতন্ত্র রক্ষার জন্য লড়বে এবং রক্ষা করতেও সমর্থ হবে।[mfn]প্রথম মহাযুদ্ধোত্তর ইউরোপে পার্লামেন্টারি গণতন্ত্র সমূহের দুর্বলতার জন্যই কমিউনিষ্ট ও ফ্যাসিষ্ট একনায়কতন্ত্রকে ঠেকিয়ে রাখা সম্ভব হয় নি। এখানে সেই দুর্বলতা খণ্ডনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। (অনুবাদক)[/mfn]
শিল্পী: গণেশ পাইন
এই আমূল গণতন্ত্রের ( র্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাসি ) আদর্শ বাস্তবে রূপায়িত হবে এক নতুন মুক্ত সমাজ গড়ে তুলতে দৃঢ় প্রতিজ্ঞ মুক্তবুদ্ধি নর-নারীর সংঘবদ্ধ প্রচেষ্টায়। তারা জনসাধারণের সার্বভৌম ক্ষমতা হস্তান্তর করিয়ে নিয়ে তাদের ভাবী শাসক হবার উদ্দেশ্যে কাজ করবে না; তারা হবে তাদের বন্ধু, উপদেষ্টা ও পথ প্রদর্শক মাত্র। যে হেতু তাদের উদ্দেশ্য প্রত্যেকটি মানুষের মুক্তি আনা, সেই হেতু এই উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য বজায় রাখতে তাদের আচরণ হবে যুক্তি ও নীতিসম্মত জনসাধারণের মুক্তির আকাঙ্ক্ষা যতই বাড়বে তাদের প্রচেষ্টাও ততই শক্তিশালী হয়ে উঠবে। অবশেষে শিক্ষিত ও মার্জিত জনমতের সমর্থনে ও সুবিবেচনার সঙ্গে সংঘটিত গণ-অভ্যুত্থানের (action of the people) দ্বারা গড়ে উঠবে র্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্র। ক্ষমতা যদি কতিপয়ের হাতে কেন্দ্রীভূত হয়ে যায় তা হলে জনসাধারণের মুক্তিও দূরে সরে যায়; র্যাডিক্যাল হিউম্যানিষ্টদের এই বিশ্বাসের জন্য তারা ক্ষমতা দখলের চেষ্টা করবে না।
তারা স্থানীয় গণসভা সমূহে জনগণকে সংগঠিত করে তুলবে এবং কালক্রমে এইসব গণ-সভাই গণতান্ত্রিক সার্বভৌম ক্ষমতার এক একটি যন্ত্র হয়ে উঠবে। যেহেতু র্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্র সমাজের সকল মানুষের প্রত্যক্ষ সমবায়ে গড়ে উঠবে তখন রাষ্ট্র ও সমাজ সমার্থক শব্দ হবে বা উভয়েই একাত্ম হয়ে যাবে, এবং যেহেতু তখন শাসিত জনগণ ও শাসক রাষ্ট্রের মধ্যে কোন তফাৎ থাকবে না, সেই হেতু তখন বাষ্ট্র আর দমন-পীড়নের যন্ত্র থাকবে না। কেবল তখনই গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র জনগণের উপাদানে (of) গঠিত এবং জনগণের দ্বারাই (by) পরিচালিত হওয়া সম্ভব হবে।
শেষ পর্যন্ত বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, ব্যক্তির স্বাধীনতা খর্ব ও খণ্ডিত না করে সমগ্র সমাজের প্রগতি ও প্রাচুর্যের জন্য সমাজকে পুনর্গঠিত করা একমাত্র গণশিক্ষার দ্বারাই সম্ভব। স্থানীয় গণসভাগুলি হবে জনগণের রাজনীতি ও সমাজনীতি শিক্ষার বিদ্যাপীঠ। এই র্যাডিক্যাল ডেমোক্র্যাটিক রাষ্ট্রের গঠন ও কার্যপ্রণালী এমনই হবে যে যার ফলে স্বার্থশূন্য অনাসক্ত মানুষদের সমাজের পুরোভাগে আনবার সুযোগ করে দেবে। এরূপ মানুষদের দ্বারা পরিচালিত রাষ্ট্র তখন আর বিশালকায় ভয়ঙ্কর জন্তু লেভিয়াথানের মত সন্দেহ ও ভয়ের বস্তু থাকবে না।[mfn] একনায়কতন্ত্রের দ্বারা জোর করে ওপর থেকে জনসাধারণের ওপর ভাল ব্যবস্থা চাপিয়ে দিলেই ভাল হয় না, কারণ মূল্য-value জোর করে সৃষ্টি করা যায় না। তা শিক্ষা ও সংস্কৃতির মাধ্যমেই ধীরে ধীরে গড়ে ওঠে। (অনুবাদক)[/mfn]
মানুষ চিন্তাশীল জীব; এই চিন্তাশীলতার জন্যই মানুষ এই পৃথিবীকে নিত্য নতুন ভাবে গড়ে তুলতে সক্ষম হচ্ছে, এবং এই চিন্তা কার্য মানুষ ব্যক্তিগত ভাবেই করতে পারে, সমষ্টিগত ভাবে পারে না। বৈপ্লবিক ও মুক্তিকামী সমাজবিজ্ঞান ও দর্শনের কর্তব্য হল, এই ঐতিহাসিক সত্যটির প্রতি বিশেষভাবে দৃষ্টিদেওয়া। মানুষের মস্তিষ্ক একটি উৎপাদনের যন্ত্রবিশেষ এবং তাতে উৎপন্ন হয় সব চেয়ে বড় বৈপ্লবিক জিনিষ। সকল বিপ্লবেরই মূলে আছে পুরাতনের পরিবর্তে নতুন গড়ে তোলার জন্য সৃজনাত্মক চিন্তা। নিজেদের সৃজনীশক্তি সম্বন্ধে সচেতন, নতুন সমাজ গড়ে তুলতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, দুঃসাহসিক ভাব ও ভাবনায় অনুপ্রাণিত এবং মুক্ত মানুষের সহযোগিতায় সৃষ্ট এক মুক্ত সমাজ গড়ে তোলার বিশ্বাসে উদ্দীপ্ত মানুষের সংখ্যাবৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে গড়ে উঠবে এই গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার অনুকূল পরিবেশ। নিষ্কাম মুক্তবুদ্ধি মানুষরা যখন সমাজ ও রাষ্ট্রের শাসন কার্যে ব্রতী হবেন একমাত্র তখনই মানুষের দাসত্ব শৃঙ্খল চূর্ণ হয়ে সকলের জন্য মুক্তি আসবে।
এখানে যে লেখাটা পেশ করছি সেটার মূল অংশটা বেশ আগের লেখা। বছর তিনেক আগের। রবীন্দ্রনাথের একটা চিঠি ছিল এই স্বল্পদৈর্ঘ্য-রচনার ভরসাবিন্দু। আমাদের দেশের ড. সেলিনা জামানের সম্পাদনা-করা (সম্ভবত ‘কিশোর রবীন্দ্র-সঞ্চয়ন’ নামের) একটা বইয়ে চিঠিটা পেয়েছিলাম। চিঠিটার আদি উৎস জানা এবং এর বয়ানের অবিকলত্ব সম্পর্কে শতভাগ নিঃসংশয় হওয়ার প্রায়-অপ্রয়োজনীয় বাতিক না মেটাতে পারার কারণে এই লেখাটা কোথাও আর ছাপতে দেওয়া হয় নি এত দিন।
বাতিক এখনও মেটে নি। তবু একটা বিশেষ উপলক্ষে এটা এখন ছাপতে ইচ্ছে করছে। ঠাকুরের চিঠিটা ছিল জুলাই মাসের ৩১ তারিখে লেখা। তার মানে শ্রাবণ মাসের মাঝামাঝিতে। ঝুম বরষায়। উপরন্তু ২২শে শ্রাবণের খুব কাছাকাছি কোনো একটা দিনে। সম্ভবত ১৬ই শ্রাবণে। বিশেষ কোনো উপলক্ষ-দিবস ধরে কখনো কিছু লিখেছি বলে মনে পড়ে না। কিন্তু এবারের শ্রাবণে কয়টা দিন ঠাকুরের সাথেই থাকতে হয়েছিল। কারণ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের প্রফেসর শহীদ ইকবাল তাঁদের ‘চিহ্ন’ পত্রিকায় ‘আমার রবীন্দ্রনাথ’ জাতীয় কিছু-একটা লেখা দিতে বলেছিলেন। বিচিত্র কারণে তাঁর ফরমায়েশ আমার শিরোধার্য-প্রায়। লেখাটা, সুতরাং, আমি দাঁড় করালাম ঠিকই কিন্তু ততদিনে দেরি হয়ে গেছে। বেরিয়ে গিয়েছে ‘চিহ্ন’। লেখাটা যে আমি করেই ফেলতে পেরেছিলাম, সে কথা তাঁদেরকে জানানো হয় নি দেরি করার লজ্জায়।
রবীন্দ্রনাথের চিত্রকর্ম
ভেবেছিলাম সেটা এখানে [দৈনিক বণিক বার্তায়] আমার এই [“আত্মঘাতী পরিস্থিতি”] কলামে ছাপার জন্য দেবো। কিন্তু, যেহেতু ইকবালের জন্য লেখা, তাই তাঁর হাতে না দিয়ে অন্য কোথাও “সম্পর্ক: রবীন্দ্রনাথের সাথে” নামে আমার সেই লেখাটা এখানে দিতে সাহস করলাম না— শ্রাবণ পেরিয়ে আশ্বিন এসে গেল যদিও। পরে কোথাও সেটা হয়তো ছাপা হবে কিংবা হবে না, সেটা পরের কথা। আপাতত বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগকে উপলক্ষ করে এ শহরের বকুলতলায় “নিনাসা” নামের একটা কেমন-যেন-অন্যরকম বাসায় এসে আশ্বিনের অঝোর বৃষ্টিতে রবীন্দ্রনাথের পবিত্র প্রেতাত্মা নতুন করে চেপে বসেছে মাথায়। নামছে না। আর-কিছু ভাবাই যাচ্ছে না। উপায়ন্তর না দেখে প্রেত-পুরাতন এই রচনাটির আশ্রয় নিয়েছি। শ্রাবণের বিলম্বিত শ্রাদ্ধে আশ্বিনের অঞ্জলি এ লেখা।
দুই। বলশেভিক নিষ্পাপতার প্রতি বঙ্কিম-নায়িকার বিগত কটাক্ষ
বিগত ২০১০ সালের এপ্রিল মাসে সত্যিকারের নতুন ধারার প্রকাশনা-সাংবাদিকতা-প্রতিষ্ঠান উইকিলিকস প্রকাশ করে “সহগামী খুনখারাবি” নামে মার্কিন সেনাবাহিনীর একটি গোপন ভিডিওচিত্র। বিষয় ছিল ইরাকে মার্কিন সেনাদের নির্বিচার খুনের সামরিক খতিয়ান। জুলাই মাসে তারা প্রকাশ করে “আফগানিস্তান যুদ্ধের ডায়েরি” নামে প্রায় ৭৫ হাজার গোপন মার্কিন সামরিক নথিপত্র প্রকাশ করে দেয়। তারপর ডিসেম্বর মাসে “ইরাক যুদ্ধের ডায়েরি” নামে তারা উন্মোচন করে প্রায় চার লক্ষ গোপন মার্কিন সামরিক নথিপত্র। কেঁপে ওঠে পৃথিবী। সারা দুনিয়ার শাসক-মিডিয়া একুশ শতকের সর্বপ্রধান (আমার বিবেচনায়) চিন্তক-দার্শনিক-যোগাযোগতাত্ত্বিক-অ্যাক্টিভিস্ট-সম্পাদক-সাংবাদিক জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে শুরু করে কুৎসা রটনার এক অবিশ্বাস্য অভিযান।
পূর্বাপর এই পরিপ্রেক্ষিতে সে বছর ৮ই ডিসেম্বর তারিখের বিডিনিউজ টোয়েন্টিফোর ডট কম-এর আকাশ-বাতায়নে প্রকাশিত হয় আমার “জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জ কি খ্যাপা বিজ্ঞানী, বিন লাদেন, নাকি ভিনগ্রহের প্রাণী?” নামের একটি লেখা। সেখানে কথাপ্রসঙ্গে আমি “পুরো মার্কিন রাষ্ট্র-প্রণালীর ক্রমাগতভাবে ফ্যাসিস্ট-বলশেভিক হয়ে ওঠার ভীতিকর ও … আগ্রাসী পরিস্থিতি”র কথা বলাতে ‘প্রতিক্রিয়া’ প্রকাশ করেন অগ্রজ বন্ধুভাজনেষু জনাব ওমর তারেক চৌধুরী।
লেখার নিচে মন্তব্যের ঘরে তিনি প্রশ্ন তোলেন: “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী করে একাধারে ফ্যাসিস্ট এবং বলশেভিক হয়ে উঠতে পারে?” এবং এরকম নিষ্পাপ একটি প্রশ্নের সঙ্গে এক নিঃশ্বাসে তিনি করেন ভয়ানক একটি লেনিনীয় ভঙ্গির বিদ্রুপ: “এ তো রাষ্ট্রবিজ্ঞানে মৌলিক অবদান রাখার মতো প্রশংসনীয় ভাবনা”। এবং পরিশেষে, অদ্ভুত অসঙ্গতিপূর্ণ প্রশংসা-বাক্য পেশ করেন তিনি: “একটি চমৎকার, পরিপূর্ণ লেখা উপহার দেবার জন্য সেলিম রেজা নিউটনকে অভিনন্দন …”।
তারেক ভাই আরো কথা তুলেছিলেন। সেদিকে আমি এখন যাব না। বিদ্রুপ এবং প্রশংসা ধর্তব্যের মধ্যে পড়ে না। ওসব জিনিস সর্বদাই একই মুদ্রার এপিঠ ওপিঠ। বর্তমান রচনায় আমি বরং ওমর ভাইয়ের মতো পূর্ণবয়স্ক বলশেভিক-বামপন্থীর নিষ্পাপ অন্ধবিশ্বাসকে বঙ্কিমচন্দ্রের নায়িকার চোখ দিয়ে অতি সামান্য কটাক্ষ-ইশারা করব শুধু। এবং বিনিময়ে, যেকোনো ককটেল খেতে আগ্রহী থাকব। তথাপি পাঠক যেন আমার নিজের জীবনের সুদীর্ঘ বলশেভিক ব্যাকগ্রাউন্ড এবং বিশেষত তারেক ভাইয়ের জন্য আমার নিষ্পাপ ভালোবাসা বিস্মৃত না হন, সেই অনুরোধ জানিয়ে রেখে শুরু করছি চোখের কাজ। বিস্তারিত ‘সরন-প্রতিসরণীয়’ কায়দায় নয়। কটাক্ষ-ইশারায় মাত্র। বঙ্কিম চট্টোপাধ্যায়ের নায়িকার ভঙ্গিতে। হাজার হোক আমাদের মরমী সাধক জালালের গানে আছে: “প্রেমিক ভঙ্গিতে যায় চেনা”।
তিন। ফ্যাসিস্ট-বলশেভিক মানুষখেগোর দল
ড. সেলিনা জামানের সম্পাদনা-করা যে বইয়ের কথা এ রচনার শুরুতে উল্লেখ করেছি, সেখানে আছে আমাদের এতদিন-অপঠিত একটি চিঠি। “দৌহিত্র নীতীন্দ্রনাথ গঙ্গোপাধ্যায়কে লেখা রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের চিঠি”। ঠাকুরের এটি ১৯৩১ সালের রচনা। চিঠিটা এবার হুবহু পড়ে নেওয়া যাক:
ওঁ
[শান্তিনিকেতন]
কল্যানীয়েষু,
নীতু, তোর চিঠি পেয়ে খুশি হলুম। জর্মানিতে ব্যাভেরিয়ার ভাবগতিক ভাল লাগছে না। যেখানে দারিদ্রে মানুষ দুর্বল সেইখানেই যেমন মারী মড়ক জোর পায় তেমনি আজকালকার য়ুরোপে দুর্ভিক্ষ যতই ছড়িয়ে পড়ছে ততই ফাসিজ্ম এবং বল্শেভিজ্ম জোর পেয়ে উঠছে। দুটোই অস্বাস্থ্যের লক্ষণ। মানুষের স্বাধীনবুদ্ধিকে জোর করে মেরে তার উপকার করা যায় এ-সব কথা সুস্থচিত্ত লোকে মনে ভাবতেই পারে না। পেটের জ্বালা বাড়লে তখনি যত দুর্বুদ্ধি মানুষকে পেয়ে বসে। বল্শেভিজ্ম ভারতে ছড়াবে বলে আশঙ্কা হয় — কেননা অন্নকষ্ট অত্যন্ত বেড়ে উঠেছে — মরণদশা যখন ঘনিয়ে আসে তখন এরা যমের দূত হয়ে দেখা দেয়। মানুষের পক্ষে মানুষ যে কি ভয়ংকর তা দেখলে শরীর শিউরে ওঠে — মারের প্রতিযোগিতায় কে কাকে ছাড়িয়ে যাবে সেই চেষ্টায় আজ সমস্ত পৃথিবী কোমর বেঁধেছে —মানুষের হাত থেকে বাঁচবার জন্যেই মানুষ কেবলই ভয়ংকর হয়ে উঠছে — এর আর শেষ নেই — খুনোখনির ঘুর্ণিপাক চলল।
আর যাই করিস এই-সব মানুষখেগো দলের সঙ্গে খবরদার মিশিস নে। য়ুরোপ আজ নিজের মহত্ত্বকে সব দিকেই প্রতিবাদ করতে বসেছে। আমাদের দেশের লোক — বিশেষ বাঙালি — আর কিছু না পারুক, নকল করতে পারে — তাদের অনেকে আজ য়ুরোপের ব্যামোর নকল করতে লেগেছে। এই নকল মড়কের ছোঁয়াচ থেকে নিজেকে বাঁচিয়ে চলিস। নিশ্চয় তোদের ওখানে এই-সমস্ত দানোয়-পাওয়া ভারতবাসী অনেক আছে, তাদের কাছে ভিঁড়িস নে, আপন মনে কাজ করে যাস।
বিশ্বের বৃহত্তম বাধ্যতামূলক, দাসত্বপরায়ন শ্রমশিবির ছিল তথাকথিত কমিউনিস্টদের রাশিয়ায়। সবচেয়ে বেশি মানুষ জেলখানায় ছিলেন লেনিন-ট্রটস্কি-স্তালিনের বহুল-প্রচারিত ‘সমাজতান্ত্রিক’ রাশিয়ায়। “মুক্ত মানুষের মুক্ত সমাজ” বানাতে গিয়ে বলশেভিকরা ‘ভুল করে’ বিশাল একটা জেলখানা বানিয়ে ফেলেছিল পৃথিবীর ছয় ভাগের এক ভাগ এলাকা জুড়ে। এই দুঃখেই সম্ভবত বর্তমান দুনিয়ার সবচাইতে বেশি উদ্ধৃত প্রফেসর নোম চমস্কি বলেন, “লেনিনকে আপনি যদি বামপন্থী মনে করেন, আমি তাহলে বামপন্থী নই।”
আর, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, যাঁর কাছে ইস্কুলের দেওয়ালকে পর্যন্ত জেলখানা মনে হতো (ন্যায্যতই), যিনি সারাজীবন বলেছেন যে “মানুষের স্বাধীনবুদ্ধিকে জোর করে মেরে তার উপকার করা যায় এ-সব কথা সুস্থচিত্ত লোকে মনে ভাবতেই পারে না”, সেই রবীন্দ্রনাথের “রাশিয়ার চিঠি”কে বলশেভিক-সমাজতন্ত্রের [আদতে কর্তৃত্বপরায়ন রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদের] সাফাই হিসেবে প্রচার করা হয়েছে যুগ যুগ ধরে। অথচ, মস্কোতে নামার পর “যা দেখছি আশ্চর্য ঠেকছে” অবস্থা সত্ত্বেও বলশেভিকদের একেবারে গোড়ার “গুরুতর গলদ” দেখতে একচুলও ভুল হয় নি রবীন্দ্রনাথের। রাশিয়ার চিঠির শুরুতেই আমরা তাই দেখি:
রাশিয়ায় একেবারে গোড়া ঘেঁষে … সমস্যা সমাধান করবার চেষ্টা চলছে। তার শেষ ফলের কথা এখনো বিচার করবার সময় হয় নি, কিন্তু আপাতত যা চোখে পড়ছে তা দেখে আশ্চর্য হচ্ছি। …
