Tag: প্যারি কমিউন ১৫০

  • মিখাইল বাকুনিন।। প্যারি কমিউন ও রাষ্ট্রের ধারণা

    মিখাইল বাকুনিন।। প্যারি কমিউন ও রাষ্ট্রের ধারণা

    • ভাষান্তর: সহুল আহমদ

    [অনুবাদকের মন্তব্য: মিখাইল বাকুনিনের ‘প্যারি কমিউন ও রাষ্ট্রর ধারণা’ প্রবন্ধটি ১৮৭১ সালে লেখা হয়েছিল। শিরোনামই বলে দিচ্ছে যে তৎকালের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা [এবং আমাদের জন্য ঐতিহাসিক] প্যারি কমিউনই প্রবন্ধের মূল বিষয়বস্তু। এটি বাকুনিনের প্রধান কাজ The Knouto-Germanic Empire and the Social Revolution এর দ্বিতীয় অংশের মুখবন্ধ। প্রবন্ধটি স্যাম ডলগফ সম্পাদিত ও অনূদিত Bakunin on Anarchy গ্রন্থে ১৯৭১ সালে সংকলিত হয়েছিল। সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের ইতিহাসে ১৮৭১ সালের প্যারি কমিউন এক ঐতিহাসিক মাইলফলক। এর ঐতিহাসিক গুরুত্ব নিয়ে প্রায় সকল সমাজতান্ত্রিক স্কুলই তর্ক-বিতর্ক করেছে, এবং আজতক সেগুলো চালু আছে। মার্ক্স, লেনিন যেমন নিজ নিজ তত্ত্বের আলোকে একে প্রশংসা করেছেন, ব্লাংকুইস্টরাও তেমনি প্রশংসা করেছেন। এই প্রবন্ধেও বাকুনিনও প্যারি কমিউনের উচ্চকিত প্রশংসা করেন। বাকুনিন প্রশংসা করার পাশাপাশি আন্দোলনের কিছু দুর্বলতাও তুলে ধরেন, এবং এগুলোর ঐতিহাসিক হেতু খোঁজার চেষ্টা করেন। তবে বাকুনিনের কাছে প্যারি কমিউন ছিল উছিলামাত্র, তিনি আসলে এখানে রাষ্ট্র নিয়েই আলাপ করেছেন, রাষ্ট্র ও গির্জার [বা, ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের] সম্পর্কের দিকে আলোকপাত করেছেন। বরাবরের মতন, নিজেকে স্বাধীনতাপ্রেমী হিসাবেই উপস্থাপন করেছেন। অনুবাদের জন্য মার্ক্সিস্ট.অর্গ –এ প্রকাশিত সংস্করণটিকেই ব্যবহার করা হয়েছে। অনুবাদে যে কোনো ধরণের ভুল-ভ্রান্তি নজরে পড়ে অনুবাদকের গোচরে আনার অনুরোধ থাকলো।]

    মিখাইল বাকুনিন — স্কেচ: রে ম্যাক্সওয়েল

    আমার অন্যান্য লেখার মতো এই লেখাও বিভিন্ন ঘটনাবলীর ফসল। এটা আমার লেটার্স টু অ্যা ফ্রেঞ্চম্যান (সেপ্টেম্বর ১৮৭০) লেখার স্বাভাবিক ধারাবাহিকতা, যেখানে আমি বর্তমান ফ্রান্সসহ পুরো সভ্য সমাজকে ঘিরে ধরা ভয়াবহ বিপর্যয় সম্পর্কে সহজ কিন্তু কষ্টদায়ক পূর্বাভাস দিয়েছিলাম; যে বিপর্যয়ের একমাত্র নিরাময় হচ্ছে সামাজিক বিপ্লব। 

    আমার এখনকার উদ্দেশ্য হচ্ছে এই ধরণের বিপ্লবের জরুরত প্রমাণ করা। আমি সমাজের ঐতিহাসিক বিকাশ, এবং বর্তমানে আমাদের চোখের সামনে ইউরোপে যা হচ্ছে তাকে পর্যালোচনা করবো। সুতরাং যারা সত্যের জন্য ব্যাকুল তারা এটা গ্রহণ করে এই দার্শনিক নীতি ও ব্যবহারিক লক্ষগুলোকে প্রকাশ্যে এবং দ্ব্যর্থ-হীনভাবে জাহির করতে পারেন। এই নীতি ও লক্ষ্যগুলো আমরা যাকে সামাজিক বিপ্লব বলছি তার একেবারে কেন্দ্রীয় বিষয়।

    আমি জানি আমার এই স্ব-আরোপিত কাজটি সহজ নয়। এটা গ্রহণ আমার ব্যক্তিগত উদ্দেশ্য থাকলে আমাকে অহংকারী বলা হতে পারে। আমি আমার পাঠকদের নিশ্চিত করতে চাই যে আমার এমন কোনো উদ্দেশ্য নেই। আমি কোনো পণ্ডিত নই, বা দার্শনিক নই, এমনকি পেশাদার লেখকও নই। আমি জীবনে খুব বেশি লেখালেখিও করি নাই, এবং আত্মরক্ষার উদ্দেশ্য ব্যতিরেক কিছুই লিখি নি, এবং যখনই নিজের কোনো অভিব্যক্তি প্রকাশের জন্য আমার স্বভাবজাত অপছন্দকে কাটিয়ে উঠতে আমার উৎসাহী প্রতীতি বাধ্য করেছে কেবল তখনই কিছু লিখেছি।

    তাহলে আমি কে এবং কোন বিষয়টা আমাকে এই মুহূর্তে বর্তমান কাজটি প্রকাশে উদ্বুদ্ধ করছে? আমি একজন সত্যানুরাগী, এবং এই দুনিয়াকে বর্বর ও দাসত্বের বন্ধনে আবদ্ধ করার নিমিত্তে প্রতিষ্ঠিত ব্যবস্থা কর্তৃক ব্যবহৃত কুৎসিত অলীক কাহিনীগুলোর একজন নির্মম শত্রু। এই ব্যবস্থা সকল সময়ের ধর্মীয়, আধ্যাত্মিক, রাজনৈতিক, আইনি, অর্থনৈতিক এবং সামাজিক কলঙ্ক থেকে লাভবান হয়েছে। আমি একজন দুর্বার স্বাধীনতাপ্রেমি। আমি স্বাধীনতাকে মানববুদ্ধি, মর্যাদা ও সুখানুভব বিকাশের একমাত্র পরিবেশ হিসাবে বিবেচনা করি। আমি সেই আনুষ্ঠানিক স্বাধীনতাকে বোঝাচ্ছি না যা কিনা রাষ্ট্র কর্তৃক সরবরাহ, পরিমাপ ও নিয়ন্ত্রণ করা হয়। কেননা এই স্বাধীনতা এক অন্তহীন মিথ্যালাপ, এবং এটা মুষ্টিমেয়ের সুবিধার্থে বাকীদের গোলামী ব্যতীত আর কিছুই নয়। আমি রুশোসহ অন্যান্য বুর্জোয়া লিবারেল স্কুলসমূহ কর্তৃক উত্থাপিত ব্যক্তিস্বাত্যন্ত্রবাদী, অহংবাদী এবং ভুয়া স্বাধীনতার কথাও বলছি না; এই বুর্জোয়া লিবারেলবাদ রাষ্ট্রের মাধ্যমে প্রকাশিত সকলের অধিকারকে ব্যক্তির অধিকারের সীমা/বাধা হিসাবে বিবেচনা করে, ফলে এটি ব্যক্তির অধিকারকে শূন্যতে পর্যবসিত করে। আমি কেবল সেই স্বাধীনতাকেই বোঝাচ্ছি যা আমাদের প্রত্যেকের মধ্যে সুপ্ত বস্তুগত, বুদ্ধিবৃত্তিক এবং নৈতিক সক্ষমতাগুলোর পূর্ণ বিকাশ ঘটাবে। এই স্বাধীনতা কেবল আমাদের প্রকৃতির আইন ব্যতীত অন্য কোনো বিধিনিষেধ জানে না। সঠিকভাবে বলতে গেলে, এর ফলশ্রুতিতে আর কোনো বিধিনিষেধই থাকে না, কেননা এইসব আইন আমাদের বাইরে থেকে, পাশে থেকে বা আমাদের মাথার উপর থেকে আরোপ করা হয় না। এই আইনগুলো বিষয়ীগত, আমাদের মধ্যেই নিহিত। এগুলো খোদ আমাদের সত্তার ভিত্তি গঠন করে। এগুলোকে সঙ্কোচন করার পরিবর্তে এগুলোর মধ্যে আমাদের প্রকৃত অবস্থা এবং আমাদের স্বাধীনতার কার্যকর কারণটি দেখতে পাওয়া উচিৎ; যেখানে এক ব্যক্তির স্বাধীনতা অন্য আরেক ব্যক্তির স্বাধীনতার সীমা হিসাবে বিবেচিত হবে না, বরঞ্চ তার নিজের স্বাধীনতারই নিশ্চিতকরণ এবং প্রসারণ হিসাবে বিবেচিত হবে। সংহতির মাধ্যমেই স্বাধীনতা, সমতার মধ্যেই স্বাধীনতা। আমি বোঝাচ্ছি নিষ্ঠুর শক্তির ওপর স্বাধীনতার জয়জয়কার, এবং সর্বদাই এ ধরণের শক্তির আসল বহিঃপ্রকাশ হচ্ছে কর্তৃত্বের নীতি। আমি সেই স্বাধীনতাকে বোঝাচ্ছি যা মর্ত্যে ও স্বর্গের দেবমূর্তিকে চূর্ণবিচূর্ণ করে দিবে এবং সকল গির্জা ও রাষ্ট্রের ধ্বংসাবশেষের ওপর সংহতির ভিত্তিতে মানবজাতির একটি নতুন দুনিয়া তৈরি করবে।

    আমি অর্থনৈতিক ও সামাজিক সমতার একজন বিশ্বস্ত সমর্থক, কারণ আমি জানি এটা ছাড়া স্বাধীনতা, ন্যায়, মানব মর্যাদা, নৈতিকতা, ব্যক্তির মঙ্গলসহ জাতিসমূহের সমৃদ্ধি সবকিছুই মিথ্যালাপ ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু যেহেতু আমি স্বাধীনতাকে মানবজাতির প্রাথমিক শর্ত হিসাবে বিবেচনা করি, আমি বিশ্বাস করি যে শ্রমিকদের স্বতঃস্ফূর্ত সংগঠন এবং স্বাধীনভাবে সংগঠিত উৎপাদক সমিতি কর্তৃক সম্পত্তির সামষ্টিক মালিকানার মাধ্যমে পৃথিবীতে সমতাকে প্রতিষ্ঠিত করতে হবে। এবং এটা করতে হবে কমিউনসমূহের স্বতঃস্ফূর্ত ফেডারেশন দিয়ে কর্তৃত্বপরায়ন পিতৃতান্ত্রিক রাষ্ট্রকে প্রতিস্থাপন করার মাধ্যমে।

    এই জায়গাতেই একটা মৌলিক বিভাজন দেখা দেয়, একদিকে থাকেন সমাজতান্ত্রিক ও বিপ্লবী যৌথবাদী [কালেক্টিভিস্ট] এবং অন্যদিকে থাকেন কর্তৃত্বপরায়ন কমিউনিস্ট যারা রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাকে সমর্থন করেন। তাদের চূড়ান্ত লক্ষ্য অভিন্ন। উভয়ই সমানভাবে একটি নতুন সমাজ ব্যবস্থা তৈরির আকাঙ্ক্ষা করেন, প্রথমত সামষ্টিক শ্রম সংগঠনের মাধ্যমে, সকলের জন্য সমান শর্তের অধীনে, ঘটনার সহজাত শক্তির মাধ্যমে সবার ওপর অবধারিতরূপে আরোপ করে, এবং দ্বিতীয়ত উৎপাদনের হাতিয়ারের ওপর সামষ্টিক মালিকানার মাধ্যমে। পার্থক্য হচ্ছে এই যে, কমিউনিস্টরা মনে করেন তারা শ্রমিক শ্রেণির, প্রধানত শহরের প্রলেতারিয়েতদের রাজনৈতিক ক্ষমতার সংগঠন এবং বিকাশের মাধ্যমে তাদের লক্ষ্য অর্জন করবেন, সহায়তা পাবেন বুর্জোয়া র্যাডিকেলবাদের। অন্যদিকে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিকরা বিশ্বাস করেন তারা শহর ও গ্রামের শ্রমিক শ্রেণির অ-রাজনৈতিক বা রাজনীতি-বিরোধী সামাজিক ক্ষমতার সংগঠন ও বিকাশের মাধ্যমে সফলকাম হবেন; উঁচু শ্রেণির বন্ধুসুলভ সকল ব্যক্তি যারা কিনা তাদের অতীতের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে খোলামেলাভাবে যুক্ত হতে চাইবেন এবং পুরোপুরি বিপ্লবী কর্মসূচিকে গ্রহণ করবেন তারাও এতে অন্তর্ভুক্ত হবেন।  

    এই মতবিরোধ কৌশলগত পার্থক্যের দিকে নিয়ে যায়। কমিউনিস্টরা বিশ্বাস করেন শ্রমিকদের সংগঠিত করা জরুরি রাষ্ট্রের রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের জন্য। বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিকরা সংগঠিত করেন রাষ্ট্রকে ধ্বংস করার উদ্দেশ্যে, আরো নরম সুরে বললে, রাষ্ট্রকে ডুবিয়ে মারার উদ্দেশ্যে। কমিউনিস্টরা কর্তৃত্বের নীতি ও চর্চাকে সমর্থন করেন, বিপ্লবীরা সমাজতান্ত্রিকরা তাদের সকল বিশ্বাস স্বাধীনতার ওপর ন্যস্ত করেন। উভয়ই সমানভাবে বিজ্ঞানের পক্ষে, যা কুসংস্কার ধ্বংস করে ধর্মীয় বিশ্বাসের স্থান দখল করে নিবে। কমিউনিস্টরা বিজ্ঞানকে শক্তির মাধ্যমে আরোপ করতে চান; অন্যরা এটাকে এমনভাবে প্রচার করতে চান যেন মানব গোষ্ঠী নিজেরাই সম্মত হয়ে স্বতঃস্ফূর্তভাবে সংগঠিত ও সংঘবদ্ধ হবেন; তলা থেকে উপর পর্যন্ত মুক্তভাবে নিজেদের সঙ্গতি ও চাহিদা অনুযায়ী সংগঠিত হবেন। তারা কখনোই কিছু ‘ঊর্ধ্বতন মনন কর্তৃক ‘অজ্ঞ’ জনতার ওপর চাপিয়ে দেয়ার কোনো পূর্ব পরিকল্পিত নীলনকশাকে অনুসরণ করেন না। 

    শিল্পী: জ্যাক টার্ডি

    বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিকরা মনে করেন যে মানবসমাজের সমস্ত ডাক্তার এবং শিক্ষকের গভীর বুদ্ধিমত্তার চেয়ে জনগণের সহজাত আকাঙ্ক্ষা এবং আসল প্রয়োজনগুলির মধ্যে আরও অনেক বেশি ব্যবহারিক ভাল জ্ঞান এবং প্রজ্ঞা রয়েছে। বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিকরা আরো মনে করেন যে, মানবজাতি দীর্ঘকাল যাবত নিজেকে শাসিত অবস্থায় রেখে দিয়েছে। তার সমস্যার কারণ কোনো একটি নির্দিষ্ট রূপের সরকারব্যবস্থার মধ্যে নয়, বরঞ্চ সরকারব্যবস্থার খোদ অস্তিত্ব ও মৌলিক নীতি সমস্যার কারণ, তা সেই সরকারব্যবস্থা যে রূপেই থাকুক না কেন!  

    পরিশেষে কমিউনিজম ও প্রুধোনিজমের মধ্যে সুপরিচিত দ্বন্দ্ব রয়েছে; কমিউনিজমের বিজ্ঞানভিত্তিক বিকাশ হয়েছে জার্মান স্কুল কর্তৃক এবং আমেরিকা ও ইংরেজের মধ্যে অংশত গৃহীত হয়েছে, অন্যদিকে প্রুধোনিজমের বিকাশ এবং একটি চূড়ান্ত পরিণতির দিকে নিয়ে যাওয়া হয়েছে লাতিন দেশগুলোর প্রলেতারিয়েতদের মাধ্যমে। প্যারিস কমিউনে বিপ্লবী সমাজতন্ত্র সবে প্রথম লক্ষণীয় ও কার্যকর বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। 

    আমি প্যারিস কমিউনের সমর্থক, কারণ রাজতান্ত্রিক ও ধর্মতান্ত্রিক প্রতিক্রিয়াতে রক্তক্ষয় হওয়া সত্ত্বেও এটি ইউরোপীয় প্রলেতারিতের অন্তরে আরো শক্তিশালী ও টেকসই হয়ে উঠছে। সবচাইতে বড়ো কথা আমি এর সমর্থক কারণ এটি সাহস করে স্পষ্টভাবে রাষ্ট্রকে নাকচ করে দিয়েছে।   

    এটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ যে রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে এই বিদ্রোহ ফ্রান্সেই সংগঠিত হয়েছে, যা তদ্দিন পর্যন্ত চরম উৎকর্ষতার সঙ্গে রাজনৈতিক কেন্দ্রিকতার জমিন ছিল, এবং যে প্যারিস মহান ফরাসি সভ্যতার নেতা ও উৎসমুখ সেখানেই কমিউনের উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। প্যারিস তার মুকুটকে একপাশে সরিয়ে রেখে প্রবল উৎসাহের সঙ্গে নিজের পরাজয় ঘোষণা করছে ফ্রান্স, ইউরোপ সহ সমগ্র দুনিয়াকে জীবন ও স্বাধীনতা দেয়ার নিমিত্তে। প্যারিস তার নেতৃত্বের ঐতিহাসিক ক্ষমতাকে পুনরুদ্ধার করছে, গোলামী জীবন যাপনে অভ্যস্ত সকল জনগণকে (এমন কোন জনতা রয়েছে যারা গোলামী করছেন না?)  মুক্তি ও স্বাস্থ্যের পথ দেখিয়ে দিচ্ছে। প্যারিস বুর্জোয়া র্যাডিকেলবাদের রাজনৈতিক ঐতিহ্যের ওপর মরণঘাতি কামড় বসিয়েছে, এবং ফ্রান্স ও ইউরোপের সকল প্রতিক্রিয়াশীলতার বিরুদ্ধে বিপ্লবী সমাজতান্ত্রিক বাস্তব ভিত তৈরি করে দিচ্ছে। প্যারিস নিজের ধ্বংসাবশেষে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে জয়োল্লাসিত প্রতিক্রিয়াকে ভুল প্রমাণ করার জন্য; নিজের বিপর্যয়ের মাধ্যমে ফ্রান্সের ভবিষ্যৎ ও মর্যাদাকে  বাঁচিয়ে দিয়েছে; মানবজাতির কাছে এটা প্রমাণ করছে যে যদি জীবন, বুদ্ধিমত্তা, ও নৈতিক জোর উঁচু শ্রেণি থেকে ঝরে পড়ে, তবে সেগুলোকে প্রলেতারিয়েতের ক্ষমতা ও প্রতিশ্রুতিতে রক্ষা করা করা হয়। প্যারিস জনতার সুনির্দিষ্ট ও পূর্ণ মুক্তি এবং রাষ্ট্রীয় সীমান্তজুড়ে তাদের খাঁটি সংহতির নতুন জমানা সূচনা করেছে। প্যারিস জাতীয়তাবাদকে ধ্বংস করে এর ধ্বংসাবশেষের ওপর মানবতার ধর্মকে প্রতিস্থাপন করেছে। প্যারিস নিজেকে মানবতাবাদী ও নাস্তিক বলে ঘোষণা করেছে; ঐশ্বরিক অলীক কাহিনীর স্থলে সামাজিক জীবনের বিরাট বাস্তবতা  ও বিশ্বাসকে বিজ্ঞান দিয়ে প্রতিস্থাপন করেছে; স্বাধীনতা, ন্যায়, সমতা, ভ্রাতৃত্ব (যেগুলো কিনা সকল মানব নৈতিকতার চিরন্তন ভিত্তি) দিয়ে পুরনো নৈতিকতার মিথ্যা ও বৈষম্যগুলোকে প্রতিস্থাপন করেছে! প্যারিস নায়কোচিত, যৌক্তিক ও আত্মবিশ্বাসী। নিজের ধ্বংসযজ্ঞ ও মৃত্যু দিয়ে হলেও মানবজাতির ভবিষ্যতের ওপর তার দৃঢ় বিশ্বাসকে নিশ্চিত করছে। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে সে তার এই বিশ্বাসকে দিয়ে যাচ্ছে! প্যারিস তার শ্রেষ্ঠ সন্তানদের রক্তে প্লাবিত হয়েছিল; খোদ মানবতাই ইউরোপের সংযুক্ত আন্তর্জাতিক প্রতিক্রিয়ায় ক্রুশবিদ্ধ হয়েছিল, খ্রিস্টান গির্জা ও পোপের সরাসরি ইন্ধনে। কিন্তু জনগণের সংহতি প্রকাশ করে আসন্ন আন্তর্জাতিক বিপ্লব হবে প্যারিসের পুনরুত্থান।

    চিরস্মরণীয় প্যারিস কমিউনের জীবন ও মরণের দুই মাসের এই হচ্ছে আসল অর্থ এবং এগুলো হচ্ছে এই দুই মাসের অপরিসীম ও হিতকর ফলাফল।

