অরাজ
আর্টওয়ার্ক: ফ্রিডম ফর অল শিল্পী: ওসামা হাজ্জাজ সূত্র: কার্টন মুভমেন্ট
প্রচ্ছদ » পিটার ক্রপোটকিন ।। আইন ও শাসন

পিটার ক্রপোটকিন ।। আইন ও শাসন

  • অনুবাদ : মাজহার জীবন ও জাভেদ হুসেন
আর্টওয়ার্ক: ক্রপোতকিন
শিল্পী: নাটালিয়া মিখায়েলেনকো
সূত্র: রাশিয়া বিয়ন্ড

পাঠ-প্রবেশ : অ্যানার্কিজম, আইন ও শাসন এবং পিটার ক্রপোটকিন

অ্যানার্কিজম একটি আন্দোলন ও মতবাদ। এটি রাজনৈতিক কর্তৃত্ব অস্বীকার করে, এর মতে সে রকম কোনো কর্তৃত্ব ছাড়াই সামাজিক সুস্থিতি বজায় রাখা সম্ভব আর তা-ই বাঞ্ছিত। আধুনিক রাষ্ট্র যেসব উপাদানে গঠিত, অ্যানার্কিজম সেগুলোকে নেতিবাচকভাবে মূল্যায়ন করে। এই উপাদানগুলোর মধ্যে রয়েছে সীমানা, সার্বভৌমত্ব, নাগরিক ও সম্পত্তির উপর বিশেষ আইনি এক্তিয়ার, এসব আধিকার বজায় রাখতে বলপ্রয়োগ, সকল সামাজিক প্রথার উপর রাষ্ট্র ও আইনের শ্রেষ্ঠত্ব এবং সর্বোচ্চ রাজনৈতিক সম্প্রদায় হিসেবে জাতি ধারণার স্বীকৃতি। এই মতে ইতিবাচক উপাদান হচ্ছে ‘স্বাভাবিক সমাজ’, মানে ব্যক্তির স্বনিয়ন্ত্রিত সমাজ এবং মুক্তভাবে গড়ে ওঠা মন্ডলী (group) যেখানে থাকবে ব্যক্তির স্বাধীনতা, ব্যক্তির সার্বভৌমত্ব —থাকবে না কোনো ধরনের একক মালিকানা।

অ্যানার্কিজমের প্রথম প্রণালীবদ্ধ ধারণা দেন উইলিয়াম গডউইন (১৭৫৬-১৮৩৬)। ধ্রুপদী অ্যানার্কিজম বৃহত্তর সমাজতান্ত্রিক আন্দোলনের অংশ, যদিও বিশেষ ক্ষেত্রে এই আন্দোলনের সাথে এর সম্পর্ক দ্বান্দ্বিক। এই সমাজতান্ত্রিক ধারার জনক পিয়েরে প্রুধো (১৮০৯-১৮৬৫)। প্রুধো সমাজতন্ত্রের ক্ষেত্রে সমবায় পদ্ধতির পক্ষ নিলেও মনে করতেন যে, পুঁজি আর রাষ্ট্রের ক্ষমতা এক ও অভিন্ন আর সর্বহারা,  রাষ্ট্র ক্ষমতা নামক জিনিস টিকিয়ে রেখে মুক্তি পেতে পারে না। এই ধারণার সরব প্রচারক ছিলেন মিখাইল বাকুনিন (১৮১৪-১৮৭৬)। তাঁর নেতৃত্বে  ১৮৬০-এর দশকে অ্যানার্কিজম মার্ক্সের চিন্তার বিরোধী হিসেবে আন্তর্জাতিকভাবে সামনে আসে। প্রথম ইন্টারন্যাশনালের সময় প্রুধোপন্থীরা শ্রমিক শ্রেণীর ট্রেড ইউনিয়ন ও রাজনৈতিক পার্টি গঠনের মার্ক্সের আহ্বানের বিরোধিতা করেন। তারা রাষ্ট্রের উৎখাত দাবি করে সে জায়গায় স্বতঃস্ফূর্তভাবে গড়ে ওঠা শিথিল ফেডারেল বন্ধনের স্বশাসিত অবয়ব প্রতিষ্ঠার কথা বলেন। মার্ক্সের বক্তব্য ছিল—নতুন ধরনের সমাজতান্ত্রিক সমাজ বিকশিত হতে সময় লাগবে আর শ্রমিক শ্রেণী রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলের মাধ্যমেই শ্রেণী সমাজকে বিলোপ করে রাষ্ট্রের জায়গায় আরো মুক্ত স্বশাসন প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এ নিয়েই আন্তর্জাতিকে বাকুনিনের সাথে মার্ক্সের মতবিরোধ ঘটে।

প্রুধোর সমবায়ের বিপরীতে বাকুনিন বলপ্রয়োগের মাধ্যমে পুঁজি ও সম্পত্তি দখল করে যৌথ মালিকানাবাদের পক্ষপাতী ছিলেন। বাকুনিনের উত্তরাধিকারী পিটার ক্রপোটকিন সামাজিক বিবর্তনের ক্ষেত্রে পারস্পরিক সহায়তাভিত্তিক অ্যানার্কিস্ট কমিউনিজমের ধারণার প্রবর্তন করেন যেখানে সবাই সবকিছুর মালিক আর বণ্টন হবে প্রয়োজনের ভিত্তিতে।

শ্রেণীহীন আর রাষ্ট্রহীন সমাজের লক্ষ্যের ব্যাপারে অ্যানার্কিস্ট কমিউনিস্ট আর মার্ক্সবাদীরা একমত । তবে তা অর্জনের পথ নিয়ে দ্বিমত রয়েছে। আরো গভীর বিবেচনায় এই মতপার্থক্য যা নিয়ে তা হচ্ছে—রাষ্ট্রের চরিত্র, পুঁজি ও সমাজের সঙ্গে এর সম্পর্ক ও বিচ্ছিন্নতার এক ধরন হিসেবে রাজনীতিকে কীভাবে অতিক্রম করার উপায়।

পিটার ক্রপোটকিন

প্রিন্স পিওতর আলেক্সেইভিচ ক্রপোৎকিন (১৮৪২-১৯২১) ছিলেন রাশিয়ান অ্যাক্টিভিস্ট, বিজ্ঞানী ও দার্শনিক। পিটার ক্রপোটকিন নামে যিনি পরিচিত। জন্ম অভিজাত জমিদার পরিবারে। খ্যাতনামা ভূতত্ত্ববিদ ছিলেন। ১৮৭৪ সালে রাজনৈতিক কার্যকলাপের জন্য গ্রেপ্তার হন। দুই বছর পর কারাগার হতে পালিয়ে সুইজারল্যান্ড, ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডে ৪১ বছর নির্বাসনে থেকে রাজনীতিতে যুক্ত থাকেন। ফ্রান্সেও ৪ বছর জেল খাটেন। ১৯১৭ সালে অক্টোবর বিপ্লবের পর রাশিয়া ফিরে আসেন। বলশেভিকদের রাষ্ট্র ক্ষমতা দখলে হতাশ হন। প্রাদেশিক সরকারে তাকে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নিতে আমন্ত্রণ জানানো হয়। তিনি তাতে রাজি হননি। ৮ ফেব্রুয়ারি ১৯২১ সালে তিনি রাশিয়াতে মারা যান। সেই শেষকৃত্যের শোভাযাত্রা শেষে এমা গোল্ডম্যান ও এরন ব্যারন বক্তৃতা দেন। ১৯৫৭ সালে সোভিয়েত সরকার মস্কোর একটি রেলস্টেশন তার সম্মানে নামকরণ করে। তার লিখিত কয়েকটি বই হচ্ছে The Place of Anarchy in Socialist Evolution (1886), The Conquest of Bread (1888), The State– Its Part in History (1898), Mutual Aid: A Factor of Evolution (1902) Modern Science and Anarchism (1903), The Great French Revolution, 1789–1793 (1909) ও Ethics (অসমাপ্ত)।

ক্রপোটকিনের রাজনৈতিক ভাবনা

বিবর্তনবাদ : বিজ্ঞানের ছাত্র হিসেবে তিনি বিবর্তনবাদে আগ্রহী ছিলেন। তার চিন্তার মাঝে এই বিবর্তনবাদের গভীর ছাপ রয়েছে। তার মতে, সাধারণ অবস্থায় মানুষ ও সমাজ জীবন বিবর্তনের স্বাভাবিক ও মসৃণ পথে এগোয়। কিন্তু যখন মানুষের কৃত্রিম ইচ্ছার অনুপ্রবেশ ঘটে তখন ছন্দ পতন ঘটে ও সংঘাতের শুরু হয়। বিবর্তনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় যখন বিঘ্ন ঘটে, তার প্রভাব কাটানোর জন্য বল প্রয়োগের দরকার হয়। একেই ক্রপোটকিন বলেন ‘বিপ্লব’। সুতরাং বিবর্তন এবং বিপ্লব একে অপর হতে বিচ্ছিন্ন কিছু নয়, একে অস্বাভাবিক বা ধ্বংসাত্মক কিছু মনে করার কারণ নেই। তার মতে, পারস্পরিক সংঘাত নয় সহযোগিতাই মানুষের প্রধান প্রবণতা। আদিম সমাজে ছিল প্রকৃতির আইন। সেখানে শত্রুতার বদলে ছিল পারস্পরিক সহায়তা, সমব্যথা আর একে অপরের কষ্ট বোঝা।

পারস্পরিক সহায়তা: ইতিহাসের উদাহরণ টেনে ক্রপোটকিন দেখান যে, যে প্রাণী যত উন্নত, তাদের মাঝে সহায়তার বোধ তত গভীর। এটাই প্রকৃতির স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। কিন্তু রাষ্ট্র বা সরকারের মতো কৃত্রিম প্রতিষ্ঠানের অবাঞ্ছিত নাক গলানোর সাথে সাথে মানুষের সহায়তামূলক মনোভাব নষ্ট হতে থাকে। এর ফলে স্বাধীনতা, ন্যায় আর সদিচ্ছা হারাতে থাকে।

রাষ্ট্রতত্ত্ব: ক্রপোটকিন যুক্তি দেন যে, সমাজ বিবর্তনের স্বাভাবিক লক্ষ্য হচ্ছে সাম্য, ন্যায্যতা আর সৌহার্দ্য অর্জন। কৃত্রিম প্রতিষ্ঠান আর লোভ তার পথে বাধা। আর রাষ্ট্র হচ্ছে এইসব ঝামেলার প্রধানতম উৎস। স্বাভাবিক বিবর্তনের সঙ্গে রাষ্ট্র অপ্রাসঙ্গিক, কারণ তা মানব সৃষ্ট। সমাজ হচ্ছে স্বাভাবিক বিবর্তনের ফল। রাষ্ট্র সেই স্বাভাবিকতার সামনে বাধা। এই বাধার ফয়সালা করতে হবে। রাষ্ট্র ব্যক্তির ক্ষমতা বিকাশের পথে প্রতিবন্ধকতা। এই রাষ্ট্রকে সরিয়ে ব্যক্তিকে তার বিকাশের জন্য তারই বেছে নেওয়া পথে চলার অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। আর তা সম্ভব স্বতঃস্ফূর্ত পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে। আদতে রাষ্ট্র খুব সাম্প্রতিক জন্ম নেওয়া এক প্রতিষ্ঠান। এর জায়গায় আসলে ছিল সহবোধ আর স্বেচ্ছাপ্রণোদিত সামাজিক সংগঠন। অর্থনৈতিক ক্ষমতা যখন সমাজকে শ্রেণীতে বিভাজিত করলো, তখন থেকে সংঘাত শুরু হয়। সেই সংঘাতের ফয়সালা করার জন্য যে প্রতিষ্ঠানের জন্ম হয় তার নাম রাষ্ট্র। একই সঙ্গে শাসক শ্রেণীর স্বার্থরক্ষার জন্য বহাল হয় আইন। এই আইন স্বাভাবিক সমাজপ্রথার জায়গা নেয়। সেই প্রথা ছিল সব মানুষের আর আইন হচ্ছে শাসক শ্রেণীর স্বার্থে। শাসন, আইন ও ব্যক্তি সম্পত্তি হচ্ছে প্রকৃতির স্বাভাবিকতার পরিপন্থী।