এর মধ্যে গলদ কিছুই নেই তা বলি নে; গুরুতর গলদ আছে। সেজন্যে একদিন এদের বিপদ ঘটবে। সংক্ষেপে সে গলদ হচ্ছে, শিক্ষাবিধি দিয়ে এরা ছাঁচ বানিয়েছে — কিন্তু ছাঁচে-ঢালা মনুষ্যত্ব কখনো টেঁকে না — সজীব মনের তত্ত্বের সঙ্গে বিদ্যার তত্ত্ব যদি না মেলে তা হলে হয় একদিন ছাঁচ হবে ফেটে চুরমার, নয় মানুষের মন যাবে মরে আড়ষ্ট হয়ে, কিম্বা কলের পুতুল হয়ে দাঁড়াবে …
১৯৩০ সালে লেখা রাশিয়ার চিঠির সাথে ঠিক পরের বছরই জার্মানি-প্রবাসী নাতিকে লেখা রবীন্দ্রনাথের ১৯৩১ সালের বহুল-অপ্রচারিত চিঠিটা মিলিয়ে পড়তে বলি, পাঠক। বলশেভিক-রাষ্ট্রপন্থা যে ফ্যাসিবাদেরই নামান্তর তা বুঝতে ইতিহাসের কাণ্ডজ্ঞানই যথেষ্ট; তবু আপাতত রবীন্দ্রনাথের চিঠির দোহাই দিচ্ছি তাঁর “রাশিয়ার চিঠি” বাংলাদেশের বলশেভিক-বামপন্থীদের বিশেষ আদরের ধন, তাই।
আর্টওয়ার্ক: রেডটেরর জার্মান এন্টি-বলশেভিক পোস্টার/১৯১৯ সূত্র: পাবলিক ডোমেন
“ফাসিজ্ম এবং বল্শেভিজ্ম” উভয়ই ঠাকুরের কাছে “অস্বাস্থ্যের লক্ষণ”, “য়ুরোপের ব্যামো”— “মরণদশা যখন ঘনিয়ে আসে তখন এরা যমের দূত হয়ে দেখা দেয়”। তাঁর মতে দুটোই “খুনোখনির ঘুর্ণিপাক” মাত্র, যারা “জোর পেয়ে” ওঠে “দারিদ্র”জনিত “মানুষের দুর্বলতা”, “দুর্ভিক্ষ”, “মারী মড়ক”, “পেটের জ্বালা” তথা “অন্নকষ্ট” ইত্যাদি কারণে। তাই, “ফাসিজ্ম এবং বল্শেভিজ্ম” উভয়ই তাঁর কাছে “মানুষখেগো দল”।
বাকি থাকল “মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র কী করে একাধারে ফ্যাসিস্ট এবং বলশেভিক হয়ে উঠতে পারে” সেই প্রশ্ন। খেয়াল করলে বোঝা যাবে, ফ্যাসিবাদ এবং বলশেভিক-রাষ্ট্রপন্থা উভয়ই আদতে চূড়ান্ত কর্তৃত্বপরায়ন, সর্বাত্মক-স্বৈরতন্ত্রী রাষ্ট্রপ্রণালী। উভয়েরই গোড়ার জোরটা গায়ের জোর, বলপ্রয়োগ, সঙ্গে “সমাজতন্ত্রের” বুলি (হিটলারও নিজেকে ‘সমাজতন্ত্রী’ বলতেন)। এদের উভয়েরই মূল শত্রু জনসাধারণের স্বাধীনবুদ্ধি। উভয়েরই মূল বিশ্বাস এই যে “মানুষের স্বাধীনবুদ্ধিকে জোর করে মেরে তার উপকার করা যায়”— যা “সুস্থচিত্ত লোকে মনে ভাবতেই পারে না।”
ইউরোপের এই ব্যামো এখন ধরেছে একদা-স্বাধীনতাকেন্দ্র অধুনা-নিওলিবারাল মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রকে। নতুন ধারার সংবাদমাধ্যম উইকিলিকস এবং জুলিয়ান অ্যাসাঞ্জের বিরুদ্ধে ‘গণতান্ত্রিক বামপন্থী’ ওবামা-প্রশাসনের কার্যকলাপে তার সাম্প্রতিকতম প্রমাণ। প্রমাণ ব্র্যাডলি ম্যানিঙের রেডিমেড বিচার-শাস্তির প্রক্রিয়ায়। প্রমাণ এডওয়ার্ড স্নোডেনের সর্বসাম্প্রতিক এনএসএ-উন্মোচনে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সর্বগ্রাসী রাষ্ট্রীয় নজরদারির বাস্তবতা হার মানিয়েছে রুশ-বলশেভিকদের ‘চেকা’, তথাকথিত কমিউনিস্ট পূর্ব জার্মানির ‘স্ট্যাসি’, এমনকি হিটলারের ফ্যাসিস্ট জার্মানির ‘গেস্টাপো’কে হার মানিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্রের অনেকেই এখন ইউএসএ বলতে বোঝেন: “ইউনাইটেড স্ট্যাসি অফ অ্যামেরিকা”। আর, অ্যাসাঞ্জ তো সেই ২০০৬ সালেই তার ব্যক্তিগত ব্লগ “আইকিউ ডট অর্গ”-এ লিখেছিলেন: “ইউনাইটেড সোভিয়েটস অফ অ্যামেরিকা”।
পাঁচ। ইউরোপের মহত্ব, ইউরোপের ব্যামো
বলশেভিক সমাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার জন্য আমরা যারা পার্টির হুকুমে চিন্তাপ্যারেড করেছি সেই কৈশোর থেকে, তারা খুবই ভালো জানি: মানুষের স্বাধীনবুদ্ধির কোনো স্থান নাই বলশেভিক পার্টি-রাষ্ট্রগুলোতে। পশ্চিম “য়ুরোপের ব্যামোর নকল” (প্রথমত পূর্ব ইউরোপের এবং ক্রমশ সারা পৃথিবীর) বলশেভিক-বামপন্থীরা অনেক করেছেন।
চলুন, এবার “য়ুরোপের মহত্ত্বের” দিকে তাকাই: সেটা এক দিকে ব্যক্তিস্বাধীনতাকামী, পুঁজিবাদবিরোধী, রেনেসাঁজনিত ধ্রুপদী উদারনীতিবাদ, এবং অন্য দিকে মার্কসেরও জন্মের আগে জন্মানো সমাজতন্ত্রী শ্রমিক আন্দোলনের দ্বিবেণীসঙ্গমে বেড়ে ওঠা নৈরাজ্যবাদ, তথা মুক্তিপরায়ন সমাজতন্ত্র।
বঙ্কিমের নায়িকার কটাক্ষ-ইশারাটুকুই থাকল আজ। ইট-পাটকেল-ককটেল আসলে (কিংবা না-আসলেও) “বাকি কথা পরে হবে”।
…………………
(লেখাটা ছাপা হয়েছিল দৈনিক বণিক বার্তা পত্রিকায় লেখকের “আত্মঘাতী পরিস্থিতি” কলামের ১০ম কিস্তি হিসেবে ২০১৩ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর তারিখে। বাংলাদেশে তখন যুদ্ধাপরাধীদের রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিচারের মধ্য দিয়ে শেখ হাসিনার ফ্যাসিজমের উত্থান ঘটতে শুরু করেছে।)
[অনুবাদকের মন্তব্য: বিখ্যাত মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও বিপ্লবী রোজা লুক্সেমবার্গের জন্ম ১৮৭১ সালের ৫ মার্চে, পোল্যান্ডের এক ইহুদি পরিবারে। কৈশোরেই রাজনীতির সাথে যুক্ত হন রোজা। ১৮৮৬ সালে পোলিশ প্রলেতারিয়েত পার্টির সদস্য হিসেবে কাজ করা শুরু করেন, কিন্তু তৎপরতার কারণে তৎকালে রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের শিকার হয়ে রোজা দেশ ছাড়েন ১৮৮৯ সালে। পাড়ি জমান সুইজারল্যান্ডে। ১৮৮৯ থেকে ১৮৯৭ সালে জুরিখ বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, ‘দি ইন্ডাস্ট্রিয়াল ডেভেলপমেন্ট অফ পোল্যান্ড’ শীর্ষক ডক্টোরাল থিসিস জমা দেন। কিন্তু ততদিনে তার তৎপরতা তাকে মার্ক্সবাদী তাত্ত্বিক ও রাজনৈতিক কর্মী হিসাবে পরিচিত করে তুলেছিল। ১৮৯৩ সালে জুরিখে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ইন্টারন্যাশনালের তৃতীয় কংগ্রেসে যোগ দেন।
১৯০৪ সালের দিকে, যখন বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধটি লেখেন, তখন রোজা লুক্সেমবার্গ মোটাদাগে দ্বিতীয় আন্তর্জাতিকের জন্য পোলিশ ও রুশ বিষয়ক একজন বিশেষজ্ঞ হিসাবে স্বীকৃতি পেয়ে গিয়েছেন। ১৯০৩ সালে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টিতে মেনশেভিক ও বলশেভিকদের যে বিভাজন হয়েছিল সেটা বিশ্লেষণ করতে ইস্ক্রার সম্পাদকরা তাকে অনুরোধ করেন। জার্মান ভাষায় ১৯০৪ সালে তিনি Neue Zeitপত্রিকায় ‘রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাংগঠনিক প্রশ্নসমূহ’ শিরোনামে প্রবন্ধটি প্রকাশ করেন। এই প্রবন্ধ হচ্ছে সংগঠন বিষয়ে লেনিনের তত্ত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সমালোচনা। রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনের ভেতর পার্টি সংগঠন ও গণতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা বিষয়ে যে তর্ক চলছিল তাতে এই প্রবন্ধ একটি উল্লেখযোগ্য সংযোজন। রোজা এখানে বৈপ্লবিক পার্টির গঠন ও কেন্দ্রিকতা বিষয়ে লেনিনের অবস্থানের কড়া সমালোচনা হাজির করেন।
রোজা এই প্রবন্ধে সংগঠন সংক্রান্ত তার ভাবনা তুলে ধরেন। আলাপ শুরু করেন লেনিনের কেন্দ্রিকতাবাদ দিয়ে, এবং এটাকে সমালোচনা ও পর্যালোচনা করার মাধ্যমে তার নিজের দৃষ্টিভঙ্গি হাজির করেন। তৎকালে এক ধরনের নতুন সংগঠন, যা কিনা বিপ্লব সফল করবে, সে বিষয়ে প্রচুর আলাপ চলছিল। লেনিনের মতে, বিপ্লবী পার্টিকে আসলে শ্রমিকশ্রেণির ভ্যানগার্ড হতে হবে। তারাই নেতৃত্ব দিবে বিপ্লবে, শ্রমিকশ্রেণিকে তাদের ‘ঐতিহাসিক দায়িত্ব’ পালনে উদ্বুদ্ধ করবে। এই যে সংগঠন বা পার্টি হবে সেটাকে খুব কেন্দ্রীভূত হতে হবে, সামরিক বাহিনীর মতো এবং আমলাতান্ত্রিক। সকল ক্ষমতা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে ন্যস্ত থাকবে। কেন্দ্রীয় কমিটিই সবকিছুর পরিকল্পনা করবে, বাদবাকি সবাই, সংগঠনের শাখা–প্রশাখা সকলেই কেবল সেই পরিকল্পনা মোতাবেক কাজ করবে। বিভিন্ন শাখা কমিটি গঠন, বিলুপ্তকরণ, নেতা নির্বাচন বা অপসারণ ইত্যাদি সকল কাজের দায়িত্ব থাকবে কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে। কেন্দ্রে যা সিদ্ধান্ত নেয়া হবে বাকিরা সেটাই বাস্তবায়িত করবেন, কীভাবে সেটা বাস্তবায়ন করা যায় সেই বিষয়ে আলাপ–আলোচনা করবেন। শ্রমিকশ্রেণির গণতন্ত্রের এইসব নিয়া ভাবনার সময় নেই। বরঞ্চ সংগঠনের আমলাতান্ত্রিকতা ও কেন্দ্রিকতাবাদ আদতে বৈপ্লবিক। রোজা এই প্রবন্ধে প্রধানত এই প্রস্তাবনা ও এর সাথে জড়িত মনোভঙ্গির সমালোচনা করেন। রোজা বৈপ্লবিক পার্টির জরুরতকে অস্বীকার করেন না, বরঞ্চ তিনি মানেন সেটা লাগবেই। কিন্তু লেনিন যে কেন্দ্রিকতার কথা বলেন, রোজা সেটা মানতে পারেন না। কারণ, রোজার মতে, লেনিন জনগণের সৃজনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততাকে যান্ত্রিক বানিয়ে তুলতে চান। লেনিন যে ‘সুবিধাবাদে’র ব্যাপক নিন্দামন্দ করেন, রোজার মতে, সেটা কেন্দ্রিকতার মাধ্যমে বরঞ্চ আরও ত্বরান্বিত হবে। রোজা তার দুই অধ্যায়ে এই অবস্থানকেই ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ করেন। তিনি বরঞ্চ সংগঠনে ব্যাপক অংশগ্রহণ চান। তাতে ভুল হতে পারে, সুবিধাবাদও প্রবেশ করতে পারে। কিন্তু সেটাকে কোনো গঠনতন্ত্র দিয়ে ঠেকানো যাবে না। ভুল ঠেকানোর জন্য যদি কঠিন কেন্দ্রীয় কমিটি গড়ে তোলা হয় তাহলে সেটা ভুল ঠেকানো দূরে থাক, উল্টো বৈপ্লবিক শ্রমিকশ্রেণির যে সজীবতা ও লড়াই করার যে স্পৃহা তাকেই গলা টিপে মেরে ফেলবে।
রোজার এমন ভাবনা মোটেই অকস্মাৎ নয়। লেনিনের সাথে তার এই দৃষ্টিভঙ্গিজনিত পার্থক্য একেবারেই মৌলিক এবং সেটা আজীবন ছিল। এই প্রবন্ধে যেমন ছিল, তেমনি ছিল শেষ দিন পর্যন্ত। রোজা বলশেভিক বিপ্লবের প্রশংসা করলেও সেখানেও তিনি এই বিষয়ে উদ্বিগ্নতা প্রকাশ করেছিলেন। কয়েকটা বিষয়ে রোজার অগাধ বিশ্বাস ছিল, এগুলোই লেনিনের সাথে তার অবস্থানের ফারাক ঘটিয়েছে, এবং সারাজীবন সকল লেখাতেই বিষ্যগুলোকে খুঁজে পাওয়া যায়। বিষয়গুলো হচ্ছে, জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততা, সৃজনশীলতা ও গণতন্ত্র। রাজনৈতিক আন্দোলনের বিকাশে জনগণের স্বতঃস্ফূর্ততার ওপর রোজা জোর দিতেন। সেখানে শ্রমিকশ্রেণির বা প্রলেতারিয়েতের বা আমজনতার সৃজনশীল সত্তা এই আন্দোলনের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। তিনি যে লেনিনের কেন্দ্রিকতাবাদের সমালোচনা করেন সেখানেও এই দুটোর অস্তিত্ব খুঁজে পাওয়া। অর্থাৎ, কেন্দ্রিকতাবাদ জনগণের আন্দোলনের স্পৃহা, তাদের সৃজনশীলতা ও স্বতঃস্ফূর্ততা সবকিছুকে দমিয়ে দিয়ে, কাগজ ও গঠনতন্ত্রের মাধ্যমে একটি কেন্দ্রীয় কমিটির খপ্পরে তুলে দেয়। ফলে রোজার চোখে সমাজতন্ত্র ও গণতন্ত্র অবিচ্ছেদ্য। তিনি অবশ্যই সমাজতন্ত্র চাইতেন কিন্তু, তার মতে, যতদূর পর্যন্ত গণতন্ত্র ও স্বাধীনতাকে বিস্তৃত করা যায় ততদূর ছাড়া তার সমাজতন্ত্র কায়েম হবে না। সকল ধরনের স্বাধীনতা, অর্থাৎ রাজনৈতিক অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্বাধীনতা ব্যতীত সেই সমাজতন্ত্র কায়েম হবে না। তার চিন্তার এই কেন্দ্রীয় বিষয়গুলো লেনিনের সাথে তার ফারাকটা গড়ে দিয়েছিল, এবং সেটা এই প্রবন্ধ থেকে শুরু করে একেবারে শেষ দিন পর্যন্ত বহাল ছিল। তৎকালে তর্কে জিত বোধহয় লেনিনেরই হয়েছিল, (যেহেতু লেনিনের নেতৃত্বে বিপ্লব হয়ে গিয়েছিল), কিন্তু বিপ্লব পরবর্তী অভিজ্ঞতা, স্ট্যালিনবাদের আবির্ভাব, সোভিয়েতের পতন ইত্যাদিসহ আজ প্রায় ১০০ বছর পর আমাদের কাছে মনে হচ্ছে রোজাই বোধহয় সঠিক আন্দাজ করতে পেরেছিলেন, বিপদ টের পেয়েছিলেন।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে সংগঠন বিষয়ক আলাপ–আলোচনা একদম অনুপস্থিত। থাকলেও সেটা অল্প। সংগঠন বিষয়ে যে সকল ধারণা প্রবলভাবে রাজনৈতিক মানসজগতে বিরাজ করছে সেখানে লেনিনের সংগঠন বিষয়ক ভাবনার একচ্ছত্র আধিপত্য। কিন্তু এই ধরনের সাংগঠনিক মডেল আজ আর কাজ করছে না। এই মুহূর্তে সংগঠন বিষয়ে আমাদের নতুন নতুন আলাপ তোলা জরুরি। এই কথা মাথায় রেখেই রোজা লুক্সেমবার্গের প্রবন্ধটির অনুবাদ করা হয়েছে।
তৎকালে এই তর্কের আরও হদিস পাওয়া যেতে পারে লেনিনের হোয়াট ইজ টু বি ডান?এবং ওয়ান স্টেপ ফরোয়ার্ড, টু স্টেপস ব্যাকশীর্ষক রচনাতে। পাশাপাশি দেখা যেতে পারে ট্রটস্কির আওয়ার পলিটিক্যাল টাস্ক।
১৯০৪ সালে এটি প্রকাশিত হয় “Organizational Questions of the Russian Social Democracy” শিরোনামে। প্রকাশিত হয় Iskraএবং Neue Zeit–এ। পরবর্তীতে Marxism vs. Leninismনামে একটি পুস্তিকা আকারেও প্রকাশিত হয়। ১৯৩৪ সালে ইন্টেজারে প্রকাশিত হয় Revolutionary Socialist Organization শিরোনামে। ১৯৩৫ সালে Leninism or Marxism?শিরোনামে আরেকটি ফেডারেশন থেকে প্রকাশিত হয়। ১৯৬১ সালে মিশিগান বিশ্ববিদ্যালয় প্রেস থেকে বার্ত্রাম উলফের ভূমিকাসহ The Russian Revolution and Leninism or Marxism?শিরোনামে প্রকাশিত হয়; ১৯৭০ সালে পাথফাইন্ডার প্রেস থেকে প্রকাশিত রোজা লুক্সেমবার্গের আরেকটা সংকলনে “Organizational Questions of Social Democracy” শিরোনামে প্রকাশিত হয়।
এখানে যে সংস্করণটি অনুবাদ করা হয়েছে তার মূল সূত্র হচ্ছে মার্ক্সিস্ট আর্কাইভ। তবে ২০০৪ সালে প্রকাশিত পিটার হুদিস এবং কেভিন বি এন্ডারসন সম্পাদিত দি রোজা লুক্সেমবার্গ রিডার–এর সংস্করণটিকেও অনুসরণ করা হয়েছে। কখনো কখনো ফুটনোটে বা বন্ধনীর ভেতর পার্থক্যসূচক মন্তব্যও জুড়ে দেয়া হয়েছে। তবে, এই দুটো সংস্করণকে পাশাপাশির রেখে আরও সম্পাদনার জরুরত রয়েছে।
রোজা লুক্সেমবার্গের এই লেখা প্রকাশিত হয়েছিল দুই অধ্যায়ে। রাষ্ট্রচিন্তা জার্নালের জন্য রোজার প্রথম অধ্যায়ের একটি খসড়া অনুবাদ করেছিলেন অনুবাদক মাজহার জীবন; কিন্তু তিনি আর কাজটা শেষ করেননি। এই অনুবাদে বিভিন্ন সময়ে তার খসড়া থেকে আমি সাহায্য নিয়েছি। তার প্রতি অন্তহীন কৃতজ্ঞতা। অনুবাদ করার সময় আরিফ রেজা মাহমুদ, সারোয়ার তুষার ও তানভীর আকন্দের কাছ থেকে বিভিন্ন সময় সহযোগিতা নিয়েছি। তাদের প্রতিও কৃতজ্ঞতা।]