    প্যারিস কমিউন খুব অল্প সময়ের জন্য টিকে ছিল। সমাজতান্ত্রিক কর্মসূচি প্রয়োগ না হোক, অন্তত পদ্ধতিগতভাবে পরিকল্পনা করার জন্যও ভার্সেলদের প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে প্রাণঘাতী লড়াইয়ে তাদেরকে অবতীর্ণ হতে হয়েছিল। এই প্রাণঘাতী লড়াই দ্বারা এর অভ্যন্তরীণ বিকাশ বাধাগ্রস্ত হয়েছিল। আমাদের অবশ্য এও বুঝতে হবে যে, কমিউনের অধিকাংশ সদস্য আদতে সমাজতান্ত্রিক ছিলেন না। যদিও আপাত সেটা মনে হয়েছিল, কারণ তারা সেদিকে যেতে বাধ্য হয়েছিলেন ব্যক্তিগত প্রত্যয়ের চাইতে বরঞ্চ ঘটনাসমূহের অপ্রতিরোধ্য প্রবাহ, পরিস্থিতির প্রকৃতি, এবং তাদের অবস্থানের জরুরতের কারণে।  সমাজতান্ত্রিক অংশটা খুবই ছোট ছিল, সর্বোচ্চ চৌদ্দ-পনেরজন। বাকিরা ছিলেন জেকোবিন। কিন্তু স্পষ্ট করে বলা দরকার, সেখানে বিভিন্ন ধরণের জেকোবিনরা ছিলেন। সেখানে লিও গাম্বেত্তার মতো জেকোবিন আইনবিদ ও মতবাদী ছিলেন। তাদের প্রত্যক্ষবাদী দাম্ভিক, স্বৈরচারী ও আইনীয় রিপাবলিকতন্ত্র পুরোন বিপ্লবী বিশ্বাসকে প্রত্যাখ্যান করে দিয়েছিল, জ্যাকোবিনতন্ত্রের সমস্তটাই গ্রহণ করেছে কেবলমাত্র তার ঐক্যের কাল্ট ও কর্তৃত্বের অংশটুকু বাদে। এবং ফ্রান্সের জনগণকে তুলে দিয়েছিল প্রুশিয়ানদের হাতে এবং পরবর্তীতে স্থানীয় প্রতিক্রিয়াশীলদের হাতে। এবং সেখানে এমনও জেকোবিন রয়েছেন যারা একেবারে স্পষ্টতই বিপ্লবী। তারা নায়ক। তারা ১৭৯৩ সালের গণতান্ত্রিক বিশ্বাসের সর্বশেষ খাটি প্রতিনিধি। প্রতিক্রিয়ার তোড়ে নিজেদের চেতনা/বিবেককে জমা দেয়ার পরিবর্তে তারা তাদের সুসজ্জিত একতা ও কর্তৃত্বকে আত্মোৎসর্গ করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মহাত্মা লুই চার্লস ডেলেসক্লুজের নেতৃত্বে এই মহান জেকোবিনরা সবকিছুর ঊর্ধ্বে বিপ্লবের বিজয় কামনা করেছিলেন। যেহেতু জনতা ছাড়া কোনো বিপ্লব নেই, এবং যেহেতু আজকাল জনতা সমাজতন্ত্রের প্রতি একধরণের মনোভাব/প্রবৃত্তি প্রকাশ করছে, এবং যেহেতু এটা একরকম  অর্থনৈতিক ও সামাজিক বিপ্লব হতে পারে, সেহেতু বিপ্লবী মুহূর্তের যুক্তি দ্বারা তাড়িত হয়ে সৎবিশ্বাসের জেকোবিনরা দিনশেষে সমাজতান্ত্রিকই হয়ে উঠবেন।  

    যে জেকোবিনরা প্যারিস কমিউনে অংশগ্রহণ করেছিলেন তারা একদম এই পরিস্থিতিতেই নিজেদের খুঁজে পেয়েছিলেন। ডেলেসক্লুজসহ অন্যান্যরা এমন সব কর্মসূচী ও ঘোষণা দিচ্ছিলেন যেগুলোর সাধারণ নিহিতার্থ ও ওয়াদা নিশ্চিতভাবেই [পজিটিভলি] সমাজতান্ত্রিক প্রকৃতির ছিল। তদপুরি তাদের সৎবিশ্বাস ও ভালো নিয়ত থাকা সত্ত্বেও তারা অন্তর্নিহিত তাগিদের চাইতে বরঞ্চ বাহ্যিক পরিস্থিতির চাপেই কেবল সমাজতান্ত্রিক ছিলেন। তাদের সময়ের অভাব ছিল। এমনকি তাদের নিজস্ব কিছু বুর্জোয়া কুসংস্কারকে পরাস্ত করা ও ছাড়িয়ে যাওয়ার সক্ষমতারও অভাব ছিল, যে কুসংস্কারগুলো  তাদের নবার্জিত সমাজতন্ত্রের বিরোধী ছিল। যে কেউই বুঝবেন, এই অভ্যন্তরীণ সংগ্রামে আটকা পড়ে তারা যেমন সাধারণ বিষয়গুলোকে মাড়িয়ে যেতে পারছিল না, তেমনি বুর্জোয়া জগতের সাথে চিরতরে যাবতীয় যোগাযোগ ও সংহতি রদ হয়ে যাবে এমন কোনো সিদ্ধান্তমূলক পদক্ষেপও নিতে পারছিল না। 

    এটা ছিল কমিউন এবং খোদ এই লোকগুলোর জন্য বড়োই দুর্ভাগ্যের বিষয়। তারা নিজেরা যেমন পক্ষাঘাতগ্রস্ত ছিলেন, তেমনি কমিউনকেও পঙ্গু করে ফেলেছিলেন। তবু আমরা তাদেরকে দোষারোপ করতে পারি না। মানুষ রাতারাতি পাল্টে যায় না। ইচ্ছামাফিক তাদের প্রকৃতি বা অভ্যাস বদলে যায় না। কমিউনের জন্য প্রাণ দিয়ে তারা তাদের আন্তরিকতার প্রমাণ দিয়ে গিয়েছেন। তাদের কাছে এর বেশি আর কী চাইতে পারি আমরা? 

    শিল্পী: জ্যাক টার্ডি

    প্যারিসের জনগণের চাইতে বেশি দোষ তাদেরকে দেয়া যাবে না, যাদের প্রভাবেই তারা চিন্তা ও কাজ করেছেন। জনগণ গভীর চিন্তাভাবনা/বিবেচনার চাইতে বেশি প্রবৃত্তির কারণেই বরঞ্চ সমাজতান্ত্রিক ছিলেন। তাদের আকাঙ্ক্ষা সর্বোচ্চ মাত্রায় সমাজতান্ত্রিক ছিল, কিন্তু তাদের চিন্তাভাবনা বা তাদের গতানুগতিক অভিব্যক্তিগুলো তেমন ছিল না। ফ্রান্সের শহরগুলোর, এমনকি প্যারিসেরও প্রলেতারিয়েতরা এখনো বহু জেকোবিন কুসংস্কারে, বহু স্বৈরাচারী ও সরকারি ধারণার মধ্যে  আটকা পড়ে আছেন। কর্তৃত্বের কাল্ট (সকল অশুভ, বঞ্চনা ও দাসত্বের উৎস ধর্মীয় শিক্ষার ভয়াবহ পরিণাম) এখনো তাদের মধ্যে এখনো নির্মূল হয়নি। এটা এতোই সত্য যে, সবচাইতে বুদ্ধিমান মানুষটা, এমনকি সবচাইতে বিশ্বস্ত বা প্রণোদিত সমাজতান্ত্রিকও এইসব ধারণা থেকে নিজেকে পুরোপুরি মুক্ত করতে পারেনি। আপনি যদি তাদের মনে একটু অনুসন্ধান চালান তাহলে সেখানে একজন জেকোবিনকে খুঁজে পাবেন যে সরকারব্যবস্থার প্রচারক; এক অন্ধকার কোনে ভয়ে জীর্ণশীর্ণ অবস্থায় রয়েছে, অবনমিত কিন্তু একেবারে নিষ্প্রাণ নয়। 

    এবং একেবারে বিশ্বস্ত সমাজতান্ত্রিক যে ছোট দলটি কমিউনে অংশগ্রহণ করেছিল তারা খুব কঠিন পরিস্থিতিতে বা অবস্থানে ছিলেন। একদিকে রয়েছে প্যারিসের জনতার কাছে তাদের সমর্থনের অভাব এবং আন্তর্জাতিক এ্যাসোসিয়েশনের অসম্পূর্ণতা, অন্যদিকে জেকোবিন সংখ্যাগরিষ্ঠদের বিরুদ্ধে তাদেরকে প্রাত্যহিক সংগ্রাম চালিয়ে যেতে হচ্ছিল। এমন সংঘর্ষের মধ্যেও তাদেরকে কয়েক হাজার শ্রমিকদের কাজ ও খাদ্য সরবরাহ করতে হচ্ছিল, তাদেরকে সংগঠিত ও সজ্জিত করতে হচ্ছিল, এবং প্রতিক্রিয়াশীলদের কাজকারবারের দিকে তীক্ষ্ণ নজর রাখতে হচ্ছিল। প্যারিসের মতন শহরে ঘেরাও অবস্থায়, অনাহারের হুমকির মুখে এবং ভার্সেইলের অনুমতিতে ও প্রুশিয়ানদের বদৌলতে প্রতিক্রিয়ার ছদ্মবেশী চক্রান্তের সম্ভাব্য শিকার অবস্থাতেই এগুলো করতে হচ্ছিল। তাদেরকে ভার্সেইলের সেনাবাহিনী ও সরকারের বিরুদ্ধে একটি বিপ্লবী সরকার প্রতিষ্ঠা করতে হচ্ছিল। রাজতন্ত্র ও পুরোহিত তন্ত্রের প্রতিক্রিয়ার বিরুদ্ধে লড়াই করার উদ্দেশ্যে, বৈপ্লবিক সমাজতন্ত্রের প্রথম শর্তকে ভুলে বা ত্যাগ করে, তারা বাধ্য হচ্ছিলেন জেকোবিন পদ্ধতিতে সংগঠিত হতে।  

    এরকম বিভ্রান্তিমূলক পরিস্থিতিতে, এটা খুব স্বাভাবিকই ছিল যে জেকোবিনরাই সমাজতান্ত্রিকদের ওপরে থাকবেন। জেকোবিনরাই কমিউনের সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ ছিলেন, তারা একটি বেশ বিকশিত রাজনৈতিক প্রবৃত্তি এবং শাসনতান্ত্রিক সংগঠনের চর্চা ও ঐতিহ্যের ধারক ছিলেন। এটা অবাক করার মত বিষয় যে, তারা তাদের সুবিধাগুলোকে বেশি চাপায়ে দেন নি। তারা প্যারিস বিদ্রোহকে পুরোপুরি জেকোবিন চরিত্র দেন নি। পরিবর্তে তারা নিজেদেরকে একটি সমাজবিপ্লবের দিকেই চালিত করেছিলেন। 

    আমি জানি বহু সমাজতান্ত্রিক, যারা তাদের তত্ত্বে খুবই যৌক্তিক, তারা আমাদের প্যারিসের বন্ধুদেরকে দোষারোপ করবেন: কেন তারা সমাজতন্ত্রীদের মতো যথার্থভাবে বিপ্লবী চর্চায় সাড়া দিলেন না! অন্যদিকে বুর্জোয়া প্রেস চেঁচামেচি করে খুব বিশ্বাসের সাথে তাদের কর্মসূচি অনুসরণ করার জন্য দোষারোপ করছে। একমুহূর্তে জন্য প্রেসের এই ইতরামি নিন্দাকে ভুলে যাওয়া যাক। আমি প্রলেতারিয়েতের মুক্তির তাত্ত্বিকদের একটা বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করতে চাই: তারা আমাদের প্যারিসের ভাইদের প্রতি অন্যায় করছেন। কারণ সবচেয়ে সঠিক তত্ত্ব ও এর প্রয়োগের মধ্যকার বিরাট দূরত্ব তা মাত্র কয়েকদিনে দূর করা সম্ভব নয়। যেমন, যাদের ইউজেন ভার্লিন সম্পর্কে জানার সৌভাগ্য হয়েছে তারা জানেনে যে, ভার্লিন ও তাঁর কমরেডরা অগাধ, প্রগাঢ় ও সুবিবেচিত সমাজতান্ত্রিক বিশ্বাস দ্বারা পরিচালিত হয়েছিলেন। যারা তাদেরকে জানেন তারা কখনোই তাদের উদ্দীপনা, একনিষ্ঠতা এবং গভীর আস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারবেন না। তবু তারা এই গভীর আস্থাসম্পন্ন বা সৎবিশ্বাসের মানুষ হওয়ার কারণে যে বিপুল কর্মযজ্ঞে নিজেদের মন ও দেহকে উৎসর্গ করেছিলেন সে যজ্ঞের মুখোমুখি হয়ে তারা আত্ম-অবিশ্বাসে পরিপূর্ণ হয়ে গিয়েছিলেন। তারা নিজেদের নিয়ে খুব অল্পই ভাবতে পেরেছিলেন! এবং তারা নিশ্চিত ছিলেন, সামাজিক বিপ্লবে, যা কিনা রাজনৈতিক বিপ্লবের চাইতে বিভিন্ন দিক থেকে একদম ভিন্ন, ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের চাইতে জনতার স্বতঃস্ফূর্ত কর্মকাণ্ডই বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ব্যক্তি যা কিছু করতে পারেন তা হচ্ছে জনতার স্বভাবজাত আকাঙ্ক্ষাগুলি প্রকাশ করে এমন ধারণা তৈরি করা, স্পষ্ট করা ও প্রচার করা; এবং জনতার স্বভাবজাত শক্তির বিপ্লবী সংগঠন নির্মাণে নিরন্তর প্রয়াস চালিয়ে যাওয়া। এইটাই। এর চাইতে বেশি কিছু না। বাকি সব কাজ কেবল খোদ জনতা দ্বারাই সম্পন্ন করা যেতে পারে। অন্যথায় রাজনৈতিক স্বৈরতন্ত্রই পরিণতি হবে, অর্থাৎ, রাষ্ট্রের পুনর্গঠন, সাথে থাকবে এর সকল বিশেষাধিকার, বৈষম্য ও জুলুম। একটি সর্পিল/প্রতারণাপূর্ণ কিন্তু অনিবার্য পথ অবলম্বন করে আমরা জনসাধারণের রাজনৈতিক, সামাজিক এবং অর্থনৈতিক দাসত্ব পুনরায় প্রতিষ্ঠা করার দিকেই যাবো। 

    ভার্লিন ও তাঁর কমরেডগণ বাকিসকল আন্তরিক সমাজতান্ত্রিকদের মতন এবং সাধারণত জনতার মধ্যে বিকশিত হওয়া সকল শ্রমিকদের মতন এক ও একই গোষ্ঠীর ব্যক্তির ক্রমাগত ক্রিয়াকলাপের প্রতি একধরণের সতর্ক মনোভাব পোষণ করতেন; এবং কয়েকজন উচ্চতর ব্যক্তিত্বের আধিপত্যের বিরুদ্ধেও সতর্ক ছিলেন। এবং যেহেতু তারা সবকিছুর ঊর্ধ্বে ন্যায়বিচারী ছিলেন, সেহেতু তারা তাদের এই দূরদর্শিতা, এই অবিশ্বাসকে ততটাই নিজের বিরুদ্ধে করেছিলেন যতটা অন্য ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে করতেন।

    একটি সামাজিক বিপ্লবকে অবশ্যই রাজনৈতিক বিপ্লব থেকে উদ্ভূত স্বৈরশাসন বা নির্বাচনী সংসদের ফরমানে সংগঠিত করতে হবে, স্বৈরচারী কর্তৃত্বপরায়ন কমিউনিস্টদের এই বিশ্বাসের বিপরীতে আমাদের প্যারিস সমাজতন্ত্রী কমরেডেরা বিশ্বাস করতেন যে, একা যেমন তিনি/তারা বিপ্লব করতে পারবেন না, তেমনি জনতা, জনগণের সকল গোষ্ঠী ও সংঘের স্বতঃস্ফূর্ত ও ধারাবাহিক কর্মকাণ্ড ব্যতীত বিপ্লবের পূর্ণ বিকাশ সাধন সম্ভব নয়। 

    আমাদের প্যারিসের কমরেডরা বহুগুণে সঠিক ছিলেন। প্রকৃতপক্ষে কোথায় সেই উজ্জ্বল মনন বা ধীশক্তি যা চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা, ইচ্ছা ও জরুরতের বিচিত্রতা ও অসীম বহুতাকে (এসব মিলেই জনগণের সামষ্টিক ইচ্ছা তৈরি হয়) ধারণ করবে? (এমনকি আমরা যদি সামষ্টিক স্বৈরতন্ত্রের কথাও বলি, এমনকি সেটা যদি উচ্চতর মানসিকতাসম্পন্ন হাজার হাজার ব্যক্তি দ্বারা গঠিত হয়ে থাকে।) এবং এমন একটি সামাজিক সংগঠন উদ্ভাবন করবে যা সমাজের ওপর রাষ্ট্রের সহিংসতাকে দীর্ঘায়ত করার পদ্ধতি বা পরিকল্পনা হবে না? এটা সর্বদা এমনই ছিল। এবং সামাজিক বিপ্লবকে আদতে এই জোরজবরদস্তিমূলক প্রতিষ্ঠানের পুরাতন ব্যবস্থার ইতি টানতে হবে। এটা করতে হবে ব্যক্তির পাশাপাশি জনতা, সকল গোষ্ঠী, কমিউন ও সংঘের পূর্ণ স্বাধীনতাদানের মাধ্যমে। এটা করতে হবে সকল ধরণের সহিংসতার সকল ঐতিহাসিক কারণকে একেবারে ধূলিসাৎ করার মাধ্যমে। এই সহিংসতাই হচ্ছে রাষ্ট্রের ক্ষমতা ও অস্তিত্ব। এর পতন আইনের সকল বৈষম্য এবং বিভিন্ন ধর্মের সকল মিথ্যের অবসান ঘটাবে, কেননা আইন ও ধর্ম উভয়ই রাষ্ট্র দ্বারা প্রকাশিত, প্রতিশ্রুত ও সুরক্ষিত সকল সহিংসতার আবশ্যিক পবিত্রকরণ ছাড়া আর কিছুই ছিল না।  

    এটা নিশ্চিত যে, যতক্ষণ পর্যন্ত রাষ্ট্র থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত মানুষের মুক্তি আসবে না, সমাজের সকল গোষ্ঠী, স্থানিক সংঘ ও ব্যক্তিবর্গের আসল স্বার্থ পূর্ণ হবে না। এটা সুস্পষ্ট যে সমাজের সমস্ত তথাকথিত সাধারণ স্বার্থ, যা রাষ্ট্রকে প্রতিনিধিত্ব করে বলে মনে করা হয় এবং যা বাস্তবে রাষ্ট্রের অধীন অঞ্চল, কমিউন, সংঘ এবং ব্যক্তিদের সত্যিকারের স্বার্থকে নাকচ করে দেয়, সেই তথাকথিত সাধারণ স্বার্থ বিমূর্ততা, অলীক ও মিথ্যা। রাষ্ট্র হচ্ছে একটি বিরাট কসাইখানা ও গোরস্থানের মত, যেখানে সকল আকাঙ্ক্ষা, দেশের সকল সজীব শক্তি সেই বিমূর্ততার ছায়ায় খুশিমনে নিজেকে খুন করে এবং সমাধিস্থ করে। এবং যেহেতু কোনো বিমূর্ততাই নিজ থেকে টিকে থাকতে পারে না, দাঁড়ানো জন্য পা নেই, হাত নেই, শিকারিদের হজম করার মতো কোনো পাকস্থলী নেই, এটা সম্ভবত স্পষ্ট যে, এই ধর্মীয় বিমূর্ততা, মানে ঈশ্বর আসলে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণির স্বার্থেরই প্রতিনিধিত্ব করেন, মানে পুরোহিতদের প্রতিনিধিত্ব করেন। অন্যদিকে ধর্মীয় বিমূর্ততার রাজনৈতিক সম্পূরক, মানে রাষ্ট্র নামক রাজনৈতিক বিমূর্ততা শোষণকারী শ্রেণি, অর্থাৎ বুর্জোয়াদের স্বার্থ ছাড়া আর কোনো কিছুরই প্রতিনিধিত্ব করে না। যেমন করে এই পুরোহিততন্ত্র সর্বদা বিভেদ-সৃষ্টিকারী ছিল এবং বর্তমানে মানুষকে শক্তিশালী ও সম্পদশালী সংখ্যালঘু এবং পরাধীন ও হতভাগ্য সংখ্যাগুরুতে বিভক্ত করে ফেলছে, তেমনি বুর্জোয়ারা শিল্প, কৃষি, ব্যাংকিং ও বাণিজ্যে তাদের সকল সামাজিক ও রাজনৈতিক সংগঠন এবং রাষ্ট্রের সকল প্রশাসনিক, অর্থনৈতিক, আইনি, শিক্ষাব্যবস্থা, পুলিশ ও সামরিক কার্যক্রম একদিকে প্রবল আধিপত্যকারী অভিজাতদের কাছে কুক্ষিগত করেছে। এর অন্যদিকে রয়েছে একটা বিরাট সংখ্যক জনতা যারা কমবেশি আশাহত জীব, স্থায়ী মোহের মধ্যে বসবাসকারী প্রতারিত জীব, এবং ধীরে ধীরে ও অনিবার্যরূপে যারা বিদ্যমান অর্থনৈতিক বিকাশের অপ্রতিরোধ্য শক্তির দ্বারা সর্বহারায় পরিণত হচ্ছে। তারা এই সর্বশক্তিমান অভিজাতদের নিছক আন্ধা-হাতিয়ারে পরিণত হচ্ছে। 

    গির্জা ও রাষ্ট্রের বিলুপ্তিই সমাজের প্রকৃত মুক্তিলাভের প্রথম ও অপরিহার্য শর্ত হওয়া উচিত। যে সমাজ নিজেকে পুনর্গঠন করতে পারবে ও করা উচিত, কিন্তু সেটা কয়েকজন প্রাজ্ঞ ব্যক্তি বা পণ্ডিতদের আদর্শ পরিকল্পনামাফিক বা কোনো স্বৈরশাসকের বা সর্বজনীন ভোটাধিকারের মাধ্যমে নির্বাচিত জাতীয় সংসদের ফরমান অনুযায়ী উপর-নিচ আদলে হবে না। পূর্বেই বলেছি, এই ধরণের ব্যবস্থা অনিবার্যভাবেই একটি নতুন রাষ্ট্রের দিকেই নিয়ে যাবে, এবং ফলস্বরূপ একটি ক্ষমতাসীন অভিজাত গঠন করবে। অর্থাৎ একটি শ্রেণি তৈরি হয় যাদের সাথে জনতার কোনো মিল নেই। এবং নিঃসন্দেহে এই শ্রেণি সাধারণ মঙ্গল অথবা রাষ্ট্রকে বাঁচানোর অজুহাতে আপামর জনতাকে শোষণ করে।