বিপ্লব ও সহিংসতা: স্বাধীনতা, ন্যায্যতা আর সাম্য প্রতিষ্ঠা করতে হলে ব্যক্তি সম্পত্তি ও তার দোসর রাষ্ট্রকে উৎখাত করতে হবে। এটি কোনো নিয়তি নির্ধারিত ঘটনা নয়। এটা এমন এক বাস্তব ঘটনা যেখানে বিদ্রোহী মজুররা জানে যে তারা কী করছে এবং সেই কাজের ফলাফল কী। এমন না হলে ক্ষমতায় নতুন কেউ এসে বসবে। পুরাতন ব্যবস্থা চালু থেকে যাবে আর মুক্ত সমাজের স্বাভাবিক বিকাশ বাধা পাবে। এই ক্ষেত্রে ধ্বংস অনিবার্য, ক্রমান্বয়ে বদল আসলে সংশোধনবাদ, আপোস।

কমিউনিজম: অ্যানার্কিস্ট কমিউনিজমের লক্ষ্য হচ্ছে উৎপাদনের উপায়গুলো জব্দ করে যৌথমালিকানা প্রবর্তন করা। ব্যক্তিগত সম্পত্তি উচ্ছেদ করা। প্রত্যেকে তার প্রয়োজন মতো পাবে। সেই পথে বাধা হচ্ছে পুঁজিতান্ত্রিক শোষণ যার বিলোপ প্রয়োজন। সমস্ত কেন্দ্রীকরণ শেষ করতে হবে।

আইন ও শাসন প্রসঙ্গে ক্রপোটকিন

তাত্ত্বিকভাবে সরকারের জনগণের জন্যই কাজ করার কথা। বাস্তবে তা কেবল শাসক শ্রেণীর অস্তিত্ব রক্ষার জন্যই ব্যস্ত থাকে আর প্রশাসনের মাধ্যমে তাদের স্বার্থ আর ক্ষমতা টিকিয়ে রাখে। রাজতান্ত্রিক, প্রজাতান্ত্রিক, সাংবিধানিক—যে রকমের সরকারই হোক, তার উদ্দেশ্য হচ্ছে শাসক শ্রেণীর দখলদারিত্ব কায়েম রাখা। এর ফলে সমাজ নিজেকে শাসন করার যে স্বাভাবিক ক্ষমতা ছিল তা রাষ্ট্র নামের কর্তৃত্ববাদী এক প্রতিষ্ঠানের হাতে চলে যায়। রাষ্ট্র সমাজের পক্ষ হয়ে শাসন করা শুরু করে। কর্তৃত্বের ফলে আসে আধিপত্য, সেই আধিপত্য অন্যের শ্রমের ফল দখলকারীর। সেই সাথে সমাজ যেহেতু নিজেকে শাসনের ক্ষেত্রে রাষ্ট্রের উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, সেহেতু তার নিজের ক্ষমতা কমে যায়, সমাজের সদস্যরা হয়ে পড়ে রাষ্ট্রের অধীন। রাষ্ট্র ও আইনি ব্যবস্থার উপর নির্ভরশীলতা সংঘাত নিরসনের একটা পরোক্ষ ব্যবস্থা জন্ম দেয়। ব্যক্তি এখানে সরাসরি নিজেদের মাঝের দ্বন্দ্ব মেটানোর বদলে তৃতীয় পক্ষের মাধ্যমে সমাধান খোঁজে, যে পক্ষ আসলে একটা শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে।

রাষ্ট্রের নিয়োজিত ব্যক্তিদের সমাজের জন্য আইন তৈরি করতে দিলে সমস্যা সৃষ্টি হয়। এখানে এক পক্ষের ইচ্ছা বা স্বার্থ অপরের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়। এই আইন তৈরি করা লোকেরা এমন ভাব দেখায় যে যাদের জন্য আইন তৈরি হচ্ছে তারা তাদের থেকে তাদের প্রয়োজন ভালো বোঝে।

আর্টওয়ার্ক: অথরিটি
শিল্পী: মানা নায়েস্তানি
সূত্র: মানা’স কার্টুন

কিন্তু এই যে সমাজ তার ক্ষমতা রাষ্ট্রের হাতে সঁপে দিল, তার কোনো উপযোগিতাই নেই। কারণ এমন বিশ্বাস করার কোনো কারণ নেই যে রাষ্ট্র সমাজের চাইতে ভালোভাবে কাজ করতে পারছে। ন্যায়বিচারের একটা স্বাভাবিক পন্থা আছে, যা মানুষ আদিকাল হতে কাজে লাগিয়ে আসছে। এর ভিত্তি আমাদের বিবেক, একে অপরের সাথে সমঝোতার প্রথা। এগুলো বাদ দিয়ে আধিপত্যবাদী শাসক শ্রেণীর মাইনে পাওয়া একদল পেশাজীবীর হাতে তৈরি হওয়া আইনের অধীনস্থ হওয়া যৌক্তিক নয়। শাসকের আধিপত্য কায়েম রাখতে দুই ধরনের প্রথার দক্ষ মিশ্রণ ঘটায়। একদিকে সমাজের জন্য প্রয়োজনীয় প্রথা, যেগুলো প্রয়োগের জন্য আইনের দরকার নেই। আরেকদিকে সেই সব নিয়ম যেগুলো সুবিধাভোগী শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে, যেগুলো প্রয়োগের জন্য আইনের ছলনার আশ্রয় নিতে হয়।

এখানে অনূদিত লেখাটি ১৮৮৬ সালে লন্ডনের ইন্টারন্যাশনাল পাবলিশিং কোম্পানি কর্তৃক পুস্তিকা আকারে প্রকাশ হয়। আগ্রহীরা ১৮৮৬ সালের সংস্করণটি এখানে পাবেন https://archive.org/details/lawauthorityanar00kropuoft | এর প্রথম অংশে লেখক আইনের কাজ ও উদ্দেশ্য নিয়ে সাধারণ ধারণা দিয়েছেন যা তার মতে বিধ্বংসী। এর পরের অংশগুলোয় তিনি সামগ্রিকভাবে যুক্তি তুলে ধরেন যে আইনের কাজ মূলত তিনটি : সম্পত্তি রক্ষা, রাষ্ট্র রক্ষা এবং ব্যক্তিকে রক্ষা। ক্রপোটকিন ইতিহাসের উদাহরণ এনে পাঠকদের বলছেন যে, আইন টিকিয়ে রাখার স্বপক্ষে কোনো যুক্তি নেই। রাষ্ট্র নিজে শাসকের স্বার্থ সিদ্ধি করে। ব্যক্তিগত সম্পত্তি মুষ্টিমেয় কয়েকজনের ফায়দা হাসিল করে। আর ব্যক্তিকে শাস্তি দিয়ে সংশোধন করা যায় না। বিপ্লবের মাঝ দিয়ে এই ক্ষতিকর আইন নামক প্রক্রিয়াকে ছুঁড়ে ফেলতে হবে। সেখানে আবার স্বাভাবিক ন্যায্যতার প্রথা ফিরিয়ে আনতে হবে। অনুবাদে উল্লেখ করা ফুটনোটগুলো অনুবাদকের।

পাঠ-প্রবেশ সূত্র :

  1. Peter Kropotkin: Bio, Life and Political Ideas (http://www.politicalsciencenotes.com/political-thinkers/peter-kropotkin-bio-life-and-political-ideas/1205)
  2. An Anarchist Theory of Criminal Justice by Coy McKinney/May 14th, 2012 (http://dissidentvoice.org/2012/05/an-anarchist-theory-of- criminal-justice/)
  3. A Dictionary of Marxist Thought by Tom Bottomore (https://gruppegrundrisse.files.wordpress.com/ 2012/06/bottomore-a-dictionary-of-marxist-thought.pdf)
  4. The Power of Legitimacy in Obedience to the Law, Introduction to Legal Studies (Legal 250-2) UMass Amherst, Spring 2007 (Hilbink) March 6, 2007 (http://www.umass.edu/legal/Hilbink/250/S07%20model2.pdf)
  5. The Marx Dictionary, Ian Fraser, Lawrence Wilde, Bloomsbury Publishing, Nov 17, 2011

 

প্রথম অধ্যায়

“অজ্ঞতা যখন সমাজ শাসন করে এবং মানুষের মনে বিশৃঙ্খলা বিরাজ করে, আইনের প্রয়োগ তখন বহুগুণে বেড়ে যায়। আইনই সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে বলে আশা করা হয়। প্রতিটি নতুন আইন হিসাবের নতুন গরমিল শুরু করে। মানুষ সেই নতুন আইনের কাছ হতে ক্রমাগত তাই দাবি করতে থাকে যা আসলে শুরু হতে পারে খোদ তাদের শিক্ষা আর নৈতিকতার মাধ্যমেই।” উক্তিটি কোনো বিপ্লবীর এমনকি কোনো সংস্কারকেরও নয়। এ উক্তিটি করেছেন ডালোইয়ের যিনি একজন আইনজ্ঞ, ফরাসি আইনের সংকলন “র‌্যাপোর্টিয়ার ডে লা লেজিসলেশন” গ্রন্থের সংকলক। এই কথাগুলো বলেছেন এমন একজন ব্যক্তি যিনি নিজে একজন অনুরাগী আইনপ্রণেতা কিন্তু উক্তিটিতে আমাদের সমাজের অস্বাভাবিকতা নিপুণভাবে ফুটে উঠেছে।

বিদ্যমান রাষ্ট্রসমূহে নতুন আইনকে সকল অশুভের প্রতিকার হিসেবে বিবেচনা করা হয়। যা খারাপ তা পরিবর্তন না করে, জনগণ নতুন আইন দাবী করতে থাকে। যদি দুই গ্রামের মধ্যে রাস্তা ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ে, তা হলে গ্রামবাসী বলতে শুরু করে “স্থানীয় পর্যায়ে রাস্তা বিষয়ে আইন থাকা উচিত”। ধরা যাক, কোনো বনরক্ষী কাউকে পথ দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছেন। তখন বনরক্ষীর কোনো আচরণে সেই ব্যক্তি অপমানিত বোধ করলেন। সেই অপমানিত ব্যক্তি বলে ওঠেন, “বনরক্ষী যাতে ভালো ব্যবহার করে এর জন্য আইন হওয়া উচিত।” কৃষি বা বাণিজ্যে বন্ধ্যাত্ব দেখা দিলে কৃষক, গবাদি পশুপালক কিংবা শস্যের ফটকাবাজ যুক্তি তুলে ধরে বলেন, “আমাদের সুরক্ষার জন্য আইন দরকার।” একবারে প্রান্তিক বৃদ্ধ দর্জিও তার ক্ষুদ্র ব্যবসা সুরক্ষার জন্য আইন চায়। যদি কোনো মালিক মজুরি কমায় কিংবা কর্মঘণ্টা বাড়ায়, তখন পুঁচকে রাজনীতিবিদও বিস্ময় প্রকাশ করে বলে ওঠেন, “আমাদের অবশ্যই এমন আইন থাকা প্রয়োজন যার মাধ্যমে অধিকার সংরক্ষণ করা যায়।” তারা শ্রমিকদের এমন কথা বলবে না যে, এর সমাধানের অন্য পথ রয়েছে এবং তা আরো বেশি কার্যকর ও সোজা পথ। আর তা হলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম শ্রমিকের কাছ থেকে লুট করা সম্পদ মালিকের কাছ থেকে উদ্ধার করা। সংক্ষেপে বলা যায়, আইনের উপস্থিতি সর্বত্র ও সবকিছুতে—ফ্যাশন বিষয়ে আইন, পাগলা কুকুর বিষয়ে আইন, সততা বিষয়ে আইন, সকল ধরনের অনাচার এবং মানুষের অলসতা ও ভীরুতার কারণে ক্ষতিকারক কাজ বন্ধের জন্য আইন।