মূল অনুবাদ
প্রথম অধ্যায়
সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ওপর এক নজিরবিহীন দায়িত্ব বর্তেছে। যে দেশে এখনো চরম ক্ষমতাধর রাজতন্ত্র প্রভাবশালী, সেখানে সর্বোত্তম সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কৌশলগত নীতি [পলিসি] নির্ধারণ করাই হলো এর দায়িত্ব। [১৮৭৯–৯০ সালের দিকে জার্মানিতে যখন বিসমার্কের সমাজতন্ত্র বিরোধী আইন কার্যকর ছিল] জার্মানির তৎকালীন পরিস্থিতির সাথে বর্তমান রাশিয়ার পরিস্থিতিকে একই সমান্তরালে তুলনা করাটা ভুল হবে। দুই দেশেরই সাধারণ মিল হলো—পুলিশি শাসন। আর কোনো দিক থেকেই দু’দেশের তুলনা চলে না [বিশেষত রাজনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে]।
গণতান্ত্রিক স্বাধীনতার অনুপস্থিতিতে সৃষ্ট সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রতিবন্ধকতাগুলো গুরুত্বের দিক থেকে তুলনামূলকভাবে গৌণ। এমনকি রাশিয়ায় জনগণের আন্দোলন রাষ্ট্র কর্তৃক আরওপিত বাধাগুলো অতিক্রম করে সাফল্য লাভ করেছে। রাস্তায় বিশৃঙ্খলার মধ্যে জনগণ তাদের ‘গঠনতন্ত্র’ (কনস্টিটিউশন) খুঁজে পেয়েছে (যদিও তা অনিশ্চিত)। এই অবস্থা বজায় রেখে একদিন রাশিয়ার জনগণ একনায়কতন্ত্রের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ বিজয় অর্জন করবে।
রাশিয়াতে বুর্জোয়া আধিপত্য স্বৈরতান্ত্রিক শক্তির আড়ালে কার্যকর; এই বাস্তবতাই রাশিয়ায় সমাজতান্ত্রিক কার্যকলাপ পরিচালনার প্রধান সমস্যা। এই স্বৈরতান্ত্রিক আধিপত্য শ্রেণিসংগ্রামের সমাজতান্ত্রিক মতবাদের একটি বিমূর্ত প্রোপাগান্ডামূলক চেহারা প্রদান করে, এবং তাৎক্ষণিক রাজনৈতিক অসন্তোষ বা বিক্ষোভকে একধরনের গণতান্ত্রিক–বৈপ্লবিক চেহারা প্রদান করে।
বিসমার্কের সমাজতন্ত্র বিরোধী আইনগুলো১ শ্রমিক আন্দোলনকে অতি উন্নত বুর্জোয়া সমাজে সাংবিধানিক চৌহদ্দির বাইরে নিয়ে এসেছে; যে বুর্জোয়া সমাজে শ্রেণিদ্বন্দ্ব ইতোমধ্যে সংসদীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতায় সর্বোচ্চ বিরোধাত্মক পর্যায়ে পৌঁছেছে। [এখানেই বিসমার্কের পরিকল্পনার অর্থহীনতা নিহিত]। রাশিয়ার পরিস্থিতি একেবারেই ভিন্ন। ওখানকার সমস্যা হলো কীভাবে একটা সোস্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলন গড়ে তোলা যায় যেখানে রাষ্ট্র এখনো বুর্জোয়াদের কব্জায় নেই।
এই পরিস্থিতির সাথে কেবল বিক্ষোভ এবং সমাজতান্ত্রিক মতবাদকে রুশ মাটিতে রোপনের পদ্ধতিই জড়িত নয়; বরঞ্চ এর সাথে পার্টি সংগঠনের প্রশ্নটিও বিশেষভাবে এবং সরাসরি সামনে চলে আসে।
সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনে এমনকি সংগঠনকেও [সমাজতন্ত্রের পূর্বেকার ইউটোপিয়ান পরীক্ষা–নিরীক্ষা থেকে স্বতন্ত্র] প্রোপাগান্ডা/প্রচারণার একটি কৃত্রিম ফসল হিসাবে না দেখে বরঞ্চ শ্রেণিসংগ্রামের একটি ঐতিহাসিক ফসল হিসাবে দেখা হয়ে থাকে। সাধারণ পরিস্থিতিতে, যেখানে বুর্জোয়াদের রাজনৈতিক কর্তৃত্ব [ডমিনেশন] সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের চেয়ে অগ্রগামী থাকে, সেখানে খোদ বুর্জোয়ারাই শ্রমজীবী শ্রেণির মাঝে ধীরে ধীরে রাজনৈতিক সংহতির সূত্রপাত ঘটান। কমিউনিস্ট ম্যানিফেস্টোর মতে, ‘এই পর্যায়ে শ্রমজীবীদের সংহতি তাদের নিজস্ব আকাঙ্ক্ষার ফসল নয়, বরঞ্চ এটা বুর্জোয়াদের কর্মকাণ্ডের ফলস্বরূপ।’ […যা কিনা নিজেদের রাজনৈতিক লক্ষ্যে পৌঁছানোর জন্য প্রলিতারিয়েতদের বাধ্য করে…’]
তদপুরি, রাশিয়াতে সোশ্যাল ডেমক্রেসিকে নিজের প্রচেষ্টাতেই একটি সম্পূর্ণ ঐতিহাসিক কালপর্ব মেরামত করতে হবে। রুশ প্রলেতারিয়েতদের বর্তমান যে ‘বিক্ষিপ্ত’ [atomized] অবস্থা স্বৈরতান্ত্রিক জমানাকে দীর্ঘায়িত করছে সে অবস্থা থেকে তাদেরকে শ্রেণি সংগঠনে রূপান্তরিত করতে হবে। এটা তাদেরকে তাদের ঐতিহাসিক উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন করে তুলবে এবং সেই উদ্দেশ্য হাসিল করতে সংগ্রামের জন্য প্রস্তুত করে তুলবে।
একটি বুর্জোয়া–গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় সাধারণত যে ধরনের সুযোগ–সুবিধার নিশ্চিয়তা থাকে সেগুলো ছাড়াই রুশ সমাজতন্ত্রীদের এমন একটি সংগঠন নির্মাণের ভার গ্রহণ করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। অন্যান্য দেশের বুর্জোয়া সমাজ যে রাজনৈতিক রসদ যোগায় তা সেখানে থাকবে না। এভাবে বলা যায় যে, সর্বশক্তিমান ইশ্বরের মতো তাদেরকেও শূন্য থেকে এধরনের সংগঠন গড়ে তুলতে হবে।
সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের প্রস্তুতিমূলক পর্যায়ে সংগঠনগুলোর বৈশিষ্ট্য হচ্ছে এগুলো সাধারণত বিচ্ছিন্ন স্থানীয় গোষ্ঠী/দল ও ক্লাব, এবং এদের প্রধান কর্মসূচি হচ্ছে প্রচারণা/প্রপাগান্ডা। প্রস্তুতি পর্যায়ের এই ধরনের সংগঠনগুলোকে কীভাবে এমন একটি বৃহৎ অখণ্ড জাতীয় কাঠামোতে রূপান্তর করা যায় যেগুলো কিনা রাশিয়া রাষ্ট্র শাসিত বিশাল অঞ্চলজুড়ে সমন্বিত রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনার জন্য উপযুক্ত? এটাই হলো রাশিয়ার সোস্যাল ডেমোক্রোসির সুনির্দিষ্ট সমস্যা যা বেশ কিছুকাল ধরে আলোচিত হচ্ছে।
পুরনো সংগঠন সক্রান্ত ধারণার সর্বাধিক লক্ষণীয় বৈশিষ্ট্য হচ্ছে স্বায়ত্তশাসন [অটোনমি] এবং বিচ্ছিন্নতা [আইসোলেশন]। সুতরাং এটা বোধগম্য যে, যিনি একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় সংগঠন দেখতে চান তাঁর শ্লোগান কেন হয়ে যাচ্ছে ‘কেন্দ্রিকতাবাদ’ [সেন্ট্রালিজম’]। গত পার্টি কংগ্রেসের প্রস্তুতির জন্য ইস্ক্রা২ যে দারুণ প্রচারাভিযান চালিয়েছে সেখানে কেন্দ্রিকতা ধারণার প্রতি সম্মতি বারংবার প্রকাশিত হয়েছে; এই ধারণা রাশিয়ার সোশ্যাল ডেমোক্রেটের পুরো তরুণ প্রজন্মকে আচ্ছন্ন করে রেখেছে। পার্টি কংগ্রেসে৩ এটা স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, ‘কেন্দ্রিকতাবাদ’ প্রত্যয়টি রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য সংগঠন প্রশ্নকে পুরোপুরি আলাপে আনতে পারেনি। আমরা আবারও বুঝতে পারলাম যে, সামাজিক আন্দোলনে কোনো বাঁধাধরা নকশা [ফর্মূলা] যে কোনো সমস্যার সমাধান দিতে পারে না।
ইস্ক্রা গ্রুপের অন্যতম সদস্য কমরেড লেনিন রচিত এক কদম আগে, দুই কদম পিছে৪ শীর্ষক গ্রন্থটি রাশিয়ার আন্দোলনের “অতি–কেন্দ্রীকতাবাদীদের” ধারণাগুলোর পদ্ধতিগত বর্ণনা। এই গ্রন্থে অতুলনীয় বলিষ্ঠ ও যুক্তি সহকারে নির্মম কেন্দ্রিকতাবাদের দৃষ্টিভঙ্গিকেই ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মূলনীতিগুলো হলো: ১) সকল সক্রিয় বিপ্লবীদের নিয়ে একটি আলাদা বাহিনী বাছাই ও গঠন করার জরুরত; এই অভিজাতদের [এলিট] চারপাশে থাকা অসংগঠিত কিন্তু বৈপ্লবিক সাধারণ জনগণ থেকে তারা আলাদা হবেন। ২) পার্টির সকল স্থানীয় কমিটিকে মনোনিত করার সুযোগ–সুবিধা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে থাকবে; সকল স্থানীয় কমিটির কার্যকর পদে নিয়োগ দেয়ার এখতিয়ার কেন্দ্রীয় কমিটির থাকবে; পার্টি পরিচালনার তৈয়ারি নিয়মকানুন সবার ওপর চাপিয়ে দেয়ার এখতিয়ারও কেন্দ্রীয় কমিটির হাতে থাকবে; এমনকি, স্থানীয় কমিটিগুলোর বিলুপ্তকরণ ও পুনর্গঠনের প্রশ্নে কোনো ধরনের আর্জির সুযোগ ছাড়াই কেন্দ্রীয় কমিটির কর্তৃত্ব থাকতে হবে। এভাবে কেন্দ্রীয় কমিটি তার প্রয়োজন অনুসারে পার্টির সর্বোচ্চ পর্যায়ে স্তর বিন্যাসে ভূমিকা রাখতে পারে। পার্টির মধ্যে কেন্দ্রীয় কমিটিই হবে একমাত্র চিন্তাশীল অংশ। বাকি সকল গ্রুপ হবে এর কার্যনিবাহী অঙ্গপ্রত্যঙ্গ।
লেনিনের যুক্তি হচ্ছে যে, এমন কেন্দ্রীভূত ধরনের সংগঠনের সাথে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক গণআন্দোলনের সংমিশ্রণই বিপ্লবী মার্ক্সবাদের একটি নির্দিষ্ট নীতি। এই থিসিসের সমর্থনে তিনি একাধিক যুক্তি উপস্থাপন করেন। এই ব্যাপারটা আরও একটু গভীরভাবে দেখা যাক।
কোনো সন্দেহ নেই যে, সামগ্রিকভাবে কেন্দ্রিকতাবাদের দিকে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির একটি জোরালো ঝোঁক বা প্রবণতা রয়েছে। সোশ্যাল ডেমোক্রেসি যেহেতু তার এই ঝোঁকগুলো [কেন্দ্রিকতাবাদের ঝোঁক] সহ পুঁজিবাদের অর্থনৈতিক জমিনে বেড়ে ওঠে এবং বৃহৎ কেন্দ্রীভূত বুর্জোয়া রাষ্ট্রের রাজনৈতিক কাঠামোর [ফ্রেমওয়ার্ক] ওপর তার সংগ্রাম ভর করে, সেহেতু সোশ্যাল ডেমোক্রেসি অন্তর্নিহিতভাবে সকল ধরনের স্থানিকতা বা জাতীয় ফেডারেলিজমের বিরুদ্ধে অবস্থান করে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে জাতীয় রাষ্ট্রের সীমানার মধ্যে প্রলেতারিয়েতের শ্রেণিস্বার্থের প্রতিনিধিত্ব করা এবং সকল স্থানীয় ও গোষ্ঠী স্বার্থের সাধারণ স্বার্থগুলোর বিরোধিতা করা। এটি সকল শ্রমিক ও শ্রমিক সংগঠনকে একটি একক দলে ঐক্যবদ্ধ করার চেষ্টা করে, তা তাদের মধ্যে যতই জাতিগত, ধর্মগত বা পেশাগত ভিন্নতা থাকুক। অস্ট্রিয়ার মতো কিছু বিশেষ ও অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে এই নীতির ব্যতিক্রম ঘটেছে।৫
এটা পরিষ্কার যে, রুশ সোশাল ডেমোক্রেসি নিজেকে অনেকগুলো জাতীয় গ্রুপ/দলের একত্রীভূত ফেডারেটিভ হিসাবে সংগঠিত করা উচিৎ নয়। বরঞ্চ তাকে পুরো সাম্রাজ্যের জন্য একটি একক পার্টি হয়ে উঠতে হবে। তদপুরি, এখানে বিবেচনাধীন প্রশ্ন এটি নয়। আমরা এখানে যা জিজ্ঞেস করছি তা হচ্ছে, এই বিশেষ পরিস্থিতিতে একীভূত ও একক রুশ পার্টির অভ্যন্তরে কেন্দ্রীয়করণের মাত্রা কদ্দূর পর্যন্ত জরুরি।
সোশ্যাল ডেমোক্রেসির যথাযথ কার্যক্রমের আঙ্গিক থেকে শ্রেণি সংগ্রামের একটি দল হিসাবে এর সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিলে প্রথমেই প্রতীয়মান হয় যে, পার্টির ক্ষমতা ও শক্তি সরাসরি পার্টির কেন্দ্রীকরণের সম্ভাবনার ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ক্ষেত্রে ঐতিহাসিক পরিস্থিতিসমূহের প্রভাবের তুলনায় এগুলো কম গুরুত্বপূর্ণ। শ্রেণি সমাজের ইতিহাসে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনই প্রথম যা প্রত্যেক পর্যায়ে এবং সকল ক্ষেত্রে জনগণের সংগঠন এবং প্রত্যক্ষ ও স্বাধীন কার্যকলাপকে বিবেচনায় নেয়।
এই কারণেই সোশাল ডেমোক্রেসি এমন এক ধরনের সংগঠন তৈরি করে যা পূর্বতন বৈপ্লবিক আন্দোলনের সাধারণ সংগঠনের (যেমন জেকোবিন ও ব্লাঙ্কুইদের অনুসারী) চেয়ে পৃথক।
লেনিন বোধহয় এই বাস্তবতাকে অবজ্ঞা করতে চেয়েছেন যখন তিনি তার বইয়ে মন্তব্য করেন যে, বৈপ্লবিক সোশ্যাল ডেমোক্রেট ‘শ্রেণি সচেতন প্রলেতারিয়েতদের সংগঠনের সাথে যুক্ত একজন জেকোবিন’–এর চাইতে বেশি কিছু নয়। লেনিনের কাছে সোশাল ডেমোক্রেসি এবং ব্লাঙ্কুইজিমের৬ পার্থক্য এই জায়গায় নেমে এসেছে যে, মুষ্টিমেয় ষড়যন্ত্রকারীর পরিবর্তে আমরা শ্রেণি–সচেতন প্রলেতেরিয়াত পেয়েছি। তিনি ভুলে যান যে, এই পার্থক্য সংগঠন প্রশ্নে আমাদের ধারণাগুলোর সম্যক পুনঃপাঠের ইশারা দিচ্ছে; কেন্দ্রিকতাবাদ নিয়ে একেবারে নতুন ধরনের ধারণার ইশারা দিচ্ছে; এবং পার্টি ও সংগ্রামের মধ্যকার বিদ্যমান সম্পর্ক বিষয়ে একেবারে ভিন্ন ধারণার ইশারা দিচ্ছে।
ব্লাঙ্কুইজম শ্রমিক শ্রেণির প্রত্যক্ষ সংগ্রাম বা অংশগ্রহণকে আমলে নেয় না। ফলে বিপ্লবের জন্য তাকে জনগণকে সংগঠিত করতে হয় না। বিপ্লবের মূহূর্তেই কেবল জনগণ তাদের ভূমিকা পালন করবে বলে ধরে নেয়া হয়। বিপ্লবের প্রস্তুতির ভার কেবল ছোট একটি সশস্ত্র বিপ্লবী দলের, যারা ক্যু করবে। বস্তুত বৈপ্লবিক ষড়যন্ত্র সফল করার জন্য ধরে নেয়া হয়েছিল যে ষড়যন্ত্রকারীদের থেকে জনগণকে দূরে রাখাই শ্রেয়। এমন সম্পর্ক কেবল ব্লাংকুইবাদীরাই গ্রহণ করতে পারতেন, কেননা তাদের সংগঠনের ষড়যন্ত্রমূলক তৎপরতার সাথে জনগণের নিত্যদিনের সংগ্রামের কোনো ঘনিষ্ঠ সংযোগ নেই।
ব্লাংকুইস্ট বিপ্লবীদের কৌশল ও তৎপরতার সাথে প্রাথমিক শ্রেণি সংগ্রামের সংযোগ খুব কমই ছিল। তারা মুক্তভাবে কোনো প্রস্তুতি ছাড়াই কাজ করতে পারতেন। ফলে তারা আগ থেকেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে একটি রেডিমেড পরিকল্পনার রূপ নিতে পারেন। এর ফলে, সংগঠনের সাধারণ সদস্যরা কেবল সাধারণ কার্যনিবাহী অঙ্গে পরিণত হন; তাদের কর্মকাণ্ডের পরিসরের বাইরে পূর্ব নির্ধারিত ইচ্ছা/সিদ্ধান্তের আদেশ পালন করাই হয়ে উঠে তাদের কাজ। তারা কেন্দ্রীয় কমিটির হাতিয়ারে পরিণত হন। এখানে আমরা ষড়যন্ত্রমূলক কেন্দ্রিকতাবাদের দ্বিতীয় বিশেষত্ব খুঁজে পাই: কেন্দ্রের ইচ্ছার কাছে পার্টির বিভিন্ন অংশের চরম ও অন্ধ সমর্পণ, এবং সংগঠনের সকল অংশে এই কর্তৃত্বের সম্প্রসারণ।
কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কার্যক্রম সম্পূর্ণভাবে [র্যাডিক্যালি] আলাদা পরিস্থিতিতে পরিচালিত হয়। ঐতিহাসিকভাবে এর উত্থান ঘটে প্রাথমিক শ্রেণি সংগ্রাম থেকে। এর বিস্তার ও বিকাশ ঘটেছে নিম্নোক্ত দ্বান্দ্বিক বিরোধের সাথে সামঞ্জস্য বজায় রেখে। অর্থাৎ, খোদ এই সংগ্রামের মধ্যেই প্রলেতারিয়েত বাহিনী নিজেকে নিযুক্ত করেছে [রিক্রুট], এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়েই তারা সংগ্রামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে সচেতন হয়ে উঠেছে। পার্টি গঠনের কার্যক্রম, সংগ্রামের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য সম্পর্কে প্রলেতারিয়েতদের সচেতনতা এবং খোদ সংগ্রাম, কোনোটাই কালানুক্রমিক ও যান্ত্রিকভাবে আলাদা আলাদা বিষয় নয়। এগুলো হলো একই সংগ্রামের ভিন্ন ভিন্ন দিক। সোশ্যাল ডেমোক্রেসির এমন কোনো একগুচ্ছ কৌশল নেই যা কিনা প্রশিক্ষণ শিবিরের সৈনিকদের শেখানোর মতো করে কেন্দ্রীয় কমিটি পার্টির সদস্যদের শেখাবে। বরঞ্চ, যে সংগ্রামের প্রক্রিয়া সংগঠন তৈয়ার করেছে সেটাই সোশ্যাল ডেমোক্রেসির প্রভাবের পরিসরে একটি ক্রমাগত ওঠানামার প্রয়োজনীয় শর্ত তুলে ধরে।
এই কারণে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতা পার্টির কেন্দ্রের প্রতি সদস্যদের যান্ত্রিক অধীনতা ও অন্ধ আনুগত্যের ওপর ভর করে হতে পারে না। এই কারণে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলন ইতোমধ্যে পার্টিতে থাকা প্রলেতারিয়েতের শ্রেণি সচেতন নিউক্লিয়াস এবং প্রলেতারিয়েতের পার্টিবিহীন অংশের মধ্যে কোনো বদ্ধ দেয়াল তৈরি অনুমোদন করে না।
এখন লেনিনের কেন্দ্রিকতা যে দুটো নীতির ওপর নির্ভর করে আছে তা হলো:
১) পার্টির কেন্দ্রের কাছে পার্টির সকল অংশের অন্ধ আনুগত্য; কেবল কেন্দ্রই সকলের জন্য চিন্তা করবে, নির্দেশনা দিবে, এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবে।
২) সামাজিক–বৈপ্লবিক প্রতিবেশ থেকে বিপ্লবীদের সংগঠিত নিউক্লিয়াসের কঠোর পৃথকীকরণ।
এ ধরনের কেন্দ্রিকতাবাদ হচ্ছে সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক শ্রেণির গণআন্দোলনের ওপর ব্লাঙ্কুইজমের সাংগঠনিক নীতিমালার একটি যান্ত্রিক প্রয়োগ।
এই মতের সাথে সামঞ্জস্য রেখে লেনিন তার ‘বৈপ্লবিক সোশ্যাল ডেমোক্রেট’কে সজ্ঞায়ন করেছেন ‘শ্রেণিস্বার্থ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠা প্রলেতারিয়েতদের সংগঠনের যুক্ত একজন জেকোবিন’ হিসাবে। প্রকৃতপক্ষে, সোশ্যাল ডেমোক্রেসি প্রলেতারিয়েতের সংগঠনে সাথে যুক্ত নয়। এটা নিজেই প্রলেতারিয়েত; এটা শ্রমিক শ্রেণির নিজেদের আন্দোলন। এই কারণেই সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতাবাদ মূলত ব্লাংকুইস্ট কেন্দ্রিকতাবাদ থেকে আলাদা। এটা কেবল মাত্র শ্রমিক শ্রেণির ব্যক্তি ও গোষ্ঠী প্রতিনিধিদের পুঞ্জীভূত বা সম্মিলিত ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ হতে পারে। বলা যেতে পারে, এটা প্রলেতারিয়েতের অগ্রসর অংশের [বা নেতৃত্বস্থানীয় স্তরের] ‘স্ব–কেন্দ্রিকতাবাদ’। এটা হলো নিজ পার্টির মধ্যে সংখ্যাগরিষ্ঠের শাসন।
সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতাকে বাস্তবে পরিণত করার অপরিহার্য শর্তগুলো হচ্ছে:
১) শ্রেণি সংগ্রামে শিক্ষিত এক বিরাট বা তাৎপর্যপূর্ণ অংশের শ্রমিকের উপস্থিতি
২) জনজীবন, পার্টি প্রেস, জনসমাবেশ ইত্যাদিতে প্রত্যক্ষ প্রভাবের মাধ্যমে নিজেদের রাজনৈতিক তৎপরতা বিকাশে শ্রমিকদের সম্ভাবনা।
এই শর্তগুলো রাশিয়াতে এখনো পুরোপুরি গঠিত হয়নি। প্রথমটি, অর্থাৎ শ্রেণিস্বার্থ সচেতন এবং রাজনৈতিক তৎপরতা পরিচালনায় সক্ষম একটি প্রলেতারিয়েত ভ্যানগার্ড, এখনো রাশিয়াতে কেবলমাত্র হাজির হওয়া শুরু হয়েছে। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগঠনের সকল প্রচেষ্ঠা এমন ভ্যানগার্ড গঠনকে ত্বরান্বিত করা উচিৎ। দ্বিতীয় শর্তটি কেবলমাত্র রাজনৈতিক স্বাধীনতার পরিস্থিতিতে বাস্তবে পরিণত হতে পারে।
এই সিদ্ধান্তগুলোর সাথে লেনিন চরমভাবে দ্বিমত পোষণ করেন। তিনি নিশ্চিত যে, একটি শক্তিশালী এবং কেন্দ্রিভূত পার্টি গঠনের সকল প্রয়োজনীয় শর্তাবলী ইতোমধ্যে রাশিয়াতে বিদ্যমান। তিনি ঘোষণা দেন যে, ‘প্রলেতারিয়েতদের নয়, বরঞ্চ সংগঠন ও শৃঙ্খলার বিষয়ে আমাদের পার্টির কিছু বুদ্ধিজীবীদের শিক্ষিত করে তুলতে হবে’। তিনি কারখানার শিক্ষামূলক প্রভাবকে মহিমান্বিত করেন, যা তার ভাষায়, প্রলেতারিয়েতদেরকে ‘শৃঙ্খলা ও সংগঠনে’ অভ্যস্ত করে তুলবে। এতকিছু বলার পর লেনিন আবারও প্রমাণ করেন যে, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠন সম্পর্কে তার ধারণা যথেষ্ট যান্ত্রিক। লেনিনের চিন্তায় যে ‘শৃঙ্খলা’ [ডিসিপ্লিন] রয়েছে তা কেবল কারখানার মাধ্যমেই শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে রোপণ করেন না, বরঞ্চ সামরিক ও বিদ্যমান রাষ্ট্রীয় বা [আধুনিক] আমলাতন্ত্রের মাধ্যমেও সেটা করেন। অর্থাৎ, কেন্দ্রীভূত বুর্জোয়া রাষ্ট্রের সকল কলকব্জা [মেকানিজম] দিয়ে এটা করা হয়।
আমরা শব্দের অপব্যবহার করি এবং আত্ম–প্রবঞ্চনা চর্চা করি যখন একই শব্দ—যেমন শৃঙ্খলা [ডিসিপ্লিন]—নিম্নোক্ত বিপরীতমুখী ধারণাতে প্রয়োগ করি: ১) সয়ংক্রিয়ভাবে চলমান হাজারো হাত পা যুক্ত শরীরে চিন্তা ও ইচ্ছার অনুপস্থিতি, এবং ২) একদল মানুষের সচেতন রাজনৈতিক তৎপরতার স্বতঃস্ফূর্ত সমন্বয়। একটি নিপীড়িত শ্রেণির অন্ধ আনুগত্য এবং নিজের মুক্তির জন্য সংগ্রামরত একটি শ্রেণির সংগঠিত বিদ্রোহের মধ্যে কোন সাধারণ বৈশিষ্ট্যটি পরিলক্ষিত হয়?
সোশ্যাল ডেমোক্রেসির স্ব–শৃঙ্খলা মানে বুর্জোয়া শাসকদের কর্তৃত্বকে একটি সমাজতান্ত্রিক কেন্দ্রীয় কমিটির কর্তৃত্ব দ্বারা নিছক প্রতিস্থাপন করা নয়। শ্রমিক শ্রেণি নতুন শৃঙ্খলার ধারণা অর্জন করবে, মুক্তভাবে সোশ্যাল ডেমোক্রেসির স্ব–শৃঙ্খলাকে গ্রহণ করবে; পুঁজিবাদী রাষ্ট্র কর্তৃক আরওপিত শৃঙ্খলার ফসল হিসেবে নয়, বরঞ্চ আনুগত্য ও দাসত্বের পুরোনো অভ্যাসের শেষ শেকড় পর্যন্ত উৎপাটন করার মাধ্যমে এটা করবে।
সমাজতান্ত্রিক [সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক–রিডার] ধারণায় কেন্দ্রিকতাবাদ শ্রমিক আন্দোলনের যে কোনো পর্যায়ে প্রয়োগযোগ্য এমন কোনো চূড়ান্ত বিষয় নয়। বরঞ্চ এটা একটা প্রবণতা, যা শ্রমজীবীদের সংগ্রামের ধারাবাহিকতায় অর্জিত বিকাশ ও রাজনৈতিক শিক্ষার আলোকে মূর্ত হয়ে ওঠে। সন্দেহ নেই, রুশ আন্দোলনে এই ধরনের কেন্দ্রিকতাকে সম্পূর্ণরূপে মূর্ত করে তুলতে প্রয়োজনীয় শর্তাবলীর অনুপস্থিতিই একটি দুরূহ বাধা হাজির করেছে।
এটা ভাবা ভুল হবে যে, যেখানে এখনো পার্টিতে সচেতন শ্রমিকদের সংখ্যাগরিষ্ঠতার শাসন প্রতিষ্ঠিত হয়নি সেখানে সে শাসনকে একটা কেন্দ্রীয় কমিটির চূড়ান্ত ক্ষমতা দিয়ে ‘সাময়িকভাবে’ প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে এবং এভাবেই পার্টি বা সংগঠনের ওপর শ্রমজীবী জনগণের উন্মুক্ত নিয়ন্ত্রণের বিপরীতে বৈপ্লবিক প্রলেতারিয়েতের ওপর কেন্দ্রীয় কমিটির নিয়ন্ত্রণ প্রতিস্থাপন করা যেতে পারে।
রুশ শ্রমিক আন্দোলনের ইতিহাস এমন ধরনের কেন্দ্রিকতার মূল্য সম্পর্কে বিবিধ সন্দেহের জন্ম দেয়। নিয়ন্ত্রণ ও হস্তক্ষেপের সীমাহীন অধিকারসহ সর্বক্ষমতাময় কেন্দ্র (অল–পাওয়ারফুল সেন্টার), যেমনটা লেনিন হয়তোবা চাইবেন, তা অর্থহীনতায় পর্যবসিত হবে যদি এই কর্তৃত্ব কেবল প্রযুক্তিগত বা টেকনিক্যাল প্রশ্নে প্রয়োগ করা হয়, যেমন তহবিল পরিচালনা, প্রচারকারী [প্রপাগান্ডিস্ট] ও বিক্ষোভকারীদের কাজের দায়িত্ব বণ্টন, পার্টি পুস্তিকা বহন ও প্রচার। কেবলমাত্র যদি এই ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সংগ্রামের কৌশল অবলম্বন এবং রাশিয়াতে একটি বিরাট বৈপ্লবিক পদক্ষেপ শুরু করা হয় তবেই এর একটি বোধগম্য রাজনৈতিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে।
কিন্তু এখন পর্যন্ত রুশ আন্দোলন যে পরিবর্তনগুলোর মধ্য দিয়ে গিয়েছে তার অভিজ্ঞতা কী? গত দশকের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ও ফলপ্রসূ পরিবর্তনগুলো আন্দোলনকারী কোনো নেতার ‘আবিষ্কার’ নয়, এমনকি নেতৃত্বস্থানীয় সংগঠনগুলোরও ফসল নয়, বরঞ্চ প্রতিটি ক্ষেত্রেই এটা ছিল আন্দোলনের সক্রিয়তার স্বতঃস্ফূর্ত ফসল। এটা সত্য ছিল রাশিয়ার প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের প্রথম পর্যায়ের জন্য; এটা শুরু হয়েছিল ১৮৯৬ সালের সেন্ট পিটার্সবার্গে স্বতঃস্ফূর্ত সাধারণ ধর্মঘটের মাধ্যমে। এই ঘটনাটি ছিল রাশিয়ার শ্রমজীবী মানুষের অর্থনৈতিক সংগ্রামের নবযুগের সূচনা। পরবর্তী সময়েও এটা কম সত্য ছিল না, ১৯০১ সালের মার্চে সেন্ট পিটার্সবার্গের শিক্ষার্থীরা যখন স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাস্তার আন্দোলনে নেমে আসে। ১৯০৩ সালের রোস্তভ অন ডনের সাধারণ ধর্মঘট ছিল রুশ প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের পরবর্তী বিশাল কৌশলগত মোড়, এটা ছিল স্বতঃস্ফূর্ত তৎপরতা। ‘অল বাই ইটসেলফ’, মানে নিজে নিজেই ধর্মঘট পরিণত হয় রাজনৈতিক সমাবেশে, রাস্তার বিক্ষোভে, বিশাল বিশাল সভা, যা কিনা কয়েকবছর পূর্বেই সবচেয়ে আশাবাদী বিপ্লবীও কল্পনা করতে পারেননি।
প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘পহেলা ছিল কর্ম’; অর্থাৎ এই ঘটনাগুলো থেকে আমাদের কাজের যৌক্তিকতা আরও শক্ত ভিত্তি পেয়েছে। সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগ ও সচেতন নেতৃত্ব এই বিকাশে খুবই নগণ্য ভূমিকা পালন করেছে। এটা সত্য যে এই সংগঠনগুলোকে এমন ঘটনা প্রবাহের জন্য বিশেষভাবে প্রস্তুত ছিল না। তবু বিপ্লবীদের এই অগুরুত্বপূর্ণ ভূমিকাকে এই ফ্যাক্ট দিয়ে বিশ্লেষণ করা যাবে না। লেনিন যে সর্বক্ষমতাময় কেন্দ্রীয় পার্টির হাতিয়ারের কথা বলেছিলেন তার অনুপস্থিতি দিয়েও এটা ব্যাখ্যা করা যাবে না। এমন একটি কেন্দ্রীয় কর্তৃত্বের অস্তিত্ব সম্ভবত স্থানীয় কমিটিগুলোতে বিশৃঙ্খলা বা সিদ্ধান্তহীনতা বৃদ্ধি করতো; উত্তেজিত জনগণ এবং সোশ্যাল ডেমোক্রেসির বিচক্ষণ অবস্থানের মধ্যে ফাটল ধরানোর মাধ্যমে এটা করা হতো। একই প্রপঞ্চ, মানে কৌশল নির্ধারণে কেন্দ্রীয় কমিটির সচেতন উদ্যোগের গৌণ ভূমিকা, বর্তমানে জার্মানি ও অন্যান্য দেশে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে। সাধারণত, সোশ্যাল ডেমোক্রেসির কৌশলগত নীতি এমন কিছু নয় যা আসলে ‘উদ্ভাবিত’ [ইনভেন্টেড] হতে পারে। বরঞ্চ বিভিন্ন পরীক্ষামূলক, এবং প্রায়শই স্বতঃস্ফূর্ত, শ্রেণি সংগ্রামের দুর্দান্ত সব সৃজনশীল কর্মতৎপরতার ধাবাহিকতার ফসল।
এখানেও চেতনের পূর্বে আসে অচেতন। ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণকারী মানবজাতির [বা, প্রক্রিয়ার এজেন্টদের] বিষয়ীগত যুক্তির পূর্বে আসে ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার [অবজেক্টিভ বা বিষয়গত] যুক্তি। এইসমস্ত ক্ষেত্রে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক নেতৃত্বের ভূমিকা রক্ষণশীল চরিত্রের হয়ে থাকে, কারণ অভিজ্ঞতা দেখিয়েছে যে, যখন তারা লড়াইয়ের জন্য নতুন জমিন জিতে নেয় তখন তারা এটার ওপর পুঙ্খানুপুঙ্খ পরীক্ষা–নিরীক্ষা শুরু করে, এবং আরও বেশি মাত্রার অধিকতর উদ্ভাবনের বিপরীতে এটাকে শীঘ্রই কেল্লা বা দুর্গে পরিণত করে।
জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসির বর্তমান কৌশল তাদের অসাধারণ বৈচিত্র্য, নমনীয়তা [ফ্লেক্সিবিলিটি], এবং একইসাথে দৃঢ়তার কারণে সবার কাছ থেকে প্রশংসা কুড়িয়েছে। এটি পার্লামেন্টারি ব্যবস্থার [রেজিম] আওতায় প্রতিদিনের ক্ষুদ্রতম বিষয়গুলোও বিবেচনায় নিয়ে পার্টির খাপ খাওয়ানোর [এডাপটেশন] একটি চমৎকার আলামত। পার্টি তার আয়ত্বে থাকা সকল জিনিসপত্রের একটি পদ্ধতিগত অধ্যয়ন করেছে; সে জানে তার নীতিগুলো পরিবর্তন না করেও কীভাবে সেগুলোকে কাজে লাগাতে হয়।
তদপুরি, এই বিশেষ কৌশল, মানে এই এই নিখুঁত অভিযোজন, আমাদের পার্টির বিস্তীর্ণ দিগন্তকে এতই কার্যকরভাবে রুদ্ধ করে দিচ্ছে যে, পার্লামেন্টারি কৌশলকে চিরস্থায়ী করার প্রবণতা পরিলক্ষিত হচ্ছে এবং এটাকে সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লড়াইয়ের জন্য নির্দিষ্ট কৌশল হিসাবে বিবেচনা করা হচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, যদি জার্মানিতে সাধারণ ভোটাধিকার বিলুপ্ত হয় তখন কৌশলগত নীতি পরিবর্তনের সম্ভাবনা (পারভাস৭ দ্বারা উত্থাপিত) বিবেচনা করতে লোকেরা অস্বীকার করেছিল; যদিও এমন একটি সম্ভাব্য ঘটনাকে [মানে ভোটাধিকারের বিলুপ্তি] জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসি একেবারে অবাস্তব মনে করেনি।
মোটাদাগে এই ধরনের জড়তার কারণ হচ্ছে যে, বিমূর্ত হাইপোথিসিস সমূহের শূন্যতার মধ্যে, অস্তিত্বহীন রাজনৈতিক পরিস্থিতির লাইন ও রূপগুলোকে সংজ্ঞায়ন করা খুবই ঝামেলাপূর্ণ। স্পষ্টত ভবিষ্যত কৌশলের জন্য রেডি–মেড পরিকল্পনা প্রস্তুত করা এবং আন্দাজ করাটা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে: ১) প্রদত্ত পরিস্থিতির সাথে মিল রেখে সংগ্রামের রুপগুলোর সঠিক ঐতিহাসিক মূল্যায়নে উৎসাহিত করা, এবং ২) বর্তমান পর্যায়ের আপেক্ষিকতা এবং শ্রেণি সংগ্রামের চূড়ান্ত লক্ষ্যের অবস্থান থেকে বৈপ্লবিক উত্তেজনার অনিবার্য বৃদ্ধি সম্পর্কে বোঝাপড়া অব্যাহত রাখা।