    শিল্পী: জ্যাক টার্ডি

    ভবিষ্যৎ সামাজিক সংগঠনকে নিচ-উপর আদলে হতে হবে। সেটা হবে মুক্ত সমিতি বা শ্রমিক ফেডারেশনের মাধ্যমে। সমিতি থেকে শুরু হয়ে, তারপর কমিউন, অঞ্চল, দেশ এবং পরিশেষে একটি আন্তর্জাতিক ও সর্বজনীন ফেডারেশনের সমাপ্তি ঘটবে। কেবল তখনই স্বাধীনতা ও সাধারণ মঙ্গলের জীবনদায়ী সামাজিক ব্যবস্থা [অর্ডার] প্রতিষ্ঠিত হবে। এই ব্যবস্থা ব্যক্তি ও সমাজের স্বার্থকে সীমিত করার চাইতে বরঞ্চ সমর্থন যোগাবে এবং এগুলোর মিলন সাধন করবে।  

    বলা হয়ে থাকে যে, সমাজের সাথে ব্যক্তির একাত্মতা এবং সর্বজনীন সংহতি বাস্তবে কখনও অর্জন করা যায় না, কারণ তাদের স্বার্থ পরস্পরবিরোধী হওয়ার কারণে কখনও মিলিত/সামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে না। এর প্রত্যুত্তরে আমি বলি যে, যদি এই স্বার্থগুলো এখনো পারষ্পরিক সমঝোতায় না আসে, তাহলে সেটা এই কারণে যে রাষ্ট্র গুটিকয়েক সুবিধাভোগীর জন্য সংখ্যাগুরুর স্বার্থকে জলাঞ্জলি দিয়েছে। এই বিখ্যাত অসামঞ্জস্যতা, অর্থাৎ সমাজের ব্যক্তিগত স্বার্থের এই সংঘাত, ভুয়া ও রাজনৈতিক মিথ্যা ছাড়া আর কিছুই নয়। এটি একটি ধর্মতাত্ত্বিক মিথ্যা থেকে জন্ম নিয়েছে, যা আদিপাপের তত্ত্ব হাজির করে মানুষকে অসম্মান করেছে এবং আত্ম-সম্মানকে ধূলিসাৎ করেছে। শত্রুভাবাপন্ন স্বার্থ সম্পর্কিত এই ভ্রান্ত ধারণা অধিবিদ্যা দ্বারাও জ্বালানি পেয়েছিল এবং সেটা ধর্মতত্ত্বের নিকটাত্মীয়। অধিবিদ্যা মানব প্রকৃতির সামাজিক চরিত্রকে স্বীকৃতি দিতে ব্যর্থ হয়ে সমাজকে ব্যক্তির যান্ত্রিক এবং একেবারে কৃত্রিম সমষ্টি হিসাবে দেখেছিল, যারা কিছু আনুষ্ঠানিক বা গোপন চুক্তির নামে একত্রিত হয়ে নির্বাধে বা একটি উচ্চতর শক্তির প্রভাবের অধীনে পর্যবসিত হয়েছিল। অধিবিদ্যার পণ্ডিতদের মতে, সমাজে ঐক্যবদ্ধ হওয়ার পূর্বে ব্যক্তি একধরণের অমর আত্মার অধিকারী হয়ে পূর্ণ স্বাধীনতা ভোগ করতো। আমরা নিশ্চিত যে, মানব বুদ্ধির সকল সম্পদ, তার নৈতিক ও বৈষয়িক বিকাশ, এবং তার আপাত স্বাধীনতা সবকিছুই সমাজে তার জিন্দেগীর ফসল। সমাজের বাইরে সে মুক্ত মানুষ হওয়া দূরে থাক, সে এমনকি প্রকৃত মানুষই হতে পারবে না; অর্থাৎ যে সত্তা নিজের বিষয়ে সচেতন, একমাত্র সত্তা যে চিন্তা করতে পারে এবং কথা বলতে পারে। কেবল বুদ্ধিবৃত্তি ও সম্মিলিত শ্রমের সংমিশ্রণই মানুষকে তার আদি বর্বরতা ও বর্বর অবস্থা (যা তার আদি প্রকৃতি গঠন করেছিল অথবা তার বিকাশের সূচনাবিন্দু ছিল) থেকে বের করে আনতে সক্ষম হয়েছিল। আমরা আরও নিশ্চিত যে, মানুষের সমগ্র জীবন – অর্থাৎ, তাদের স্বার্থ, প্রবণতা, জরুরত, মোহ, এমনকি বোকামি, সহিংসতা, অবিচার এবং আপাত স্বেচ্ছাধীন কার্যকলাপ – কেবলমাত্র অনিবার্য সামাজিক শক্তির পরিণামকে তুলে ধরে। মানুষ যেমন পারস্পরিক স্বাধীনতার ধারণাটিকে খারিজ করতে পারে না, তেমনি বাহ্যিক প্রকৃতির প্রকাশকে তুলে ধরে এমন বিপরীতমুখী প্রভাব ও সমরূপতাকেও অস্বীকার করতে পারে না। 

    খোদ প্রকৃতির মাঝে এই বিস্ময়কর পারস্পরিক সম্পর্ক [কোরেলেশন] এবং আন্তঃনির্ভরতা নিশ্চিতভাবেই সংগ্রাম ছাড়া তৈরি হয়নি। বরঞ্চ প্রকৃতির শক্তিগুলোর মাঝে সামঞ্জস্যতা/সংগতি দেখা দেয় কেবল ক্রমাগত সংগ্রামের ফলেই। এটাই জীবন ও পরিবর্তনের প্রকৃত শর্ত। সমাজের মতো করেই প্রকৃতিতেও সংগ্রাম বিনা শৃঙ্খলা[অর্ডার] মানেই মৃত্যু।  

    মহাবিশ্বে যদি শৃঙ্খলা [অর্ডার] প্রাকৃতিক ও সম্ভাব্য হয়েই থাকে, তবে সেটা কেবল এই কারণে যে মহাবিশ্ব কোনো এক সুপ্রিম বা মহত্তম ইচ্ছা দ্বারা আরোপিত কিছু প্রাক-কল্পিত ব্যবস্থা অনুসারে পরিচালিত হচ্ছে না। ঐশ্বরিক বিধানের ধর্মতাত্ত্বিক হাইপোথিসিস কেবল সকল শৃঙ্খলা/ব্যবস্থাকেই খারিজ করে দেয় না, বরঞ্চ খোদ প্রকৃতিকেই খারিজ করে দেয়। প্রাকৃতিক আইনই [ন্যাচারাল ল’]  কেবল প্রকৃত কেবল এগুলো প্রকৃতিতে অন্তর্নিহিত, এবং এগুলো কোনো কর্তৃত্ব দ্বারা প্রতিষ্ঠিত নয়। এই আইনগুলো আমরা যাকে ‘প্রকৃতি’ বলি তার সমরূপতার সহজ বহিঃপ্রকাশ, অথবা নিরবচ্ছিন্ন রূপান্তর ছাড়া আর কিছুই নয়। মানুষের বুদ্ধিমত্তা ও বিজ্ঞান এগুলোকে পর্যবেক্ষণ করেছে, পরীক্ষা-নিরীক্ষা করেছে, একটা পদ্ধতিতে জড়ো করেছে এবং এগুলোকে আইন বলা হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতি এমন কোনো আইন জানে না। প্রকৃতি অবচেতনভাবেই কাজ করে যাচ্ছে। সে তার মধ্যে অসীম ধরণের ঘটনা/প্রপঞ্চকে ধারণ করে, অনিবার্যভাবে পুনরাবৃত্তি করে। কাজের এই অনিবার্যতাই হচ্ছে মহাবিশ্বের শৃঙ্খলার টিকে থাকার কারণ।  

    এমন একটা শৃঙ্খলা/ব্যবস্থা [অর্ডার] মানব সমাজেও দৃশ্যমান। এটি একটি কথিত প্রকৃতি-বিরোধী উপায়ে বিকশিত হয়েছে বলে মনে হয়, কিন্তু এটা সহজাত/প্রাকৃতিক প্রাণির জরুরতের দ্বারা নির্ধারিত হয়েছে। তার চিন্তা করার সক্ষমতা তার বিকাশে একটি বিশেষ উপাদান সরবরাহ করেছে; এটা সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক উপাদান এই অর্থে যে, মানুষ বিদ্যমান সবকিছুর মতোই প্রাকৃতিক শক্তির মিলন ও কর্মকাণ্ডের বস্তুগত উৎপাদনের প্রতিনিধিত্ব করে। এই বিশেষ উপাদান হচ্ছে যুক্তি [রিজন], মানে সাধারণীকরণ ও বিমূর্তকরণের সক্ষমতা। যার ফলে মানুষ অদ্ভুত বহিরাগত বস্তুসমূহকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা এবং পর্যবেক্ষণের মতো করে নিজেকেই নিজের চিন্তায় প্রজেক্ট করতে সক্ষম হয়। নিজেকে চিন্তায় নিজের ঊর্ধ্বে তুলে ধরে এবং তার চতুঃপার্শ্বের দুনিয়া থেকে নিজেকে ঊর্ধ্বে তুলে ধরে সে পৌঁছে যায় নিখুঁত বিমূর্তন ও পরম শূন্যতা উপস্থাপনের দিকে। এবং এই পরম তার বিমূর্তকরণের সক্ষমতা ব্যতীত আর কিছুই নয়, যা বিদ্যমান সবকিছুকে তুচ্ছ করে এবং সবকিছুকে নাকচ করার মধ্য দিয়ে স্থির হয়। এটাই মনের সর্বোচ্চ বিমূর্তকরণের চূড়ান্ত সীমা। এই পরম শূন্যতাই ঈশ্বর।

    এইটাই প্রতিটি ধর্মতাত্ত্বিক মতবাদের অর্থ ও ঐতিহাসিক ভিত্তি। যেহেতু আগের মানুষজন ও তাদের সমাজ  নিজস্ব চিন্তার প্রকৃতি ও বস্তুগত কারণ বুঝতে পারেনি, এমনকি তাদের এমন চিন্তার তলায় লুকিয়ে থাকা শর্তাবলী বা প্রাকৃতিক নিয়মও খুঁজে পান নি, ফলে তারা আন্দাজও করতে পারেন নি যে, তাদের পরম ধারণাগুলি কেবল বিমূর্ত ধারণা প্রণয়নের তাদের নিজস্ব ক্ষমতারই ফলাফল ছিল। ফলে প্রকৃতি থেকে প্রাপ্ত তাদের ধারণাগুলোকে তারা আসল বস্তু হিসাবে দেখেছিলেন, এর পরে খোদ প্রকৃতিই সফল হতে নিবৃত্ত করে। তারা তাদের কাহিনীকে, পরমের অসম্ভব ধারণাকে পূজা করা শুরু করে এবং শ্রদ্ধা দেখাতে শুরু করে। কিন্তু যেহেতু তারা শূন্যতার বা ঈশ্বরের বিমূর্ত ধারণাকে একটা দৃঢ় বা কনক্রিট আকার দেয়ার জরুরত অনুভব করলো, তখন ঐশ্বরিক [ডিভাইনিটি] ধারণা তৈয়ার করে নিলো। অধিকন্তু এগুলোকে  শুভ ও অশুভ সকল গুণাবলী ও ক্ষমতা দিয়ে জড়িয়ে দিল। প্রকৃতি ও সমাজে তারা কেবল এই শুভ ও অশুভ-কেই খুঁজে পেল। এমনটাই ছিল সকল ধর্মের গোড়া ও ঐতিহাসিক বিকাশ, একেবারে প্রতিমাপূজা বা বস্তুপূজা থেকে একেবারে খ্রিস্টানধর্ম পর্যন্ত।

    ধর্ম, ধর্মতাত্ত্বিক ও অধিবিদ্যার অর্থহীন/হাস্যকর ইতিহাস আলোচনা করার ইচ্ছা নেই। অথবা শত বছরের বর্বরতার ফলে সৃষ্ট সকল ঐশ্বরিক অবতার ও কল্পনার মিছিল নিয়েও আলোচনা করতে চাই না। আমরা জানি যে, কুসংস্কার বিপর্যয় ডেকে আনে, রক্ত ও অশ্রুর বন্যা বইয়ে দেয়। হতদরিদ্র মানবজাতির এই বিদ্রোহী বিকারগুলো ছিল সামাজিক সংগঠনের স্বাভাবিক বিকাশ ও বিবর্তনের ঐতিহাসিক ও অনিবার্য পর্যায়। এই বিকারগুলো একটি ভয়াবহ ধারণার জন্ম দিয়েছে: মহাবিশ্ব একটি অতিপ্রাকৃত ক্ষমতা ও ইচ্ছা দ্বারা চালিত হচ্ছে। এই ধারণাই মানুষের কল্পনায় আধিপত্য বিস্তার করেছে। শতকের পর শতক পার হয়ে গিয়েছে, সমাজগুলো এই ধারণাতে এতই অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিল যে, এসবের ভেতর থেকে উত্থিত যে কোনো প্রগতি অর্জনের সক্ষমতা বা তাড়নাকে ধ্বংস করে দেয়া হয়েছিল। 

    শুরুতে কিছু ব্যক্তির এবং পরবর্তীতে কিছু সামাজিক শ্রেণির ক্ষমতার অভিলাষ দাসত্ব ও দখলকে প্রধান নীতি হিসাবে প্রতিষ্ঠিত করেছিল, এবং ঐশ্বরিকতার এই ভয়াবহ ধারণাটি সমাজের অন্তরে রোপণ করে দিয়েছিল। ফলস্বরূপ, মূলে গির্জা ও রাষ্ট্র এই দুই প্রতিষ্ঠান ব্যতীত কোনো সমাজকে কার্যকর/সম্ভাব্য বলে দেখাই গেলো না। এই দুই সামাজিক দুর্দশাকে তাদের সকল সমর্থক মতবাদগুলো রক্ষা করে গিয়েছে।   

    পৃথিবীতে এই প্রতিষ্ঠানগুলো আবির্ভূত হওয়া মাত্রই দুই শাসক শ্রেণি, অর্থাৎ পুরোহিত ও অভিজাতরা তাত্ক্ষণিকভাবে নিজেদের সংগঠিত করে ফেলে; এবং তারা গির্জা ও রাষ্ট্রের উপযোগিতা, অপরিহার্যতা এবং পবিত্রতার ধারণাগুলো দিয়ে বন্দি জনগণের মগজ ধোলাই করতে খুব বেশি নেয় নি। 

  • লুইস মিশেল || কমিউনের স্মৃতি

    লুইস মিশেল || কমিউনের স্মৃতি

    • অনুবাদ: সারোয়ার তুষার

    সম্পাদকের নোট: প্যারি কমিউনের অন্যতম লড়াকু কমিউনার্ড, লুইস মিশেল ছিলেন শিক্ষিকা। কমিউনের পতনের পর তাকে নির্বাসনে পাঠানো হয়েছিল নিউ ক্যালদোনিয়ার পেনাল কলোনিতে। ১৮৮০ সালে আবার ফ্রান্সে ফেরার পর, জীবনের বাকি সময়টা লুইস মিশেল কাটিয়েছেন হয় জেলখানায়, নয়তো বক্তৃতা দিয়ে। ১৮৮৬ সালে প্রকাশিত হয় তাঁর আত্মজীবনী, Mémoires de Louise Michel écrits par elle-même। এই লেখাটি সেই বইয়ের অংশ।

    লুইস মিশেল (১৮৩০-১৯০৫)

    আমি প্রথমে নিজের সম্পর্কে কিছু না বলেই এই ভলিউমটি লিখেছিলাম। বন্ধুরা যখন এ ব্যাপারটি আমার নজর আনল, কিছু বিষাদ হজম করে হলেও আমি ব্যক্তিগত কিছু পর্ব যুক্ত করলাম।  আমি যা করেছি বরং তার বিপরীত প্রভাবটিই প্রকাশিত হতে শুরু করল: কাহিনিটি এগিয়ে নেয়ার সাথে সাথে আমি আমার প্রকৃত অস্তিত্ব মুক্তি সংগ্রামের সেই সময়টির স্মৃতিময় পুনর্জীবন দেখতে ভালবাসলাম এবং এর স্মৃতিতে নিজেকে হারাতে আমি ভালোবাসি।

    এজন্যই আমি আমার চিন্তাভাবনাগুলিকে এমন এক ধারাবাহিক টুকরো টুকরো দৃশ্যের সমাহার হিশেবে দেখি যেখানে অগুনিত অস্তিত্ব চিরতরে অদৃশ্য হয়ে যায়।

    আমরা Champs de Mars এ অবস্থান করছি: আমাদের অস্ত্রগুলি স্তুপীকৃত এবং অসাধারণ এক রাত। রাত তিনটার দিকে আমরা ভের্সাইতে যাব ভেবে রওয়ানা হলাম। আমি বৃদ্ধ Louis Moreau এর সাথে কথা বলি এবং তিনিও যাত্রা করতে পেরে বেজায় খুশি। আমার পুরানা রাইফেলের জায়গায় তিনি আমাকে একটি রেমিংটন কারবাইন দিয়েছেন। এই প্রথমবারের মতো আমার কাছে একটি ভাল অস্ত্র এসেছে যদিও এটি খুব একটা নির্ভরযোগ্য না বলে বলা হয়েছিল। তবে কথাটি সত্য নয়। আমি আমার মাকে বলা মিথ্যাগুলো পুনর্ব্যক্ত করলাম যেন তার দুশ্চিন্তা না হয়। আমার দিকথেকে সমস্ত সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে, আমার পকেট আশ্বাসব্যঞ্জক পত্রে ঠাসা, যেগুলো আগাম তারিখে পোস্ট করা হবে। আমি আমার মা’কে বলি তাদের আমাকে প্রয়োজন ছিল; আমি প্রথম মুহূর্তেই মন্টমার্টে যাবো।

    আমার হতাভাগা মা! আমি কতই না তাকে ভালোবাসতাম! আমার বিবেকের নির্দেশ অনুসারে তিনি আমাকে চলার যে স্বাধীনতা দিয়েছেন তার জন্য আমি তার কাছে চিরকৃতজ্ঞ এবং আমি প্রায়শই তার দুর্দিনে তাকে রক্ষা করতে কতই না পছন্দ করতাম!

    মন্টমার্টের কমরেডরা আছেন। আমরা একে অপরের বিষয়ে নিশ্চিত এবং যারা আদেশ দিবে তাদের সম্পর্কে নিশ্চিত।

    এখন আমরা চুপ করে যাই; লড়াই শুরু হয়েছে। একটি পাহাড়ে আমি এগিয়ে যেতেই চিৎকার করছি: ভার্সাই এর দিকে! ভার্সাই! লোকেদের জড়ো করার জন্য রাজাউয়া আমাকে তার তলোয়ারটি ছুঁড়ে দিল। আমরা পাহাড়ের চূড়ায় হাত মিলিয়েছি; আকাশে যেন আগুনের ছটা! কেউ আহত হয়নি।

    আমরা ছোট গাছের স্টাম্পে পূর্ণ জমিকে ট্যারিলেয়ার হিশেবে স্থাপন করি। আপনি ভাববেন যে আমরা এটি আগেও করেছি।

    এবার আমরা মৌলিনাক্সে (Moulineaux) রয়েছি। যেমনটা ভাবা হয়েছিল ঠিক তেমন সৈন্য সন্নিবেশিত নেই। একবার ভাবলাম আমরা আরও অগ্রসর হবো, কিন্তু না, আমরা এখানেই রাত কাটাতে যাচ্ছি, আমাদের একাংশ দূর্গে, বাকিরা জেসুইট কনভেন্টে। আমাদের মধ্যে যারা ভেবেছিল যে আমরা আরও এগিয়ে যাব, মন্টমার্তের কমরেডরা এবং আমি নিজেও, ক্রোধে কন্দনরত। তথাপি আমরা দৃঢ় আত্মবিশ্বাসী। ইউডস, র্যানভিয়ার বা অন্যরা কেউই গুরুতর কারণ ছাড়া যেখানে থাকার কথা সেখানে থাকবেন না। তারা আমাদের কারণগুলি জানায় কিন্তু আমরা শুনি না। আমরা আশা পুনর্জীবিত করি: ইসির দূর্গে এখন কামান প্রস্তুত আছে এবং সেখানে থাকাই ভাল হবে। দখলকৃত অবশিষ্টাংশ, বন্দুকের ক্যালিবারের সাথে খাপ না খাওয়া গুলি সমেত আমাদের যুদ্ধসজ্জা অদ্ভুত।

    আমি দেখলাম আমাকে ছায়ার মতো পাশ কাটিয়ে যাচ্ছে যারা কনভেন্টের নীচের বড় হলে ছিল: ইউডস, মে ভাইয়েরা, ক্যারিয়া ভাইয়েরা, বীরের মতো সাহসী তিন বৃদ্ধ পুরুষ: বৃদ্ধ মোরো, বৃদ্ধ শেভালিট, বুড়ো মানুষ ক্যারিয়া, রাজউয়া, মন্টমার্তের সকল ফেডারেল; বন্য জন্তুর মতো স্পষ্ট সাদা দাঁতযুক্ত এক নিগ্রো কালো: তিনি ভাল, বুদ্ধিমান এবং সাহসী।

    জেসুইটরা চলে গেছে, কেবলমাত্র একজন একজন বৃদ্ধ লোক ছাড়া যিনি বললেন যে তিনি কমিউনে ভীত নন এবং তিনি নিজের ঘরে শান্তিপূর্ণভাবে অবস্থান করছেন এবং যে রাঁধুনি, কেন জানি না, সে আমাকে আমার ভাই জিন ডেস ইউটোমার্সকে স্মরণ করিয়ে দেয়। দেয়ালগুলি সাজাতে যে পেইন্টিংগুলি ব্যবহার করা হয়েছে বিষয়বস্তুর চরিত্র সম্পর্কে ভাল ধারণা দেয় এমন একটি প্রতিকৃতির দিকে আলাদাভাবে নজর গেল আমার, নিশ্চই কোন না কোন জেসুইট পরিভালকের প্রতিকৃতি হবে।

    একটি বেশ জমকালো দূর্গ, আমি আর্টিলারিম্যানদের সাথে বেশ ভাল সময় ব্যয় করি। আমরা সেখানে দীর্ঘকালীন বন্ধু ভিক্টরিন ইডস-এর দেখা পেয়েছি, এখনও তিনি শক্ত-সমর্থ রয়েছেন। তিনিও গুলি চালাতে বেশ পারদর্শী।

    আছেন নারীরা, যারা তাদের বুলেটবিদ্ধ লাল পতাকাসমেত ফেডারেলকে স্যালুট জানাচ্ছিল। তারা দূর্গে মোবাইল হাসপাতাল স্থাপন করেছিল, সেখান থেকে আহতদের প্যারিসে উন্নততর হাসপাতালে প্রেরণ করা হয়। আরও কার্যকর হতে আমরা ছড়িয়ে পড়ি। আমি ক্ল্যামার্টে ট্রেন স্টেশনে যাই, প্রতি রাতে ভের্সাই আর্টিলারি দিয়ে গুলি চালাতাম। আমরা ইসির দূর্গে যাওয়ার জন্য একটি হেজ রেখাযুক্ত পথ অনুসরণ করি; রাস্তাগুলো কামানে পিষ্ট পুষ্পাঞ্জলিতে পূর্ণ।

    কাছেই পাথর কল। ক্ল্যামার্ট ট্রেঞ্চে প্রায়শই আমাদের যথেষ্ট লোকবল থাকে না। কেল্লার কামান যদি আমাদের সমর্থন না করে তবে যে-কোন আচমকা আক্রমণের মুখে পড়ে যাওয়া সম্ভব ছিল: ভের্সাইপন্থীরা কখনওই জানত না সংখ্যায় আমরা ঠিক কত গুটিকয়েক ছিলাম।

    ব্যারিকেড, দ্য প্যারিস কমিউন || শিল্পী: আন্দ্রে দেভাম্বে

    এমনকি এমনও হয়েছিল যে এক রাতে স্টেশনের সামনের পরিখরে আমরা কেবল দু’জন ছিলাম!, যদিও আমি জানি না কেন: প্রাক্তন পন্টিফিকাল জোউভে এবং আমার লোডেড রাইফেলসহ: আমরা নূন্যতম সতর্কতা অবলম্বন করেছিলাম। আমাদের অবিশ্বাস্য ভাগ্য সেই রাতে কোন আক্রমণ হয়নি। আমরা যখন ট্রেঞ্চের সামনে পিছনে টহল দিচ্ছিলাম, তখন মুখোমুখি হতেই তিনি আমাকে বললেন:

    “আমরা যে জীবনযাপন করছি তা নিয়ে আপনার অনুভূতি কেমন?”