প্রচলিত শিক্ষা আমাদের এমন ভুল পথে পরিচালিত করে যে শিশুকাল থেকেই আমাদের মাঝে বিদ্রোহ করার স্পৃহা নষ্ট হয়ে যায়। এই শিক্ষা আমাদেরকে শাসকের কাছে সমর্পণ করতে শেখায়। এই অবস্থা দ্বারা আমরা এমনভাবে ভুল পথে পরিচালিত হই যে, আইনের পরিমন্ডল আমাদের জীবনের সকল ক্ষেত্রকে নিয়ন্ত্রণ করে — আমাদের জন্ম, আমাদের শিক্ষা, আমাদের উন্নয়ন, আমাদের ভালোবাসা, আমাদের বন্ধুত্ব—সবকিছু। এ অবস্থা চলতে থাকলে আমাদের সকল উদ্যোগ—আমাদের এবং আমাদের নিজেদের মঙ্গলের জন্য ভাবনার অভ্যাস হারিয়ে ফেলবো। আমাদের সমাজ এখন এটা বুঝতে অক্ষম যে, আইনের আধিপত্যের বাইরেও আমরা টিকে থাকতে পারি। এই আইনের আধিপত্যের বিস্তার ঘটায় একটি প্রতিনিধিত্বশীল সরকার এবং তা পরিচালনা করে মুষ্টিমেয় কয়েকজন শাসক। এমনকি পরাধীনতা থেকে মুক্ত হলেও তার তাৎক্ষণিক কাজ হয় সেই পুরোনো ব্যবস্থা আবার প্রতিষ্ঠা করা। ‘মুক্তির প্রথম বছর’ কোনোভাবেই একদিনের বেশি টেকেনি। কারণ মুক্তির পরপরই তারা নিজেরাই নিজেদের আইন ও শাসনের জোয়ালে আটকে ফেলেছিল।

বস্তুত কয়েক হাজার বছর ধরে আমাদেরকে যারা শাসন করেছে,‌‌‌’আইনকে শ্রদ্ধা কর, শাসককে মেনে চল’ বলা ছাড়া তারা কিছুই করেনি। এই নৈতিক পরিবেশের মাঝেই পিতামাতা তাদের সন্তানদের বড় করে তোলে।

আর শিক্ষায়তনগুলো এই ধারণাকে আরো বদ্ধমূল করে তোলে। শিশুদেরকে আইনের প্রয়োজনীয়তার সাথে ধাতস্থ করে তুলবার জন্য খণ্ড খণ্ড বিচ্ছিন্ন মেকি বিজ্ঞানকে চতুরতার সাথে কাজে লাগানো হয়। আইন মান্য করাকে ধর্ম পর্যায়ে নিয়ে যাওয়া হয়। নৈতিক শুদ্ধতা ও আইনের প্রভুদের একাকার করে সমান ঐশ্বরিকতায় মিলিয়ে ফেলা হয়। শিক্ষায়তনের ঐতিহাসিক নায়ক হয় তারাই, যারা আইন মান্য করে এবং আইনকে আইনবিরোধীদের হাত থেকে রক্ষা করে।

পরবর্তীকালে আমাদের যখন জনজীবন, সমাজ ও সাহিত্যের সঙ্গে সংযোগ ঘটে,এই পূর্ব ধারণা আমাদের মাথায় ঠেসে ঢোকানো হয়। আর তা  কাজ  করে তেমনভাবে যেভাবে দিনের পর দিন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা পানির ফোঁটা পাথরেও গর্ত করে ফেলে। আইনের প্রতি শ্রদ্ধার বিষয়টি ইতিহাস, রাজনীতি বিজ্ঞান, সামাজিক অর্থনীতির বইয়ে ঠাসা থাকে। এমনকি ধর্মতত্ত্ব ও স্বৈরাচারী শক্তির উপর ভর করে, জ্ঞানরাজ্যে কৃত্রিমতার বিকাশ ঘটিয়ে ভৌত বিজ্ঞানকেও (physical science) প্রয়োজনে ব্যবহার করা হয়। যদিও এই জ্ঞান নিখাদ পর্যবেক্ষণের ফলাফল। এভাবেই আমাদের বুদ্ধিমত্তাকে সুকৌশলে বিভ্রান্ত করা হয় এবং সব সময় আইনের প্রতি শ্রদ্ধা করাকে বহাল রাখা হয়। ঠিক একই কাজ করে সংবাদপত্র। আইনকে শ্রদ্ধা করে না— এমন কোনো প্রতিবেদন সেখানে পাওয়া যাবে না। যদিও দেখা যায়, প্রথম পাতায় যেখানে আইনের শাসনের কথা প্রচার করা হয়, সেখানে পরের পাতাতেই সেই আইনের অকার্যকারিতা নিয়ে প্রতিবেদন ছাপা হয়। এরা আইনের দাসত্বকে গুণ হিসেবে পরিগণিত করে। এমন কোন বিপ্লবী কি পাওয়া যাবে, যে তার যৌবনে আইনকে তথাকথিত ‘অপব্যবহারের’ হাত হতে রক্ষা করতে আইনের রক্ষক হিসেবে শুরু করেনি? যদিও আইনের নিজেরই অবশ্যম্ভাবী পরিণতি হলো আইনের অপব্যবহার।

শিল্প (Art) মিলিতভাবে হবু বিজ্ঞানের সাথে ঐকতান গড়ে তোলে। ভাস্কর, চিত্রকর আর সঙ্গীতের নায়কেরা তাদের কর্ম দিয়ে আইনকে আগলে রাখে। আইনকে যারা লঙ্ঘন করে তাদের বিনাশ করতে এই নায়কেরা জ্বলজ্বলে চোখ ও নাক ফুলিয়ে সদাসর্বদা প্রস্তুত। আইনের রক্ষক তো বটেই এমনকি বিপ্লবীরাও তাদের স্পর্শ করতে কুণ্ঠা বোধ করে। বিপ্লব যখন এই পুরাতন প্রতিষ্ঠানের কিছু অংশকে মুছে ফেলতে উদ্যত হয়, সেই কাজও তখন আইন দিয়েই বৈধ করা হয়।

কী করা যাবে আর কী করা যাবে না তা নিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত একগাদা নিয়মকেই বলা হয় আইন। যা আমাদের দান করেছে দাসত্ব, ভূমিদাসত্ব, সামন্ততন্ত্র আর আনুগত্য। (প্রাচীনকালের) পাথরের দৈত্যদের উদ্দেশে মানুষকে বলী দেওয়ার ভূমিকা এখন দখল করেছে আইন। এই পাথরের দৈত্যদের তখন দাসসুলভ বর্বরেরা এমনকি স্পর্শ করারও সাহস পেত না, পাছে তারা স্বর্গের বজ্রপাতে ছিন্নভিন্ন হয়ে যায়!

মহান ফরাসী বিপ্লবের পর থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণীর হাতে সর্বময় ক্ষমতা অর্পিত হয়। তখন থেকে বিশেষ সফলতার সাথে এই নতুন পূজার প্রচলন শুরু হয়েছে। আগের শাসনামলে, মানুষ আইন নিয়ে খুবই কম আলোচনা করতো। বস্তুতপক্ষে মঁতেস্কু, রুশো ও ভলতেয়ার রাজকীয় খেয়ালখুশির বিরোধিতা শুরু করার পর সেই আলোচনার সূত্রপাত ঘটে। রাজা ও তার তোষামোদকারীদের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ ছিল বাধ্যতামূলক, নইলে কারাগার অথবা ফাঁসিকাষ্ঠ। কিন্তু বিপ্লবকালীন ও তার পরবর্তী সময় যখন আইনজ্ঞরা ক্ষমতা পেল, তারা তখন তাদের সাধ্যমতো তাদের নিজেদের প্রাধান্য বজায় রাখার স্বার্থে নিয়মনীতি শক্তিশালী করতে বদ্ধপরিকর হলো। জনগণের বিশাল জোয়ার আটকানোর জন্য মধ্যবিত্ত শ্রেণী এই আইনের শাসনকে বাঁধ হিসেবে সঙ্গে সঙ্গে মেনে নিল। অতলে ডুবে যাওয়া থেকে রক্ষা পেতে, যাজকের দল দ্রুততার সাথে একে বৈধতা দিল। পরিশেষে স্বৈরাচারী শাসন ও অতীতের সহিংসতার থেকে ভালো মনে করে জনগণও তা গ্রহণ করে নিল।

উপরে উল্লিখিত পরিস্থিতি বুঝতে আমাদের আঠারো শতকের দিকে নজর দিতে হবে। সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী অভিজাত শ্রেণী যেভাবে নারী-পুরুষের উপর নৃশংসভাবে অত্যাচার করেছে, তা ভাবলে আমাদের মন ব্যথায় ভরে উঠবে। ‘আইনের চোখে সবাই সমান, জন্ম ও ভাগ্যের পার্থক্য ব্যতিরেকে সকলকে তা মেনে চলতে হবে’ এই বাক্য কীভাবে কৃষকের উপর জাদুকরী প্রভাব ফেলেছিল তা বুঝতে আমাদের ঐ সময়ের অবস্থা বুঝতে হবে। এই ঘোষণার আগ পর্যন্ত একজন মানুষ পশুর থেকেও নিষ্ঠুরভাবে অত্যাচারিত হতো। তার কোনো রকমের অধিকারের বালাই ছিল না। সে কখনো রাজন্যবর্গের বিরুদ্ধে বড় রকমের বিদ্রোহে ন্যায়বিচার পায়নি; যতক্ষণ পর্যন্ত না প্রতিহিংসায় তাকে ফাঁসিকাষ্ঠে ঝুলানো হয়েছে। এর বিপরীতে ‘সবাই সমান’ এই বাণীতে সে নিজের স্বীকৃতি খুঁজে পেল, অন্তত তাত্ত্বিকভাবে হলেও। কমপক্ষে তার ব্যক্তিগত অধিকারের ক্ষেত্রে নিজেকে তার প্রভুর সমান ভাবতে পারল। আইন যা-ই হোক না কেন, তা রাজন্যবর্গ ও কৃষকের সমান হওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে; আইনের চোখে ধনী গরীব উভয়ই সমান ঘোষিত হয়েছে। এই প্রতিশ্রুতি ছিল মিথ্যা, আমরা এখন তা বুঝতে ও জানতে পারি। কিন্তু সে সময়ের জন্য ওটা ছিল একধরনের অগ্রগতি। শঠতা যেমন সত্যের স্বীকৃতি, এও তেমনি। এ কারণেই বিপদগ্রস্ত মধ্যবিত্ত শ্রেণীর উদ্ধারকারীরা (রোবস্পিয়ের ও দাঁতোর অনুসারীরা)

ভলতেয়ার ও রুশোর মতো লেখকদের রচনার পক্ষাবলম্বন করে ঘোষণা করেন ‘আইনকে শ্রদ্ধা কর, আইন সকলের জন্য সমান’। জনগণ এই আপোষ মীমাংসা মেনে নেয়। কারণ তাদের বিপ্লবী প্রেরণা ইতোমধ্যে শত্রুর বিরুদ্ধে সংগ্রামে দিন দিন নিঃশেষ হয়ে গেছে। তাদের প্রভুদের স্বৈরাচারী ক্ষমতার হাত থেকে রক্ষা পেতে আইনের জোয়ালের নীচে তারা নিজেরাই তাদের গলা বাড়িয়ে দিল।