লেনিনের চাওয়া মতে পার্টির শীর্ষে নেতিবাচক চরিত্রের এমন নিরঙ্কুশ ক্ষমতা দেয়া হলে আমরা এমন অঙ্গের অন্তর্নিহিত রক্ষণশীলতাকে একটা বিপজ্জনক পরিমাণে শক্তিশালী করে তুলবো। সমাজতান্ত্রিক পার্টির কৌশল যদি একটি কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন না হয়ে উল্টো পুরো পার্টি গঠন বা আরও ভালো হবে যদি পুরো শ্রমিক আন্দোলন গড়ে তোলা হয়, তাহলে এটা স্পষ্ট যে পার্টির বিভিন্ন অংশ [সেকশন] ও ফেডারেশনের কর্মের স্বাধীনতার জরুরত রয়েছে। এই স্বাধীনতা তাদেরকে বৈপ্লবিক উদ্যোগ গড়ে তোলার এবং পরিস্থিতি সকল উপাদানকে ব্যবহার করার অনুমতি দিবে। লেনিন কর্তৃক প্রস্তাবিত অতি–কেন্দ্রিকতা একজন প্রহরীর নিষ্ফলা চেতনায় ভরপুর। এটা কোনো ইতিবাচক এবং সৃজনশীল চেতনা নয়। পার্টির কর্মকাণ্ডকে আরও ফলপ্রসূ করার চাইতে লেনিনের তাগিদ হচ্ছে পার্টিকে নিয়ন্ত্রণ করা—আন্দোলনকে বিকশিত করার পরিবর্তে আরও সঙ্কুচিত করা ফেলা, সমন্বয় করার পরিবর্তে বেঁধে ফেলা।
বর্তমান পরিস্থিতিতে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য এই ধরনের পরীক্ষা নিরীক্ষা দ্বিগুণ বিপজ্জনক হবে। জারের শাসনের বিরুদ্ধে যুদ্ধের চূড়ান্ত প্রান্তে এটি দাঁড়িয়ে আছে। এখন এটি তীব্র সৃজনশীল কর্মকাণ্ডের কালে প্রবেশের সময় এসেছে, অথবা ইতোমধ্যে প্রবেশ করেই ফেলেছে; যখন কিনা এটি তার প্রভাবের পরিধিকে বিস্তৃত করে তুলবে [বৈপ্লবিক সময়ে যেমন সাধারণত হয়ে থাকে] এবং জোরেশোরে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সামনে এগিয়ে যাবে। এই মুহূর্তে পার্টির উদ্যোগকে বেঁধে রাখার চেষ্টা, কাঁটাতার দিয়ে চতুর্দিক থেকে ঘিরে রাখার মানেই হচ্ছে এই মুহূর্তের যে অভাবনীয় দায়িত্ব বর্তেছে সেটা পালনে অক্ষম হয়ে পড়া।
সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রিকতার প্রশ্নে আমরা যে সাধারণ ধারণা হাজির করেছি সেগুলো রুশ পার্টির জন্য মানানসই গঠনতান্ত্রিক [কনস্টিটিউশনাল] পরিকল্পনা প্রণয়নের জন্য পর্যাপ্ত নয়। চূড়ান্ত মুহূর্তে, এই ধরণের বিধিবিধান নির্ধারণ করা যেতে পারে কেবল সেই বাস্তবতায়, যার অধীনে একটি প্রদত্ত যুগে সংগঠনের কার্যকলাপ সংঘটিত হচ্ছে। রাশিয়ায় এই মুহূর্তের প্রশ্ন হচ্ছে কীভাবে একটি বৃহৎ প্রলেতারিয়েত সংগঠন চালু করা যায়। কোনো গঠনতান্ত্রিক প্রকল্পই অভ্রান্ততা দাবি করতে পারে না। অগ্নিপরীক্ষার মাধ্যমেই নিজেকে প্রমাণ করতে হয়।
কিন্তু সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক সংগঠনের প্রকৃতি সম্পর্কে আমাদের সাধারণ ধারণা থেকে আমরা মনে করি, এর স্পিরিটের জন্য প্রয়োজন, বিশেষ করে গণপার্টির শুরুতেই, আন্দোলনের সমন্বয় ও একত্রীকরণ; একগুচ্ছ নিয়মকানুনের কাছে অন্ধ আনুগত্য নয়। যদি পার্টি রাজনৈতিক গতিশীলতার গুণ ধারণ করতে পারে, পাশাপাশি নীতির প্রতি অটল থাকে এবং ঐক্য নিয়ে ভাবনা থাকে তাহলে আমরা নিশ্চিত হতে পারি যে, পার্টির গঠনতন্ত্রে যে কোনো ধরনের ত্রুটি চর্চার মাধ্যমে সংশোধিত হয়ে যাবে। আমাদের জন্য এক টুকরো দলিল নয়, বরঞ্চ সদস্যরা সংগঠনের ভেতর যে জীবন্ত চেতনা নিয়ে আসেন সেটাই সাংগঠনিক বিভিন্ন রূপের মূল্য নির্ধারণ করে দেয়।
দ্বিতীয় অধ্যায়
এতক্ষণ আমরা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাধারণ দৃষ্টিকোণ এবং কিছুটা হলেও রাশিয়ার অভিনব পরিস্থিতির আলোকে কেন্দ্রিকতাবাদের সমস্যাকে পর্যালোচনা করলাম। তদপুরি, লেনিন ও তার কমরেডদের বহুল প্রচারিত সামরিক অতি–কেন্দ্রিকতাবাদ মতের আকস্মিক ভিন্নতার ফসল নয়। বলা হয় যে এটা সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে একটি অভিযানের সাথে জড়িত যা লেনিন ক্ষুদ্রতর সাংগঠনিক বিবরণের মধ্যে ধারণ করেছেন।
লেনিন বলছেন যে, ‘সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে মোটামুটি কার্যকরী অস্ত্র দাগা জরুরি’। তিনি বিশ্বাস করেন যে, সুবিধাবাদ বিশেষত বিকেন্দ্রীকরণ ও বিশৃঙ্খলার প্রতি বুদ্ধিজীবীদের ঝোঁক থেকে আসে, কঠোর শৃঙ্খলা ও ‘আমলাতন্ত্র’ এর প্রতি তাদের বিতৃষ্ণা থেকে আসে; যদিওবা এগুলো পার্টির কার্যক্রমের জন্য প্রয়োজন।
লেনিন বলছেন যে, বুদ্ধিজীবীরা সোশ্যালিস্ট/সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে যোগ দেয়ার পরও ব্যক্তিবাদী রয়ে যান এবং নৈরাজ্যবাদের প্রতি ঝুঁকে থাকেন। তার মতে, কেন্দ্রীয় কমিটির নিরঙ্কুশ কর্তৃত্বের প্রতি প্রবল বিরোধিতা কেবল বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেই দেখা যায়। তিনি বলেন, খাঁটি প্রলেতারিয়েত তার শ্রেণি–প্রবৃত্তির কারণে দৃঢ় নেতৃত্ব ও কঠোর/নির্দয় শৃঙ্খলার খপ্পরে নিজেকে সঁপে দিয়ে একধরনের ইন্দ্রিয়পরায়ণ সুখানুভূতি খুঁজে পায়। তিনি লেখেন, ‘আমলাতন্ত্রবাদ বনাম গণততন্ত্রবাদ হচ্ছে বিপ্লবী সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাংগঠনিক নীতি বনাম সুবিধাবাদীর সাংগঠনিক নীতি’। তিনি ঘোষণা করেন যে, যেসব দেশে সংস্কারবাদী ও বিপ্লবী সমাজতন্ত্র মুখোমুখি অবস্থায় রয়েছে সেখানে কেন্দ্রীয়বাদী ও স্বায়ত্তশাসনবাদী প্রবণতার মধ্যে একধরনের সংঘাত বিরাজ করছে। আইনভায় সমাজতান্ত্রিক প্রতিনিধির কতটুকু স্বাধীনতা পার্টি অনুমোদন করবে—এই প্রশ্নে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে যে সাম্প্রতিক বিতর্ক চালু আছে সে দিকে লেনিন বিশেষভাবে ইঙ্গিত দেন।৮
লেনিন উত্থাপিত সাদৃশ্যগুলোকে পরীক্ষা করা যাক।
প্রথমত, এটা উল্লেখ করা গুরুত্বপূর্ণ যে, সমাজতান্ত্রিক সংগঠনের ব্যাপারে প্রলেতারিয়েতের অনুমিত প্রতিভার গুণকীর্তন এবং বুদ্ধিজীবীদের প্রতি সাধারণ অবিশ্বাস এগুলো ‘বিপ্লবী মার্ক্সবাদী’ মানসিকতার আবশ্যক লক্ষণ নয়। এটা খুব সহজেই দেখানো সম্ভব যে, এই ধরনের যুক্তি নিজেই আসলে সুবিধাবাদের বহিঃপ্রকাশ।
শ্রমিক আন্দোলনে খাঁটি প্রলেতারিয়েত উপাদান ও অ–প্রলেতারিয়েত বুদ্ধিজীবীদের মধ্যকার বিরোধকে মতাদর্শিক বিষয় হিসাবে উত্থাপিত করা হয় নিম্নোক্ত উপায়ে: ফরাসি সিন্ডিকালিস্টদের আধা–নৈরাজ্যবাদ, যার জিগির হচ্ছে, ‘রাজনীতিবিদ থেকে সাবধান!’; ইংরেজ ট্রেডইউনিয়বাদী, ‘সমাজতান্ত্রিক স্বপ্নদ্রষ্ট্রা’দের ব্যাপারে অবিশ্বাসী; এবং আমাদের তথ্য যদি সঠিক হয়, তাহলে এরপরেই রয়েছে ‘খাঁটি অর্থনীতিবাদী’, রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে রাবচায়া মিসলে৯ কিছুদিন আগে এর প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন, সেন্ট পিটাসবার্গ–এ প্রকাশিত হয়েছিল।
পশ্চিম ইউরোপের অধিকাংশ সমাজতান্ত্রিক পার্টির মধ্যে সুবিধাবাদ ও ‘বুদ্ধিজীবী’দের মধ্যে নিঃসন্দেহে একটি যোগসূত্র রয়েছে, পাশাপাশি শ্রমিক আন্দোলনের সুবিধাবাদ ও বিকেন্দ্রীকরণ প্রবণতার মধ্যেও যোগসূত্র রয়েছে। কিন্তু ঐতিহাসিক জমিন থেকে সামাজিক প্রপঞ্চগুলোকে আলাদা করা এবং প্রপঞ্চগুলোকে বিমূর্ত নীতি হিসাবে উপস্থাপন (যেন এগুলোর একটি চূড়ান্ত ও সর্বজনীন প্রয়োগ রয়েছে) করার চাইতে মার্ক্সবাদী চিন্তার ঐতিহাসিক দ্বান্দ্বিক পদ্ধতির বিপরীত আর কিছুই হতে পারে না।
ধরে নেয়া যাক, যে কেউ বলতে পারেন, বুর্জোয়া শ্রেণি থেকে উঠে আসা একটি সামাজিক উপাদান হিসেবে ‘বুদ্ধিজীবী’ আদতে প্রলেতারিয়েত থেকে দূরবর্তী থাকেন; তিনি তাঁর শ্রেণি–পরিচয়ের বোধের সাথে সামঞ্জস্য রেখে সমাজতন্ত্রে যোগ দেন না, বরঞ্চ মতাদর্শিক পথকে গ্রহণের মাধ্যমে সেই বোধকে মাড়িয়ে তিনি যোগ দেন। এই কারণে তার শ্রেণি সচেতন প্রলেতারিয়েতের তুলনায় বেশি সুবিধাবাদী বিভ্রান্তে পড়ার প্রবণতা রয়েছে। যেহেতু শ্রেণি–সচেতন প্রলেতারিয়েতের নিজস্ব সামাজিক পারিপার্শ্বিক অবস্থা ও জনতার সাথে যোগসূত্র হারিয়ে যায়নি, সেহেতু তার তাৎক্ষণিক শ্রেণি–প্রবৃত্তি তাকে বিপ্লবী মেরুদণ্ড প্রদান করে। কিন্তু সুবিধাবাদের দিকে বুদ্ধিজীবীর ঝুঁকে থাকার এই পূর্বানুমানের দৃঢ় রূপ এবং সর্বোপরি সাংগঠনিক প্রশ্নে এই প্রবণতা যেভাবে নিজেকে প্রকাশ করে তা সবসময়ই প্রদত্ত সামাজিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার ওপর নির্ভর করে।
জার্মান, ফরাসি ও ইতালির সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনে লেনিন যে প্রপঞ্চ চিহ্নিত করেছেন সেখানে বুর্জোয়া পার্লামেন্টারিজম বা সংসদীয় রীতি হচ্ছে সেই প্রপঞ্চের নির্দিষ্ট সামাজিক ভিত্তি। পশ্চিমা সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে বিদ্যমান সকল সুবিধাবাদী প্রবণতার উর্বর জমিন হচ্ছে এই পার্লামেন্টারিজম।
ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মানিতে আমরা বর্তমান সুবিধাবাদের যেসকল বিভ্রান্তির বিষয় দেখতে পাচ্ছি, যেমন: সামাজিক সংস্কার, শ্রেণি ও পার্টির সহযোগিতা, সমাজতান্ত্রিক পথে শান্তিপূর্ণ বিকাশের আশা ইত্যাদির অতি–মূল্যায়ন, পার্লামেন্টারিজম কেবল এগুলোকে সমর্থনই যোগাচ্ছে না, বরঞ্চ এটা সেই জমিন তৈরি করে দিচ্ছে যেখানে এই বিভ্রান্তিগুলোকে অনুশীলন করা যায়। কারণ, এমনকি সোশ্যাল ডেমোক্রেসির ভেতরেই, পার্লামেন্টারিয়ান হিসাবে বুদ্ধিজীবীদেরকে এটি প্রলেতারিয়েত থেকে আলাদা করে ফেলে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে প্রলেতারিয়েতদের ওপরে স্থান দিয়ে দেয়। শ্রমিক আন্দোলন বৃদ্ধির সাথে সাথে পার্লামেন্টারিজম হয়ে উঠছে রাজনৈতিক ক্যারিয়ারবাদীদের উর্বর জমিন। এই কারণেই বুর্জোয়াদের এত বেশি উচ্চাভিলাষী ব্যর্থতা সমাজতান্ত্রিক পার্টির ব্যানারে ভিড় জমিয়েছে।
এইসকল কারণ পশ্চিম ইউরোপের সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীদের মধ্যে অরাজকতা ও শৃঙ্খলতার অভাবের দিকে একটি নির্দিষ্ট ঝোঁকের উত্থান ঘটিয়েছে। বর্তমান সুবিধাবাদী ঢেউয়ের দ্বিতীয় নির্দিষ্ট শর্ত হচ্ছে উচ্চ বিকশিত সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন এবং এর ফলে একটি প্রভাবশালী সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টি সংগঠনের উপস্থিতি। বুর্জোয়া–পার্লামেন্টারি প্রবণতার বিরুদ্ধে এই পার্টি বিপ্লবী শ্রেণি সংগ্রামের দুর্গ হিসাবে কাজ করবে। যদি প্রলেতারিয়েতদের সুদৃঢ় ও সক্রিয় প্রাণভোমরাকে ভেঙে একটি নিরাকার গণ ‘ভোটারে’ পরিণত করতে হয় তাহলে এই দুর্গকে ভেঙে ফেলতে হবে এবং অকার্যকর করে তুলতে হবে। এভাবেই আধুনিক সুবিধাবাদের ‘স্বায়ত্তশানবাদী’ ও বিকেন্দ্রীয়করণের প্রবণতাগুলোর জন্ম হয়। তারা ঐতিহাসিকভাবে সু–প্রতিষ্ঠিত এবং নির্দিষ্ট কিছু রাজনৈতিক লক্ষ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ। ফলে এগুলোকে ‘বুদ্ধিজীবী’র অন্তর্নিহিত অস্থিরতা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না, যেমন করে লেনিন বলছেন; বরঞ্চ এগুলোকে বুর্জোয়া পার্লামেন্টারিয়ানদের প্রয়োজনীয়তা দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়। বুদ্ধিজীবীদের ‘মনস্তত্ত্ব’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যাবে না, বরঞ্চ সুবিধাবাদী ‘রাজনীতি’ দিয়ে ব্যাখ্যা করা যায়।
তদপুরি জারের রাশিয়ার পরিস্থিতি একদম ভিন্ন। সাধারণত রাশিয়ার শ্রমিক আন্দোলনের সুবিধাবাদ কোনোভাবেই সোশ্যাল ডেমোক্রেসির শক্তিশালী বিকাশ অথবা বুর্জোয়া সমাজের বিভাজনের ফসল নয়, বরঞ্চ এটি রুশ সমাজের পশ্চাৎপদ রাজনৈতিক পরিস্থিতির ফসল।
এটা বোধগম্য যে, রাশিয়ার যে বিদ্বৎসমাজ থেকে সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিজীবীরা উঠে এসেছেন সেই সমাজের এখনো সুনির্দিষ্ট শ্রেণিচরিত্র গড়ে ওঠেনি, এবং পশ্চিম ইউরোপের বিদ্বৎসমাজের চাইতে কিছুদূর অব্দি এখনো শ্রেণিচ্যুত বলা যায়; অর্থাৎ, তারা সে তুলনায় এখনো কম বুর্জোয়া। এটি রাশিয়ার প্রলেতারিয়েত আন্দোলনের অপরিপক্বতার সাথে যুক্ত হয়ে তত্ত্বীয় অস্থিরতা ও সুবিধাবাদী দোদুল্যমানতার বিস্তর সুযোগ তৈরি করে দেয়; যা কখনো শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক সম্ভাবনাকে পুরোপুরি খারিজ করে দেয়, কখনো এর একদম বিপরীতে গিয়ে সন্ত্রাসকে মুক্তির একমাত্র উপায় হিসাবে বিশ্বাস করে, এবং পরিশেষে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে লিবারেলিজমের পঙ্কিলতায় অথবা দার্শনিক পরিমণ্ডলে কান্টের আদর্শবাদীতার খপ্পরে পড়ে।১০
আমাদের মতে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক বুদ্ধিজীবীদের সংগঠনহীনতার দিকে একটি নির্দিষ্ট সক্রিয় প্রবণতাকে উস্কে দেয়ার জন্য বুর্জোয়া পার্লামেন্টারিজমের ইতিবাচক অভিজ্ঞতার কেবল অভাবই নয়, বরঞ্চ এটা সংশ্লিষ্ট সামাজিক–মনস্তাত্ত্বিক পারিপার্শ্বিক অবস্থার সাথে জড়িত। আধুনিক পাশ্চাত্য বুদ্ধিজীবীদের যারা এই সময়ে ‘ইগোর কাল্টে’ নিজেকে নিয়োজিত করেছেন এবং এমনকি ‘প্রভু জাতের নৈতিকতা’কে সমাজতান্ত্রিক চিন্তা ও সংগ্রামের জগতে টেনে নিয়ে আসছেন, তারা সাধারণত বুর্জোয়া বিদ্বৎসমাজের আদর্শ প্রতিনিধি নন, বরঞ্চ তারা তাদের সামাজিক বিকাশের একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের প্রতিনিধিত্ব করেন। অন্য ভাবে বলা যায়, এটি একটি ক্ষয়িষ্ণু ও বিকৃত বুর্জোয়া সমাজের ফসল, যা কিনা ইতোমধ্যে তার নিজের শ্রেণি আধিপত্যের দুষ্টচক্রে জড়িয়ে পড়েছে। এর বিপরীতে এবং সঙ্গত কারণেই, রাশিয়ার সমাজতান্ত্রিক বুদ্ধিবৃত্তির ইউটোপিয়ান ও সুবিধাবাদী কল্পনাগুলো বরঞ্চ আত্ম–অস্বীকৃতি ও আত্ম–অননুমোদনের বিপ্রতীপ তাত্ত্বিক রূপের গ্রহণ করার দিকে ঝোঁকে। নিশ্চিতভাবে পুরনো নারদনিকদের ‘জনতার কাছে যাওয়া’১১ নামক আন্দোলন, মানে বুদ্ধিজীবীকে বাধ্যতামূলকভাবে কৃষকের ছদ্মবেশ ধারণ ছিল একটি হতাশাজনক আবিষ্কার। একইভাবে সাম্প্রতিক খাঁটি ‘অর্থনীতিবাদে’র শীষ্যরা শ্রমিকের ‘মসৃণ হাত’–এর সামনে আমাদেরকে মাথা নত করাতে চায়।