    “অদূরেই একটা নদীর তীর দেখতে পাওয়ার মতন অনুভূতি, যেখানে আমাদেরকে পৌঁছাতে হবে। ”, আমি বললাম।

    তিনি উত্তর দিলেন, “আমার কাছে একটি ছবিওয়ালা বই পড়ার মতো অনুভূতি হচ্ছে।”

    আমরা ক্ল্যামার্টের ওপর ভের্সাই এর নীরবতার মধ্যেই পরিখায় হাঁটতে থাকি।

    লিসবন যখন সকালে তাঁর সাথে একদল লোক নিয়ে হাজির হলো এসেছিল তখন তিনি একইসাথে খুশি ও ক্ষিপ্ত হয়েছিলেন, যেন মাছি তাড়াচ্ছেন এমন ভঙ্গিতে নীচে মাথা নাড়ছিলেন।

    একই জায়গায় বার্সার সাথে আরও একটি রাতের অভিযাত্রা, যারা আমাদের ছেড়ে চলে গিয়েছিল তাদের হাজার হাজার বিপদ নিয়ে ভের্সাইয়ের আগুনে যেন আমাদের সাথে যোগ দিতে।

    আমি আবারও এসব দেখতে পাচ্ছি। যেন স্বপ্নের রাজ্যে স্বপ্ন, স্বাধীনতার স্বপ্ন।

    একজন শিক্ষার্থী যে কিনা আমাদের ধারণাগুলো ধারণ করে না, তবে ভের্সাইপন্থীও নন, তার সম্ভাবনার গণনা যাচাই করার লক্ষ্যে আগুনের বিনিময়ে ক্ল্যামার্টে এসেছিল।

    তার সাথে ছিল বদলেয়ারের একটি ভলিউম, যা আমরা সময় সময় কয়েক পৃষ্ঠা পড়েছিলাম।

    একদিন যখন বেশ কয়েকটি ফেডেরাল একই জায়গায় খাদের মাঝখানে একটি ছোট প্ল্যাটফর্মে কামানবল দ্বারা আঘাতপ্রাপ্ত হয়েছিল, তখন সে তার হিসাবগুলি আবার পরীক্ষা করতে চেয়েছিল এবং আমাকে এক কাপ কফির আমন্ত্রণ জানিয়েছিল।

    আমরা স্বাচ্ছন্দ্যে নিজেদেরকে স্থির করেছিলাম এবং “La Charogne” শিরোনামের কবিতাটি পড়ছিলাম। আমাদের কফি যখন প্রায় শেষের দিকে, তখন ন্যাশনাল গার্ডের সৈন্যরা আমাদের দিকে ঝুঁকে পড়ে, আমাদেরকে টেনেহিঁচড়ে নিতে থাকে আর চেঁচিয়ে বলতে থাকে, “আচ্ছা, আচ্ছা! বেশ! এখনই এসব থামাতে হবে!”

    ঠিক সেই মুহূর্তেই কামানের গোলাটি আঘাত হানল এবং কাপগুলো প্ল্যাটফর্মে পড়ে টুকরো টুকরো হয়ে গেল, বইটিকে অতিসূক্ষ্ম ছেঁড়া টুকরোতে পরিণত করল।

    “আমার হিসাব একদম হুবহু ছিল,” শিক্ষার্থীটি তার শরীরকে আচ্ছাদিত করা ময়লা পরিস্কার করতে করতে বলল।

    এরপর সে আরও কয়েকদিন ছিল, কিন্তু আমি তাকে আর দেখিনি।

    কমিউনের দিনগুলোতে আমি কেবল একটা চ্যাংড়া ছেলের মধ্যেই সাহসের অভাব দেখেছি। সে তার সদ্য বিবাহিত বউ এর চিন্তায় পেরেশান ছিল এবং তার ডরপুক স্বভাবের সমালোচনা করে তাকে প্যারিস ফেরত পাঠাতে ইউডসের কাছে আমি এক পত্র পাঠিয়েছিলাম। চ্যাংড়াটি এতেও খুশি ছিল। আমি লিখেছিলাম:

    “প্রিয় ইউডস,

    আপনি কি অনুগ্রহ করে এই আহাম্মকটিকে প্যারিসে ফেরত পাঠাবেন? এ কেবল ঘাবড়াতেই জানে! আমি তাকে বুঝিয়েছি যে আমাদের দূর্গ থেকে যেসব কামান দাগা হচ্ছে, তা মূলত ভের্সাই থেকে আমাদের দিকে দাগা হচ্ছে। যেন সে দ্রুত পালায়। দয়া করে তাকে দ্রুত প্যারিস পাঠিয়ে দিন।”

    সে এতটাই ভয় পেয়েছিল যে আমরা আর তাকে দেখিনি। ভার্সাই সেনাবাহিনী প্যারিসে প্রবেশের সময় সে যদি তার ফেডারাল ইউনিফর্ম রাখে, তবে তাকে অবিলম্বে কমিউনপন্থী ধরে নিয়ে সাথে সাথে গুলি করে হত্যা করা হত। এই পরিস্থিতিতে আরও অনেকে ছিলেন।

    একই ধরনের অন্য একটি যুবক ছিল। একদিন রাতে ক্লামার্ট স্টেশনে যখন আমরা হাতেগোণা কয়েকজন ছিলাম এবং ভের্সাই থেকে আমাদের দিকে গুলিবর্ষণ করা হচ্ছিল, এমন এক অবস্থায় সে হঠাৎ আত্মসমর্পণের কল্পনায় মশগুল হয়ে গেল। কিছুতেই তাকে অন্য কিছু বোঝানো যাচ্ছিল না। আমি তাকে বলেছিলাম: “তুমি চাইলে আত্মসমর্পণ কর, তবে আমি এখানেই থাকব এবং তুমি যদি আত্মসমর্পণ কর তবে আমি স্টেশনটি উড়িয়ে দেব”, আমি একটি ছোট্ট চেম্বারে একটি মোমবাতি জ্বালিয়ে বসেছিলাম যেখানে প্রজেক্টিকেলগুলো স্তূপ করে রাখা, সেখানে আমার সাথে করমর্দন করতে এল সেই নিগ্রোটি। সে সেদিন টহলে ছিল। পরেরদিন যুবকটি চলে গেল এবং কখনই ফিরে আসেনি।

    ক্ল্যামার্টে আমি ও ফার্নান্দেজ বিচিত্র কিছু অ্যাডভেঞ্চারের মুখোমুখি হলাম। আমরা বেশ কয়েকজন ফেডারালদের সাথে গেম ওয়ার্ডেনের বাড়িতে গিয়েছিলাম, যেখানে ভাল লোকদের ডেকে আনা হয়েছিল।

    আমাদের চারপাশে এত এত  গুলি ছড়ানো-ছিটানো ছিল যে ফার্নান্দেজ আমাকে বলেছিলেন: “যদি আমি মারা যাই তবে আমার ছোট বোনদের খেয়াল রাখবেন।” আমরা আলিঙ্গন করি এবং রাস্তা ধরে এগুতে থাকি। আহত তিন বা চারজন লোক বাড়িতে ছিল, মেঝেতে বা গদিতে পড়ে ছিল। গেম ওয়ার্ডেন অনুপস্থিত ছিলেন এবং তাঁর একা হয়ে পড়া স্ত্রীকে বেশ ভীত দেখাচ্ছিল।

    শিল্পী: ‍গুস্তাভ বুলাঁজ্যে

    যখন আমরা আহত লোকদের নিতে শুরু করি তখন তিনি আমাকে ও ফার্নান্দেজকে চলে যেতে অনুরোধ করতে শুরু করলেন। বহন করা যায় না এমন আহতদের তিনি আমাদের সাথে থাকা ফেডারেলদের তত্ত্বাবধানে রেখে আমাদের চলে যেতে বললেন।

    ভদ্রমহিলা কেন এইরকম আচরণ করছিলেন তা বুঝতে পারছিলাম না। আমরা দুনিয়ার কোন কিছুর বিনিময়ে আহতদের এমন ঝুঁকিপূর্ণ জায়গায় রেখে যাব না। আমরা আমাদের সাথে থাকা অ্যাম্বুলেন্স স্ট্রেচারগুলিতে বেশ কষ্টেসৃষ্টে আহতদের উঠাচ্ছিলাম আর ওই মহিলা আমাদের পেছিন পেছন এসে বারংবার আমাদেরকে কেটে পড়তে বলছিলেন।

    তার কথা তেমন একটা আমলে নেয়া হচ্ছে না দেখে তিনি চুপ করে গেলেন এবং গুলিবিদ্ধ আহত রোগীদের নিয়ে তার সদর দরজা থেকে আমরা সামনে অগ্রসর হলাম।

    পরে আমরা জানতে পারলাম যে তার ঘরেই ভের্সাই এর নিয়মিত সৈনিকরা ঘাপটি মেরে ছিল। তিনি অন্য নারীকে খুন হতে দেখতে হবে এই ভয়ে ছিলেন? নাকি তিনি স্রেফ হতভম্ব অবস্থায় ছিলেন?

    আমাদের বয়ে নিয়ে আসা আহতদের মধ্যে আমরা একটি অর্ধ-মৃত ছোট ভের্সাই সৈনিককেও নিয়ে এসেছিলাম যাকে অন্যান্যদের সাথে প্যারিসের ভ্রাম্যমাণ হাসপাতালে রাখা হয়। ধীর ধীরে সে সেরে উঠছিল। প্যারিস আক্রমণের সময়ে অন্য সৈনিকদের সাথে হয়তো তাকেও মেরে ফেলা হতো।

     ইউডস যখন লিজিওন অফ অনারে গিয়েছিলেন তখন আমি লা সিসিলিয়ার সাথে মন্ট্রোজে এবং তারপরে ডম্ব্রোভস্কির সাথে নিউইলি গিয়েছিলাম। এই দু’জন পুরুষ শারীরিকভাবে একে অপরের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ নন; অথচ ক্রিয়াকালীন তাদের একই দ্রুত দৃষ্টি, একই সিদ্ধান্ত, একই দুর্গমতা।

    সাধারণভাবে ফেডারেলদের সাহসের কোন তুলনা হয় না। মূলত এই সাহস ছিল একটি বিপ্লবী আন্দোলনের উদ্দীপনা। কমিউনের সেনাবাহিনী সম্পর্কে অপবাদগুলি প্রদেশগুলির চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে; এই সেনাবাহিনীকে দস্যু এবং ন্যায়বিচার থেকে পলাতকদের সমন্বয়ে গঠিত একটি বাহিনী বলে অভিহিত করা হয়।

    তবুও পাওল মিংক, আমোরোকস এবং অন্যান্য বীর বিপ্লবীরা যে সমস্ত কমিউন ঘোষিত বড় শহরগুলিতে তাদের অনুগামীদের পাঠিয়েছিল। বাকি প্রদেশ এবং গ্রামাঞ্চল ভার্সাই থেকে সামরিক প্রতিবেদন পেয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, যে ডুভালের মৃত্যুতে গ্রামগুলি আতংকিত হয়ে পড়েছিল।

    প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, “আমাদের সেনাবাহিনী ৫০০ এরও বেশি বন্দি গ্রহণ করেছে এবং তাদের মধ্যে আমরা শয়তানগুলোর মুখ বন্ধ করতে পারি যারা হালকা মন দিয়ে তাদের পাশবিক আবেগের বশে দেশটিকে প্রায় ধ্বংস করে দিয়েছিল। বেশিরভাগের বয়স চল্লিশ-পঞ্চাশ বছরের মধ্যে ছিল, তবে ঘৃণ্য ব্যক্তিদের এই দীর্ঘ লাইনে বৃদ্ধ পুরুষ এবং শিশুরাও ছিলেন। তাদের মধ্যে কিছু মহিলাও দেখা গেছে। ক্রুদ্ধ জনতার কব্জা থেকে এদেরকে ছাড়িয়ে নিতে এদের প্রহরা দিয়ে নিয়ে আসা অশ্বচালিত অশ্বারোহী প্লাটুনকে বেশ বেগ পেতে হয়েছে। তা সত্ত্বেও, আমরা তাদের অক্ষত অবস্থায় আস্তাবলের কাছে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছি।

    “ব্যক্তি ডুভাল, সেই অন্য নকল জেনারেল, সকালে দুই সাধারণ কর্মচারীর সাথে তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছিল।”

    “তিনজনই গর্বের সাথে অস্ত্র তুলে নেয়া সমস্ত বিদ্রোহী নেতাদের ভাগ্যে যা ঘটে  সেই ভাগ্য বরণ করেছিল।”

    (ভের্সাই সেনাবাহিনীর এক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার রচিত The war of the Communists of Paris)

    আমরা জানতাম যে সাম্রাজ্যের জেনারেলরা যারা নিজেদের পদবি ব্যতীত অন্য কোনও পরিবর্তন না করে ভের্সাই প্রজাতন্ত্রের সেবায় চলে গিয়েছিলেন তাদের কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করা যায়।

    প্যারিস হত্যার ভবিষ্যতের অন্যতম প্রতিশোধ হবে সামরিক প্রতিক্রিয়ার প্রচলিত কুখ্যাত বিশ্বাসঘাতকতা প্রকাশ করা।

  • জেমস গিঁয়ুম || ফেডেরালবাদ: প্যারিস কমিউনের গঠনতন্ত্র 

    জেমস গিঁয়ুম || ফেডেরালবাদ: প্যারিস কমিউনের গঠনতন্ত্র 

    • অনুবাদ: অনিক সন্ধি

    সম্পাদকের নোট: ১৮৭১ সালের এপ্রিলে, Solidarité পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় লেখাটি প্রকাশ করেছিলেন জেমস গিঁয়ুম। প্রেক্ষাপট ছিল: কিভাবে ফেডারেটিভ নীতিমালার ভিত্তিতে প্যারিস কমিউন গড়ে উঠতে পারে।

    জেমস গিঁয়ুম (১৮৪৪-১৯১৬)

    প্যারিসে সংঘটিত বিপ্লবের সত্যিকারের চরিত্র এত স্পষ্টভাবে ছড়িয়ে পড়েছে যে রাজনৈতিক তত্ত্ব সম্পর্কে অপরিচিত একজন ব্যক্তিও তা সহজে বুঝে ফেলতে পারবে। 

    প্যারিসের বিপ্লব হল ফেডেরালিস্ট। 

    প্যারিসের জনতা নিজ ইচ্ছা মত সংগঠিত হবার স্বাধীনতা চায়। তারা চায় না ফ্রান্সের বাকি অংশ তাদের বিষয়ে নাক গলাক। ঠিক তেমনি তারাও চায় না অন্যের বিষয়ে তারা নাক গলাবে বা মাতব্বরি করবে। তারা একই সাথে সবাইকে তাদের নিজ আঞ্চলিক স্বায়ত্বশাসন অনুযায়ী সংগঠিত হবার আহবান যানায়। 

    এরূপ বিভিন্ন স্বায়ত্বশাসিত সংগঠন মুক্তভাবে যুক্ত হবে, বা অন্য ভাষায় ফেডারেটেড হবে, যাতে তারা একে অপরের অধিকার ও স্বাধীনতা নিশ্চিত করতে পারে। 

    বলে রাখা ভাল প্যারিসের এই ফেডেরালবাদকে যুক্তরাষ্ট্র বা সুইজারল্যান্ডের কথিত “ফেডেরালবাদের” সাথে মিশিয়ে ফেলা উচিৎ হবে না।  

    সুইজারল্যান্ড সাধারণ এক ফেডেরাল রাষ্ট্র। এই শব্দই আলোচিত দুই সিস্টেমের পার্থক্য বলে দেয়। সুইজারল্যান্ড একটি রাষ্ট্র। সুইজারল্যান্ড রাষ্ট্রের দ্বারা সীমাবদ্ধ কতগুলোর জাতীর একক। তাই তার ফেডেরাল চেহারা থাকা সত্ত্বেও তার আসল সার্বভৌমত্ব রাষ্ট্রের সেই চূড়ার নিকটই একত্রিত। তার ক্যান্টনগুলো[mfn] সুইজারল্যান্ডের প্রশাসনিক এককগুলোকে ক্যান্টন বলা হয়। সুইজারল্যান্ডের ফরাসি নাগরিকগণ একে কমিউনও বলে। [/mfn] নিজস্ব একক ও সার্বভৌম সত্তা নয়। সেগুলো শুধু সুইস রাষ্ট্রের সম্পূর্ণটার একাংশ। একটা ক্যান্টনের নিজের উপর সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই তাই তার সম্পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসনও[mfn] নিজেকে শাসন করার অধিকার। ইংরেজিতে এই অধিকারকে বলা হয় Self-determination। [/mfn] নেই। তার বিধাননীতি ফেডেরাল সংবিধানে[mfn] সুইস সংবিধান। পুরো নাম হল সুইস কনফেডারেশনের ফেডেরাল সংবিধান (The Federal Constitution of the Swiss Confederation) [/mfn] সীমাবদ্ধ। সেই ফেডেরাল সংবিধান কিন্তু কোন সত্যিকারের মুক্ত চুক্তি নয়। তার প্রতি সব ক্যান্টন আলাদা ভাবে সম্মতি দেয় নি। সব ক্যান্টনের উপর এই চুক্তি সংখ্যাগরিষ্ট ভোটের মাধ্যমে চাপিয়ে দেয়া হয়েছে। কোন ক্যান্টনের ফেডেরাল চুক্তি নাকচ করার অধিকার নেই। তাদের ফেডারেশন থেকে বের হবার কোন অধিকার নেই। আবার কোন ক্যান্টন বিভাজিত হয়ে নতুন ক্যান্টন তৈরি করারও কোন স্বাধীনতা নেই, সম্প্রতি টেসসিন[mfn] Tessin Canton অপর নাম Ticino canton। সুইজারল্যান্ডের ২৬টি ক্যান্টনের মধ্যে এটি অন্যতম। ১৯ শতকে (এই লেখাটির সময়কালে) টেসসিন সুইজারল্যান্ডের সবচেয়ে গরীব ও শোষিত অংশ ছিল এবং নিরক্ষরতার হার ছিল দেশের সর্বাধিক। স্বাভাবিকভাবেই এরূপ অন্যায় অত্যাচার প্রতিবাদের জন্য ও সার্বিক মুক্তির জন্য সেখানে নানা রাজনৈতিক আন্দোলনের জন্ম নেয়। ১৮৭০-১৮৯১ পর্যন্ত ফেডেরাল সেনাবাহিনীকে সেখানে ডাকা হয় নানান বিদ্রোহ দমনের জন্য। [/mfn] ক্যান্টনের সাথে যা হচ্ছে। একেবারে মামুলি কোন রাজনৈতিক বা সমাজবাদী আন্দোলন, যেমন কোন স্ট্রাইক, ফেডেরাল সেনাবাহিনীকে ক্যান্টনের দোর প্রান্তে নিয়ে আসতে পারে। 

    অর্থাৎ সুইজারল্যান্ড শুধু নামেই ফেডারেশন। সুইজারল্যান্ডকে আসলে ফেডারেশন না বলে বিকেন্দ্রিক বললে আরো সঠিক হয়। সুইজারল্যান্ডের মিল পাওয়া যাবে ফ্রান্সে “১৭৮৯ এর নীতির দ্বারা অনুপ্রাণিত” ১৭৯১ এর ভার্সাই এসেম্বলি-তে লিখিত সংবিধানের সাথে[mfn] ১৭৯১ এর ফরাসী সংবিধান ফরাসী জনতার শত বছরের স্বাধীনতা-সংগ্রামের রক্তে লিখিত সংবিধান। ইউরোপে প্রথমবারের মত এই সংবিধান মানবাধিকার ও সমানাধিকার কায়েম করে। প্রথমবারের মত তারা ঘোষণা করেঃ রাজা বা ঈশ্বর নয়, সার্বভৌমত্ত্বের সত্যিকারের উৎপত্তি হল জনগন। [/mfn] যা ফেডেরালবাদের আকাঙ্ক্ষা ধারণ করার চেষ্টা করে কিন্তু পুরোপুরি তা পারে না। 