এর পর থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণী এই সাধারণ নীতিই বহাল রেখেছে। তারপর থেকে মধ্যবিত্ত শ্রেণী এই নীতি হতে সর্বোচ্চ ফায়দা তোলা অব্যাহত রেখেছে। সেই সাথে উঠে এলো প্রতিনিধিত্বমূলক সরকার নামের আরেক তত্ত্ব, যা উনবিংশ শতাব্দীর সমগ্র বুর্জোয়া দর্শনের সারকথা। নিজেদের মতবাদে, লেখালেখিতে বুর্জোয়ারা এই তত্ত্ব প্রচার করেছে। এই উদ্দেশ্যেই সে নিজেদের শিল্পকলা ও বিজ্ঞানকে সেই ছাঁচে ঢেলেছে। এই বিশ্বাস সকল ক্ষেত্রে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। যেমন ধর্মনিষ্ঠ ইংরেজ নারী তার মনের কথা চিরকুটে লিখে গোপনে দরজার তলা দিয়ে রেখে আসে। এসব কাজ এমন চমৎকারভাবে সম্পন্ন করা হয়েছে যে, এখন বিষয়টাকে আমাদের কাছে প্রশ্নাতীত বলে মনে হয়। যখনই তীব্র সমালোচনার স্পৃহা আবার জেগে ওঠে, তখনই মুক্তিকামী মানুষ মুক্তি পাওয়ার কাজটা শুরু করে অদ্ভুতভাবে। তারা তাদের প্রভুদের কাছে আইন সংশোধন করে তাদের রক্ষা করার জন্য সদয় হওয়ার আবেদন জানায়, যে আইন কিনা সেই প্রভুদেরই তৈরি করা।

কিন্তু গত শ’খানেক বছর আগ থেকে সময় ও মেজাজের পরিবর্তন ঘটেছে। এখন সব জায়গায় বিদ্রোহীদের দেখা যায়, যারা এর ব্যবহার কী এবং এর প্রতি আনুগত্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতা কতটুকু এবং একে মান্য করার যৌক্তিকতা কী তা না জেনে আর আইন মানতে রাজি নয়। আমাদের সময়ের বিদ্রোহীরা সমাজের মূলভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন করছে যাকে এখন পর্যন্ত পবিত্র বলে মনে করা হয়। সেই প্রশ্নাতীত পবিত্র জিনিসের মধ্যে প্রথম ও অগ্রগণ্য বিষয় হলো সেই অন্ধ আনুগত্য যার নাম—আইন। সেই কারণেই আজকের যে অভ্যুত্থান তা নিছক বিদ্রোহ নয়, সে হলো বিপ্লব।

সমালোচকেরা আইনের উৎসের অনুসন্ধান করে বিশ্লেষণ করেছেন। আইনের উৎস হতে পারে দুটো। একদিকে আছে ঈশ্বর, অসভ্য, বর্বরদের ভয়। যে ঈশ্বর তার গায়ে অতিপ্রাকৃতকতার তকমা লাগানো পুরোহিতের মতোই জড়বুদ্ধি, অল্পেই ক্ষিপ্ত আর বিদ্বেষপরায়ণ। দ্বিতীয়টি হলো, ধ্বংসযজ্ঞে অর্জিত রক্তপাত আর দখলদারিত্ব। সমালোচকেরা আইনের চরিত্র অধ্যয়ন করেছেন। এর বিকাশের বদলে সেখানে দেখতে পেয়েছেন একটা নির্দিষ্ট প্রবণতা। সেই প্রবণতা হলো স্থবিরতা, জমাট বেঁধে যাওয়া। একে দিনের পর দিন সংস্কার আর বিকাশ ঘটাতে হয়। তারা এও অনুসন্ধান করেছেন যে, আইন কীভাবে বহাল থেকেছে। তারা দেখেছেন তা বহাল রাখতে গিয়ে বাইজেন্টাইনরা কীভাবে হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছে, দেখেছেন ইনকুইজিশনের নিষ্ঠুরতা, মধ্যযুগের অত্যাচার, জল্লাদের চাবুকের আঘাতে শরীর থেকে মাংস ছিন্নভিন্ন হয়ে যাওয়া, শিকল, মুগুর, কুঠার, অন্ধ কারাপ্রকোষ্ঠ, তীব্র যন্ত্রণা, অভিশাপ আর কান্না। আগের মতোই এখনো দেখতে পাচ্ছি, একদিকে কুঠার, ফাঁসি রজ্জু, রাইফেল, কারাগার প্রভৃতি দিয়ে কারা কর্তৃপক্ষকে হিংস্র করে তোলা হচ্ছে। একদিকে নির্যাতিত কারাবন্দীদের খাঁচায় ভরা জন্তুর পর্যায়ে নামিয়ে আনা হচ্ছে তার সমগ্র নৈতিক সত্তার অমর্যাদা করে। অন্যদিকে মানুষের প্রকৃতিকে সম্মান জানানো সকল অনুভ‚তিকে ছুড়ে ফেলে বিচারকেরা আইনি কল্পরাজ্যে আছেন এক ভবিষ্যৎ দ্রষ্টা হয়ে। কয়েদ আর মৃত্যুদণ্ড দিয়ে তারা ক্ষয়ের অতলতা প্রকাশ করছে নিজেরই পাগলামির শীতল বিদ্বেষ সম্পর্কে বিন্দুমাত্র সন্দেহ না করে। যাদেরকে শাস্তি দিচ্ছে তাদের চোখে সে নিজেই এই ক্ষয়ের শিকার।

তারা দেখতে পায়, এক প্রজাতির আইনপ্রণেতা রয়েছেন যারা নিজেরাই আইন বিষয়ে কিছুই জানেন না। আজকে হয়তো পয়ঃনিষ্কাশন নিয়ে আইন প্রণয়ন করছেন পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে বিন্দুমাত্র ধারণা না রেখে, আবার আগামীকাল যোদ্ধাদের অস্ত্রে সজ্জিত করা নিয়ে নিয়ম বানাচ্ছেন বন্দুক সম্পর্কে সম্যক ধারণা ছাড়াই। আরেকদিন হয়তো তারা শিক্ষা ও পাঠদান নিয়ে আইন বানাচ্ছেন কোনোদিন কোনোরকম শিক্ষা প্রদানের অভিজ্ঞতা ছাড়াই, এমনকি নিজের সন্তানদেরও সৎ শিক্ষা না দিয়েই।

১২ শতকে ফ্রান্সে প্রথম শুরু হয়। সারা ইউরোপে এ প্রতিষ্ঠানগুলো মুক্তচিন্তা, আধুনিক ধ্যানধারণা ও স্বাধীনতাকামীদের নিপীড়নের হাতিয়ার হয়ে ওঠে।

চতুর্দিকে তারা আইন বানিয়ে যাচ্ছেন, কিন্তু এও ভুলছেন না যে, তাদের এই আইনের ক্ষতিপূরণ দিতে হবে ছেঁড়াকাপড় পরা গরীব মানুষকে ফাঁসিকাঠে ঝুলে বা জেলখানায় পঁচে। এরা কিন্তু আইনপ্রণেতাদের চাইতে হাজার গুণ কম চরিত্রহীন।

পরিশেষে তারা কারারক্ষককে সকল প্রকার মানবতা বর্জিত হিসেবে দেখে; গোয়েন্দাকে এমন প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় যেন সে রক্তচোষা; পুলিশের চর নিজেকেই অবজ্ঞা করে; গোপন তথ্য দেওয়া সদগুণে রূপান্তরিত হয়; দুর্নীতি একটা ব্যবস্থা হয়ে দাঁড়ায়। সকল ধরনের অনাচার আর মানুষের সকল প্রকার খারাপ প্রবৃত্তি লালনপালন ও সমর্থন করা হয় আইনের জয়গানের জন্য।

এ সবই তো আমরা দেখতে পাই। আর তাই এসব দেখে পাগলের মতো পুরাতন সূত্র ‘আইনকে শ্রদ্ধা কর’ না আউড়িয়ে আমরা বলি ‘আইন এবং এ সংক্রান্ত সকল কিছুকে অবজ্ঞা কর’। ‘আইন মান্য কর’ এই কাপুরুষোচিত শব্দমালার বিপরীতে আমরা চিৎকার করে বলি ‘সকল আইনের বিরুদ্ধে বিদ্রোহ কর’।

প্রতিটি আইনের নামে যে অপকর্ম করা হয় এবং এর মাধ্যমে ভালো যা কিছু হয় তার তুলনা করে দেখুন। এই ভালো আর মন্দকে মেপে দেখুন। তা হলেই বুঝতে পারবেন আমরা সঠিক কি না।

দ্বিতীয় অধ্যায়

আপেক্ষিক অর্থে বলা যায়, আইন হলো আধুনিককালের ফসল। হাজার বছর মানুষ কোনো ধরনের লিখিত আইন ছাড়াই চলেছে। এমনকি উপাসনালয়ের প্রবেশমুখের পাথরে খোদিত দেবদেবীর মূর্তিরও তখন বালাই ছিল না। এ সময়ে মানুষের সম্পর্ক সাধারণভাবে নিয়ন্ত্রিত হতো প্রথা, অভ্যাস, ও আচারব্যবহার দ্বারা। নিরন্তর পুনরাবৃত্তির মাধ্যমে এগুলোকে পবিত্র বানানো হয়েছে। প্রত্যেকে তা শিশুকাল থেকে আয়ত্ত করে। ঠিক যেভাবে সে শিশুকাল থেকে শেখে কীভাবে শিকার, পশুপালন বা কৃষি কাজের মাধ্যমে তার খাবার জোগাড় করতে হয়।

সকল মানব সমাজই এই আদিম পর্ব পার করেছে। এবং হাল আমলেও অনেক সমাজে কোনো লিখিত আইন নেই। প্রতিটি গোত্রের রয়েছে তাদের নিজস্ব আচার-আচরণ ও প্রথা—আইনজ্ঞরা যাকে প্রথাগত আইন নামে অভিহিত করেন। এদের সাধারণ সামাজিক অভ্যাসই তাদের নিজ গোত্র বা কমিউনিটি সদস্য বা গ্রামের মানুষের মাঝে সৌহার্দ্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখার জন্য যথেষ্ট। এমনকি আমাদের মতো ‘সভ্য’ জাতি সমূহের লোকজন যখন বড় শহর থেকে গ্রামে যায়, তখন দেখা যায়, সেখানে প্রতিবেশীদের সাথে পারস্পরিক সম্পর্ক নিয়ন্ত্রিত হয় আদিম এবং সাধারণভাবে গ্রহণযোগ্য প্রথার মাধ্যমে—আইনপ্রণেতাদের লিখিত আইনের মাধ্যমে নয়। রাশিয়া, ইতালি, স্পেন এমনকি ফ্রান্স ও ইংল্যান্ডের বড় অংশের কৃষকের মাঝে লিখিত আইনের কোনো ধারণা নেই। যখনই তারা রাষ্ট্রের সাথে কোনো সম্পর্কে নামে তখনই তাদের স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। তাদের নিজেদের মধ্যে সম্পর্ক কিছু কিছু ক্ষেত্রে জটিল হলেও, তারা সাধারণভাবে প্রাচীনকালের প্রথা দ্বারা পরিচালিত হয়। অতীতে মানবসমাজে এটাই ছিল ব্যাপার।

আদিম মানুষের আচার ব্যবহার বিশ্লেষণ করে প্রথা সম্পর্কে উল্লেখযোগ্য দুই ধরনের প্রবণতা দেখা যায়।