আমরা যদি সাংগঠনিক কাঠামোর প্রশ্নটিকে সরাসির ইউরোপ থেকে রাশিয়াতে আমদানি না করে খোদ রাশিয়ার নির্দিষ্ট পরিস্থিতিকে পর্যবেক্ষণের মাধ্যমে সমাধান করতে চাই তাহলে আমরা একদম ভিন্ন ফলাফল পাবো। সংগঠনের কোনো একটি নির্দিষ্ট কাঠামো, যেমন বিকেন্দ্রীকরণ, এর প্রতি প্রবল উৎসাহের জন্য সুবিধাবাদকে দায়ী করার (যেমনটি লেনিন করেছেন) মানে হলো সুবিধাবাধের অন্তর্নিহিত নির্যাসকে ভুল বোঝা। সাংগঠনিক প্রশ্নে সুবিধাবাদের কেবল একটাই নীতি থাকে: নীতির অনুপস্থিতি। এটা সবসময়ই পরিস্থিতির সাথে তাল মিলিয়ে পদ্ধতি নির্বাচন করে, যতক্ষণ পর্যন্ত তার উদ্দেশ্যের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে। কিন্তু যদি লেনিনের মতো করে আমরা সুবিধাবাদকে একটি প্রবণতা বা আকাঙ্ক্ষা হিসাবে সংজ্ঞায়িত করি যা কিনা প্রলেতারিয়েতদের স্বাধীন বিপ্লবী শ্রেণি সংগ্রামকে অসাড় করে ফেলে এবং এটাকে উচ্চাভিলাষী বুর্জোয়া বুদ্ধিজীবীদের একটি হাতিয়ারে পরিণত করে, তাহলে আমাদের এটাও স্বীকার করতে হবে যে, শ্রমিক আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে এই ফলাফল বিকেন্দ্রীকরণের মাধ্যমে নয়, বরঞ্চ দৃঢ় কেন্দ্রিকতাবাদের মাধ্যমেই কায়েম হয়ে যায়। কঠোর কেন্দ্রিকরণের মাধ্যমেই একটি নব–বিকশিত ও অপরিষ্ফুটিত প্রলেতারিয়েত আন্দোলন একটি কেন্দ্রীয় কমিটির বুদ্ধিজীবী নেতাদের হাতের মুঠোয় চলে যায়।
জার্মানিতেও আন্দোলনের একেবারে প্রাথমিক পর্যায়ে, সচেতন প্রলেতারিয়েতদের একটি শক্তিশালী নিউক্লিয়াস এবং অভিজ্ঞতাভিত্তিক একটি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কৌশল হাজির হওয়ার পূর্বেই বিপরীতমুখী দুই সাংগঠনিক প্রবণতাই বিবাদে মুখোমুখি হয়েছে। একদিকে রয়েছে লাসালের জেনারেল জার্মান ওয়ার্কার্স ইউনিয়ন কর্তৃক প্রচারিত উগ্র কেন্দ্রিকতাবাদ, এবং অন্যদিকে রয়েছে আইজেনাখার কর্তৃক প্রচারিত ‘স্বায়ত্বশাসনবাদ’। আইজেনাুখারদের কৌশলগত নীতি কিছুটা দিশেহারা হওয়া সত্ত্বেও এটি জার্মানের জনগণের মধ্যে শ্রেণি সচেতনতা বৃদ্ধিতে লাসালিয়ানদের তুলনায় বেশি অবদান রেখেছিল। অতি শীঘ্রই শ্রমিকরা এই পার্টিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করা শুরু করেছিল এবং আন্দোলনের দ্রুত বিস্তৃতি ঘটেছিল। একইসময়ে লাসালিয়ানরা তাদের ‘স্বৈরশাসক’দের নিয়ে পরীক্ষা–নিরীক্ষা উল্টো বিপর্যয়ের দিকে ধাবিত করেছিল।
সাধারণভাবে, যেখানে শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে বিপ্লবী উপাদান এখনো অসংগঠিত এবং খোদ আন্দোলনই দোদুল্যমান, (সংক্ষেপে, এই পরিস্থিতির সাথে বর্তমান রাশিয়ার মিল রয়েছে) এমন পরিস্থিতিতে সুবিধাবাদী বুদ্ধিজীবীরা একটি কঠোর স্বৈরাচারী কেন্দ্রিকতাবাদী সাংগঠনিক প্রবণতাকে সমর্থন করেন। অন্যদিকে, একটি সংসদীয় শাসনামলে এবং একটি শক্তিশালী শ্রমিক দলের মুখোমুখি হয়ে বুদ্ধিজীবীদের সুবিধাবাদী প্রবণতা তখন ‘বিকেন্দ্রীকরণে’র দিকে ঝুঁকে পড়ে।
শ্রমিক শ্রেণির আন্দোলনে বিদ্বৎসমাজের বিপজ্জনক প্রভাব সম্পর্কে লেনিনের যে ভয় সে দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বলা যায়, সংগঠন প্রশ্নে তার নিজের ধারণা রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেসির জন্য সবচেয়ে বড় বিপদ হাজির করছে। প্রকৃতপক্ষে, বিকাশমান প্রলেতারিয়েত আন্দোলনকে একটি আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতাবাদের পকেটে ঢুকাতে পারলে এই আন্দোলন ক্ষমতাকাঙ্ক্ষী একদল বুদ্ধিজীবীদের কব্জায় খুব সহজে, এবং নিশ্চিতভাবেই চলে যায়। এই আমলাতান্ত্রিক কেন্দ্রিকতা সংগ্রামী শ্রমিকদের একটি ‘কমিটি’র অনুগত হাতিয়ারে পরিণত করে। অন্যদিকে, শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ড, যার ফলশ্রুতিতে শ্রমিকরা রাজনৈতিক দায়বদ্ধতা অর্জন করেন, তা তাদেরকে উচ্চাভিলাষী বিদ্বৎসমাজ পরিচালিত কমিটির সুবিধাবাদী ব্যবহার থেকে রক্ষা করবে।
লেনিন আজ যাকে অলীক ছায়া বা ভূত হিসাবে দেখছেন কাল তা সহজেই বাস্তবে পরিণত হতে পারে।
আমাদের ভুলে যাওয়া চলবে না যে রাশিয়ার আশু বিপ্লব একটি বুর্জোয়া বিপ্লব হতে যাচ্ছে, কোনো সর্বহারা বিপ্লব নয়। এটি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লড়াইয়ের সকল পরিস্থিতি পরিবর্তন করে ফেলবে। তখন রুশ বুদ্ধিজীবীরা দ্রুতই বুর্জোয়া মতাদর্শে ডুব দিবে। যদি বর্তমানে রুশ শ্রমিক শ্রেণির মধ্যে সোশ্যাল ডেমোক্রেসিই প্রধান ধারা হয়ে থাকে, তাহলে বুর্জোয়া বিপ্লবের পরপরই, সর্বোপরি এর বুদ্ধিজীবীরা জনগণকে সংসদীয় হেজেমনির জন্য স্তম্ভমূল বানাতে চাইবে। স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ড, স্বাধীন উদ্যোগ এবং শ্রমিকদের মধ্যে রাজনৈতিক চেতনাধারী অংশ যত কম হবে, তত বেশি সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক কেন্দ্রীয় কমিটির রাজনৈতিক জবরদস্তির শিকার হবে, নতুন রাশিয়ার বুর্জোয়া বক্তৃতাবাজ নেতাদের খেলা তত সহজ হবে, এবং আজকের সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক শ্রমিকদের ফসল তত বেশি বুর্জোয়াদের মাচায় উঠবে।
সর্বোপরি, অতি–কেন্দ্রিকতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির মূল অভিমুখ, অর্থাৎ সাংগঠনিক অবস্থা বা পার্টির গঠনতন্ত্রের ধারা–উপধারা দিয়ে শ্রমিক আন্দোলনকে সুবিধাবাদের হাত থেকে রক্ষা করার ধারণাটি, আসলে মিথ্যা। ফ্রান্স, ইতালি ও জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসির সাম্প্রতিক ঘটনাসমূহ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের মাঝেও সুবিধাবাদকে শ্রমিক আন্দোলনের জন্য এলিয়েন বা বিজাতীয় উপাদান হিসাবে বিবেচনা করার প্রবণতা তৈরি হয়েছে; যেন এটা কেবল বুর্জোয়া গণতন্ত্রের উপাদানের সাথে বাইরে থেকে এসেছে। যদি এটা সত্য হয়ে থাকে তাহলে সংগঠনের গঠনতন্ত্রের ধারা–উপাধারা এই অনুপ্রবেশ বন্ধ করতে পারবে না। অর্থাৎ, সুবিধাবাদী উপাদানের চাপে এটা অকার্যকর হিসাবে প্রমাণিত হবে। প্রলেতারিয়েত সংগঠনে বা সোশ্যাল ডেমোক্রেসির মধ্যে নন–প্রলেতারিয়েত উপাদানের এই অন্তঃপ্রবাহ আসলে বিভিন ধরনের সামাজিক কারণের ফলাফল, যেমন পাতি–বুর্জোয়াদের অর্থনৈতিক পতন, বুর্জোয়া উদারবাদের দেউলিয়াপনা এবং বুর্জোয়া গণতন্ত্রের অবক্ষয়। সংগঠনের গঠনতন্ত্রে লিখিত ফর্মুলা দিয়ে এই প্রবাহকে আটকানোর আশা করা বোকামিই। কয়েকটি অনুচ্ছেদ, বা বিধিবিধানের ম্যানুয়াল কেবল একটি ছোট উপদল বা গোপন (প্রাইভেট) চক্রকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে, ইতিহাসের প্রবাহ সবসময় এই অনুচ্ছেদকে মাড়িয়ে যায়। তাছাড়া, বুর্জোয়া সমাজের ক্রমাগত অবক্ষয়ের ফলে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের দিকে ঠেলে দেয়া উপাদানগুলোকে ঠেকানোর মানে শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থকে রক্ষা করা—এও সত্য নয়। সোশ্যাল ডেমোক্রেসি সর্বদাই দাবি করে এসেছে যে, এটি কেবল প্রলেতারিয়েতদের শ্রেণি স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করে না, বরঞ্চ সমগ্র সমসাময়িক সমাজের প্রগতিশীল আকাঙ্ক্ষাকে ধারণ করে। বুর্জোয়া আধিপত্যের জুলুমের শিকার সবার স্বার্থকে এটা তুলে ধরে। এটাকে নিছক এই অর্থে বোঝা যাবে না যে, এইসমস্ত স্বার্থ আদর্শস্বরূপ সোশ্যালিস্ট বা সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচিতে অন্তর্ভুক্ত রয়েছে। ঐতিহাসিক বিকাশের প্রক্রিয়াতেই এই ধারণাটি বাস্তবে হাজির হবে, যেখানে কিনা রাজনৈতিক পার্টি হিসাবে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি ধীরে ধীরে আমাদের সমাজের সকল অসন্তুষ্ট উপাদানগুলোর আশ্রয়স্থল হয়ে উঠবে। যার ফলে এটি গুটিকয়েক আধিপত্যকামী বুর্জোয়াদের পার্টি হওয়ার বিপরীতে জনতার পার্টি হয়ে উঠবে। এ জন্য জানতে হবে কীভাবে এই বিচিত্র সমষ্টির যন্ত্রণা, ক্রোধ ও আশাকে শ্রমিক শ্রেণির চূড়ান্ত লক্ষ্যের দিকে ধাবিত করা যাবে। বিদ্যমান সমাজের বিরুদ্ধে অ–প্রলেতারিয়েতের বিক্ষোভকে প্রলেতারিয়েতের বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের সাথে একত্রে আবদ্ধ করতে হবে। অর্থাৎ, আগত উপাদানগুলোকে একীভূত করতে হবে। এটা কেবল তখনই সম্ভব যদি সোশ্যাল ডেমোক্রেসিতে ইতোমধ্যেই রাজনৈতিকভাবে শিক্ষিত ও শ্রেণি সচেতন প্রলেতারিয়েত নিউক্লিয়াসের উপস্থিতি থাকে (যেমন এখন পর্যন্ত জার্মানি) যারা কিনা শ্রেণিচ্যুত ও পাতি–বুর্জোয়া উপাদানগুলোকে নিজেদের পক্ষে নিয়ে আসতে পারবে। সেক্ষেত্রে কেন্দ্রীয়করণের নীতির কঠোর প্রয়োগ এবং দলীয় বিধি অনুসারে গঠিত কঠিন শৃঙ্খলা সুবিধাবাদের বিপদের বিরুদ্ধে একটা কার্যকর সুরক্ষা হতে পারে। এভাবেই ফ্রান্সের বৈপ্লবিক সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন জ্যোরাসি১২ বিভ্রান্তির বিরুদ্ধে নিজেকে রক্ষা করেছিল। সেদিকে জার্মান সোশ্যাল ডেমোক্রেসির গঠনতন্ত্রের সংশোধন একটি সময়োচিত পদক্ষেপ হবে। কিন্তু এমনকি এক্ষেত্রে কেবল দলীয় গঠনতন্ত্র বা বিধিকে সুবিধাবাদের বিরুদ্ধে আত্মরক্ষার হাতিয়ার ভাবা উচিৎ নয়, বরঞ্চ এটাকে পার্টির মধ্যে বিদ্যমান বৈপ্লবিক সংখ্যাগরিষ্ঠ প্রলেতারিয়েত কর্তৃত্বমূলক প্রভাব প্রয়োগের একটি বাহ্যিক বাধ্যতামূলক বা জবরদস্তিমূলক হাতিয়ার হিসাবে দেখা উচিৎ। যদি এই সংখ্যাগরিষ্ঠতার অভাব থাকে তাহলে সবচেয়ে ভয়ানক কাগুজে অনুমোদনও বিকল্প হয়ে উঠতে পারে না।
তদপুরি আমরা উল্লেখ করেছি যে, কেবল বুর্জোয়া উপাদানের অনুপ্রবেশই সোশ্যাল ডেমোক্রেসির মধ্যে সুবিধাবাদী প্রবাহের একমাত্র উৎস নয়। আরেকটি কারণ হচ্ছে খোদ সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ের চরিত্র ও এর মধ্যে অন্তর্নিহিত বৈপরীত্য। সর্বমুক্তির দিকে প্রলেতারিয়েতদের আন্তর্জাতিক লড়াই বা বিজয়ের দিকে প্রলেতারিয়েতদের ঐতিহাসিক অগ্রগতি একটি অভূতপূর্ব প্রক্রিয়া। কারণ ইতিহাসের প্রথমবারের মতো জনগণ [পিপল] সচেতনভাবে নিজেদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে, এবং সমস্ত শাসক শ্রেণির বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তাদের ইচ্ছার বহিঃপ্রকাশ ঘটাচ্ছে। কিন্তু এই ইচ্ছা কেবল বিদ্যমান ব্যবস্থা বা সমাজের উর্ধ্বে উঠে বা ছাড়িয়ে গিয়ে সিদ্ধ হতে পারে। তদপুরি অন্যদিকে, এই জনতা তাদের এই ইচ্ছাকে গঠিত বা বিকশিত করতে পারে কেবল বিদ্যমান ব্যবস্থার বিরুদ্ধে দৈনন্দিন সংগ্রামের মাধ্যমে, অর্থাৎ কেবল বিদ্যমান কাঠামোর মধ্যেই (অর্থাৎ, পুঁজিবাদী সমাজের সীমাবদ্ধতার মধ্যে)। একদিকে রয়েছে জনতা [মাস] অন্যদিকে রয়েছে এর ঐতিহাসিক লক্ষ্য যা কিনা বিদ্যমান সমাজের বাইরে অবস্থিত। একদিকে রয়েছে দৈনন্দিন সংগ্রাম, অন্যদিকে রয়েছে সামাজিক বিপ্লব। এই দ্বান্দ্বিক বৈপরীত্যের মধ্য দিয়েই সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের [সোশ্যালিস্ট ডেমোক্রেটিক আন্দোলন] বিকাশ ঘটছে বা ঘটে। এই পথচলায় দুটো বিপদকে যৌক্তিকভাবে মোকাবিলা করেই যেতে হয়, একদিকে রয়েছে গণচরিত্রের ক্ষতি, অন্যদিকে রয়েছে এর লক্ষ্যে পরিত্যাগ। একদিকে রয়েছে একটি উপদল বা সম্প্রদায়ের দশায় পুনঃপতিত হওয়ার বিপদ, অন্যদিকে রয়েছে একটি বুর্জোয়া সংস্কার আন্দোলনে পরিণত হওয়ার বিপদ।
এই কারণেই এটা চিন্তা করা অনৈতিহাসিক ভ্রান্তি যে, সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনের বৈপ্লবিক কৌশল পূর্ণরূপে সবার জন্য নির্ধারণ করা যাবে এবং শ্রমিক আন্দোলনকে সুবিধাবাদী ভ্রান্তি থেকে একেবারেই মুক্ত করা সম্ভব। অবশ্যই, মার্ক্সবাদী তত্ত্ব আমাদেরকে সুবিধাবাদী সাধারণ প্রবণতাগুলোকে চিহ্নিত করতে এবং এর বিরুদ্ধে লড়াই করার হাতিয়ার সরবরাহ করে। কিন্তু যেহেতু সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন একটি গণ–আন্দোলন এবং এর বিপদগুলো ব্যক্তির মনন থেকে উদ্ভূত না হয়ে বরঞ্চ সামাজিক পরিস্থিতি থেকে উদ্ভূত হয়, ফলে আগ থেকে সুবিধাবাদী ভ্রান্তির বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ নেয়া যায় না। যখন এগুলো বাস্তবে মূর্ত আকার ধারণ কবে কেবল তখনই, খোদ আন্দোলনের মাধ্যমেই এটাকে কাটিয়ে উঠা সম্ভব হবে; এবং অতি অবশ্যই মার্ক্সবাদ প্রদত্ত হাতিয়ার দিয়ে, মানে মার্ক্সবাদী তত্ত্বের সহায়তায়। এদিক থেকে দেখলে সুবিধাবাদকে শ্রমিক আন্দোলনের ঐতিহাসিক বিকাশের অনিবার্য পর্যায় ও ফসল বলে মনে হবে। রাশিয়ার মতো অঞ্চলে যেখানে সোশ্যাল ডেমোক্রেসি এখনো অবিকশিত, এবং যেখানে শ্রমিক আন্দোলনের রাজনৈতিক পরিস্থিতি খুবই অস্বাভাবিক, সেখানে সুবিধাবাদ মোটাদাগে এই উৎস থেকে উৎসারিত হতে পারে। অর্থাৎ, এটি সমাজতান্ত্রিক লড়াইয়ের কৌশলের ক্রমাগত পরীক্ষা–নিরীক্ষা ও অনুসন্ধান থেকে উৎসারিত হতে পারে, সমাজতান্ত্রিক মৌলিক নীতিগুলোর ব্যতিক্রমী ও অতুলনীয় পরিস্থিতিতে বর্তমান সংগ্রামকে নিয়ে আসার প্রয়োজন থেকে উৎসারিত হতে পারে।