    শিল্পকর্ম: Olgu Ülkenciler

    প্যারিস কমিউনের দ্বারা ও মহান সমাজবাদী প্রুঁধোর[mfn] পীঁয়ের জোসেফ প্রুঁধো। ১৯ শতকের বিখ্যাত ফরাসী সমাজবাদী ও অনেকের মতে প্রথম এনার্কিস্ট। [/mfn] বৈজ্ঞানিক তত্ত্ব দ্বারা প্রণীত ফেডেরালবাদ সম্পূর্ণভাবে রাষ্ট্র ও জাতিতত্ত্ব প্রত্যাখান করে। 

    ফেডেরালবাদের কাছে রাষ্ট্র, রাষ্ট্রের দ্বারা সীমাবদ্ধ জাতীয় ও ভূগৌলিক একক বলে কিছু নেই। সে শুধু চিনে কমিউন[mfn] ফরাসী শব্দ কমিউন দ্বারা প্রশাসনিক একক বুঝালেও সমাজবাদী বা কমিউনিস্ট তত্ত্বানুযায়ী বিপ্লবের পূর্ববর্তী, মধ্যবর্তী ও পরবর্তী সময়ে এর স্বাস্থ্যবান বিকাশ ও স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণের গুরুত্ব ব্যাপক। [/mfn] সমষ্টির ফেডারেশনকে। এ এমন এক সমষ্টি যার মূলনীতি শুধুমাত্র চুক্তিবদ্ধ দলগুলোর স্বার্থ রক্ষা করা। আর তাই জাতীয়তাবাদ ও ভূখন্ডের সীমা সে সম্পূর্ণভাবে অগ্রাহ্য করে। 

    ফেডেরালবাদের সামনে কোন রাষ্ট্র নেই। কোন কেন্দ্রীয় শক্তি নেই, যা অন্য সংগঠনের উপর নিজের মহত্ত্ব কায়েম করে ও নিজের কর্তৃত্ব তাদের উপর চাপিয়ে দেয়। সংগঠনের সমষ্টিগত শক্তিই তার একমাত্র শক্তি। এই সমষ্টিগত শক্তি তাদের ফেডেরাল চুক্তি নিশ্চিত ও রক্ষণাবেক্ষণে সাহায্য করে। কিন্তু এই চুক্তি সুইস বা যুক্তরাষ্ট্রীয় “ফেডেরাল” চুক্তির মত মামুলি চুক্তি নয়। এটি এমন এক চুক্তি যা নিশ্চিত করে প্রত্যেক চুক্তিকারী অন্য চুক্তিকারীর স্বার্থ রক্ষা করবে।[mfn] সিভিল ল’ তে এরূপ চুক্তিকে synallagmatic চুক্তি বলে। লেখাটির ইংরেজি ভাষান্তরে এই শব্দটিই ব্যবহৃত হয়েছিল। [/mfn] আর এই চুক্তি প্রত্যেক স্বাক্ষরকারী সংগঠনের দ্বারা আলাদা ও এককভাবে নির্ধারিত। এই সমষ্টিগত শক্তি কখনো অন্য ফেডারেট করা সংগঠনের উপর মহত্ত্ব কায়েম করতে পারবে না যেমনটা রাষ্ট্র সমাজ ও কমিউনগুলোর উপর করে। অর্থাৎ কেন্দ্রীয় রাষ্ট্র ও জাতীয় রাষ্ট্রের বিলুপ্তি ঘটবে। কমিউনগুলো নিজের পূর্ণ স্বাধীনতা পাবে ও সত্যিকারের নৈ-রাজ্য[mfn] নেই যার রাজ্য, নেই যার কর্তৃত্ত্ব। শাসন-শোষণ বিহীন এক স্বাধীন ও সাম্যবাদী সমাজ। [/mfn] ফুটে উঠবে। 

    শিল্পকর্ম: Olgu Ülkenciler

    তবে এ ভাবার কারণ নেই যে রাষ্ট্র ও জাতীয়তাবাদ দমনের পর ফেডেরালবাদ, স্বৈরাচারবাদ, একাকিত্ব, বিচ্ছিন্নতাবাদ বা অহংকারবাদের[mfn] Egoism। লেখক খারাপ অর্থে এ শব্দ ব্যবহার করলেও জার্মান লেখক ম্যাক্স স্টার্নার কতৃক এই দর্শন পরবর্তীতে নৈরাজ্যবাদের দর্শন ও সাহিত্যে খুব গুরুপূর্ণ অংশ হয়ে দাঁড়ায়। [/mfn] জন্ম দিবে। মোটেও না, ফেডেরালবাদ হল সমাজবাদী। তার কাছে সংহতি ও স্বাধীনতা অবিচ্ছিন্ন। কমিউনগুলো সম্পূর্ণ স্বায়ত্ত্বশাসিত হলেও নানা কারণে যেমন নিজের স্বাধীনতাকে আরো ভালোভাবে সুরক্ষার জন্য অন্য কমিউনের সাথে সংহতির মাধ্যমে থাকবে। এই সংহতি হবে অন্তরঙ্গ যা নিশ্চিত হবে নানান ফেডেরাল চুক্তির মাধ্যমে। এই চুক্তি তাদের সাধারণ স্বার্থগুলো নির্ধারণ করবে। বড় বড় জনসেবা কর্মকান্ড, পণ্য উৎপাদন ও বিনিময়, ব্যক্তি স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণ ও বহিরাগত আক্রমনের সময় মিউচুয়াল এইড – এসব ফেডেরাল চুক্তি নিশ্চিত করবে।

    ফরাসি জনতা তাদের দুর্দশা ও জুলুমের প্রতি জেগে উঠুক। সত্যের আলোয় তাদের চোখ আলোকিত হোক! ১৮৭১ সাল হোক সেই সাল, যে সালে তারা ফেডেরাল ও সমাজবাদী প্রজাতন্ত্র কায়েম করে। ঠিক যেমন ১৭৯৩ ছিল সেই সাল, যে সালে তারা মানবাধিকার কায়েম করে। ইউরোপ, যে আজ জার্মান সাম্রাজ্যের কালো থাবার তলে[mfn] পুরো ইউরোপের এক-চতুর্থাংশ তখন জার্মান সাম্রাজ্য ও অস্ট্রো-হাঙ্গেরিয়ান সাম্রাজ্যের পদতলে ছিল। সাম্রাজ্যবাদী দখলের জন্য যুদ্ধ লাখ লাখ মানুষের জীবন নাশ করেছিল। জার্মান সাম্রাজ্যের ফ্রান্স দখলের জন্য যুদ্ধের সময় তারা তার রাজধানী প্যারিস ঘেরাও করে। প্যারিসের জনতাকে জার্মান কসাইদের মর্জির উপর ছেড়ে দিয়ে ফরাসী সেনাবাহিনী ও শাসকগণ নির্লজ্জভাবে শহর ছেড়ে পালায়। কিন্তু ফরাসী জনতা কোনঠাসা হয়নি। বীরের মত তারা অস্ত্র তুলে নেয় ও ফরাসী কমিউন কায়েম করে। দুনিয়ার প্রথম সমাজবাদী বিপ্লব ছিল এটি। কিন্তু যে ফরাসী ও জার্মান সেনাবাহিনী ক’দিন আগেও একজন আরেকজনের গলা কাটছিল, তারা বিপ্লবের আভাস পেয়ে হাতে হাত মিলিয়ে প্যারিসে ঢুকে নির্বিচার গণহত্যা চালায়। অন্তত ২০,০০০ নিরীহ মানুষ শহীদ বরণ করে। প্যারিস কমিউন সাক্ষী, শাসক শ্রেণীর কোন জাতি নেই, দেশ নেই। তাদের স্বার্থ একটাই – পূঁজির কর্তৃত্ব বহাল রাখা। সে হোক জার্মান, ফ্রেঞ্চ, আমেরিকান, রাশিয়ান, চীনা, সৌদি, ইরানি, ভারতীয় বা বাঙালি – জনতা যখন সার্বিক মুক্তির জন্য শেষ যুদ্ধ ঘোষণা করবে, শাসক শ্রেণী দেশ, জাতি, ধর্ম, বর্ণ সব ভুলে সেই যুদ্ধে জনগণকে পরাজিত করার জন্য একত্রিত হবে। [/mfn], সে ইউরোপে আবারো জ্বলে উঠুক সাম্য ও স্বাধীনতার অনির্বাণ আগুন। 

  • পিতর ক্রপোৎকিন।। প্যারিসের কমিউন

    পিতর ক্রপোৎকিন।। প্যারিসের কমিউন

    • অনুবাদ: পার্থ প্রতীম দাস

    সম্পাদকের নোট: রাশিয়ান নৈরাজ্যবাদী পিতর ক্রপোৎকিনের এই লেখাটি লা রিভোল্ট পত্রিকায় প্রথম প্রকাশিত হয়েছিল ১৮৮০ সালে, ফরাসি ভাষায়। প্যারি কমিউনের প্রায় ১০ বছর পর। ১৮৯৫ সালে লেখাটির প্রথম ইংরেজি সংস্করণ প্রকাশিত হয় ফ্রিডম প্যামফ্লেটে। অনুবাদটি সেই ইংরেজি সংস্করণ অবলম্বনে করা হয়েছে। মূল লেখাটি পাবেন এখানে। 

    পিতর ক্রপোৎকিন (১৮৪২-১৯২১)

    ১. সাম্যবাদী বিবর্তনে কমিউনের স্থান

    ১৮৭১ সালের ১৮ মার্চ। প্যারিসের জনসাধারণ বিদ্রোহ করে ঘৃণিত ও নিন্দিত সরকারের বিরুদ্ধে। শহরটিকে ঘোষণা দেয় মুক্ত ও নিজেদের বলে।

    বিপ্লবের সময় সাধারণত যেসব ক্রিয়া-প্রতিক্রিয়া দেখা যায়, সেগুলো ছাড়াই উচ্ছেদ করা হয়েছিল কেন্দ্রীয় ক্ষমতাকে। এজন্য কোনো বন্দুকের গুলির প্রয়োজন হয়নি, ব্যারিকেডের সামনে রক্ত ঝরাতে হয়নি। মানুষ যখন নিজেদের সশস্ত্র করে রাস্তায় বেরিয়ে এসেছে, তখন [ভয়েই] শাসকরা পালিয়ে গিয়েছিল। তাদের সৈন্য-সামন্তরা শহর ছেড়েছিল, বেসামরিক কর্তৃপক্ষের মানুষজন হাতের কাছে যা কিছু পেয়েছে, তাই নিয়েই রওনা দিয়েছে ভার্সাইয়ের দিকে। সরকার ঠিক যেন উবে গিয়েছিল, যেভাবে গ্রীষ্মে বাষ্প হয়ে উবে যায় পুকুরের পানি। ১৯ মে, প্যারিস শহর নিজেকে আবিস্কার করে সেসব অপবিত্রতা থেকে পুরোপুরি মুক্ত অবস্থায়, যেগুলো দিনের পর দিন তাকে কলুষিত করেছে। আর এজন্য তার সন্তানদের এক ফোঁটা রক্তও ঝরাতে হয়নি।

    এর মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছিল বিপ্লবের দীর্ঘ ইতিহাসের নতুন এক অধ্যায়। যেখানে মানুষ দাসত্বের শেকল ভেঙে হাঁটতে শুরু করেছিল মুক্তির পথে। “প্যারিস কমিউন”-এর নামে জন্ম হয়েছিল নতুন একটি ভাবনার। যেটি ভবিষ্যতের আরো অনেক বিপ্লবের জন্য কাজ করছে সূচনাবিন্দু হিসেবে। 

    সব সময়ের মতো, এই ভাবনাটিও কোনো একক ব্যক্তির মাথা থেকে বা কোনো দার্শনিকের চিন্তা থেকে আসেনি; এটির জন্ম হয়েছিল একটি সম্মিলিত চেতনা থেকে, পুরো কমিউনিটির হৃদয় ও মস্তিস্ক থেকে। প্রথম দিকে অনেক কিছুই অবশ্য অস্পষ্ট ছিল। বিপ্লব-বিদ্রোহে অংশ নেওয়া অনেকেই হয়তো তাদের জীবনও দিয়েছেন, কিন্তু ঘটনাবলীর তাৎপর্য বুঝতে উঠতে পারেননি; যেভাবে এখন আমরা বুঝছি। তাদের অনেকেই হয়তো উপলব্ধি করেননি যে, কী ধরনের নতুন নীতি-নৈতিকতা তারা সামনে আনার চেষ্টা করছেন। সত্যিই বিষয়গুলো বাস্তবে চর্চা শুরুর পর তারা ধীরে ধীরে এগুলো উপলব্ধি করতে শুরু করেছেন। নতুন সেসব নীতি যখন সতর্কতার সাথে ও পর্যাপ্ত পর্যালোচনার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে শুরু করা হয়, তখন এগুলো আরো স্পষ্ট ও সুনির্দিষ্ট হতে থাকে। এগুলোকে তাদের পূর্ণ সৌন্দর্য্য ও স্বচ্ছতায় দেখতে পাওয়া যায়। বুঝতে পারা যায় এর ন্যায়-নীতি ও তার ফলাফলের গুরুত্ব। 

    কমিউনের আগের পাঁচ-ছয় বছরে, সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন একটি নতুন মাত্রা পেয়েছিল ইন্টারন্যাশন্যাল ওয়ার্কিংমেনস অ্যাসোসিয়েশনের দ্রুত বৃদ্ধি ও বিস্তৃতিতে। স্থানীয় শাখা পর্যায়ের বৈঠক ও সাধারণ সম্মেলনগুলোতে ইউরোপের শ্রমিকরা একে অপরের সঙ্গে মিলিত হতেন এবং নানাবিধ সামাজিক প্রশ্ন নিয়ে আলাপ-আলোচনা, পরামর্শ করতেন। এমনটা তারা আগে কখনো করেননি। তাদের মধ্যে যারা সামাজিক বিপ্লবকে প্রায় আসন্ন মনে করতেন এবং সেই পাটাতন তৈরির কাজে ব্যস্ত থাকতেন, তারা সব কিছুর ওপরে একটি বিষয়ে সমাধানের ব্যাপারে জোর দিয়েছিলেন। “শিল্পকারখানার বর্তমান এই অগ্রগতি, আমাদের সমাজকে একটি মহান অর্থনৈতিক বিপ্লবের মধ্যে দিয়ে যেতে বাধ্য করবে; এই বিপ্লবের মধ্য দিয়ে ব্যক্তিমালিকানা বিলুপ্ত হবে; আগের প্রজন্মগুলোর মাধ্যমে যেসব পুঁজি সঞ্চিত হয়েছে, তাতে সবার মালিকানা প্রতিষ্ঠিত হবে; কিন্তু আমাদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থায় এসব পরিবর্তন আনার জন্য কোন ধরনের রাজনৈতিক সংগঠন/জোট সবচে যথার্থ হবে?” 

    ইন্টারন্যাশনাল ওয়ার্কিংমেনস অ্যাসোসিয়েশনের উত্তর ছিল, “এই জোট কোনোভাবেই ক্ষুদ্র জাতীয়তার মধ্যে বন্দী থাকা যাবে না। এটিকে অবশ্যই কৃত্রিম সব সীমান্ত ও সীমারেখার বাধা পেরিয়ে যেতে হবে।” দ্রুতই এই মহান ধারণাটি মানুষের হৃদয়ে গেঁথে যায়, তাদের মস্তিস্কে স্থায়ী বসতি গড়ে। যদিও তারপর থেকে পৃথিবীর সব প্রজাতির প্রতিক্রিয়াশীলদের যৌথ উদ্যোগ এটিকে ধ্বংস করার চেষ্টায় নিয়োজিত আছে, কিন্তু তবুও এটিকে মেরে ফেলা যায় নি। এটি জীবিত আছে, এবং যখনই বিদ্রোহ-বিপ্লবের মধ্য দিয়ে এর সামনে থাকা বাধাগুলো সরে যায়, তখনই আবার এটি অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে আরো শক্তিশালী হয়ে সামনে আসে। 

    কিন্তু এই ধরনের বিস্তৃত একটি অ্যাসোসিয়েশন গড়ে ওঠার উপাদানগুলো কী ধরনের হবে, তা এখনো খুঁজে দেখা বাকি। 

    প্যারিস কমিউন, ১৮৭১ || গ্রেঞ্জার

    এখন পর্যন্ত, দুইভাবে এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়া হয়েছে। দুই ধরনের উত্তর থেকে তৈরি হয়েছে দুটি আলাদা চিন্তাধারা। যার একদিকে আছে জনপ্রিয় রাষ্ট্র; এবং অন্যদিকে নৈরাজ্য।

    জার্মান সমাজতন্ত্রীরা বলেছেন যে, রাষ্ট্রই এসব পুঞ্জিভূত সম্পদের দায়িত্ব গ্রহণ করবে এবং সেগুলো শ্রমিকদের অ্যাসোসিয়েশনগুলোতে বিতরণ করবে। এছাড়াও রাষ্ট্রই উৎপাদন ও বিনিময়ের ব্যবস্থাগুলো পরিচালনা করবে, এবং সামগ্রিকভাবে সমাজ ও ব্যক্তিজীবনের যাবতীয় কর্মকাণ্ডের দিকে নজর রাখবে। 

    এর জবাবে, অনেক বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের অভিজ্ঞতায় ঋদ্ধ, ল্যাটিন জাতির সমাজতন্ত্রীরা বললেন, সত্যিই যদি এমন কোনো রাষ্ট্র কখনো থেকে থাকে, তাহলে তা হবে একটি অলৌকিক ঘটনা। আর সত্যিই যদি এমন কিছু দেখা যায়, তাহলে নিশ্চিতভাবেই তা হবে সবচে বাজে ধরনের স্বৈরশাসন। এই সমাজতন্ত্রীরা বলেছিলেন: সর্বক্ষমতাময় ও কল্যানমূলক একটি রাষ্ট্রের ধারণা শুধুই অতীত থেকে ধার করে আনা হচ্ছে। এবং এটি মোকাবিলার জন্য তারা সামনে এনেছেন একটি নতুন আদর্শ: নৈরাজ্য। যেখানে রাষ্ট্রের পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটাতে হবে এবং সহজ-সাধারণ থেকে শুরু করে জটিল; সব ধরনের সামাজিক সংগঠনই গড়ে তুলতে হবে উৎপাদক ও ভোক্তার জনপ্রিয় সব গ্রুপগুলোর মুক্ত ফেডারেশনের মাধ্যমে।

    দ্রুতই এটি মেনে নেওয়া হয় যে, জনপ্রিয় রাষ্ট্রের বদলে নৈরাজ্যের মাধ্যমেই সমাজকে আরো ভালোভাবে সংগঠিত করা সম্ভব। এমনকি উদার মানসিকতার রাষ্ট্রপন্থী সমাজতন্ত্রীরাও এটি মেনে নিয়েছিলেন। কিন্তু তাদের কথা হলো: নৈরাজ্যবাদী আদর্শ এতোই ‍দূরের ব্যাপার যে আমরা এখনই এ নিয়ে মাথা ঘামাতে চাই না। 

    একই সঙ্গে, এটিও সত্য যে, নৈরাজ্যবাদী তত্ত্বগুলোর কিছু মাত্রায় স্পষ্ট প্রকাশভঙ্গির প্রয়োজন ছিল। এমন কিছু সূত্রের প্রয়োজন ছিল যা একই সঙ্গে সহজ-সাধারণ এবং বাস্তবসম্মত। কোন সময় থেকে এটি পুরোনো সমাজের সঙ্গ ছেড়ে নতুন পথে যাত্রা করবে, এবং কিভাবে মানুষের সত্যিকারের ঝোঁক-প্রবণতাগুলো থেকে এটি সমর্থন পাবে; ইত্যাদি বিষয় আরো স্পষ্টভাবে তুলে ধরার প্রয়োজন ছিল। জাতি-সীমানা নির্বিশেষে শ্রমিক ইউনিয়ন ও ভোক্তাদের গ্রুপগুলোর ফেডারেশন, যেটি কিনা স্বাধীনভাবে কাজ করবে– ধারণাটিকে খুব অস্পষ্ট বলে মনে হয়েছিল। এবং, তারচেয়েও বড় কথা, খুব সহজেই দেখা যাচ্ছিল যে, এটি মানুষের অসীম চাহিদা বা প্রয়োজনীয়তা পুরোপুরি মেটাতে পারবে না। ফলে একটি স্পষ্ট ও পরিস্কার সূত্র প্রয়োজন হয়ে পড়েছিল, যা থেকে বিষয়গুলো সহজেই বোঝা যাবে। এবং যেটি সত্যিকারের জীবন-বাস্তবতার ভিত্তিতে শক্তভাবে গড়ে উঠবে।

    একটি তত্ত্বকে কোন উপায়ে আরো ভালোভাবে ব্যাখ্যা করা যায়- প্রশ্নটি যদি শুধু এটিই হতো, তাহলে আমরা হয়তো বলতাম, শুধু তত্ত্বের কোনো বিশেষ গুরুত্ব নেই। কিন্তু নতুন কোনো ধ্যানধারণার যদি একটি স্পষ্ট, সুনির্দিষ্ট বক্তব্য না থাকে; সেটি যদি স্বাভাবিক সব কর্মকাণ্ডের মধ্যে থেকে গড়ে না ওঠে, তাহলে সেটি কখনোই মানুষের মস্তিস্কে জায়গা করে নিতে পারে না। তাদেরকে অনুপ্রাণিত করতে পারে না একটি প্রাণপন লড়াইয়ে যোগ দিতে। সামনে কোনো ইতিবাচক ও স্পষ্ট চিন্তা না থাকলে মানুষ নিজেকে অজানা-অচেনা পরিস্থিতির মধ্যে ছুঁড়ে ফেলে না। পরিবর্তনের শুরুর জায়গাটিতে পৌঁছানোর পর এটি কাজ করে একটি স্প্রিংবোটের মতো।  