মানুষ একাকী বেঁচে থাকতে পারে না; তার মধ্যে অভ্যাস ও অনুভূতির বিকাশ ঘটে যা সমাজ রক্ষা ও জাতির বিকাশের জন্য প্রয়োজনীয়। সামাজিক অনুভূতি ও অভ্যাস ব্যতীত, সাধারণভাবে মানুষের জীবন যাপন হতো সম্পূর্ণভাবে অসম্ভব। এগুলো প্রতিষ্ঠিত হতে আইনের প্রয়োজন হয়নি। এগুলো হলো সকল আইনের পূর্বের বিষয়। এমনকি ধর্মীয় কোনো আদেশেও তা প্রতিষ্ঠিত হয়নি। এগুলো ধর্মেরও পূর্ববর্তী। এগুলোর উপস্থিতি সমাজের সকল জন্তুর মাঝেই দেখা যায়। এগুলো স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিকাশ ঘটেছে বস্তুর প্রকৃতিগত কারণেই। জন্তুর মাঝে এ অভ্যাসকে মানুষ নাম দিয়েছে প্রবৃত্তি। এগুলো উঠে আসে বিবর্তনের মধ্য দিয়ে—যা কাজে লাগে। আর অস্তিত্ব রক্ষার লড়াইয়ের স্বার্থে সমাজকে এক করে রাখতে এটা মানতে বাধ্য করা প্রয়োজনীয়ও বটে।

বর্বরেরা একে অপরকে খেয়ে ফেলা বন্ধ করলো। কারণ তারা দেখলো যে দীর্ঘমেয়াদে বছরের শেষে বৃদ্ধ কোনো আত্মীয়ের মাংস দিয়ে ভোজ করার চাইতে চাষাবাদে যুক্ত হলে বেশি লাভ হয়। অনেক পরিব্রাজক চূড়ান্তরূপে স্বাধীন অনেক জাতিগোষ্ঠীর অভ্যাস পর্যবেক্ষণ করেছেন। সেখানে আইন ও গোষ্ঠীপ্রধানের উপস্থিতি নেই, সেখানে সদস্যরা নিজেদের মধ্যে প্রতিটি দ্বন্দ্বে একে অপরকে ছুরিকাঘাত করে না। কারণ সমাজে বাস করার অভ্যাস শেষ পর্যন্ত এক ধরনের ভ্রাতৃত্ববোধ ও সাধারণ স্বার্থের বোধ তৈরি করেছে আর কোনো বিরোধ নিরসনে তারা তৃতীয় কোনো পক্ষকে আহ্বান করাই ভালো মনে করে। আদিম মানুষের আতিথেয়তা আর মানুষের জীবনের প্রতি শ্রদ্ধা, পারস্পরিক বাধ্যবাধকতার বোধ, দুর্বলের প্রতি সমবেদনা, অন্যের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দেওয়ার সাহস—এগুলোই তারা শিখেছে প্রথমে নিজেদের সন্তান ও বন্ধুদের প্রয়োজনে; পরে তার নিজ গোষ্ঠীর অন্য সদস্যের প্রতিও যা প্রযোজ্য হয়েছে। সামাজিক প্রাণী হিসেবে উপরোক্ত সকল গুণ মানুষের মাঝে জন্ম নিয়েছে সকল ধরনের আইন, সকল ধর্মের সাপেক্ষে স্বতন্ত্রভাবে। এ ধরনের অনুভূতি ও চর্চাই হলো সামাজিক জীবনের অবশ্যম্ভাবী ফল। যাজক ও অধিবিদ্যাবিশারদগণ বলেন যে এই রকম গুণ কেবল মানুষের মাঝে সহজাত, কিন্তু তা সাধারণ জীবনের পরম্পরা।

এসব প্রথার পাশাপাশি, সমাজজীবনের প্রয়োজন ও জাতিকে রক্ষা করতে মানুষের সম্মিলনের মাঝে গড়ে উঠলো অন্যান্য বাসনা, আবেগ এবং সেই সাথে অন্যান্য অভ্যেস ও প্রথা। অন্যের উপর কর্তৃত্বের আকাঙ্ক্ষা এবং নিজের ইচ্ছে অন্যের উপর চাপিয়ে দেওয়া এবং পার্শ্ববর্তী গোত্রের শ্রমে উৎপাদিত পণ্য লুফে নেওয়ার আকাঙ্ক্ষা, অপরদিকে নিজে কিছু না করে আরাম আয়েশে থাকা যেখানে দাসেরা তাদের মনিবদের জন্য সকল রকমের আয়েশের ব্যবস্থা করবে—এই স্বার্থপর আকাঙ্ক্ষার ফলে রীতিনীতি ও অভ্যাসে আরেক ধরনের প্রবণতা তৈরি হয়েছে। যাজক ও যোদ্ধারা কুসংস্কারকে পুঁজি করে, নিজেকে এসব হতে মুক্ত রেখে অন্যদের মাঝে তা ছড়িয়ে দিয়ে মানুষ ঠকিয়ে লাভ করেছে। অপরদিকে আছে উৎপীড়ক, যে তার প্রতিবেশীর উপর আক্রমণ চালিয়েছে এবং লুণ্ঠন ডেকে আনে যাতে সে বিনিময়ে লুটের মাল আর আর দাস পেতে পারে। এই দুই পক্ষ হাতে হাত মিলিয়ে আদিম সমাজে সফলভাবে প্রথা আরোপ করেছে, যা এই দুই পক্ষের জন্যই লাভজনক। কিন্তু জনগণের উপর তাদের নিরন্তর নিয়ন্ত্রণের প্রবণতা তৈরি করেছে। অসংগঠিত জনতার আলস্য, ভয়, জড়তা পুঁজি করে আর বারবার এগুলোর পুনরাবৃত্তি ঘটিয়ে তারা স্থায়ীভাবে এমন প্রথা কায়েম করেছে যা তাদের আধিপত্যের নিরেট ভিত্তি গড়েছে।

এই উদ্দেশ্যে প্রথমত তারা এই প্রবণতাকে মানবসমাজের মাঝে খুব সুচারুভাবে ব্যাপক আকারে প্রচলন করেছে। শিশু ও বর্বরদের মাঝে তা বিস্ময়কর ব্যাপ্তি পেয়েছে, এবং তা পশুর মধ্যেও পরিলক্ষিত হয়। মানুষ যখন পুরোপুরি কুসংস্কারাচ্ছন্ন থাকে তখন সে সর্বদাই বর্তমান অবস্থায় যে কোনো পরিবর্তনে ভীত থাকে; সাধারণত সে যা কিছু প্রাচীন তাকে মান্য করে। বলতে থাকে ‌‌‌’আমাদের পূর্বপুরুষেরা অমুক অমুক করেছে; তারা যথেষ্ট ভালো ছিল;  তারা তোমাকে লালনপালন করেছে; তারা অসুখী ছিল না; তাদেরকে অনুসরণ কর।’ তরুণরা যখনই কোনো পরিবর্তন করতে চায়, বয়স্ক মানুষেরা এসব বলতে থাকে। অজানা কোনো কিছু তাদেরকে ভীত করে তোলে। তারা অতীতকে আঁকড়ে রাখতে চায়। এমকি তা অতীত দারিদ্র্য, শোষণ ও ক্রীতদাসের প্রতিনিধিত্ব করলেও। এমনও বলা হয় যে, সে যতই পরিবর্তন করতে চাইবে, তার অবস্থা ততই খারাপ হবে। ভালো কিছু আশা করতে শুরু করার আগে পুরোনো জীবনধারার সমালোচনা আর পরিবর্তনের সূচনা করতে অবশ্যই কিছু আশার আলো, একটু স্বস্তি তার অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে উঁকি দেওয়া দরকার। যতক্ষণ পর্যন্ত না সে আশায় অনুপ্রাণিত হচ্ছে; যতক্ষণ পর্যন্ত না সে  কুসংস্কার ও ভয়কে ব্যবহার করে যারা, তাদের হাত হতে মুক্ত হচ্ছে, ততক্ষণ পর্যন্ত সে তার আগের অবস্থানকে শ্রেয় মনে করে। যদি কোনো তরুণ পরিবর্তনের আশা করে, বয়স্করা তখন নতুন কথা বলা এই তরুণদের বিরুদ্ধে শোরগোল সৃষ্টি করে। কিছু বর্বর তাদের দেশের প্রথা ভঙ্গ করার চাইতে বরং মৃত্যুকে শ্রেয় মনে করে। কারণ তারা শৈশবকাল থেকে শুনে আসছে যে, প্রতিষ্ঠিত বিধিবিধানের সামান্যতম বিচ্যুতিই মন্দ-ভাগ্য ডেকে আনবে, এবং সমগ্র গোত্রের ধ্বংস বয়ে আনবে। এমনকি হাল আমলেও অনেক রাজনীতিবিদ, অর্থনীতিবিদ ও হবু বিপ্লবীরা একই মনোভাব পোষণ করে এবং অপসৃয়মাণ অতীতের সাথে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে থাকে। কতজনই বা পূর্বদৃষ্টান্তের প্রতি নজর রাখে! কত দুর্ধর্ষ নতুন পথপ্রদর্শক আসলে কেবল অতীতের বিপ্লবের অনুকরণ করে যায়!

নিয়ম মেনে চলার স্পৃহার উৎস হলো কুসংস্কার, অলসতা, কাপুরুষতা। এগুলোই সব সময় শোষণের প্রধান অবলম্বন। আদিম মানবসমাজে যাজক ও সামরিক নেতাদের ভাগ্যের পরিবর্তন ঘটাতে চতুরতার সাথে এগুলো ব্যবহার করা হয়েছে। যেসব রীতিনীতি কেবল তাদের জন্য লাভজনক সেগুলোকেই জিইয়ে রেখে তা সমগ্র গোত্রের ওপর চাপিয়ে দিতে সফল হয়েছে। যতদিন পর্যন্ত  ব্যক্তিগত স্বাধীনতার উপর গোষ্ঠীপ্রধানের হস্তক্ষেপ অব্যাহত রাখতে এই সংরক্ষণশীল মলম লাগানো যায়, যতদিন মানুষের মাঝের বৈষম্য কেবল প্রকৃতি সৃষ্ট, যতদিন সেই বৈষম্য ক্ষমতা আর সম্পদের মাধ্যমে বহুগুণ বৃদ্ধি না পেয়েছে, ততদিন আইনের প্রয়োজন পড়েনি। এমনকি ভয়ঙ্কর আদালত এবং তার হুকুম প্রয়োগ করার জন্য ক্রমবর্ধমান শাস্তি দেয়ারও প্রয়োজন পড়েনি।

কিন্তু যতই সমাজ ক্রমেই দুটো বৈরী শ্রেণীতে বিভক্ত হয়ে গেছে, এক পক্ষ চেয়েছে আরেক পক্ষের উপর আধিপত্য চালাতে; আর অপর পক্ষ চেয়েছে সেই আধিপত্য থেকে মুক্ত হতে, তখনই সংঘাতের শুরু হয়েছে। তখন বিজয়ীরা তার কাজের ফলাফলকে চিরস্থায়ী করতে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পডেছে। সে তার অবস্থানকে প্রশ্নাতীত করার জন্য চেষ্টা চালিয়েছে। প্রতি পদক্ষেপে তার শক্তিকে পবিত্র ও পূজনীয় করার প্রচেষ্টা চালিয়েছে। আইন আবির্ভূত হলো যাজকদের অনুমোদন নিয়ে আর যোদ্ধার অস্ত্র নিয়োজিত হলো তার সেবায়। এই আইন নামক প্রতিষ্ঠান, সংখ্যালঘিষ্ঠ আধিপত্যকারীদের স্বার্থের মতোই প্রথাকে অপরিবর্তনীয় বলে প্রচার করতে লাগলো। সামরিক কর্তৃপক্ষ আনুগত্যের নিশ্চয়তার দায়িত্ব নিল। এই নতুন দায়িত্ব যোদ্ধাদের ক্ষমতার নিশ্চয়তা বিধান করলো। এখন থেকে সে আর তার দানবীয় শক্তি নয় বরং আইনের রক্ষক হয়ে গেল।