যদি এটা হয়ে থাকে, তাহলে কোনো একটা নির্দিষ্ট সাংগঠনিক গঠনতন্ত্র দিয়ে রাশিয়ার আন্দোলনে সুবিধাবাদের উত্থান এড়ানোর ধারণাটা অদ্ভুত খেয়ালিপনায় পূর্ণ। এক টুকরা কাগজ দিয়ে সুবিধাবাদকে নিবৃত্ত করার প্রয়াস প্রচণ্ড ক্ষতিকারক হয়ে উঠতে পারে, সুবিধাবাদের জন্য নয় বরঞ্চ সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের জন্যই। কারণ একটি সুস্থ জীবনের স্বাভাবিক হৃদস্পন্দন বন্ধ করার মাধ্যমে আপনি তার লড়াই করার স্পৃহাকেই দুর্বল ও দমন করে ফেলেন। যা কিনা কেবল সুবিধাবাদের বিরুদ্ধেই নয়, বরঞ্চ বিদ্যমান সামাজিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেও তার লড়াইর স্পৃহাকে দুর্বল করে দেয়। উপায় উদ্দেশ্যের বিরুদ্ধেই চলে যায়।
শিল্পী: পল স্নোডেন
রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের একটা অংশের (বা লেনিনের) এই যে অতি–উদ্বিগ্নতা, অর্থাৎ একটি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ ও প্রাণশক্তিসম্পন্ন শ্রমিক আন্দোলনকে কোনো ধরনের ভুল–ভ্রান্তি থেকে রক্ষা করার জন্য একটি সর্বজ্ঞ ও সর্বশক্তিমান কেন্দ্রীয় কমিটির প্রতিষ্ঠা করার উচ্চাকাঙ্ক্ষার মধ্যে আমরা সেই একই সাবজেক্টিভিজমের আলামত দেখতে পাচ্ছি, যা কিনা রাশিয়া সমাজতান্ত্রিক চিন্তাভাবনার জগতে ইতোমধ্যে একের অধিক প্রতারণা করে ফেলেছে। সাম্প্রতিক রাশিয়ার ইতিহাসে শ্রদ্ধেয় মানব ‘অহং’কে যে অদ্ভুত ডিগবাজিগুলো করতে হয়েছে তা আগ্রহোদ্দীপক। রুশ স্বৈরাচার কর্তৃক একেবারে ধুলোয় মিশে গিয়ে এই ‘অহং’ নিজেকে, নিজস্ব চিন্তার পদ্ধতিতে, সিংহাসনে বসিয়ে এবং অস্তিত্বহীন ‘নারোদনায়া ভোলিয়া’র১৩ নামে ষড়যন্ত্রকারীদের একটি কমিটি হিসাবে নিজেকে সর্বশক্তিমান হিসাবে ঘোষণা করে তার প্রতিশোধ গ্রহণ করেছিল। কিন্তু ‘বিষয়’ [অবজেক্ট] শক্তিশালী হিসাবে প্রমাণিত হয়েছিল। এই কষাঘাত (knout/knot একেক স্থানে এককটা দেয়া আছে) বিজয়ী হয়েছিল, কারণ এটি ঐতিহাসিক প্রক্রিয়ার একটি নির্দিষ্ট পর্যায়ের ‘বৈধ’ অভিব্যক্তি হিসাবে প্রমাণ করেছিল।
সময়ে সময়ে আমরা দৃশ্যপটে ইতিহাসের আরও বেশি ‘বৈধসম্মত’ সন্তানকে দেখতে পেলাম, মানে রুশ শ্রমিক আন্দোলনকে। প্রথমবারের মতো একটি খাঁটি ‘পিপলস উইল’ বা ‘জনগণের ইচ্ছা’ গঠনের ভিত্তি রাশিয়ার জমিনে স্থাপন করা হয়েছে। কিন্তু এখানে আবারও রুশ বিপ্লবী ‘অহং’! মাথার উপর দাঁড়িয়ে এটা আরেকবার নিজেকে ইতিহাসের সর্বশক্তিমান পরিচালক হিসাবে ঘোষণা করছে; এইবার রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক পার্টির মহামান্য কেন্দ্রীয় কমিটির নামে। এই তুখোড় কসরতবাজ অনুধাবন করতে ব্যর্থ হয়েছেন যে, আজ যে কর্তা বা সাবজেক্ট পরিচালকের ভূমিকা পালন করার যোগ্যতা অর্জন করেছে, তা হচ্ছে শ্রমিক শ্রেণির সমষ্টিগত ‘অহং’। শ্রমিক শ্রেণি তাদের ভূল করার এবং ইতিহাসের দ্বন্দ্ব শেখার অধিকার দাবি করছেন। আমরা স্পষ্টভাবে কথা বলতে পারি। ঐতিহাসিকভাবে, সবচেয়ে চতুর কেন্দ্রীয় কমিটির অভ্রান্ততার চাইতে কোনো একটি সত্যিকারের বৈপ্লবিক আন্দোলনের ভুল বা ত্রুটিগুলো বহুগুণ উপকারী।
টীকা:
১. জার্মানির সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক আন্দোলনকে দমন করার উদ্দেশ্য নিয়ে ১৮৭৮ সালে জার্মানির রাইখস্ট্যাগে বিসমার্ক কর্তৃক উত্থাপিত সমাজতন্ত্র–বিরোধী আইনটি গৃহীত হয়। ১৮৯০ সালে এই আইন প্রত্যাহার করা হয়।
২. ইস্ক্রা হচ্ছে রুশ সোশ্যাল ডেমোক্রেটিক লেবার পার্টি [RSDLP] কর্তৃক প্রকাশিত রুশ সংবাদপত্র। ভি আই লেনিনের তত্ত্বাবধানে এর প্রথম সংখ্যা প্রকাশিত হয়েছিল ১৯০০ সালের ১ ডিসেম্বর। জার দ্বিতীয় নিকোলাসের দমন পীড়নের জন্য এটি রাশিয়ার বাইরে প্রকাশ করতে হতো, এবং বিদেশে প্রকাশিত হয়ে গোপনে রাশিয়াতে প্রচার করা হতো। ১৯০৩ সালে RSDLP এর বিভাজনের পর পত্রিকাটি মেনশেভিকদের দখলে যায়।
৩. এখানে ১৯০৩ সালের আগস্টে অনুষ্ঠিত RSDLP এর দ্বিতীয় কংগ্রেসের কথা বলা হচ্ছে। এই কংগ্রেসেই মেনশেভিক ও বলশেভিকরা আলাদা হয়েছিল।
৪. লেনিনের এই গ্রন্থটি ১৯০৪ সালের মে মাসে প্রকাশিত হয়েছিল।
৫. এখানে অস্ট্রীয় সোশ্যাল ডেমোক্রেটদের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অস্ট্রীয়–হাঙ্গেরীয় সাম্রাজ্যের বহুজাতিক চরিত্রের প্রতিক্রিয়ায় তারা যেভাবে একটি ফেডারেল পার্টি কাঠামো তৈরি করেছিলেন, যেখানে কিনা তাদের বিভিন্ন জাতির স্বায়ত্তশাসনের অনুমতি দেয়া হয়েছিল।
৬. লুই অগাস্ট ব্লাঙ্কুই (১৮০৫–১৮৮১) কর্তৃক প্রচারিত বিপ্লবের ধারণাকে ব্লাংকুইজম বলা যায়। এর মতে, তুলনামূলক একটি ছোট ও খুব সঙ্ঘবদ্ধ গ্রুপ এবং গোপন ষড়যন্ত্রকারীদের দ্বারা সমাজতান্ত্রিক বিপ্লব পরিচালিত হওয়া উচিত। ক্ষমতা দখলের পর বিপ্লবীরা এই রাষ্ট্রের ক্ষমতাকে ব্যবহার করে সমাজতন্ত্র চালু করবে। এটা মনে করে যে, রাজনৈতিক বিপ্লব আসলে একধরনের ক্যু’র মাধ্যমেই হতে হবে।
৭. পারভাস আলেক্সান্ডার হেলফান্ড (১৮৬৭–১৯২৪) এর ছদ্মনাম ছিল। তিনি ছিলেন রুশ বিপ্লবী; ১৮৯১ এর SPD এর সাথে সক্রিয় ছিলেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ আগ পর্যন্ত তিনি লুক্সেমবার্গের সাথে কাজ করেছেন। ১৯১৪ সালের পর তিনি যখন জার্মানির পক্ষাবলম্বন করেন তখন রোজা তার সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করেন।
৮. এস্পিডি এর সংস্কারপন্থীরা এসপিডির অতিরিক্ত কেন্দ্রিকতাবাদের বিরুদ্ধে স্থানিক স্বায়ত্বশাসনের পক্ষে যুক্তি দিতেন, তাদের সংস্কারপন্থী নীতিকে তুলে ধরার একটা উপায় হিসাবে।
৯. রবচায়া মিসলে(শ্রমিকদের চিন্তাধার) অর্থনীতিবাদীদের সংবাদপত্র। ১৮৯৭ থেকে ১৯০২ সাল পর্যন্ত প্রকাশিত হয়েছিল। ১৬টি সংখ্যা বের হয়েছিল, ৩ থেকে ১১ সংখ্যা এবং ১৬তম সংখ্যা বের হয়েছিল বার্লিন থেকে, অন্যান্য সংখ্যা বেরিয়েছিল সেন্ট পিটাসবার্গ থেকে। – তথ্যসূত্র: ভি আই লেনিন, কী করিতে হইবে, পৃষ্ঠা. ১৮৭ [ফুটনোট]
১০. ইমানুয়েল কান্টের ক্রিটিক্যাল ফিলোসফির উল্লেখ; রোজা তাঁর লেখাপত্রে ধ্রুপদী দার্শনিকদের কথা যে অল্প কয়বার উল্লেখ করেছেন তন্মধ্যে এটা অন্যতম। এসপিডির কয়েকজন সংস্কারপন্থী নেতা কান্টবাদী ছিলেন। – সম্পাদক, রোজা লুক্সেমবার্গ রিডার
১১. ‘জনতার কাছে যাওয়া’ ছিল ১৮৭০–১৮৮০ সালের দিককার রুশ পপুলিস্ট বিদ্বৎসমাজের একটি শ্লোগান।
১২. জ্যা জ্যোরাসি (১৮৫৪–১৯১৪) একজন সংস্কারপন্থী ফরাসি সমাজতন্ত্রী নেতা, তিনি L Humaniteনামক পত্রিকা ১৯০৪ সালে প্রতিষ্ঠা করেন। লুক্সেমবার্গ অনেকবার তার সাথে বিতর্ক করেন। কিন্তু তার উচ্চকিত প্রশংসা করতেন। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যুদ্ধের বিরোধীতা করার কারণে তিনি হত্যার শিকার হন।
১৩. নারোদনায়া ভোলিয়া ১৮৭৯ এর আগস্টে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। একটি ছিল রুশ পপুলিস্ট সংগঠন, বৈপ্লবিক সন্ত্রাসবাদের চর্চা করতো। ১৮৮১ সালের মার্চে এই দলের সদস্যরা জার আলেক্সান্ডার দ্বিতীয়কে হত্যা করে। এরপরে রুশ সরকার এই গোষ্ঠীকে মারাত্মক দমন পীড়নের মাধ্যমে নিধন করেছিল।
[জর্জি ডিমিট্রভের এই লেখাটি অনুবাদ করেছিলেন দীপিকা বসু ও পত্রলেখা বন্দ্যোপাধ্যায়। পরিচয় পত্রিকার নব্বই বছর পূর্তি উপলক্ষ্যে, কলকাতা থেকে ২০২১ সালে প্রকাশিত, ফ্যাসিস্টবিরোধী সংকলন এ অনূদিত লেখাটি ছাপা হয়। গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছিলেন দীপেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায় ও তরুণ সন্যাল। অরাজের পাঠকদের সুবিধার্থে গ্রন্থের সম্পাদকদ্বয়ের দেয়া ভূমিকাসহ লেখাটি পুনঃপ্রকাশ করা হলো। বানান সমরূপতা রক্ষায় মুদ্রণ প্রমাদ সংশোধন করা হয়েছে।—সম্পাদক]
সম্পাদকীয় ভূমিকা: জার্মানির রাষ্ট্রপতি ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি হিটলারকে রাইখ চান্সেলরের পদে নিয়োগ করেন। জার্মানির কমিউনিস্ট পার্টি ছিল শক্তিশালী ও সংগঠিত, ১৯৩২ সালের নভেম্বরে রাইখস্টাকের নির্বাচনে কমিউনিস্টরা ৬০ লক্ষ ভোট পেয়েছিল। ফ্যাসিস্টদের প্রধান শত্রু ছিল তারাই। ফলে হিটলার-গোয়েরিং-গোয়েবলস চক্রের প্রথম কাজ হল ছলে বলে কৌশলে কমিউনিস্টদের নিশ্চিহ্ন করা। প্রথমে প্রচার করা হল যে ‘কার্ল লীব কনেথট’ ভবনে অবস্থিত কমিউনিস্ট পার্টি অফিসে তল্লাশি করে “অতি ভয়ানক ধরনের অনেক কিছু” পাওয়া গেছে। কিন্তু প্রায় প্রতি সপ্তাহে পুলিশের নিয়মিত তল্লাশি সত্ত্বেও ঐ ভবনে মাটির নিচে ভাড়ার তৈরি করা, যাতায়াতের গোপন পথ নির্মাণ ও আস্ত একটি বিদ্রোহ-পরিকল্পনা লুকিয়ে রাখা সম্ভব—এই আষাঢ়ে গল্প প্রায় কেউই বিশ্বাস করেনি। তারপর ঘটল অভূতপূর্ব ঘটনা। ২৭ ফেব্রুয়ারি সন্ধ্যায় রাইখস্টাকে আগুন লাগার সংবাদ দাবানলের মতোই ছড়িয়ে পড়ে। হিটলার সঙ্গে সঙ্গে ঘটনাস্থলে হাজির হয়ে সমবেত বিদেশী সাংবাদিকদের বলে “এটা ঈশ্বরের নির্দেশ— কমিউনিস্টদের ওপর আমরা আঘাত হানব।” অচিরে সরকারী ঘোষণা জারী করে স্পষ্ট বলা হয় রাইখস্টাকে এ-আগুন কমিউনিস্টরাই লাগিয়েছে ৷
বুলগেরীয় কমিউনিস্ট পার্টির অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা, বিশ্ব কমিউনিস্ট আন্দোলনের অন্যতম প্রধান নেতা জঙ্গি ডিমিট্রভ তখন জার্মানিতে ছিলেন। ঐ রাতে ট্রেনে মিউনিখ থেকে বার্লিন যাচ্ছিলেন। ২৮ শে ফেব্রুয়ারি প্রভাতী সংবাদপত্রে তিনি রাইখস্টাকে আগুন লাগাবার সংবাদ পান। ডিমিট্রভ বোঝেন সংসদীয় নির্বাচনের আগে কমিউনিস্টদের জনপ্রিয়তা খর্ব ও জয়লাভের সম্ভাবনাকে বিনষ্ট করার জন্য হিটলারই রাইখস্টাকে আগুন দিয়েছে ।
গোটা জার্মানি জুড়ে হিটলার-পুলিশ ও ফ্যাসিস্ট ‘ঝঞ্ঝা বাহিনী’র ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস শুরু হয় ।
ছবি: তরুণ বয়সে জর্জি ডিমিট্রিভ
বলা যায় রাইখস্টাকে অগ্নিকাণ্ড ‘মহাভারত’-এর ‘জতুগৃহদাহ’ পর্ব। তারপর কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধশেষে ১৯৪৫ সালের ৩রা মে তারিখে রাইখস্টাকে রক্তপতাকা উত্তোলনের মধ্যে কার্যত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান এবং পৃথিবীতে সমাজতান্ত্রিক যুগের অভ্যুদয়। ডিমিট্রভ দুই যুগের অমোঘ সেতু ৷
১৯৩৩ সালের ১লা মার্চ জার্মান ফ্যাসিস্টরা বুলগেরীয় কমিউনিস্ট পার্টির দুই সহকর্মী ব্লাগোই পপোভ ও ভাসিল তানেভসহ জর্জি ডিমিট্রভকে গ্রেপ্তার করে। কিছুদিন আটক রাখার পর লাইপৎসিকে শুরু হয় বিশ্ববিখ্যাত ‘রাইখস্টাক বিচার’।
‘সমাজতান্ত্রিক জার্মানি’ পত্রিকার সেপ্টেম্বর-অক্টোবর ১৯৭৩ সংখ্যায় এ-প্রসঙ্গে লেখা হয়েছে :
“লাইপৎসিক আদালতে জঙ্গি ডিমিট্রভ প্রথম কথা বলেছিলেন ১৯৩৩ সালের ২৩শে সেপটেম্বর তারিখে। সেটি ছিল বিচারের তৃতীয় দিন। আদালতে উপস্থিত ছিলেন ৮২ জন বিদেশী সাংবাদিক ও জার্মান পত্রপত্রিকার ৬২ জন সাংবাদিক। কমিউনিস্ট, সোশ্যালিস্ট ও বামপন্থী বুর্জোয়া পত্রপত্রিকার সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশ করতে দেওয়া হয়নি। গোড়ার দিকে কোনো সোভিয়েত সাংবাদিক ছিলেন না। পরে, সোভিয়েত গভর্নমেন্ট যখন অনুরূপ ব্যবস্থা অবলম্বন করে সোভিয়েত ইউনিয়নে জার্মান সাংবাদিকদের তৎপরতার ওপরে বিধি-নিষেধ আরোপ করলেন, একমাত্র তখনই জার্মান ফ্যাসিস্ট কর্তারা সোভিয়েত সাংবাদিকদের আদালতে প্রবেশ করতে দিয়েছিল। পুরোপুরি সাজিয়ে ও পাকিয়ে তোলা উত্তেজনা-সৃষ্টির এই মামলার জয়লাভ সম্পর্কে ফ্যাসিস্টরা এতই নিশ্চিত ছিল যে গোড়ার দিকে আদালতের সওয়াল তারা বেতারে প্রচার করতে থাকে। তারপরেই ২৩শে সেপটেম্বর তারিখে ডিমিট্রভের প্রথম ভাষণের পরে বেতারে প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। কিন্তু তাতেও এই বিচার সম্পর্কে বিশ্বজোড়া যে আগ্রহ সৃষ্টি হয়েছিল তা বন্ধ হয় নি। লোকের মুখে মুখে ফিরতে থাকে জর্জি ডিমিট্রভের নাম। …লাইপৎসিক আদালতে ডিমিট্রিভ গোটা বিশ্বের সামনে তুলে ধরেছিলেন কমিউনিস্ট মতাদর্শের নীতি। আদালতে ঘোষণা করেছিলেন :
একথা সত্য যে, আমি একজন বলশেভিক, একজন প্রোলেতারীয় বিপ্লবী। একথাও সত্য যে, বুলগেরীয় কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য হিসেবে ও কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহক কমিটির সদস্য হিসেবে আমি একজন দায়িত্বশীল কর্মী ও নেতা। কিন্তু তাই বলে আমি সন্ত্রাসবাদী বা মতান্ধ নই, হঠাৎ আক্রমণে লিপ্ত চক্রী নই, নই আগুনবাজ । …
একথাও সত্য যে, সোভিয়েত ইউনিয়নের কমিউনিস্ট পার্টির আমি উৎসাহী সমর্থক ও গুণগ্রাহী, কেননা এই পার্টি ভূ-গোলকের এক-ষষ্ঠাংশ জুড়ে বিস্তৃত বিশ্বের সবচেয়ে বড়ো দেশটি শাসন করছে এবং সাফল্যের সঙ্গে সমাজতন্ত্র নির্মাণ করছে।
রোমাঁ রোলাঁ তাঁর ‘শিল্পীর নবজন্ম’ গ্রন্থে ১৯৯৩ সালের ১১ই ডিসেম্বর এ-বিষয়ে লিখেছেন: “আমাদের সময়কার সবচেয়ে চাঞ্চল্যকর মামলা শেষ হইয়া আসিতেছে।…কিন্তু যে উত্তেজনার সৃষ্টি করা হইয়াছে তাহার ফলে বিচারশালার আবহাওয়া বিষাক্ত হইয়া উঠিয়াছে…। যে মন্ত্রীর হাতে বিচার-বিভাগের ভার ন্যস্ত আইনের প্রতি শ্রদ্ধা দেখানোর কথা যাহার সবচেয়ে বেশি এবং ধৃত ব্যক্তিদের নিরাপত্তার জন্য যিনি নিজে দ্বায়ী তিনিই যখন বিচারশালার মধ্যেই দাঁড়াইয়া প্রকাশে আসামীদের ভয় দেখান, রায় যদি তাহার নির্দেশানুযায়ী না হয়, তবে আসামীদের নিহত হইবার সম্ভাবনা রহিয়াছে।
তারপর তথাকথিত লাইপৎসিক মামলা শেষ হল। ‘সমাজতান্ত্রিক জার্মানি’র ঐ সংখ্যায় ঠিকই বলা হয়েছে:
“আদালতের কাঠগড়াকে জর্জি ডিমিট্রভ ব্যবহার করেছিলেন সমাজতন্ত্র ও কমিউনিজমের ধ্যানধারণা প্রচার করার জন্য। ফ্যাসিস্ট আদালতের সমস্ত রকমের প্রচেষ্টা সত্ত্বেও কমিউনিস্ট পার্টির ওপরে রাইখস্টাক অগ্নিকাণ্ডের দোষ চাপানো যায়নি এবং জর্জি ডিমিট্রভকে মুক্তি দিতে হয়েছিল।”
সম্প্রতি ডিমিট্রভের ওপর একটি সোভিয়েত তথ্যচিত্র দেখার সুযোগ আমাদের হয়েছে। রোলাঁ, বারব্যুস প্রমুখ বিশ্ববিশ্রুত লেখক ও কাশ্যাঁ, ইবারুরি, তোগলিয়াত্তি প্রমুখ অগ্রগণ্য রাজনৈতিক নেতার যৌথ উদ্যোগে জর্জি ডিমিট্রভের মুক্তির দাবিতে যে যুক্তফ্রন্ট গড়ে ওঠে—তা শুধু ফ্যাসিস্টবিরোধী আন্দোলনের এক দিকচিহ্নই ছিল না, ছিল যুক্তফ্রন্ট তত্ত্বের ভবিষৎ প্রবক্তার জন্য বিশ্ববিবেকের আগমনী গীত, যথাযোগ্য অর্ঘ্য।
সোভিয়েত ইউনিয়ন জর্জি ডিমিট্রভকে নাগরিকত্ব দান করে এবং মুক্তির পর তাঁকে হত্যার ফ্যাসিস্ট চক্রান্ত ব্যর্থ করে সোভিয়েত বিমানে বিজয়ী বীরকে “বিশ্বশ্রমিক-প্রিয়” সোভিয়েত ভূমিতে নিয়ে আসে ।
কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের অবিসংবাদী নেতা হিসেবে ডিমিট্রভের বিপ্লবী জীবন অব্যাহত থাকে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর তিনি হন মুক্ত সমাজতান্ত্রিক বুলগেরিয়ার প্রথম প্রধানমন্ত্রী। সমাজতন্ত্র নির্মাণের কাজে মগ্ন অবস্থারই ১৯৪৯ সালে এই সৃজনশীল কমিউনিস্টের জীবনদীপ নির্বাপিত হয়।
২রা ও ৩রা আগস্ট ১৯৩৫ সালে কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের ঐতিহাসিক সপ্তম কংগ্রেসে আস্তর্জাতিকের সাধারণ সম্পাদক জর্জি ডিমিট্রভ যে বিশ্ববিখ্যাত রিপোর্ট পেশ করেন এবং আলোচনার যে-উত্তর দেন, ‘মনীষা গ্ৰন্থালয়’ সম্প্রতি ‘যুক্ত ফ্রন্ট/ ফ্যাসিবাদ ও যুদ্ধের বিরুদ্ধে সংগ্রাম’ নামে সেই মহান আন্তর্জাতিক দলিলের বঙ্গানুবাদ প্রকাশ করেছে। সেই বইয়েরই একটি অধ্যায়—‘ফ্যাসিবাদের শ্রেণী চরিত্র’ আমরা পুনর্মুদ্রণ করলাম । অধ্যায়ের শুরুতে ছিল ”কমরেডগণ” এই সম্বোধন। রচনাটির কয়েক জায়গায় মোটা হরফ ব্যবহৃত হয়েছিল। আমরা বাদ দিয়েছি। বানান ও যতিচিহ্নে প্রয়োজনীয় সংশোধন করা হয়েছে।
বার্থ অফ ফ্যাসিজম (১৯৩৬) শিল্পী: ডেভিড আলফারো সিকেরোস
মূল লেখা
কমিউনিস্ট আন্তর্জাতিকের কার্যনির্বাহী কমিটির ত্রয়োদশ প্লেনাম সঠিকভাবেই শাসনক্ষমতায় অধিষ্ঠিত ফ্যাসিবাদকে সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল, সবচেয়ে জাতিদাম্ভিক এবং লগ্নী পুঁজির সবচেয়ে সাম্রাজ্যবাদী প্রতিভূর প্রকাশ্য সন্ত্রাসবাদী একনায়ত্ব বলে বর্ণনা করেছিল।
সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল ধরনের ফ্যাসিবাদ হল জার্মান ফ্যাসিবাদ। এর নিজেকে জাতীয় সমাজতন্ত্র বলে অভিহিত করায় ধৃষ্টতা রয়েছে, যদিও সমাজতন্ত্রের সঙ্গে এর কোনই মিল নেই। হিটলারের ফ্যাসিবাদ শুধুমাত্র বুর্জোয়া জাতীয়তাবাদ নয়, এ হল পাশবিক জাতিদম্ভ। এ হল রাজনৈতিক দস্যুতার এক শাসনব্যবস্থা, শ্রমিকশ্রেণী, কৃষক, পেটি-বুর্জোয়া ও বুদ্ধিজীবীদের বিপ্লবী অংশের বিরুদ্ধে প্ররোচনা ও নির্যাতনের ব্যবস্থা। এ হল মধ্যযুগীয় বর্বরতা ও পাশবিকতা, অন্যান্য জাতিদের সম্পর্কে বল্গাহীন আক্রমণ ।
জার্মান ফ্যাসিবাদ আন্তর্জাতিক প্রতিবিপ্লবের উদ্যত খড়গ হিসাবে, সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধের প্রধান প্ররোচক হিসাবে এবং সমগ্র বিশ্বের মেহনতী মানুষের মহান পিতৃভূমি সোভিয়েত ইউনিয়নের বিরুদ্ধে জেহাদের প্রবর্তক হিসাবে কাজ করে চলেছে।
ফ্যাসিবাদ অটো বাওয়ারের মত অনুযায়ী “প্রলেতারিয়েত ও বুর্জোয়া—এই দুই শ্রেণীর ঊর্ধ্বে অবস্থিত রাষ্ট্রক্ষমতার কোনো একটা রূপ নয়।” অথবা ব্রিটিশ সোশ্যালিস্ট ব্রেলস ফোর্ডের ঘোষণামতো “রাষ্ট্রের শাসনযন্ত্র-দখলকারী পেটি বুর্জোয়াদের বিদ্রোহ”ও নয়। না, ফ্যাশিবাদ শ্রেণীর উর্ধ্বে কোনো সরকার নয় অথবা লগ্নী পুঁজির উপর পেটি বুর্জোয়া বা ভবঘুরে সর্বহারার কোনো সরকার নয়। ফ্যাশিবাদ হল লগ্নী পুঁজিরই শক্তি। এ হল শ্রমিকশ্রেণী, কৃষক ও বুদ্ধিজীবীদের বিপ্লবী অংশের বিরুদ্ধে সন্ত্রাসবাদী প্রতিহিংসার সংগঠন। পররাষ্ট্র নীতির ক্ষেত্রে ফ্যাসিবাদ হল জাতিদম্ভের নগ্নতম রূপ যা অপরাপর জাতির বিরুদ্ধে পাশবিক ঘৃণার প্ররোচনা যোগায় ।
ফ্যাসিবাদের এই সঠিক চরিত্রের উপর বিশেষ গুরুত্ব আরোপ অবশ্যই করতে হবে; কারণ অনেকগুলি দেশে ফ্যাসিবাদ সমাজবাদী বুলির আড়ালে সেই অগণিত পেটিবুর্জোয়া জনগণের, যারা সংকটের আবর্তে নিজ নিজ গতিপথ থেকে বিচ্যুত হয়েছে তাদের এবং এমনকি সর্বহারাশ্রেণীর সবচেয়ে পশ্চাদপদ স্তরের কোনো কোনো অংশেরও সমর্থন অর্জন করতে সক্ষম হয়েছে। ফ্যাসিবাদের প্রকৃত শ্রেণীচরিত্র ও এর সঠিক প্রকৃতি অনুধাবন করলে, তারা কখনই একে সমর্থন জানাত না ৷
এক-একটি নির্দিষ্ট দেশের ঐতিহাসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অবস্থা অনুযায়ী এবং জাতীয় বৈশিষ্ট্য ও আন্তর্জাতিক অবস্থান অনুযায়ী ফ্যাসিবাদ ও ফ্যাসিবাদী একনায়কত্বের বিকাশ বিভিন্ন দেশে ভিন্ন ভিন্ন রূপ গ্রহণ করে। কোনো কোনো দেশে, বিশেষ করে যেখানে ফ্যাসিবাদের কোনো ব্যাপক গণভিত্তি নেই এবং যেখানে ফ্যাসিবাদী বুর্জোয়াদের নিজেদের শিবিরে নানা উপদলের সংঘর্ষ খুব তীব্র, সেখানে ফ্যাসিবাদ সরাসরিভাবে সংসদকে অবলোপ করার সাহস রাখে না আর তাই অন্যান্য বুর্জোয়া দল এবং এমনকি সোশ্যাল ডেমোক্রাটিক পার্টিকেও কিছু পরিমাণ বৈধতা রাখবার অনুমতি দেয়। অন্য সকল দেশে, যেখানে শাসক বুর্জোরাশ্রেণী এক আসন্ন বিপ্লবের আবির্ভাব সম্পর্কে শঙ্কিত, সেখানে তারা হয় তৎক্ষণাৎ অথবা প্রতিদ্বন্দ্বী দল ও উপদশের বিরুদ্ধে নির্যাতন ও সন্ত্রাসের শাসনকে তীব্রতর করে তার সীমাহীন একচেটিয়া রাজনৈতিক অধিকার প্রতিষ্ঠা করে। এর দ্বারা ফ্যাসিবাদের অবস্থা যখন বিশেষভাবে সংকটাপন্ন হয়ে ওঠে, তখন এর দরুন কিন্তু ফ্যাসিবাদের পক্ষে নিজের শ্রেণীচরিত্রকে পরিবর্তিত না করেও প্রকাশ সন্ত্ৰাসবাদী একনায়কত্বের সঙ্গে স্থূল ভুয়ো সংসদীয় পন্থার সংযুক্তিসাধন ও নিজের ভিত্তিপ্রসারের প্রচেষ্টায় বাধা হয় না ।
ফ্যাসিবাদের ক্ষমতালাভ এক বুর্জোয়া সরকার থেকে অপর এক সরকারে মামুলি উত্তরণ নয়, এ হল বুর্জোয়াদের শ্রেণীকর্তৃত্বের একটি রাষ্ট্রীয় রূপ, বুর্জোয়া গণতন্ত্রের জায়গায় অন্য এক রাষ্ট্রীয় রূপের প্রকাশ, সন্ত্রাসমূলক একনায়কত্বের প্রতিষ্ঠা। এই পার্থক্যটি উপেক্ষা করা গুরুতর ভুল হবে; এই ভুল বিপ্লবী সর্বহারাদের আদতে, ফ্যাসিবাদের ক্ষমতা দখলের বিপদের বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য শহর ও গ্রামের মেহনতী মানুষের ব্যাপক সমাবেশ ব্যাহত করবে এবং তাদের বুর্জোয়া শিবিরের মধ্যেকার স্ব-বিরোধিতার সুযোগ গ্রহণ থেকে বঞ্চিত করবে। কিন্তু আবার ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক দেশগুলিতে বুর্জোয়াশ্রেণীর দ্বারা অনুসৃত ক্রমবর্ধমান প্রতিক্রিয়াশীল কার্যকলাপ, যা মেহনতী জনগণের গণতান্ত্রিক স্বাধীনতাকে দমন করে, সংসদের অধিকারকে খর্ব করে ও তা নিয়ে জোচ্চুরি করে এবং বিপ্লবী আন্দোলনের বিরুদ্ধে দমননীতিকে তীব্র করে, সেগুলির গুরুত্বকে ছোট করে দেখা কিছু কম বিপজ্জনক ও কম গুরুতর ভ্রাস্তি নয় ।
কমরেডগণ, ফ্যাসিবাদের ক্ষমতালাতকে এই রকম সরলীকৃত ও স্বচ্ছরূপে কল্পনা করা ভুল হবে যে, এ যেন লগ্নী পুঁজির কোনো একটি কমিটি কোনো এক নির্দিষ্ট তারিখে ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করল। বাস্তবক্ষেত্রে, ফ্যাসিবাদ সাধারণত ক্ষমতায় আসে পুরনো বুর্জোয়া পার্টিগুলির অথবা ঐ পার্টিগুলির কোনো নির্দিষ্ট অংশের মধ্যে পারস্পরিক লড়াইয়ের গতিপথে, অথবা কখনও কখনও তাদের বিরুদ্ধে কঠোর লড়াইয়ের গতিপথে, এমনকি ফ্যাসিস্ট শিবিরের মধ্যেই লড়াইয়ের গতিপথে—কখনও কখনও এ লড়াই সশস্ত্র সংঘর্ষে পরিণত হয় যেমন হয়েছিল জার্মানি, অস্ট্রিয়া ও অপরাপর দেশে। এই সবকিছু কিন্তু এই সত্যটিকে চাপা দেয় না যে, ফ্যাসিবাদী একনায়কত্ব প্রতিষ্ঠার আগে বুর্জোয়া সরকারগুলি সাধারণত কতকগুলি প্রাথমিক পর্যায় অতিক্রম করে এবং কতকগুলি প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থা অবলম্বন করে যা ফ্যাসিবাদের ক্ষমতা দখলের পথকে প্রত্যক্ষভাবে সুগম করে। বুর্জোয়াদের এই প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এবং প্রস্তুতিপর্বে ফ্যাসিবাদের শক্তিবৃদ্ধির বিরুদ্ধে যে সংগ্রাম না করে, সে ফ্যাসিবাদের বিষয়কে প্রতিহত করার ক্ষমতা রাখে না, বরঞ্চ সেই বিজয়ের পথ প্রশস্ত করে ।
সোশ্যাল ডেমোক্রাট নেতারা ফ্যাসিবাদের প্রকৃত শ্রেণীচরিত্রকে চাপা দিয়ে জনতার কাছ থেকে তাকে গোপন রেখেছিল, এবং বুর্জোয়াত্বের ক্রমবর্ধমান প্রতিক্রিয়াশীল ব্যবস্থাবলীর বিরুদ্ধে সংগ্রামের জন্য তাদের আহ্বান জানায় নি। তারা এক ঐতিহাসিক দ্বায়িত্ব বহন করছে এই কারণে যে, ফ্যাসিবাদী দেশে মেহনতী জনগণের এক বিশাল অংশ ফ্যাসিবাদের মধ্যে তাদের সবচেয়ে ঘৃণ্য শত্রু, রক্তলোলুপ, লুণ্ঠনকারী লগ্নী পুঁজিকে চিনতে ব্যর্থ হয়েছিল এবং ঐ জনগণ তাকে প্রতিহত করতে প্রস্তুত ছিল না।
জনগণের উপর ফ্যাসিবাদের প্রভাবের উৎস কি? ফ্যাসিবাদ জনগণকে আকর্ষণ করতে সক্ষম হয় এই কারণে যে, জনগণের সবচেয়ে জরুরী প্রয়োজন ও দাবিগুলির কাছে সে মহাবাগাড়ম্বরে আবেদন করে। ফ্যাসিবাদ শুধু জনগণের মধ্যে গভীরভাবে বদ্ধমূল সংস্কারগুলিকেই উসকিয়ে দেয় না, উপরন্তু তাদের অপেক্ষাকৃত উন্নততর অনুভূতিগুলি, যথা- তাদের ন্যায় বিচারের চেতনাকে, এমনকি কখনও কখনও তাদের বিপ্লবী ঐতিহ্যকেও কাজে লাগায়৷ কেন জার্মান ফ্যাসিবাদীরা, যারা বড় বড় বুর্জোয়াদের সেবাদাস ও সমাজতন্ত্রের মারাত্মক শত্রু, ভারা জনগণের কাছে নিজেদের “সমাজতন্ত্রী” বলে পরিচয় দেয় এবং তাদের ক্ষমতাদখলকে বিপ্লব বলে বর্ণনা করে? তার কারণ জার্মানির অগণিত মেহনতী জনগণের সমাজতন্ত্রের যে আকাঙ্ক্ষা এবং বিপ্লবের প্রতি যে বিশ্বাস রয়েছে তাকেই কাজে লাগাবার চেষ্টা করে।
শিল্পী: মারিও সিরোনি
ফ্যাসিবাদ চরম সাম্রাজ্যবাদীদের স্বার্থেই কাজ করে, কিন্তু জনগণের কাছে নিজেকে নির্ধাতিত জাতিগুলির রক্ষকের ছদ্মবেশে উপস্থিত করে এবং অপমানিত জাতীয় অনুভূতিগুলিকে নাড়া দেয়, যেমন জার্মান ফ্যাসিবাদীরা করেছিল যখন তারা “ভার্সাই চুক্তির বিরোধিতা”র স্লোগান তুলে পেটি বুর্জোয়া জনগণের সমর্থন অর্জন করেছিল।
ফ্যাসিবাদের উদ্দেশ্য হল জনগণের উপর বল্গাহীন শোষণ কায়েম করা, কিন্তু লুণ্ঠনকারী বুর্জোয়া, ব্যাঙ্ক, ট্রাস্ট ও ধনকুবেরদের বিরুদ্ধে মেহনতী জনগণের তীব্র ঘৃণা নিয়ে ফ্যাসিবাদ অতি সুকৌশলে, পুঁজিবাদবিরোধী বুলি কপচিয়ে ও রাজনৈতিকভাবে অপরিণত জনগণের কাছে এক-একটি নির্দিষ্ট সময়ে সবচেয়ে লোভনীয় স্লোগান নিয়ে হাজির হয়ে তাদের চিত্ত জয় করে। তাদের এই রকমের স্নোগান হল: জার্মানিতে “ব্যক্তিগত মঙ্গলের চেয়ে সাধারণ মহা অনেক ঊর্ধ্বে”; ইতালিতে “আমাদের রাষ্ট্র ধনতান্ত্রিক নয়, বরং এক যৌথ রাষ্ট্র”; জাপানে “শোষণহীন জাপানের জন্ম”, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে “সম্পদের ভাগ নাও” ইত্যাদি ।
ফ্যাসিবাদ জনগণকে সবচেয়ে দুর্নীতিপরায়ণ ও ঘুষখোর লোকেদের হাতে শিকার হবার জন্য তুলে দেয়, কিন্তু জনগণের সামনে হাজির হয় এক “সং ও নিষ্কলুষ সরকার”-এর ছবি নিয়ে। বুর্জোয়া গণতান্ত্রিক সরকার সম্পর্কে জনসাধারণের মোহভঙ্গের উপর বেসাতি করে ফ্যাসিবাদ দুর্নীতির কপট নিন্দা করে [উদাহরণস্বরূপ জার্মানিতে বারমাত এবং স্কলারেকের কাণ্ড, ফ্রান্সে স্ট্রাভিস্কির কাণ্ড এবং অনুরূপ অন্যান্য অসংখ্য ঘটনা ]।
পুরনো বুর্জোয়া পার্টিগুলিতে আস্থা হারিয়ে যে জনসাধারণ তাদের পরিত্যাগ করেছে সেই জনসাধারণকে ফ্যাসিবাদ বুর্জোয়াদের সবচেয়ে প্রতিক্রিয়াশীল চক্রের স্বার্থেই পাকড়ায়। কিন্তু বুর্জোয়া সরকারগুলির বিরুদ্ধে তার আক্রমণের কঠোরতার দ্বারা ও পুরনো বুর্জোয়া দলগুলির প্রতি তার আপসহীন ভাবভঙ্গির দ্বারাই ফ্যাসিবাদ এই জনগণকে প্রভাবিত করে। মানববিদ্বেষ ও ছলনায় বুর্জোয়া-প্রতিক্রিয়াধারাকে ছাপিয়ে ফ্যাসিবাদ তার প্রতিটি দেশের জাতীয় বৈশিষ্ট্যের এমনকি একই দেশের ভিন্ন ভিন্ন সামাজিক স্তরের বৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপ খাইয়ে নেয়। অভাব, বেকারত্ব এবং জীবনের অনিশ্চয়তার দরুন হতাশ পেটি বুর্জোয়া জনগণ, এমনকি শ্রমিকদেরও একটি অংশ ফ্যাসিবাদের এই সামাজিক ও জাতিদাম্ভিক বাগাড়ম্বরের শিকার হয় ।
সর্বহারাশ্রেণীর বিপ্লবী আন্দোলনের বিরুদ্ধে এবং বিক্ষুব্ধ জনগণের বিরুদ্ধে আক্রমণের পার্টি হিসাবেই ফ্যাসিবাদ ক্ষমতায় আসে, কিন্তু তবুও সে তার ক্ষমতালাভকে বুর্জোয়াদের বিরুদ্ধে “সমগ্র জাতির পক্ষ থেকে” এক “বিপ্লবী” আন্দোলন হিসাবে এবং সমগ্র জাতির “পরিত্রাণ”-এর প্রতীক হিসাবে প্রতিপক্ষ করে [ এখানে আমরা মুসোলিনির রোম “অভিযান”, পিলসুদস্কির ওয়ারশ “অভিযান”, জার্মানিতে হিটলারের ন্যাশনাল নোশ্যালিস্ট “বিপ্লব” এবং অনুরূপ ঘটনা স্মরণ করতে পারি ] ৷
কিন্তু ফ্যাসিবাদ যে কোনো মুখোশই ধারণ করুক, যে কোনো রূপেই নিজেকে উপস্থাপিত করুক এবং যে কোনো পথেই ক্ষমতায় আসুক, তবুও ফ্যাশিবাদ হল মেহনতী জনগণের উপর পুঁজির সবচেয়ে হিংস্র আক্রমণ;—ফ্যাসিবাদ হল বল্গাহীন জাতিদম্ভ ও আগ্রাসী যুদ্ধ,— ফ্যাসিবাদ হল প্রতিক্রিয়া ও প্রতিবিপ্লব : ফ্যাসিবাদ হল শ্রমিকশ্রেণীর এবং সমস্ত মেহনতী মানুষের সবচেয়ে ঘৃণ্য শত্রু ।