    শুরুর জায়গাটির ক্ষেত্রে বলতে হয়, বাস্তব জীবনের নানা ঘটনাবলী-অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই এটিকে এই অবস্থায় আসতে হবে। 

    পুরো পাঁচ মাস প্যারিসকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছিল জার্মান অবরোধকারীরা। এই পাঁচ মাসে প্যারিসকে নিজেই নিজের গুরুত্বপূর্ণ রিসোর্সগুলো সরবরাহ করতে হয়েছে। এবং সে জেনেছে কী বিপুল পরিমাণ অর্থনৈতিক, বুদ্ধিবৃত্তিক ও নৈতিক শক্তি তার আছে। সে তার নিজের নতুন নতুন সব উদ্যোগের দিকে এক নজর তাকিয়েই সেগুলোর অর্থ উপলব্ধি করেছে। একই সময়ে, সে এটিও দেখছিল যে, ক্ষমতা দখল করা নির্বোধ মানুষদের কোনো ধারণা নেই কিভাবে ফ্রান্সের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলা যায় বা এর অভ্যন্তরীন বিষয়াবলী পরিচালনা করা যায়। সে দেখছিল যে, শহরের প্রতিটি স্বতঃস্ফূর্ত বুদ্ধিবৃত্তিক প্রকাশের বিপরীতে দাঁড়িয়ে যায় বা দ্বিধা-সংশয় তৈরি করে কেন্দ্রীয় সরকার। এবং শেষপর্যন্ত, সে বুঝতে পেরেছিল যে, বড় কোনো বিপর্যয় থেকে সুরক্ষার জন্য বা দ্রুত বিবর্তনের পথ নির্বিঘ্ন করার জন্য যে কোনো ধরনের সরকারকে অবশ্যই নিস্ক্রিয় করে রাখতে হবে। প্যারিসের সেই অবরোধের মধ্যে, তার রক্ষাকারী, তার শ্রমিকরাই সবচে দুর্দশার মধ্যে পড়েছিল। অন্যদিকে, তার নিস্ক্রিয় নাগরিকরা উপভোগ করছিল উদ্ধত আভিজাত্য। এবং প্যারিস দেখেছে: কেন্দ্রীয় সরকারের কারণে এসব কেলেঙ্কারির অবসান টানা যায় নি। প্রতিটা সময়, যখনই প্যারিসের সাধারণ মানুষ নতুন কোনো মুক্ত আকাঙ্ক্ষার কথা প্রকাশ করেছে, তখনই সরকার সেগুলোর ওপর বাড়তি বোঝা চাপিয়ে দিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই, এই অভিজ্ঞতা থেকে এমন ধারণার জন্ম নেয় যে, প্যারিসকে অবশ্যই একটি স্বাধীন কমিউন হতে হবে। এবং এর দেয়ালের মধ্যে থাকা নাগরিকদের আশা-আকাঙ্ক্ষা উপলব্ধি করতে হবে। 

    ১৮৭১ সালের কমিউন একটি প্রথম পদক্ষেপ ছাড়া আর কিছুই না। এটি শুরু হয়েছিল একটি যুদ্ধের শেষপ্রান্তে দাঁড়িয়ে, যেখানে দুই দেশের সেনাবাহিনী জনতার এই বিপ্লবকে গুঁড়িয়ে দেওয়ার জন্য হাত মেলাতে প্রস্তুত ছিল। এসব পরিস্থিতির মুখে তারা নিঃসংশয়ভাবে অর্থনৈতিক বিপ্লবের পথে হাঁটতে পারেনি; এটি নিজেকে সাম্যবাদী বলেও দৃঢ় ঘোষণা দিতে পারেনি; পুঁজি বিলুপ্ত বা শ্রম সংগঠনের দিকেও এটি যেতে পারেনি; এটি এমনকি শহরের সাধারণ সব মালসামানকেও বিবেচনায় নেয়নি। 

    রাষ্ট্র, বা প্রতিনিধিত্বমূলক সরকারের অতীত ঐতিহ্যও এটি ছিন্ন করতে পারেনি। স্বাধীনতা ও কমিউনগুলোর মুক্ত ফেডারেশনের ঘোষণা না দিয়েই কমিউন তৈরি হয়েছিল। কিন্তু এর ভেতরের সহজ থেকে জটিল- সব ধরনের সংগঠনের ক্ষেত্রেই তারা এই নীতির প্রভাব প্রতিষ্ঠা করতে পারে নি। 

    তারপরও, এটি নিশ্চিত যে, প্যারিস কমিউন আর কয়েক মাস স্থায়ী হলে, এটি নিশ্চিতভাবে এসব অন্যান্য বিপ্লবী কর্মকাণ্ডের দিকেও ধাবিত হতো। আমাদের ভুলে গেলে চলবে না যে, সীমিত রাজতন্ত্র থেকে প্রজাতন্ত্রে রূপান্তরিত হতে চার বছর (১৭৮৯-১৭৯৩) নানাবিধ বিপ্লবী তৎপরতার মধ্যে পার করেছিল ফরাসী মধ্যবিত্ত শ্রেণী। তাহলে, প্যারিসের মানুষজন যে এতো অল্প সময়ের মধ্যে বিধ্বংসী সরকারের ধারণা থেকে নৈরাজ্যবাদী কমিউনের ধারনায় আসতে পারবে না; তাতে খুব অবাক হওয়ার কিছু আছে কি? আবার আমরা এটিও মাথায় রাখতে চাই যে, পরবর্তী বিপ্লবে (অন্তত ফ্রান্স ও স্পেনে যেটি কমিউনাল ধরনের হওয়ার কথা) মানুষ এই প্যারিস কমিউনের অসমাপ্ত কাজ আবার নিজেদের কাঁধে তুলে নেবে। ভার্সেই সৈন্যদের নির্বিচার হত্যার মুখে যে কাজটি বাধাগ্রস্থ হয়েছিল। 

    প্যারিস কমিউন, ১৮৭১ || গ্রেঞ্জার

    কমিউনের পতন হয়েছিল। আর আমরা খুব ভালো করেই জানি, শাসকদের ভীত নাড়িয়ে দেওয়ার জন্য, ভয় ধরিয়ে দেওয়ার জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণী কিভাবে প্রতিশোধ নিয়েছিল প্যারিসের শ্রমজীবী মানুষের ওপর। প্রমাণ হয়ে গিয়েছিল যে, আমাদের আধুনিক সমাজে সত্যিই মাত্র দুইটি শ্রেণী আছে। একদিকে, সেসব মানুষেরা, যারা উৎপাদন করে ও সেই উৎপাদনের অর্ধেকই তুলে দেয় সম্পদের একচেটিয়া মালিকদের হাতে। এবং তারপরও হালকাভাবে এড়িয়ে যায় শাসকদের করা অন্যায়গুলো। অন্যদিকে আছে নিস্ক্রিয় পরজীবীরা। সব কিছু নষ্টকারী এই মানুষগুলো তাদের দাসদের ঘৃণা করে; খেলার মতো করে তাদের হত্যা করতে প্রস্তুত থাকে, নিজের সম্পদ-সম্পত্তির দখল হুমকির মুখে দেখলে সে চূড়ান্ত বর্বর আচরণও করতে পারে। 

    প্যারিসের মানুষকে অবরুদ্ধ করে ফেলার পর এবং বেরোনোর সব রাস্তা বন্ধ করে দেওয়ার পর, ভার্সেই সরকার তাদের ওপর সেনাবাহিনী লেলিয়ে দেয়। মদ ও সেনাজীবনের বর্বরতায় প্ররোচিত হওয়া সৈন্যদের বলা হয়েছিল “নেকড়ে ও তার শাবকদের” মতো কাজ করে দেখাতে। প্যারিসের সাধারণ মানুষের উদ্দেশ্যে বলা হয়েছিল: 

    তুমি যে-ই হও, তোমার মৃত্যু অবধারিত! যদি তুমি হাতে অস্ত্র তুলে নাও, মৃত্যু! যদি সেগুলোর ব্যবহার করো, মৃত্যু! যদি ক্ষমা ভিক্ষা করো, মৃত্যু! যেদিকেই যাও, ডাইনে, বাঁয়ে, সামনে, পিছে, উপরে, নিচে; মৃত্যু! তোমরা শুধু আইনেরই বাইরে নয়, মানবতারই বাইরে। বয়স বা লিঙ্গ; কোনো কিছুই তোমাদের বাঁচাতে পারবে না। তোমরা মরবে। তবে তার আগে দেখবে তোমাদের স্ত্রী, বোন, মা, ছেলে-মেয়ে, এমনকি দোলনায় থাকা শিশুদেরও আর্তচিৎকার! তোমার চোখের সামনে আহত মানুষকে অ্যাম্বুলেন্স থেকে বের করে তার বুকে বেয়োনেট চালিয়ে দেওয়া হবে বা রাইফেলের বাঁট দিয়ে মাথায় মারা হবে। জীবন্ত অবস্থাতেই তার ভাঙা পা বা রক্ত ঝরতে থাকা হাত ছিঁড়ে ফেলা হবে, ছুঁড়ে ফেলা হবে নর্দমায়। মৃত্যু! মৃত্যু! মৃত্যু!১

    এই উন্মক্ত-বর্বর আহ্বানের পর, প্যারিসে রাস্তায় জমে লাশের সারি। এবং এই নিধনযজ্ঞ চালানোর পর আসে পেটি প্রতিশোধ। জেলারদের চাবুক-লাঠির ঘা, অপমান, অনাহার ইত্যাদি যত ধরনের নিষ্ঠুরতা আছে; সব কিছু দিয়ে নেওয়া হতে থাকে প্রতিশোধ। মানুষ কী এসব ভুলে যেতে পারে? 

    প্যারিস কমিউনকে উচ্ছেদ করা গেছে, কিন্তু পরাজিত করা যায়নি। আমাদের সময়ে কমিউন আবার নতুন করে জন্ম নিয়েছে। এটি শুধু একটি লুপ্ত হয়ে যাওয়া স্বপ্ন নয়, শুধুই একটি সুন্দর আশা-আলেয়ার কল্পনা নয়। না! আজকের “কমিউন” হয়ে উঠছে আরো দৃশ্যমান। বিপ্লবের সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য আমাদের পায়ের নিচে গর্জে উঠছে। সাধারণ মানুষের এই স্রোতধারার গভীরে যাওয়া এবং তাদেরকে লড়াইয়ে অনুপ্রাণিত করাই এখন কাজ। আমরা বর্তমান এই প্রজন্মের ওপরই ভরসা রাখছি যে, তারা কমিউনের মধ্যে সামাজিক বিপ্লব সম্পন্ন করবে; মধ্যবিত্তের শোষণ-শাসনের এই হীন ব্যবস্থাটির অবসান ঘটাবে; রাষ্ট্রের রক্ষায় নিযুক্ত থাকা মানুষদের থেকে মুক্তি দেবে; এবং মনুষ্যজাতির বিবর্তনে সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার নতুন এক অধ্যায়ের সূচনা করবে।

    প্যারিস কমিউন, ১৮৭১ || গ্রেঞ্জার

    ২. কিভাবে প্যারি কমিউন নিজের সত্যিকারের লক্ষ্য উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হয়েছিল, তবে তারপরও সেই লক্ষ্যটি তুলে ধরেছিল বিশ্বের সামনে

    ক্ষয়িষ্ণু সাম্রাজ্যের সুযোগ নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিশ্বাসঘাতক সরকারকে উচ্ছেদ করেছিল প্যারিসের মানুষ। সেই ঘটনার ১০ বছর পেরিয়ে গেলেও, এখনো সভ্য সমাজের নিপীড়িত জনতা প্রবলভাবে আকৃষ্ট হয় ১৮৭১ সালের সেই আন্দোলনের দিকে। কেন প্যারিস কমিউনের ধারনাটি বিশ্বের প্রতিটি জায়গার, প্রতিটি জাতির শ্রমিকের কাছে এতো আকর্ষণীয় হয়ে উঠেছে? 

    উত্তরটা সহজ। ১৮৭১ সালের বিপ্লব, সব কিছুর ওপরে ছিল খুবই জনপ্রিয় একটি তৎপরতা। সাধারণ মানুষ নিজেরাই এটি তৈরি করেছিল। জনসমুদ্রের ভেতর থেকে এটি গড়ে উঠেছিল স্বতঃস্ফূর্তভাবে। এবং এই মহান জনসমুদ্রের ভেতর থেকেই প্যারিস কমিউন খুঁজে পেয়েছিল তার রক্ষক, নায়ক ও শহীদদের। এটি এতোটাই “নিচু” শ্রেণীর মানুষদের বিষয় ছিল যে মধ্যবিত্ত শ্রেণী কখনোই এটিকে ক্ষমা করতে পারে না। এবং একই সময়ে, এটি পরিচালিত হচ্ছিল একটি সামাজিক বিপ্লবের ধারণা নিয়ে। সেটি নিশ্চিতভাবেই অনেক অস্পষ্ট ছিল। হয়তো অবচেতনে ছিল। কিন্তু, তারপরও এটি সব মানুষের জন্য সত্যিকারের মুক্তি, সত্যিকারের সাম্য অর্জনের কথা বলেছিল। এটি ছিল এমন এক বিপ্লব, যেখানে সমাজের নিচের স্তরের মানুষেরা তাদের অধিকার আদায়ের পথে যাত্রা শুরু করেছিল। 

    বিপ্লবের এই অর্থ ও তাৎপর্য বদলে দেওয়ার অনেক চেষ্টা হয়েছে এবং এখনো হচ্ছে। এসব ক্ষেত্রে এটিকে দেখানো হয় শুধুই প্যারিসের স্বাধীনতা অর্জনের বিষয় হিসেবে। যেন এটি ফ্রান্সের মধ্যেই আরেকটি ছোট রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার চেষ্টা। কিন্তু এর চেয়ে অসত্য আর কিছুই হতে পারে না। প্যারিস কখনোই পুরো ফ্রান্স থেকে নিজেকে আলাদা করতে চায়নি। অস্ত্রের জোরে এটি দখলও করতে চায়নি; প্যারিস নিজেকে নিজের দেয়ালের মধ্যে বন্দীও করে ফেলতে চায়নি, যেমনটি একজন নান করেন নিজেকে কনভেন্টের মধ্যে বন্দী করে ফেলার মাধ্যমে; প্যারিস নিজেকে আবদ্ধ করে ফেলেনি দেয়ালঘেরা সুন্দর এলাকা তৈরির মতো সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির মধ্যে। প্যারিস যদি নিজের স্বাধীনতা দাবি করে থাকে, কেন্দ্রীয় ক্ষমতার হস্তক্ষেপ থামিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে থাকে, তাহলে সে এটি করেছে কারণ এই ধরনের স্বাধীনতার মধ্যেই প্যারিস দেখেছিল ভবিষ্যতের নানাবিধ সংগঠনের ভীত এবং এগুলো ঘিরে সে পরিচালনার চেষ্টা করেছিল একটি সামাজিক বিপ্লব। যে বিপ্লবটি হয়তো পুরোপুরি বদলে দিত উৎপাদন ও বণ্টনের পুরো ব্যবস্থাটিকে। সেটিকে প্রতিষ্ঠা করত ন্যায়-নীতির ভিত্তিতে। যেগুলো পুরোপুরি বদলে দিত নানাবিধ মনুষ্য সম্পর্ককেও। তাদের চালিত করত সাম্যের পথে। যেটি শেষপর্যন্ত তৈরি করত নতুন ধরনের সামাজিক নীতি-নৈতিকতা। যার ভিত্তি হতো সাম্য ও সংহতি। প্যারিসের মানুষের জন্য তখন কমিউনের স্বাধীনতার বিষয়টি ছিল একটি উপায় মাত্র। তাদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য ছিল: সামাজিক বিপ্লব। 

    এই লক্ষ্য হয়তো অর্জন করাও সম্ভব হতো যদি ১৮ মার্চের সেই বিপ্লবকে তার স্বাভাবিক পথে পরিচালিত হতে দেওয়া হতো। যদি ভার্সেইয়ের আততায়ীরা প্যারিসের মানুষকে ছিন্নভিন্ন করে না ফেলত। বিপ্লবের মধ্য দিয়ে কী করতে চাওয়া হচ্ছে, তা কিভাবে স্পষ্ট ও নির্দিষ্ট করে, সহজ কথায় ব্যাখ্যা করা যায়, যা পুরো বিশ্বের মানুষের জন্যেই বোধগম্য হবে- তা ছিল বিপ্লবের শুরুর সময় থেকে প্যারিসের মানুষের একটি অন্যতম প্রধান ভাবনা। কিন্তু এ ধরনের মহান কোনো ধারণা একদিনে তৈরি হয়ে যায় না। বিপ্লবের সময় সেগুলো যত দ্রুতই ছড়ানো বা ব্যাখ্যা-বিস্তার করা হোক না কেন। সব সময়ই এগুলো গড়ে উঠতে, জনসাধারণের মধ্যে সেসব ধ্যানধারণা ছড়াতে ও সেগুলোর ভিত্তিতে কর্মতৎপরতা তৈরি হতে কিছুটা সময় লাগে। এবং এই জায়গাতেই প্যারিস কমিউন ব্যর্থ হয়েছিল। এটির ব্যর্থতার একটি অন্যতম কারণ, যেমনটি আমরা আগে দেখেছি: ১০ বছর আগে সমাজতান্ত্রিক আন্দোলন পার করছিল একটি রূপান্তরের পর্যায়। ১৮৪৮ সালের কর্তৃত্বপরায়ন, আধা-ধর্মীয় সমাজতন্ত্র; আমাদের সময়ের বাস্তববাদী ও মুক্তচিন্তার মানুষদের কাছে আর আবেদন জাগাতে পারছে না। মজুরি ব্যবস্থা ও যৌথ সম্পত্তিকে এক জোয়ালে জুড়ে দিতে চাওয়া কালেক্টিভিজম ছিল দুর্বোধ্য, অনাকর্ষণীয়, এবং এটি বাস্তব প্রয়োগের পথে হাঁটতে গিয়ে বারবার হোঁচট খেতে হয়েছে। মুক্ত সমাজতন্ত্র বা নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্রের ধ্যানধারণা তখন কেবল শ্রমিকদের মাথায় আসতে শুরু করেছে। এবং তারা তখনও এমন সব কর্মকাণ্ড শুরু করেনি, যা থেকে সরকার-পূজারীরা তাদের আক্রমণ করা শুরু করবে। তখনও মানুষ কোনো স্থির সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি। সামনে কোনো সুনির্দিষ্ট রূপকল্প না থাকায়, সমাজতন্ত্রীরা নিজেরাও ব্যক্তিমালিকানা উচ্ছেদের দিকে হাত দিতে পারেনি। তারাও এমন সব যুক্তি দিয়ে নিজেদের বিভ্রান্ত করেছেন যা অনেক বছর ধরে হয়ে আসছে। তা হলো: “আমাদের প্রথমে বিজয় নিশ্চিত করতে হবে। তারপর আমরা দেখব কী করা যায়।”

    বিজয় নিশ্চিত করা! যেন ব্যক্তি মালিকানার ওপর হাত না দিয়ে মুক্ত কমিউন গঠনের অন্য কোনো উপায় আছে! বিপ্লবের বিজয়ে সাধারণ জনগণ সরাসরি আগ্রহী না হলে, অংশগ্রহণ না করলে শত্রুদের পরাজিত করার অন্য কোনো রাস্তা নেই। এবং এটি তারা করবে না যদি তারা সেখানে সবার বস্তুগত, নৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সুযোগ দেখতে না পায়। 

    সরকারের প্রশ্নে, নীতি-নির্ধারনের প্রসঙ্গেও একই জিনিস দেখা যায়। মুক্ত কমিউনের ঘোষণা দেওয়ার মাধ্যমে, প্যারিসের মানুষ একটি মৌলিক নৈরাজ্যবাদী নীতি গ্রহণ করেছিল। তা হলো: রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা।  

    যদি আমরা মেনে নিই যে, কমিউনগুলোর মধ্যে আন্তঃসম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজন নেই; তাহলে আমরা কেন মানব যে, প্রতিটি কমিউনের ভেতরে সবার পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রণ করার জন্য এমন কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজন আছে? আমরা আগামী দিনের ব্যবসা-বাণিজ্য সংক্রান্ত কর্মকাণ্ডকে যদি এমনভাবে কল্পনা করি, যেখানে বেশ কয়েকটি শহরের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান নিজেদের মধ্যে বোঝাপড়ার মাধ্যমে মুক্তভাবে কোনো উদ্যোগ নেবে তাদের নিজ নিজ কমিউনিটির জন্য। তাহলে কেন আমরা একটি কমিউনের ক্ষেত্রেও কল্পনা করছি না যে, এখানেও এই একই ধরনের মুক্ত উদ্যোগের মাধ্যমেই কর্মকাণ্ড পরিচালনা করা যাবে? কমিউনের বাইরে যদি কোনো কেন্দ্রীয় সরকারের প্রয়োজনীয়তা না থাকে, তাহলে কমিউনের ভেতরেও তা থাকার কোনো যৌক্তিক কারণ নেই। 