আর্টওয়ার্ক: পুলিশ এন্ড জাস্টিস
শিল্পী: এঞ্জেল বলিগান
সূত্র: পলিটিক্যাল কার্টুন

আইন যদি কেবল শাসক শ্রেণীর কাজে লাগে— এমন বিধানের সমষ্টি হয়, তা হলে তা গ্রহণযোগ্য আর আনুগত্য অর্জনের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যা হতে পারে। আইনপ্রণেতারা একগুচ্ছ আইনের মধ্যেই দুই রকমের প্রথার মিশেল ঘটিয়ে বিভ্রান্ত করলেন। একটু আগেই আমরা সে বিষয়ে আলোচনা করেছি। একদিকে সেসব বচন যা সাধারণ জীবনের ফলাফল হিসেবে নৈতিকতা আর সামাজিক ঐক্যের প্রতিনিধিত্ব করে। অপরদিকে সেইসব আদেশ যার অর্থ হলো বৈষম্যের বাহ্যিক অস্তিত্ব নিশ্চিত করা। প্রথা সমাজের অস্তিত্বের জন্য অতি গুরুত্বপূর্ণ। শাসক শ্রেণী আইনের যে ব্যবহার আরোপ করেছে, এই প্রথা আইনের মধ্যে তা অতি চতুরতার সাথে সংমিশ্রণ করেছে। আইন ও প্রথা উভয়ের জন্যই সমান সম্মান দাবি করা হলো। আইন বলছে ‌‌’হত্যা কোরো না’‌‌, সেই সাথে এও যুক্ত হয় যে, ‘যাজকের প্রাপ্যের এক-দশমাংশ প্রদান কর’। এক আইনে বলা হচ্ছে ‘চুরি কোরো না’, আর সাথে সাথে এও বলা হচ্ছে ‘যে কর দিতে অস্বীকার করে তাকে গ্রেফতার করো’।

আই ন এ রকমই। এবং আইনের এই দ্বিমুখী চরিত্র আজকের দিনেও বহাল রয়েছে। এর উৎস হলো শাসক শ্রেণীর নিজস্ব ক্ষমতা লক্ষ্যে আরোপিত রীতিনীতিকে স্থায়ী ভিত্তি দেয়ার আকাঙ্ক্ষা। এর চরিত্র হলো সমাজের জন্য উপকারী প্রথার সুচারুরূপে মিশ্রণ,যে প্রথার সম্মান নিশ্চিত করার জন্য কোনো আইনের প্রয়োজন হয় না। অন্যান্য প্রথা যা কেবল শাসক শ্রেণীর জন্যই উপকারী এবং সাধারণ জনগণের জন্য ক্ষতিকর তা  মেনে চলা হয় কেবল শাস্তি পাওয়ার ভয়ে।

প্রতারণা ও সহিংসতার আর শাসকের ছত্রছায়ায় মাধ্যমে সৃষ্ট ব্যক্তিগত সম্পদের মতো আইনের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধার কোনো কারণ নেই। সহিংসতা ও কুসংস্কার থেকে জন্ম এবং ভোক্তা যাজক ও ধনী শাসকের স্বার্থে প্রণীত আইন, যেদিন জনগণ শৃঙ্খল ভেঙে বের হয়ে আসার ইচ্ছা করবে সেদিনই তাকে সম্পূর্ণ ধ্বংস করা যাবে।

পরবর্তী অধ্যায়ে আমরা বিশ্লেষণ করেছি আইনের দূরবর্তী বিকাশের কারণ যার সাথে সম্পৃক্ত রয়েছে ধর্ম, শাসন ও বিদ্যমান সংসদীয় ব্যবস্থা। সেখানে এই বিষয়ে বেশি নিশ্চিত হবো।

অধ্যায় তিন

আমরা আগের অধ্যায়ে দেখেছি যে, প্রতিষ্ঠিত ব্যবহার ও প্রথার মধ্যে কীভাবে আইনের উৎপত্তি হয়েছে। আর কীভাবে প্রথম থেকেই তা সামাজিক অভ্যাসের সুদক্ষ সংমিশ্রণের প্রতিনিধিত্ব করেছে। এখানে দুই ধরনের অভ্যাস মিশিয়ে ফেলা হয়। একদিকে সেই সব অভ্যাস যা মানবজাতির টিকে থাকার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। আরেক দিকে সেইসব প্রথা যা  জনপ্রিয় কুসংস্কার একই সঙ্গে শক্তিশালীদের অধিকার ও সুবিধার স্বার্থে  ব্যবহৃত হয়। আইনের এই দ্বৈত চরিত্রই পরবর্তীকালে তার রাজনৈতিক সংগঠনের বিকাশকে নির্ধারণ করেছে। সময়ের পরিক্রমায় আইনের মধ্যে খোদিত সামাজিক প্রথার প্রাণকেন্দ্র সামান্য ও ক্রমপরিমার্জিত হয়েছে। অপরদিকে অন্য অংশটি আধিপত্যকারী শ্রেণীর স্বার্থে আর তাদের হাতে অধীনস্থদের দাবিয়ে রাখতে ব্যাপকভাবে বিকশিত করা হয়েছে। সময় সময় এই আধিপত্যবাদী শ্রেণী এমন কিছু আইনের সুযোগ নিয়েছে যা উত্তরাধিকার-বঞ্চিতদের কিছু নিশ্চয়তা দিয়েছে বা দেয়ার ভান করেছে। কিন্তু তখন এ ধরনের আইন পূর্বের আইন রদ করে। এবং শাসক শ্রেণীর সুবিধার জন্যই এই নতুন আইন প্রণয়ন করা হয়। বাকলের মতে,‘সর্বশ্রেষ্ঠ আইন হলো সেটাই যা আগের আইন রদ করে’। কিন্তু মানুষকে শেকল পরিয়ে রাখে যেসব মৌলিক আইন সেগুলোর কোনো একটা বাতিল করার প্রশ্ন যতবার আসে ততবার কী ভয়ঙ্কর প্রয়াসের প্রয়োজন পড়ে, কত রক্তের স্রোতধারা বয়ে যায়। রাজদরবারের ক্ষমতা চূর্ণ করতে, সামন্ত অধিকার আর ভূমিদাসত্বের বিলুপ্তি ঘটাতে ফ্রান্সকে চার বছরের বিপ্লব ও ২০ বছরব্যাপী যুদ্ধ পরিচালনা করতে হয়েছে। অতীতের হাতে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া অন্যায় আইনের সামান্যতম রদ করতে প্রয়োজন পড়ে যুগ যুগ ধরে সংঘাত। তার পরও তা সামান্যই উধাও হয়, কেবল বিপ্লব চলাকালেই এর ব্যতিক্রম।

সমাজতন্ত্রীরা পুঁজির উৎপত্তি সম্পর্কে অনেকবার বলেছেন। তারা দেখিয়েছেন, যুদ্ধ ও লুণ্ঠন, দাসত্ব ও ভূমি দাসত্ব, আধুনিক জোচ্চুরি ও শোষণের দ্বারা কীভাবে পুঁজির জন্ম হয়েছে। তারা এও দেখিয়েছেন যে, শ্রমিকের রক্তে কীভাবে তা পুষ্টি লাভ করেছে এবং কীভাবে একটু একটু করে তা সারা পৃথিবীকে জয় করেছে। আইনের উৎপত্তি আর বিকাশ নিয়ে এই একই গল্প এখনো বলা বাকী আছে। যথারীতি, সাধারণের বুদ্ধিবৃত্তি বই পড়ুয়া মানুষকে টেক্কা দিয়ে দিয়েছে। এই ইতিহাসের দর্শন সে ইতোমধ্যেই জোড়া দিয়ে ফেলেছে, এখন সে ব্যস্ত এর প্রামাণিক বৈশিষ্ট্যগুলো জায়গামতো বসানোর কাজে।

পুঁজি আর আইন হলো ভাই আর বোন। লুণ্ঠন, দাসত্ব আর শোষণের ফলাফলের নিশ্চয়তা দিতে আইন পুঁজির মতো একই বিকাশের ধারা মেনে চলে। তারা একে অপরের হাত ধরে এগিয়েছে। মানুষের দুঃখ দুর্দশাতে ফায়দা লুটে একে অপরকে টিকিয়ে রেখেছে। ইউরোপের প্রত্যেক দেশে তারা প্রায় অভিন্ন। পার্থক্য কেবল বর্ণনায় কিন্তু মূল ঘটনা একই। জার্মানি বা ফ্রান্সে আইনের বিকাশ পরখ করলেই অন্যান্য ইউরোপীয় দেশগুলোর অবস্থা বোঝা যাবে।

প্রথম দৃষ্টান্তে আইন ছিল জাতীয় অংশ বা চুক্তি। এই ধরনের চুক্তি হয়েছিল চ্যামস ডি মারস ও লিজিয়নের মধ্যে। একই কালের এক ধ্বংসাবশেষ এমনকি এখনো প্রাচীন সুইস ক্যান্টনে (ফিল্ড অব মে) সংরক্ষিত আছে যদিও তার উপরে কেন্দ্রীভূত আর মধ্যবিত্ত শ্রেণীর নাক গলানোর ছাপ পড়েছে।

এটা সত্য যে, এই চুক্তি সব সময় স্বাধীনভাবে গৃহীত হয়নি। এমনকি ঐ প্রাথমিককালেও ধনী ও শক্তিশালীরা অন্যদের উপরে তাদের ইচ্ছা চাপিয়ে দিত। কিন্তু সকল ঘটনাতেই সাধারণ মানুষ দ্বারা তাদের দখলদারিত্বে বাধার সম্মুথীন হতে হতো। জনগণ বিপরীতে তাদেরকে তার শক্তি-সামর্থ্য বুঝিয়ে দিত।

কিন্তু একদিকে চার্চ আর অন্যদিকে অভিজাতরা জনগণকে ক্রীতদাসে পরিণত করে দমিয়ে রাখতে সক্ষম হতো।

ফলে আইন প্রণয়নের অধিকার জাতির কাছ থেকে হাতছাড়া হয়ে তা চলে যায় সুবিধাভোগীদের কাছে। নিজের কোষাগারে সম্পদ কুক্ষিগত করে, চার্চ তার শাসন আরো সম্প্রসারণ করে। সে ক্রমাগত ব্যক্তিগত জীবনে আরো বেশি হস্তক্ষেপ করা শুরু করে এবং আত্মার পরিত্রাণের কথা বলে তার ভূমিদাসদের শ্রম কব্জা করতে থাকে, সকল শ্রেণীর কাছ থেকে কর আদায় করে, বাড়িয়েছে তার আইনি এক্তিয়ার, শাস্তির মাত্রা বহুগুণ বাড়িয়েছে। যত অপরাধ সংঘটিত হয়েছে তার বহুগুণ বেশি নিজের ঝুলি ভারি করেছে, সব ক্ষতিপূরণ তো জমা হতো তারই কোষাগারে। জাতির স্বার্থের সাথে আইনের আর কোনো সম্পর্ক নেই। ফরাসি আইনের এক ইতিহাসবিদ বলেছেন,’‌‌আইনগুলো দেখলে মনে হয়, এগুলো আইনবিদদের হাতে নয়, বরং একদল ধর্মীয় উগ্রবাদীর হাতে তৈরী হয়েছে’।

সেই সময়েই যেহেতু ব্যারনরা একইভাবে জমিতে মজুরদের উপর আর শহরগুলোতে কারিগরদের উপর তাদের শাসনক্ষমতা বৃদ্ধি করেছে, সেহেতু এই ব্যারনরাও হয়ে উঠেছে আইনপ্রণেতা ও বিচারক। একাদশ শতাব্দী থেকে শুরু হয়ে আসা জাতীয় আইনের কিছু অবশেষ নিছক সেবা নিয়ন্ত্রণের চুক্তি, শ্রমচুক্তি এবং দাস ও সামন্তদের তাদের মালিকদের বকেয়া নজরানা পরিশোধের শর্তাবলী। সে সময়ের আইনজ্ঞরা ছিলেন মূলত মুষ্টিমেয় কিছু লুটেরা যারা সংগঠিত হয়েছিল কৃষিতে নিযুক্ত হয়ে দিন দিন আরো শান্তিকামী হয়ে উঠতে থাকা মানুষগুলোকে রাহাজানি করবার উদ্দেশ্যে। এইসব দস্যু মানুষের সহজাত ন্যায়বিচারের অনুভূতিকে নিজ স্বার্থে ব্যবহার করেছে। নিজেদের এই ন্যায়বিচারের প্রশাসক হিসেবে জাহির করেছে। মৌলিক নীতিমালার আলোকে তাদের নিজেদের জন্য একটা আয়ের ব্যবস্থা করে নিজেদের আধিপত্য বজায় রাখতে আইনের মিথ্যা কাহিনী সাজিয়েছে।

পরবর্তীকালে আইনবিশেষজ্ঞরা এইসব আইন সংগ্রহ করে শ্রেণীবিন্যাস করেছেন, যা আধুনিক আইনের ভিত্তি। আমরা কি ব্যারন আর যাজকদের ঐতিহ্য বহনকারী এইসব আইনশাস্ত্রের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করবো?