    প্যারিসের মানুষ আগেও অনেক সরকারকে উচ্ছেদ করেছে। কিন্তু ১৮৭১ সালে, তারা এই সরকারতান্ত্রিক ব্যবস্থার বিরুদ্ধেই বিদ্রোহ করার প্রথম নজির দেখিয়েছিল। শেষপর্যন্ত অবশ্য তারা সরকারের অলৌকিক ক্ষমতার পূজায় ভেসে যায় এবং নিজেদেরও একটি সরকার প্রতিষ্ঠা করে বসে। তার পরিণাম কী হয়েছিল- সেই সাক্ষ্য ইতিহাস থেকে পাওয়া যায়। প্যারিস, তার সবচে নিবেদিতপ্রাণ সন্তানদের এই সরকার পরিচালনার জন্য পাঠিয়েছিল টাউন হলে। সেখানে, তারা ডুবে গিয়েছিল গাদা গাদা পুরোনো কাগজপত্রের মধ্যে। সহজাত বোধ-বুদ্ধি, তাদেরকে মানুষের মধ্যে থেকে কাজ করতে বললেও, তারা বাধ্য হয়েছিল শাসন করতে। তারা আলোচনা করতে বাধ্য হয়েছিল যে, কখন কী পদক্ষেপ নিতে হবে; কখন সমঝোতা করতে হবে, যেখানে কোনো ধরনের সমঝোতাই ভালো কোনো নীতি হতে পারে না। এবং শেষপর্যন্ত, সব সময় জনসাধারণের মধ্যে থাকলে যে ধরনের অনুপ্রেরণা পাওয়া যায়, সেগুলো তারা হারিয়ে ফেলছিল। এভাবে ধীরে ধীরে নিজেদের করে তুলেছিল অক্ষম। জনমানুষের কাছ থেকে এভাবে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় সরকার পঙ্গু হয়ে পড়েছিল। এবং বিপ্লবী শক্তির কেন্দ্র হওয়ায়, এটি জনপ্রিয় সব মুক্ত উদ্যোগকেও করে তুলছিল পক্ষাঘাতগ্রস্থ। ফলে, এসব কারণে প্রুশিয়ার বন্দুকের নিচ থেকে জন্ম নেওয়া, প্যারিস কমিউনের পতন নিশ্চিত ছিল। তবে, খুবই জনপ্রিয় রূপ ধারণ করায় এটি আরো অনেক বিপ্লবকে অনুপ্রাণিত করেছে। চিন্তাভাবনার দিক থেকে এটি ছিল সামাজিক বিপ্লবের অগ্রদূত। প্যারিস কমিউনের শিক্ষা অবশ্য পাওয়া গেছে। এবং ফ্রান্স আবার যখন এ ধরনের বিদ্রোহী সব কমিউন দিয়ে গর্জে উঠবে, তখন মানুষ হয়তো আর সরকারের জন্য অপেক্ষা করবে না, এবং আশা করবে না যে, সরকারই সব বিপ্লবী পদক্ষেপ গ্রহণের উদ্যোগ নেবে। বরং, তারা যখন সত্যিই এসব পরজীবীদের হাত থেকে নিজেদের মুক্ত করবে; সব সামাজিক সম্পত্তির দখল নেবে এবং সেগুলো নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্রের নীতিতে নিজেদের মধ্যে ভাগাভাগি করে নেবে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি, সরকার, ও রাষ্ট্র থেকে নিজেদের পুরোপুরি মুক্ত করে ফেলার পর, মানুষ নিজেদের মতো করে মুক্তভাবে সমাজ গঠন করবে, জীবনের প্রয়োজনীয়তা অনুসারে। বিগত দিনের শৃঙ্খল ছিন্ন করে, মূর্তি-বিগ্রহ গুঁড়িয়ে দিয়ে, মানুষ যাত্রা করবে সুন্দর এক ভবিষ্যতের পথে। তারা জানবে যে, সেখানে কেউ কারো প্রভু বা দাস হবে না। সেখানে শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হবে সেসব মহান শহীদদের, যারা মুক্তির পথে প্রথম পা বাড়িয়ে তাদের রক্ত ঝরিয়েছেন। এবং আমাদের উদ্বুদ্ধ ও আলোকিত করেছেন স্বাধীনতার পথে যাত্রা শুরুর জন্য। 

    প্যারিস কমিউন, ১৮৭১ || গ্রেঞ্জার

    ৩. আধুনিক সমাজতন্ত্রে প্যারি কমিউনের শিক্ষা

    সোশ্যালিস্ট কিছু গ্রুপ আছে, এমন প্রায় প্রতিটি শহরে ১৮ মার্চ, প্যারি কমিউনের স্মরণে সমবেত হয়েছিল সাধারণ মানুষ। ১৮ মার্চের এই সমাবেশগুলো ভালোভাবে পর্যবেক্ষণ করা দরকার। শুধু এ কারণে না যে, এগুলো থেকে শ্রমিকশ্রেণীর শক্তিমত্তা টের পাওয়া যায়। বরং এজন্য যে, এগুলো দুই ধারার সমাজতন্ত্রীদেরই মনোভাব প্রভাবিত করার সুযোগ তৈরি করে। যে কোনো ধরনের ভোট ব্যবস্থার মাধ্যমে “ভোট নেওয়ার” চেয়ে এই সমাবেশগুলো অনেক ভালো সুযোগ নিজেদের আশা-আকাঙ্ক্ষাগুলো উপস্থাপন করার। এখানে নির্বাচন-কেন্দ্রিক পার্টি কৌশলের কোনো প্রভাব থাকে না। শ্রমিকরা শুধু প্যারিসের প্রলেতারিয়েতদের সাহসীকতাকে প্রশংসা করা বা মে গণহত্যার প্রতিশোধ চাওয়ার জন্যই সমবেত হয়নি। হ্যাঁ, প্যারিসের সেই সাহসী সংগ্রামের স্মৃতি অবশ্যই তাদের উজ্জীবিত করে। কিন্তু তারা শুধু এটুকুতেই আটকে না থেকে, আরো অনেক আলাপ তুলেছে। তারা প্রশ্ন তুলেছে যে, ১৮৭১ সালের কমিউন থেকে আমরা আগামী দিনের বিপ্লব সম্পর্কে কী শিক্ষা পেতে পারি। তারা জানতে চেয়েছে: কমিউনের ভুলভ্রান্তিগুলো কী ছিল। তারা শুধু এর জন্য দায়ী মানুষদের খুঁজে বের করে তাদের সমালোচনা করতে চায়নি। বরং খুবই স্পষ্টভাবে সামনে এনেছে যে, কিভাবে সম্পত্তি ও কর্তৃত্ব নিয়ে বাঁধাধরা সব ধারণা তাদের পিছু টেনে ধরেছে। বিপ্লবী চিন্তাধারার বিকাশকে বাধাগ্রস্থ করেছে, এবং পরিণামে এটি বিশ্বের জন্য একটি আলোকবর্তিকা হয়ে উঠতে পারেনি।  

    ১৮৭১ সালের এসব শিক্ষা পুরো বিশ্বের শ্রমিকদের কাজে লেগেছে। তারা পুরোনো সব ধ্যানধারণা ও চিন্তাভাবনা ঝেড়ে ফেলেছে। সহজ ও স্পষ্টভাবে বোঝাপড়া তৈরি করেছে যে, তাদের আগামী বিপ্লবটা কেমন হতে যাচ্ছে। 

    আগামী দিনে কমিউনের উত্থান শুধুই একটি “কমিউনাল” আন্দোলন হবে না। যারা এখনো মনে করেন যে বিপ্লবের শুরুতেই স্বাধীন, স্থানীয় স্বশাসিত সংগঠন/সংস্থা গড়ে তুলতে হবে, তারা শুধু নিজেদের এলাকার মধ্যে অর্থনৈতিক সংস্কার ঘটিয়েই থেমে যাবেন না। জনপ্রিয় চেতনাকে ধারন করে আরো অনেক কিছুর বিকাশ ঘটাবেন। অন্তত ফ্রান্সে এমনটিই দেখা যাবে। আগামী বিপ্লবের কমিউনগুলো তাদের স্বাধীনতা ঘোষণা ও প্রতিষ্ঠা করবে সরাসরি সব সমাজতান্ত্রিক বৈপ্লবিক কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে। তারা বিলুপ্ত করবেন ব্যক্তিগত মালিকানা। যখন এমন বিপ্লবী পরিস্থিতি বিরাজ করবে, এবং জনতার বিপ্লবী স্রোতে সরকার ভেসে যাবে; রাষ্ট্রীয় সুরক্ষার ওপর নির্ভর করা মধ্যবিত্ত শ্রেণী যখন বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির মধ্যে পড়ে যাবে; তখন এই বিপ্লবী জনতা নতুন কোনো সরকারি ডিক্রি জারির অপেক্ষা করবে না। যেটি কিনা তার দুর্দান্ত জ্ঞান দিয়ে অল্প কিছু অর্থনৈতিক সংস্কার নিয়ে আসবে মাত্র!

    তারা এমন কোনো ডিক্রির জন্য অপেক্ষা করবে না যেটির পর সামাজিক পুঁজির দখল রাখা মানুষদের সম্পত্তি ছিনিয়ে নেওয়া হবে। আসলে এমন একটি ডিক্রি কার্যত অকার্যকরই থাকবে যদি শ্রমিক-জনতা নিজে সে ব্যাপারে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ না নেয়। বিপ্লবের পর তাই কোনো দেরি না করে, সাধারণ মানুষ নিজ নিজ এলাকায় সব সম্পদের দখল নেবেন এবং সেগুলো যথাযথভাবে ব্যবহারের মাধ্যমে সেখানে নিজেদের অধিকার প্রতিষ্ঠা করবেন। তারা কলকারখানায় নিজেদের এমনভাবে সংগঠিত করবেন যেন সব কর্মকাণ্ড চালু থাকে। কিন্তু এখন থেকে তারা উৎপাদন সংক্রান্ত কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবেন সাধারণ মানুষের চাহিদা, আকাঙ্ক্ষা অনুযায়ী। তারা নিজেদের বস্তি-কলোনি ছেড়ে বিত্তবানদের মতো বাসস্থানের ব্যবস্থা করবেন; শহরে জমা হয়ে থাকা সম্পদ কিভাবে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবহার করা যায়, সেভাবে নিজেদের সংগঠিত করবেন। তারা এই সঞ্চিত সম্পদকে নিজেদের বলেই বিবেচনা করবেন এবং দাবি করবেন যে, মধ্যবিত্ত শ্রেণী এগুলো তাদের কাছ থেকে চুরি করে নিয়ে গিয়েছিল। 

    যে শিল্পকারখানার মালিকরা এতোদিন শ্রমিকদের ব্ল্যাকমেইল করে ফায়দা লুটেছে, সেই মালিকদের উচ্ছেদ করা মাত্র আবার উৎপাদন শুরু হবে। সেসব বাধা-নিষেধাজ্ঞা ছুঁড়ে ফেলে দিতে হবে, যেগুলো উৎপাদন শুরুর প্রক্রিয়াকে বিলম্বিত করবে। সেই ধরনের সব সংশয়-সন্দেহের অবসান ঘটাতে হবে, যেগুলো উৎপাদন থামিয়ে দিতে পারে বা এটিকে বিশৃঙ্খল করে তুলতে পারে। পুরো প্রক্রিয়াটির রূপান্তর ঘটাতে হবে বিপ্লবী পরিস্থিতি-তৎপরতার আকাঙ্ক্ষা অনুসারে, এবং মুক্ত শ্রমের ভিত্তিতে। “ফ্রান্সের মানুষ কখনোই এতোটা উৎসাহ নিয়ে কাজ করেনি, যতটা করেছিল ১৭৯৩ সালে, অভিজাতদের হাত থেকে জমি ছিনিয়ে নিয়ে সেটিতে কাজ করার সময়,” বলেছেন ইতিহাসবিদ মিশলে২। মানুষ তখনও এমন উৎসাহ নিয়ে কাজ করবে, যেদিন থেকে শ্রম মুক্ত হয়ে যাবে এবং শ্রমিকের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড পুরো সমাজের কল্যানের স্বার্থে কাজ করবে। বিভিন্ন ধরনের সামাজিক সম্পদের মধ্যে পার্থক্য টানার একটি চেষ্টা পরবর্তীতে হয়েছে। এবং সোশ্যালিস্ট পার্টিগুলো এই প্রশ্নে বিভক্ত হয়ে আছে। বর্তমানের কালেক্টিভিস্ট স্কুল, পুরোনো আন্তর্জাতিকের কালেক্টিভিজমকে (যেটি নিছকই একটি কর্তৃত্ববিরোধী কমিউনিজমের ধারনা) প্রতিস্থাপন করেছে নতুন এক ধরনের কালেক্টিভিজমের তত্ত্ব দিয়ে। যেখানে দুই ধরনের পুঁজির মধ্যে পার্থক্য টানার চেষ্টা করা হয়েছে। এক দিকে থাকবে এমন পুঁজি যেটি উৎপাদন ও সামাজিক জীবনের প্রয়োজনীয়তা পূরণে কাজে লাগানো হবে। এগুলোর মধ্যে থাকবে যন্ত্রপাতি, কল-কারখানা, কাঁচামাল, যোগাযোগের উপায় ও ভূমি। এবং অন্য ধরনের পুঁজিতে থাকবে আবাসন, বিভিন্ন উৎপাদিত পণ্য, জামাকাপড়, ইত্যদি। প্রথম ধরনের পুঁজিতে থাকবে কালেক্টিভ মালিকানা। এবং দ্বিতীয় ধরনের পুঁজি থাকবে ব্যক্তিমালিকানায়। এভাবেই ভেবেছেন এই সমাজতান্ত্রিক স্কুলের অধ্যাপকরা!

    এরকম একটি পার্থক্য টানার উদ্যোগ নেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল। কিন্তু সাধারণ মানুষের সম্মিলিত বোধশক্তি সেটি হতে দেয়নি। তাদের কাছে এটিকে মনে হয়েছে অবাস্তব এবং এটি প্রতিষ্ঠা করা অসম্ভব। এটি তাত্ত্বিকভাবে ত্রুটিপূর্ণ এবং বাস্তব জীবনে প্রয়োগে ব্যর্থ হয়। শ্রমিকরা বুঝতে পেরেছিল: যে বাড়িতে তারা থাকেন, যে কয়লা-গ্যাস জ্বালান, মানবশরীর চালাতে যে জ্বালানি খরচ হয়, জীবনধারনের জন্য যে জামাকাপড় প্রয়োজন হয়, যে বই আমরা পড়ি জানার জন্য, এমনকি যে আনন্দ-উৎসবের ব্যবস্থা থাকে; সব কিছুই আমাদের অস্তিত্বের খুব গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই সব কিছুই কার্যকরীভাবে উৎপাদন চালিয়ে যাওয়া ও সামগ্রিকভাবে মনুষ্য সভ্যতার প্রগতিশীল বিকাশের ক্ষেত্রে ঠিক ততটাই গুরুত্বপূর্ণ, যতটা বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, কলকারখানা, কাঁচামাল ও উৎপাদন সংক্রান্ত অন্যান্য উপাদান। শ্রমিকরা ক্রমেই এই সিদ্ধান্তে উপনীত হচ্ছেন যে, যদি কিছু কিছু ধনসম্পদের ক্ষেত্রে ব্যক্তিমালিকানার চল রেখে দেওয়া হয়, তাহলে সেটি বৈষম্য, নিপীড়ন, শোষণ জারি রাখবে। কালেক্টিভিজমের তত্ত্ব তাদের চিন্তার সামনে যে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করেছিল, সেটিকে শ্রমিকরা পেরিয়ে যাচ্ছেন। তারা হাঁটছেন সবচে সহজ-সাধারণ এবং সবচে বাস্তবসম্মত কাঠামোর কর্তৃত্ববিরোধী সমাজতন্ত্রের দিকে। 

    এখনকার সমাবেশগুলোতে বিপ্লবী শ্রমিকরা খুব স্পষ্টভাবে বলছে সব ধরনের সামাজিক সম্পদের ওপর তাদের অধিকারের কথা, এবং ব্যক্তিমালিকানা বিলুপ্তির কথা। সেটি সব ক্ষেত্রেই: নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিস থেকে শুরু করে বিলাসী পণ্য পর্যন্ত। তারা বলছেন, “বিপ্লবের দিন, শহরে জমা হয়ে থাকা সব সম্পদ আমরা বাজেয়াপ্ত করব এবং সেগুলো সর্বসাধারণের ব্যবহারের লক্ষ্যে কাজে লাগাব।” সমাবেশগুলোতে তাদের এই ঘোষণাকে সবাই স্বাগত জানাচ্ছে সম্মিলিতভাবে হাততালি দিয়ে। বিপ্লবী এই শ্রমিকরা আরো বলছেন, “নতুন করে মুক্ত শ্রমের ভিত্তিতে উৎপাদন শুরুর আগে সবাই যেন তার প্রয়োজনীয়তা অনুসারে পর্যাপ্ত রসদ নিতে পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। শহরের দোকানগুলোতে পর্যাপ্ত পোশাক আছে সবাইকে দেওয়ার মতো। সেগুলো দোকানগুলোতে সাজিয়ে রাখা হয়েছে। আর বাইরে মানুষ দারিদ্রতার মধ্যে উলঙ্গ হয়ে ঘুরে বেড়াচ্ছে। এমনকি সেখানে এতো পোশাক আছে যে সবাই নিজেদের পছন্দ অনুযায়ী অভিজাত সব পোষাকও বেছে নিতে পারবে।”

    ফ্রান্স ও অন্যান্য আরো অনেক জায়গায় প্যারি কমিউনের স্মরণে যেসব সভা-সমাবেশগুলো হচ্ছে, এবং সেসব জায়গায় যে ধরনের কথা বলা হচ্ছে, তাতে করে এটি স্পষ্টই বোঝা যায়: শ্রমিকরা আগামী দিনের বিপ্লবের ব্যাপারে তাদের মনস্থির করে ফেলেছেন। তারা আগামী বিপ্লবে হাঁটবেন নৈরাজ্যবাদী সমাজতন্ত্র এবং মুক্ত শ্রমের ভিত্তিতে উৎপাদন পুনর্গঠনের দিকে। এই দুইটি বিষয়ে সবাই মোটামুটি একমত হয়েছেন এবং এই দিক থেকে চিন্তা করলে, আগামী দিনের বিপ্লবগুলোতে আর পূর্বসূরীদের সেই একই ভুলগুলোর পুনরাবৃত্তি হবে না। যে পূর্বসূরীরা ভবিষ্যত অগ্রগতির জন্য নিঃশঙ্ক চিত্তে রক্ত ঝরিয়েছেন। 

    ল্যঁ সিয়েজ দে প্যারি || জঁ লুই আরনেস্ত মিসোনিয়ে

    তবে, তৃতীয় আরেকটি বিষয় আছে, যা নিয়ে এখনো কোনো ঐক্যমত্যে পৌঁছানো যায় নি। এটিও একইভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এবং সেই ঐক্যমত্যে পৌঁছানোর সময়টিও হয়তো খুব বেশি দূরে নেই। এই গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হচ্ছে সরকার গঠন নিয়ে। 

    খুব ভালোমতোই জানা আছে যে, সমাজতান্ত্রিক পার্টিগুলো এই প্রশ্নে দুটি অংশে পুরোপুরি বিভক্ত হয়ে যায়। একপক্ষ থেকে বলা হয়, “বিপ্লবের দিনই, আমাদের এমন একটি সরকার গঠন করতে হবে যা সব ক্ষমতার দখল নিয়ে নেবে। শক্তিশালী, ক্ষমতাবান, ও দৃঢ়প্রতিজ্ঞ এই সরকার এরপর বিপ্লবী কর্মকাণ্ড পরিচালনা করবে এটা-সেটা ডিক্রি জারি করে এবং সবাইকে বাধ্য করবে সেসব নির্দেশ মানতে।”

    “কী করুণ ভ্রান্তি!” বলে আরেক পক্ষ, “যে কোনো ধরনের কেন্দ্রীয় সরকার যদি কোনো দেশের ওপর নিজের শাসন চালাতে আসে, তাহলে এটি অবশ্যই বিপ্লবের পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। এটি সব সময়ই গড়ে উঠবে এর অন্যতম প্রধান নির্যাস, সংরক্ষণবাদ এবং সবচে বিসদৃশ সব উপাদন দিয়ে। কমিউনগুলোতে গর্জে উঠতে থাকা বিপ্লবী কর্মকাণ্ডগুলোর রাশ টেনে ধরা ছাড়া এটি আর কিছুই করবে না। ফলে পিছিয়ে পড়ে থাকা কমিউনগুলোকে বিপ্লবী কর্মকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করার কাজটিও তারা করতে পারবে না। একই ঘটনা ঘটে বিক্ষুব্ধ, বিপ্লবী হয়ে ওঠা কোনো কমিউনের মধ্যেও। হয় কমিউনাল এই সরকার এরই মধ্যে বাস্তবায়ন হয়ে যাওয়া কিছু জিনিসের অনুমোদন দেবে, এবং তারপর এটি একটি অপ্রয়োজনীয় ও বিপজ্জনক একটি যন্ত্র হয়ে থেকে যাবে; অথবা এটি বিপ্লবের নেতৃত্ব নিজের হাতে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা দেখাবে এবং সেসব বিষয়ে নিয়মনীতি তৈরি করার চেষ্টা করবে যেগুলো তখনও শ্রমিকরা স্বাধীনভাবে নিজেদের মধ্যে গড়ে তুলতে পারেনি। টিকে থাকার জন্য এগুলো করা ছাড়া তার আর কোনো পথ থাকে না। এটি তখন বিভিন্ন তত্ত্ব প্রয়োগ করবে, যেখানে পুরো সমাজ চেষ্টা করছে নতুন ধরনের সামাজিক জীবন গড়ে তুলতে। সমস্ত শৃঙ্খল ভেঙে ফেলার পর মানুষের সামনে নতুন ও বিস্তৃত দিগন্ত খুলে যাবে এবং এগুলোর মধ্যে থেকে গড়ে ওঠা সম্মিলিত সৃজনশীল শক্তি দিয়েই সামাজিক কর্মকাণ্ডের নতুন সব সংগঠন তারা গড়ে তুলবে। ক্ষমতায় থাকা মানুষরা এই বিপ্লবী স্ফূরণকে শুধু বাধাগ্রস্থ করবে। সেসব কিছুই তারা করবে না, যেগুলো তারা করত; যদি তারা সাধারণ মানুষের ভেতরে থাকত। তা না করে তারা নিজেদের বন্দী করে ফেলেছে প্রশাসনিক সব দপ্তরের মধ্যে এবং নিজেদের ছুঁড়ে দিচ্ছে অলস সব তর্ক-বিতর্কের মধ্যে। ফলে বিপ্লবী সরকার সব সময়ই থাকবে একটি বিঘ্ন ও বিপদের প্রতীক হয়ে। ভালো অবস্থায় সেটি থাকবে ক্ষমতাহীন হয়ে, আর খারাপ অবস্থায় এটি হয়ে উঠবে দুর্দমনীয়। ফলে এরকম একটি জিনিস থাকার ফায়দা কী?”

    ন্যায্য ও স্বাভাবিক মনে হলেও, এই যুক্তিগুলোকে লড়তে হচ্ছে আগেকার অনেক গোঁড়া চিন্তাধারার বিরুদ্ধে। এবং এমন মানুষদের বিরুদ্ধে, যারা সরকারের পূজনীয় ভাব বজায় রাখার স্বার্থে কাজ করে। একই সাথে সম্পত্তি ও ধর্মের যৌক্তিকতা ও বিশ্বাস তুলে ধরা ভাবধারার সঙ্গেও তাদের লড়তে হচ্ছে। 

    তিনটি গোঁড়া পূর্ব সংস্কারের মধ্যে এই শেষটিই এখনো টিকে আছে এবং এটি আগামী বিপ্লবগুলোতে একটি বিপদ হয়ে দেখা দিতে পারে। যদিও এটি ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ারও অনেক লক্ষণ এরই মধ্যে দেখা যাচ্ছে। শ্রমিকরা বলতে শুরু করেছে, “সরকারের কোনো নির্দেশ ছাড়াই আমরা নিজেদের অর্থনৈতিক কর্মকান্ড নিজেরাই ব্যবস্থাপনা করা শুরু করব। কেউ যদি নিজেদের যাজক, ভূস্বামী বা শাসক বলে কর্তৃত্ব প্রতিষ্ঠা করতে আসে, তাহলে তাদেরকে আমরা পদদলিত করব।” আমাদের এখন এমন আশা করতে হবে যে, নৈরাজ্যবাদী শক্তি যেন কঠোরভাবে এই সরকার-পূজারীদের মোকাবিলা করতে থাকেন; এবং কখনো নিজেদের ক্ষমতার লড়াইয়ে লিপ্ত না করেন। আমাদের আশা করতে হবে যে, বিপ্লবের আগের সময়গুলোতে সরকারপন্থী এসব ভাবধারাকে এমনভাবে নাড়া দিতে হবে যেন বিপ্লবের সময় এটি মানুষকে অন্য কোনো ভুল পথে নিয়ে যাওয়ার মতো শক্তিই অর্জন করতে না পারে।  

    পরবর্তী বিপ্লবের সময় কমিউনগুলো রাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করবে এবং সংসদীয় শাসনের পরিবর্তে মুক্ত ফেডারেশন গড়ে তুলবে। তারা নিজ নিজ কমিউনিটির মধ্যেও সংসদীয় শাসনের প্রথা বিলুপ্ত করে ফেলবে। খাদ্য ও অন্যান্য পণ্য উৎপাদন ও সরবরাহের জন্য তারা ভরসা করবে শ্রমিকদের মুক্তভাবে গড়ে ওঠা গ্রুপগুলোর সংগঠনের ওপর। যেগুলো অন্য শহর ও গ্রামের সংগঠনগুলোর সঙ্গে যুক্ত থাকবে ফেডারেশনের মাধ্যমে। তারা কোনো কমিউনাল সংসদের মাধ্যমে এই যোগাযোগ করবে না। বরং নিজেদের লক্ষ্য অর্জনের জন্য তারা এই যোগাযোগ ব্যবস্থা গড়ে তুলবে সরাসরি।   

    তারা কমিউনের ভেতরেও যেমন নৈরাজ্যবাদী হবে, তেমনি কমিউনের বাইরেও নৈরাজ্যবাদী হবে। এভাবেই তারা বাঁচতে পারে পরাজয়ের দুঃস্বপ্ন থেকে, প্রতিক্রিয়াশীলদের প্রতিশোধ থেকে।

    ———————-

    ১. Arthur Arnould, Historie populaire et parlementaire de la Commune de Paris, Bruxelles: H. Kistemaeckers, 1878, 2 tomes en 1 vol.

    ২. জুলস মিশলে (১৭৯৮-১৮৭৪) একজন ফরাসী ইতিহাসবিদ। তিনিই ফ্রান্সের ইতিহাস বিষয়ক বইয়ে ইউরোপের পুনর্জাগরনের বিষয়টিকে রেঁনেসা নামে পরিচিত ও জনপ্রিয় করে তোলেন।

  •  ক্রাইমথিঙ্ক. || মার্চ ১৮, ১৮৭১: প্যারিস কমিউনের অভ্যুদয়

     ক্রাইমথিঙ্ক. || মার্চ ১৮, ১৮৭১: প্যারিস কমিউনের অভ্যুদয়

    • অনুবাদ: ইশাদী হুসাইন

    সম্পাদকের নোট: কিভাবে, কোন পরিস্থিতিতে প্যারিসের জনসাধারণ পুরো শহরের দখল নিয়ে নিয়েছিল- তার একটি ভাষ্য উঠে এসেছে কমিউনার্ড লুইস মিশেলের সঙ্গে ঘটা ঘটনাবলীর মধ্য দিয়ে। লেখাটি নেওয়া হয়েছে ক্রাইমথিঙ্ক. থেকে।

    লুইস মিশেল

    সালটা ১৮৭১। জার্মানির সাথে যুদ্ধে সম্রাট নেপোলিয়নের পরাজয়ের পরপরই ফ্রান্সের বিপ্লব একটি গণতান্ত্রিক সরকারের গোড়াপত্তন করেছে ঠিক। কিন্তু এই নতুন প্রজাতন্ত্র কাউকেই সন্তুষ্ট করতে পারছে না। নতুন গঠিত ভারপ্রাপ্ত সরকারটি পুরানা মহারাজের চাকুরিজীবী আমলাদের দ্বারা সংগঠিত; বিপ্লবীদের সমাজ বদলানোর দাবিদাওয়া পূরণে তারা না কোন কাজ করেছে, না তারা করতে চায়। প্রতিক্রিয়াশীল ডানপন্থীরা মহারাজকে পুনরায় নির্বাহী ক্ষমতা প্রদানের কিংবা তাতে ব্যর্থ হলে নতুন কোন রাজতন্ত্র প্রতিষ্ঠার ষড়যন্ত্র করছে। ফ্রান্স এবং প্রতিবিপ্লবের মাঝামাঝি দাঁড়িয়ে আছে একা বিদ্রোহী প্যারিস। 

    নিয়মের দাসদের কাজকর্ম ঠিকঠাক বেঁটে দেওয়া হয়েছে। প্রথমে, ফরাসী জনতাকে বাধ্য করতে হবে অক্ষরে অক্ষরে জার্মানির জনবিরোধী সমর্পণ শর্ত মান্য করতে। নাগরিকদের উপর যুদ্ধবিরতি চাপানোর জন্য নতুন প্রজাতন্ত্রটি দু’টি জাতীয় সেনাবাহিনীর জোরে র‍্যাডিকাল ক্লাবগুলিকে নিষিদ্ধ করেছে এবং সংবাদপত্রগুলি বন্ধ করে দিয়েছে। নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়েছে কেবল যখন সম্রাটকে উৎখাত যারা করেছে তাদের গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরেই।

    র‍্যাডিকালরা জেলে কিংবা অজ্ঞাতবাসে থাকায় নির্বাচনে জেতে সংরক্ষণশীলেরা। প্রধান জয়ী হয় প্রুধোঁ’র আদি শত্রু ব্যাংকার অ্যাডল্ফ থিয়ের যে ১৮৪৮ এর বিপ্লব বেঁচতে সহযোগিতা করেছিল। তার জন্যে না হলে হয়তো সম্রাট ক্ষমতা অধিগ্রহণও করতে পারতেন না। প্রাদেশিক গ্রামাঞ্চলের ভোটে সরকারের অফিসে যেতে পেরেই থিয়েরের প্রথম কাজ হ’লো ৫০ কোটি ফ্রাংক খরচ করে জার্মানির সাথে শান্তির জন্য আপোস করা। থিয়েরের কাছে এটা রাষ্ট্রের ক্ষমতা দখলের সস্তা উপায় মাত্র – বিশেষ করে যেখানে পুরোটাই দিচ্ছে ফরাসি জনতা, সে নিজে না। আর যদি জনগণ তা না দিতে চায়? তাহলেও সে জার্মানি নয় বরং ফ্রান্সের বিরুদ্ধেই যুদ্ধ করবে।

    থিয়েরের সমর্পণচুক্তির মধ্যে অন্যতম শর্ত হলো জার্মান সৈন্যদের রাজধানীর মধ্য দিয়ে বিজয় মিছিল করতে দেয়া। মাসের পর মাস ঘেরাওয়ের ফলে ক্ষুধায় ক্লীষ্ট প্যারিসবাসী এটা কোনভাবেই হতে দিতে চায় না। গুজব ছড়িয়ে পড়ছে যে জার্মানিরা শহর লুটতে আসছে। বিপ্লবের পরে গড়ে ওঠা প্রহরী সমিতি নিষিদ্ধ হওয়া সত্ত্বেও সাক্ষাৎ চালিয়ে যাচ্ছে।

    ফেব্রুয়ারি ২৬ এর রাতে, সরকারি নির্দেশ অমান্য করে জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর দশ হাজারের বেশি বিদ্রোহী সদস্য চ্যাম্পস-ইলিসিসের মফঃস্বল শহরে জড়ো হয়। তাদের সাথে আছেন নগরপ্রান্ত মন্তমার্ত্রের স্কুলশিক্ষিকা চল্লিশ বছর বয়স্ক লুইস মিশেলের মতোন কঠোর-মূর্তি বিপ্লবীরা। একসাথে তারা সদ্য আটক হওয়া রাজবন্দীদের জেল ভেঙে মুক্ত করে। তারপর তারা প্যারিসের জন্য মৃত্যুর প্রস্তুতি নিয়ে নিকষ আঁধারে অপেক্ষা করতে থাকে জার্মানদের আগমনের।

    ছবি: ক্রাইমথিঙ্ক

    ভোর নাগাদ আক্রমণের কোন লক্ষণই দেখা না যাওয়ায় বিদ্রোহীরা প্যারিসে থাকা যুদ্ধের অবশিষ্ট কামানগুলি করায়ত্ত করে নেয়। বিদ্রোহীরা বিশ্বাস করে গরিবের দাতব্য চাঁদায় কেনা এই কামানগুলির যোগ্য অধিকার তাদেরই আছে যারা শহরটিকে রক্ষা করতে চায়; শহরের সাথে প্রবঞ্চনা করা রাজনীতিবিদ কিংবা যেই জার্মান বাহিনী নিরস্ত্র করে তাদের গ্লানি জর্জরিত করতে চায় তাদের কক্ষণো নয়। বিলাসী এলাকা থেকে সরিয়ে ভারী অস্ত্রগুলি তারা বস্তি আর ভাগাড়ের ফাঁকে নিজেদের এলাকায় নিয়ে মন্তমার্ত্রের টিলায় স্থাপন করেন।

    অবশেষে, ১৮৭১ সালের পয়লা মার্চে, জার্মান বাহিনী প্যারিসে প্রবেশ করে। অস্থির বস্তিগুলো এড়িয়ে তারা পুরান শহরে চেপে চেপে আগায়। দোকানপাট সব বন্ধ; মিছিলের যাত্রাপথে সমস্ত ভাস্কর্য কালোবসনে আবৃত আর কালো পতাকা উড়তে থাকে দালানে দালানে। দুস্থ জনতা দূর থেকে কড়া চোখে তাকিয়ে দেখে; তাদের বুভুক্ষু নজর হৃষ্টপুষ্ট জার্মানদের মজ্জা কাঁপিয়ে দেয়। হানাদার বাহিনী লেজ গুটিয়ে শিবির স্থাপন করে শহরের বাইরে পূর্বপাশে।

    এর কিছুদিন পরেই থিয়েরের সরকার ঘোষণা করে ঘেরাওয়ের সময় স্থগিত রাখা ভাড়াগুলি বাড়িওয়ালারা আদেশমাত্র দাবি করতে পারবে। চারমাসের বকেয়া সুদসমেত বাকী, এবং বন্ধক রাখা মাল বিক্রির স্থগিতাদেশও বাতিল ঘোষণা করা হয়। বিশেষ প্রয়োজন দেখাতে না পারলে, জাতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর বেতনও দেয়া হয় বন্ধ করে। এইসব এবং আরও অনেক কিছুই থিয়ের যেই শর্তে শান্তি লিখে দিচ্ছে সেই চুক্তিতে অবধার্য।

    মার্চ ১৮ এর সকালে মন্তমার্ত্রেবাসী ঘুম ভেঙে দেখে দেয়ালে দেয়ালে এলান। পৈতৃক প্রতাপে অ্যাডল্ফ থিয়ের ব্যাখ্যা করে দিচ্ছে কীভাবে জনশৃঙ্খলা, গণতন্ত্র, প্রজাতন্ত্র, অর্থনীতি, এবং তাদের নিজেদের পিঠ বাঁচানোর স্বার্থে প্যারিসের সুনাগরিকদের কামানগুলো ফেরত দিয়ে বিপথে চালিত করা অপরাধীদের ধরিয়ে দিতে হবে:

    ন্যায়বিচার ও সুবুদ্ধির খাতিরে এই কর্ম সম্পাদনে সরকার আপনাদের সহায়তা কামনা করছে। জনমতের সাথে বিরোধিতা না করে সমর্থন করে সুনাগরিকেরা কুনাগরিকের সঙ্গ ত্যাগ করবে এই বিশ্বাস করে। এই প্রজ্ঞাপন জারি মাত্রই, বলপ্রয়োগে আপনাদের সম্মতি গৃহীত হবে, কেননা আর একদিনও দেরি না করে শান্তি নিশ্চিত করতে হবে। 

    ছবি: ক্রাইমথিঙ্ক.

    ঠিক এর আগের দিন রাতে, লুইস মিশেল মন্তমার্ত্রের চূড়ায় উঠে কামানের তত্ত্বাবধানে থাকা প্রতিরক্ষীদের একটি বার্তা পৌঁছে দেন। দেরি হয়ে যাওয়ায়, তাদের হেডকোয়ার্টারে তিনি রাতটা থেকে যান। সারারাত একের পর এক সন্দেহজনক চরিত্র টিলার উপরে উঁকি দিতে হাজির হয় মাতালের ভান করে আউলফাউল গপ্পো সাজিয়ে।

    বন্দুকের গর্জনে তার ঘুম ভাঙে। তখনও আঁধার কাটে নাই। বিছানা ছেড়ে দাঁড়ানোর আগেই বাড়িটার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নিয়েছে থিয়েরের অনুগত ফরাসি সৈন্যরা। ঘরদোর তছনছ করে ছেলেদের গ্রেফতার করেছে বটে কিন্তু তাকে খেয়াল করে কদাচিৎ – তিনি একজন মেয়েলোক ছাড়া কী। এলাকায় নিরাপত্তা নিশ্চিত করে সৈন্যরা প্রতিরক্ষীদের একজনকে নিয়ে আসে যাকে গুলি করা হয়েছে। তার রক্তের স্রোত আর মিশেলের অশ্রু প্রবাহ এক হয়ে মিশে যায়।

    মন্তমার্ত্রের উদারপন্থী মেয়র আসলেন। তার নগরবাসীরা ভাঙচুর শুরু করার আগে তাড়াতাড়ি সৈন্যদের কামানগুলি সরিয়ে নেয়ার পাশাপাশি তিনি আহত প্রতিরক্ষীর ব্যাপারেও চিন্তিত। মাথা নাড়ানো ছাড়া মিশেলের করার কিছু নেই। তাই মিশেল ক্ষত বেঁধে দিয়েছেন না জেনেও তিনি পরিষ্কার ব্যান্ডেজের খোঁজ করায় মিশেল নিজেই তা নিয়ে আসার আগ্রহ জানালেন।

    “আপনি নিশ্চিত আপনি ফিরে আসবেন?” তিনি কটাক্ষে তাকালেন।

    “আমি কথা দিচ্ছি,” জবাবে মিশেল, অবিচল।

    দৃষ্টির সীমানা পেরোতেই, পাহাড়ের তল থেকে এক দৌড়ে, দেয়ালে সাঁটানো থিয়েরের প্রজ্ঞাপন পড়তে থাকা জটলাগুলো পেরিয়ে স্থানীয় প্রহরা সমিতির মূলভবনের সড়কে পৌঁছাতেই পুরা দমে চিৎকার করতে থাকলেন, “বেইমান! বিশ্বাসঘাতক!” তার বন্ধুরা সেখানেই ছিলো। নিজেদের বন্দুক নিয়ে সবাই ছুটলেন পাহাড়ের উপরে আবার তার সাথে। দূরে তখন শোনা যাচ্ছে রণধ্বনি প্রতিরক্ষী বাহিনীর দামামায়।

    এখন রাস্তায় জমেছে ভীড়: দাঁড়িওয়ালা প্রতিরক্ষী জোয়ান বিড়বিড় করছে রাইফেল হাতে দুই বা তিনজন নারীর সাথে এখানে-ওখানে। জমতে জমতে মানব জোয়ার হয়ে উর্দ্ধগামী ছুটছে সকলে। তাদের সবার আগে, মিশেল দেখতে পায় পাহাড়টা, দিনের মৃদু আলোয় উজ্জ্বল চূড়াটা। চূড়ান্তে দাঁড়িয়ে, রণব্যুহে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত একটি সৈন্যদল। তিনি এবং তার বন্ধুরা মারা যাবেন। এই নিদারুণ সত্যের উত্তেজনাটা প্রায় শ্বাসরুদ্ধকর। হঠাৎ, মিশেলের মা এসে দাঁড়ায় সেই ভীড়ে তার পাশে। “লুইস, কত দিন ধরে তোমারে দেখি না! কই ছিলা তুমি? এই ঝামেলার মধ্যে তো পড়তে যাচ্ছো না তুমি, না?”

    যখন তিনি পাহাড়ের শীর্ষে পৌঁছেছেন, জনতা ততক্ষণে সৈন্যদের নিরাপত্তা বেষ্টনী ভেঙে ভিতরে চলে গিয়েছে। তাদেরকে ঘিরে ধরা হয়েছে। মহিলারা থিয়েরের সৈন্যদের জ্বালা ধরিয়ে দিচ্ছে:

    “এই কামানগুলি কই নিচ্ছো, গা? বার্লিনে?”

    “না– ওরা এইগুলা নবাব নেপোলিয়নের কাছে ফিরায়ে নিচ্ছে গো!”

    “তোমরা আমাদের উপর গুলি করতে পারো, কিন্তু জার্মানদের উপর করতে পারো না, এহ?”

    ঘোড়ায় টানা কামানের ঘোড়া আর কামানের মধ্যে দাঁড়িয়ে পড়া এক রণচণ্ডীর সামনে লজ্জায় নতমুখে এক অফিসার অনুনয় করতে থাকে। “সরে দাঁড়ান, মা জননী, এদিকে আসেন।”

    “যা সর, কুলাঙ্গার,” তিনি পালটা চিৎকার করে বলেন, “গুলি কর আমারে আমার বাচ্চাগুলার সামনে!”

    “দড়িগুলা কেটে ফেলেন!” কেউ চিৎকার করে ভীড়ের পিছন থেকে। একটা ছুড়ি হাত থেকে হাতে পৌঁছে যায় কামান আটকে রাখা নারীটির হাতে। তিনি ঘোড়ার সাথে জুড়ে বাঁধা দড়িটা কেটে আলাদা করেন। জনতা গর্জে উঠে। 

    ছবি: ক্রাইমথিঙ্ক.

    জেনারেল লেকোন্তে স্বয়ং স্বীয় উচ্চাসনে চড়ে হাজির হোন। উপত্যকায় প্রতিধ্বনিত কর্তৃবাচ্যে তিনি হুঙ্কার করেন: “সৈন্যদল! অস্ত্র সাজো!”

    থমকে যায় সব। সৈন্যরা অস্ত্র সাজায়। তাদের মুখ রক্তশূণ্য। কেউ চিল্লায় উঠে, “গুলি কোরো না!” কিন্তু জনতা পিছু হটে না।

    “তাক করো!”

    এক সারি রাইফেল তুলে ধরা হয়। একজন নারী কাঁপছে; আরেকজন তার হাত শক্ত করে ধরে রাখে, উর্দিধারী জোয়ানদের দিকে তাকিয়ে ভেঙচি কেটে। তাদের পিছনে, মিশেল আর তার বন্ধুরাও রাইফেল তুলে ধরে। তারা দেখতে পায় কিছু সৈন্যরাও কাঁপছে। 

    “চালাও গুলি!” এক মুহুর্তের জন্য সব স্তব্ধ।

    একজন অফিসার তার অস্ত্র ছুঁড়ে ফেললেন। বের হয়ে গেলেন সারি থেকে। “চুদি তোরে!”

    “সবাই রাইফেল ঘুরায় নাও!” আরেকজন চিৎকার করলো। এবং এই মুহুর্তটা মিশেলের সারাজীবন মনে থাকবে।

    এরপর দিন, নগর ভবনে উড়িয়ে দেয়া হয় লাল পতাকা – জনতার পতাকা, ১৮৪৮ সালেই যেটা ওড়ানো উচিৎ ছিলো। প্রহরা সমিতি এলাকার যাবতীয় প্রশাসনিক ভবনগুলিতে অবস্থান নিয়েছে। লেকোন্তেকে গুলি করা হয়েছে। সামরিক বাহিনীর অবশিষ্টাংশ সাথে নিয়ে থিয়ের আর তার শাগরেদরা উড়াল দিয়েছে নিকটবর্তী শহর ভার্সাইয়ে। তাদের পৃষ্ঠপোষকেরা তল্পিতল্পা গুটিয়ে গেছে তাদের গ্রামের তালুকে। ভিক্টর হুগো পালিয়েছে বেলজিয়ামে। পূর্বদিক থেকে অপেক্ষমান জার্মান সেনারা দেখছে ফরাসি সরকার এই বিপ্লব ঠেকাতে পারে কিনা। তাদের ভয়, যা ছড়িয়ে পড়তে পারে সমগ্র ইউরোপে।

    প্যারিস কেবলমাত্র সেই সাধারণের হাতে যারা পরিচিত কেবলই একে অপরের কাছে। রহস্যজনক হলো, এইদিনের মতো এতো শান্তি এই শহরে আগে কখনো ছিল না।