প্রথম বিপ্লব ছিল শহর এলাকার বিদ্রোহ। এই বিপ্লব এইসব আইনের কিছু অংশ মাত্র বিলুপ্ত করতে সক্ষম হয়েছিল। নাগরিক অধিকার সম্বলিত শহরগুলোর চার্টারের অধিকাংশই ছিল ব্যারন ও বিশপশাসিত আইনের সাথে আপোস আর পৌরসভা থাকা নগরগুলোর মধ্যে তৈরি হওয়া নতুন সম্পর্ক। কিন্তু এই আইনগুলোর সাথে আমাদের সময়ের আইনের কী ব্যাপক পার্থক্য! রাষ্ট্রের কারণে নগর একা একা কাউকে শাস্তি ও ফাঁসি দিতে পারতো না। কিন্তু নগরের শত্রুদের সাথে ষড়যন্ত্রকারী যে কাউকে নগর থেকে বহিষ্কার করতে পারতো এবং তাদের বাড়িঘর ধুলায় মিশিয়ে দিতে পারতো। তথাকথিত ‘লঘু ও গুরু অপরাধ’-এর শাস্তি অর্থদণ্ডর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকতো। ত্রয়োদশ শতকের নগরগুলোতে যে ন্যায়ের নীতিমালা মানা হতো তাও আজকের যুগ ভুলে গেছে। সে সময় কোনো একজন ব্যক্তির অপকর্মের দায় ঐ জনগোষ্ঠীর সকলে বহন করতো। সে সময় সমাজে অপরাধকে দুর্ঘটনা হিসেবে দেখা হতো, এখন যে ধারণা রাশিয়ার কৃষক সমাজে দেখা যায়। তাই তারা বাইবেলে প্রচার করা ব্যক্তিগত প্রতিশোধের নীতিকে গ্রহণ করতো না। বরং উল্টো প্রত্যেকটি অপকর্মকে সমগ্র সমাজের বলে গণ্য করা হতো। এর পেছনে ছিল বাইজেনটাইন গির্জার প্রভাব। এরা পাশ্চাত্যের স্বৈরতন্ত্রের পরিমার্জিত নিষ্ঠুরতা পশ্চিমে আমদানি করেছিল। ফরাসি ও জার্মানদের মধ্যে শাস্তি হিসেবে মৃত্যুদণ্ড প্রবর্তন করা হলো এবং অপরাধী হিসেবে চিহ্নিতদের জন্য ভয়ঙ্কর শাস্তির ব্যবস্থা হলো। ঠিক একইভাবে ভূমিতে পরম সম্পত্তি মালিকানার ধারণা প্রবর্তন করে আদিম মানুষের সাম্যতান্ত্রিক প্রথা ছুঁড়ে ফেলতে রাজকীয় রোমের দুর্নীতির হাতে তৈরি রোমান আইনের সকল প্রভাব কাজে লাগাতে হয়েছিল।

আমরা জানি স্বাধীন নগরগুলো তাদের নিজস্বতা বজায় রাখতে পারেনি। ধনী ও দরিদ্র, নাগরিক ও ভূমিদাসদের মধ্যে বিবাদে ছিন্নভিন্ন হয়ে তারা রাজন্যবর্গের সহজ শিকারে পরিণত হয়েছে। রাজন্যবর্গ যত শক্তিশালী হয়েছে, আইন প্রণয়নের ক্ষমতা তত কুক্ষিগত হয়েছে দরবারের ষড়যন্ত্রকারীদের হাতে। রাজার দাবিকৃত কর আদায়ের জন্যই কেবল জাতির কাছে আবেদন করা হয়েছে। সংসদ দুই শতকের বিরতির সমন জারি করলো। আর তা করা হলো আদালত,‘‌বিশেষ ব্যক্তিদের’, অ্যাসেম্বলিস অব নোটাবেলস আর মন্ত্রীদের মর্জি অনুযায়ী। রাজার প্রজাদের নালিশ শোনার সামান্যই অবসর ছিল। অথচ এরাই ছিলেন ফ্রান্সের আইনপ্রণেতা। পরবর্তীকালে যখন সকল ক্ষমতা এমন এক এক ব্যক্তির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, যিনি বলতে পারেন ‘আমিই রাষ্ট্র’, তখন ‘রাজন্যের গোপন পরিষদে’ কোনো মন্ত্রীর বা নির্বোধ রাজার হুজুগে অধ্যাদেশ জারি হতে থাকে। মৃত্যুর মতো যন্ত্রণা নিয়ে সেই সব আইন মানা ছাড়া প্রজাদের কিছু করার ছিল না। সকল প্রকার আইনগত নিশ্চয়তা ধ্বংস হয়ে যায়, পুরো জাতি রাজপরিবার ও তার মুষ্টিমেয় রাজন্যবর্গের হাতে ভূমিদাস হয়ে যায়। সেইকালে সবচেয়ে ভয়ঙ্কর শাস্তির বিধানগুলো আমাদের কল্পনাকেও ছাড়িয়ে যায়— শূলে চড়ানো, জীবন্ত পুড়িয়ে মারা, যত রকমের নির্যাতন কল্পনা করা সম্ভব তার সবই মানসিকভাবে অসুস্থ যাজক আর উন্মাদেরা আবিষ্কার করেছিল। শাস্তি পাওয়া অপরাধীদের যন্ত্রণা দেখাতেই ছিল তাদের আনন্দ।

মহান বিপ্লব আমাদের উপর রাজতন্ত্র ও সামন্ততন্ত্রের চাপিয়ে দেওয়া আইনের এই কাঠামো উচ্ছেদ শুরু করেছিল। কিন্তু আইনের আদি ধ্বংসাবশেষের কিছু অংশ নিশ্চিহ্ন করার পর, বিপ্লব আইন প্রণয়নের ক্ষমতা তুলে দেয় বুর্জোয়াদের হাতে। এই বুর্জোয়ারা আইনের এক সম্পূর্ণ নতুন কাঠামো তৈরি করতে শুরু করে। যার উদ্দেশ্য ছিল জনসাধারণের উপর মধ্যবিত্তের আধিপত্য স্থায়ী করা। তাদের সংসদ চতুর্দিকে আইন প্রণয়ন করতে থাকে এবং ভয়ঙ্কর দ্রুততার সাথে আইনের পাহাড় গড়ে তোলে। কিন্তু এই সকল আইনের মূল উদ্দেশ্য কী ছিল?

অধিকাংশ আইনের একমাত্র  উদ্দেশ্য  ছিল ব্যক্তিগত সম্পত্তির সুরক্ষা। যার অর্থ হলো একজন আরেকজনকে শোষণের মাধ্যমে জমানো সম্পদের সুরক্ষা। তাদের উদ্দেশ্যই হলো শোষণের মাধ্যমে পুঁজির জন্য নতুন নতুন ক্ষেত্র উন্মোচন করা। আরেক উদ্দেশ্য হলো, নতুন ধরনের উদ্যোগের অনুমোদন দেওয়া যাতে শোষণ অব্যাহত থাকে। পুঁজি একদিকে মানুষের কার্যকলাপে নতুন মাত্রা যুক্ত করে যেমন রেলওয়ে, টেলিগ্রাফ, ইলেক্ট্রকি বাতি, রাসায়নিক শিল্প কারখানা, সাহিত্য ও বিজ্ঞানে মানুষের চিন্তার প্রকাশ ইত্যাদি। বাকি সব আইনের উদ্দেশ্যও মূলত একই। তারা টিকে রয়েছে সরকারি ব্যবস্থাকে সচল রাখার জন্য। যার অর্থ হলো পুঁজির নিরাপত্তা বিধান যা শোষণ ও একমালিকানা সম্পদ তৈরির মাধ্যমে অর্জিত হয়। ম্যাজিট্রেসি, পুলিশ, সামরিক বাহিনী, সরকারি নির্দেশনা, অর্থ ব্যবস্থাপনা, সবকিছুই এক দেবতার সেবায় নিয়োজিত, আর সেই দেবতার নাম হলো পুঁজি। এদের সবার একটাই উদ্দেশ্য—পুঁজিপতিদের শ্রমিকের উপর শোষণের ব্যবস্থা করা। গত আশি বছরের আইন বিশ্লেষণ করলে আপনি এর বেশি কিছু পাবেন না। ব্যক্তিকে সুরক্ষা যা আইনের সত্যিকার উদ্দেশ্য হিসেবে দেখানো হয়েছে, কিন্তু আইনে তার অবস্থান যৎকিঞ্চিৎ। কারণ বর্তমান সমাজে কেবল ঘৃণা ও হিংস্রতার জন্য কোনো ব্যক্তিকে লাঞ্ছনা করার প্রবণতা কমে আসছে। এখন কেউ যদি খুন হয় তবে তা সাধারণত ডাকাতি করার জন্য— খুব কম ক্ষেত্রেই দেখা গেছে ব্যক্তিগত প্রতিহিংসার কারণে তা হয়েছে। যদি এই শ্রেণীর লঘু ও গুরু অপরাধ কমতেই থাকে তা হলে আমরা নিশ্চিতভাবেই বলতে পারি এটি আইন পরিবর্তনের কারণে ঘটেনি বরং আমাদের সমাজে মানবিকতার বিকাশ এবং ক্রমাগত বিকশিত সামাজিক অভ্যাসের কারণেই তা সম্ভব হয়েছে। ব্যক্তি রক্ষার জন্য সকল আইন আগামি দিন বাতিল করে দিন, তা হলেও ব্যক্তিগত প্রতিহিংসা বা নিষ্ঠুরতার ঘটনা একটাও বাড়বে না।

সম্ভবত পাল্টা যুক্তি তোলা হবে যে, বিগত পঞ্চাশ বছরে অনেক ভালো উদারনৈতিক আইন জারি হয়েছে। কিন্তু যদি এইসব উদারনৈতিক আইন বিশ্লেষণ করা যায়, আমরা দেখতে পাব যে, প্রণীত এসব আইন বিগত শতকের বর্বরতার ফল হিসেবে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া আইনগুলোর প্রত্যাহার করা ছাড়া আর কিছু নয়। প্রতিটি উদারনৈতিক আইন, প্রতিটি র‌্যাডিকেল কর্মসূচীকে এভাবে সারসংক্ষেপ করা যেতে পারে, সেসব আইন মধ্যবিত্ত শ্রেণীর ভোগান্তির কারণ হয়েছে তা বাতিল করা এবং ত্রয়োদশ শতকের নগরকেন্দ্রিক সকল নাগরিক, যে স্বাধীনতা ভোগ করতো তা আবার সম্প্রসারিতভাবে ফেরত আনা। মৃত্যুদণ্ড রোহিতকরণ, জুরির মাধ্যমে সকল ‘অপরাধের’ বিচার (বর্তমানের তুলনায় ত্রয়োদশ শতকে জুরিরা বেশি উদার ছিলেন), ম্যাজিট্রেট নির্বাচন, সরকারি কর্মকর্তাদের বিচারের অধীনে আনা, স্থায়ী সামরিক বাহিনীর বিলুপ্তি, যখন তখন আদেশ ইত্যাদি যা কিছু আধুনিক উদারতাবাদের আবিষ্কার বলে চিহ্নিত করা হয় তা আসলে রাজা ও চার্চ মানুষের জীবনের সকল ক্ষেত্রে হস্তক্ষেপ করার পূর্বে যে স্বাধীনতা ছিল, সেই অবস্থায় ফিরে যাওয়া ছাড়া আর কিছু নয়। তাই রাজা ও চার্চ করেছিল।

তাই দেখা যাচ্ছে, সম্পত্তি আইনের মাধ্যমে প্রত্যক্ষভাবে এবং পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার রক্ষণাবেক্ষণের মাধ্যমে শোষণকে রক্ষা করা হলো আমাদের আধুনিক আইনের সারবস্তু ও তার নৈতিক অবস্থান। আর এই ব্যবস্থা টিকিয়ে রাখা হলো আমাদের ব্যয়বহুল এই আইনি কাঠামোর একটা কাজ। কিন্তু এখন সময় এসেছে, এইসব আপ্তবাক্যে সন্তুষ্ট না থেকে আইনের প্রকৃত মর্মার্থ উপলব্ধি করতে শেখা। আইন প্রাথমিক অবস্থায় নিজেকে হাজির করেছিল, সমাজ টিকিয়ে রাখার জন্য প্রয়োজনীয় প্রথা হিসেবে। এই আইন বর্তমানে শোষণ টিকিয়ে রাখার হাতিয়ার এবং অলস ধনীদের দ্বারা মেহনতি মানুষের উপর আধিপত্য বিস্তারের পন্থা হিসেবে পরিগণিত হয়েছে। বর্তমান সময়ে মানুষকে সভ্য করার যে মিশন আইন দেখাতো তা এখন শূন্য, এখন তার একটাই উদ্দেশ্য, আর তা হলো শোষণকে মদদ দেয়া।

আইনের ক্রমবিকাশ সম্পর্কে ইতিহাস আমাদের এই কথাই বলে।এই ইতিহাসের কথা বলেই কি আমাদের আইনকে শ্রদ্ধা করতে বলা হয়? তাকে কি শ্রদ্ধা করা যায়? অবশ্যই না। যে পুঁজি লুণ্ঠনের ফসল, আইন সেই পুঁজির চাইতে বেশি শ্রদ্ধা পাওয়ার যোগ্য নয়। উনবিংশ শতাব্দীর বিপ্লবীদের প্রথম দায়িত্ব হবে বিদ্যমান সকল আইনের বহ্ন্যুৎসব করা, সেই আগুনে সম্পত্তির সকল মালিকানাকেও জ্বালিয়ে ছাই করতে হবে।

অধ্যায় চার

মানবতাকে নিয়ন্ত্রণের জন্য রয়েছে লক্ষ লক্ষ আইন। এ সকল আইন পুঙ্খানুপুঙ্খ বিচার করলে তিনটি প্রধান শ্রেণীতে ভাগ করা যেতে পারে—সম্পত্তির সুরক্ষা, ব্যক্তির সুরক্ষা এবং সরকারের সুরক্ষা। এই তিন শ্রেণীর আইনকে বিশ্লেষণ করে এই যৌক্তিক ও অপরিহার্য সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারি যে, আইন হলো অকার্যকর ও ক্ষতিকর।

সমাজবিজ্ঞানীরা জানেন, সম্পত্তি সুরক্ষা বলতে কী বোঝায়। সমাজ কিংবা ব্যক্তি সম্পত্তি সংক্রান্ত আইন নিজ শ্রমে উৎপন্ন পণ্য ভোগের নিশ্চয়তা দেয় না। উল্টো এগুলো প্রণীত হয়েছে উৎপাদকের কাছ থেকে জোর করে তার সম্পত্তির আংশিক হরণ করার জন্য। আর সার্বিকভাবে সমাজ বা উৎপাদকের কাছ থেকে সম্পদ যারা চুরি করে তাদের সুরক্ষা দেয়ার জন্য। ধরা যাক, আইন কোনো একজনের একটা বাড়ির উপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করেছে। সেই অধিকার কিন্তু নিজের তৈরি করা বা তার কোনো বন্ধুর সহায়তায় তার নিজের জন্য তৈরি করা বাড়ির উপর অধিকার প্রতিষ্ঠার কথা বলা হচ্ছে না। এই ক্ষেত্রে কেউ তার অধিকার নিয়ে কোনো বিরোধ করবে না। বিপরীতক্রমে আইন সেই বাড়ির উপর তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে যেটা তার নিজ শ্রমের ফসল নয়। প্রথমত এর কারণ এই যে সে এই বাড়ি নিজের জন্য তৈরি করেছে অন্যদের দিয়ে যাদেও শ্রমের পূর্ণ মূল্য সে দেয়নি। আর তার পরের কারণ হলো এই যে, বাড়িটার একটা সামাজিক মূল্য আছে, যা তার পক্ষে একা তৈরি করা সম্ভব নয়। আইন সেই জিনিসের উপর তার অধিকার প্রতিষ্ঠা করে যেটা সাধারণভাবে সকলের, কিন্তু বিশেষভাবে কারো নয়। একই বাড়ি সাইবেরিয়ায় নির্মাণ করা হলে তার দাম বড় শহরে নির্মিত বাড়ির সমান হবে না। বড় শহরে এর মূল্য বাড়ে কেন? কারণ এই শহরটা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মানুষের শ্রমের বিনিময়ে তৈরি হয়েছে, তারা এর সৌন্দর্য বৃদ্ধি করেছে, পানি ও গ্যাসের সরবরাহ এনেছে, কলেজ থিয়েটার, দোকানপাট, রেলপথ ও রাস্তাঘাট তৈরি করেছে। এভাবে প্যারিস, লন্ডন কিংবা রুই শহরে কোনো একটা বাড়ির উপর কোনো নির্দিষ্ট একজনের অধিকার প্রতিষ্ঠার অর্থ হলো অন্যায়ভাবে সাধারণভাবে মানবজাতির শ্রমে উৎপন্নের একটা নির্দিষ্ট অংশকে ঐ মানুষকে আত্মসাৎ করতে দেয়া। ঠিক এই আত্মসাতের কারণে এই ধরনের সকল সম্পত্তি অর্জন এক জঘন্য অন্যায়। মানুষের মাঝের ন্যায্যতা আর শুভ বোধকে ঠেকিয়ে এই অন্যায় বজায় রাখতে তাই দরকার হয় অসংখ্য আইন, সেনাবাহিনী, পুলিশ আর বিচারক।

আর্টওয়ার্ক: রিপ্রেজেন্টেটিভ
শিল্পী: এঞ্জেল বলিগান
সূত্র: পলিটিক্যাল কার্টুন

প্রতিটি দেশে এভাবেই আমাদের অর্ধেক আইন, সিভিল কোডের উদ্দেশ্য আর কিছু নয়, কেবল এই আত্মসাৎকে টিকিয়ে রাখা, সমগ্র মানবজাতির বিরুদ্ধে অল্প কিছু ব্যক্তির লাভের জন্য এই একমালিকানা জারি রাখা। আদালতের তিন-চতুর্থাংশ মামলার বিষয় আর কিছু নয় বরং দুই একমালিকানাবাদীর ঝগড়া, লুটের মাল নিয়ে দুই ডাকাতের কোন্দল। এবং আমাদের অধিকাংশ ফৌজদারি আইনের একই উদ্দেশ্য—শ্রমজীবীদের মালিকের অধীনস্থ করা এবং শোষণের নিরাপত্তা দেয়া।

উৎপাদকের শ্রমের উৎপন্নের নিরাপত্তা দেয়ার জন্য কোনো আইন নেই। এমনকি তা পাবার ন্যূনতম চেষ্টা করা যাবে সেরকম কোনো আইনও নেই। এটা এতই স্বাভাবিক ও সরল যে, মানবজাতির অভ্যাস ও প্রথার সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যে আইন তা নিয়ে ভাবারই দরকার মনে করে না। তলোয়ার নিয়ে লুণ্ঠন, লুটতরাজ আমাদের যুগে আর নেই। এমনকি এখন একজন শ্রমিক তার উৎপাদিত পণ্য নিয়ে আরেকজনের সাথে বিরোধ করে না। যদি তাদের মাঝে কোনো ভুল বোঝাবুঝি তৈরি হয় তবে তারা আইনের দ্বারস্থ না হয়ে তা সমাধানের জন্য তৃতীয়পক্ষকে ডাকে। মালিক হলো একমাত্র সেই যে অন্যের উৎপন্ন হজম করে, যিনি উড়ে এসে সিংহভাগটাই নিয়ে নেন। সাধারণভাবে মানবতা বিশেষ কোনো আইনের মধ্যস্থতা বাদেই সর্বত্র প্রত্যেকে তার সৃষ্টির উপর অধিকারকে শ্রদ্ধা করে।

সম্পত্তি সংক্রান্ত সকল আইন একত্রে ঢাউস আকারের বহু খণ্ড বই হবে। এগুলো আমাদের আইনজীবীদের আনন্দের উৎস। এসব আইনের একটাই উদ্দেশ্য। আর তা হলো নির্দিষ্ট কিছু একমালিকানাওয়ালার হাতে মানব শ্রমের অন্যায্য আত্মসাৎকে রক্ষা করা। এসব আইনের টিকে থাকার কোনো যুক্তি নেই। আর তাই বিপ্লবের দিন সমাজ বিপ্লবীরা এগুলোর অবশেষ ঘটাতে বদ্ধপরিকর। তথাকথিত ‘সম্পত্তির অধিকার’ বিষয়ক সকল আইন, সকল মালিকানার দলিল, সকল রেজিস্টার পুড়িয়ে বহ্ন্যুৎসব হলে তা হবে সত্যিকারের ন্যায়বিচার। এইসব শীঘ্রই বিগতকালের ভূমিদাসত্ব আর দাসপ্রথার মতো মানবতার ইতিহাসে কলঙ্ক হিসেবে বিবেচিত হবে।

সম্পত্তি সম্পর্কিত আইন বিষয়ে এখন যা বলা হলো তা দ্বিতীয় শ্রেণীভুক্ত আইন, মানে সরকার রক্ষণাবেক্ষণ তথা সাংবিধানিক আইন সম্পর্কেও সমানভাবে প্রযোজ্য।

আবারও সেই একগাদা আইন, ডিগ্রি, অর্ডিনেন্স, কাউন্সিলের অর্ডার আরো কত কিছু, সব দিয়ে রক্ষা করা হচ্ছে বিভিন্ন রকমের অর্পণ করা বা জবরদখল করা প্রতিনিধিত্বশীল সরকারকে, যার তলে চাপা পড়ে মানবতা আর্তনাদ করে। আমরা ভালোভাবেই জানি যে, অ্যানার্কিস্টরা বিভিন্ন ধরনের সরকার নিয়ে তাদের নিরন্তর সমালোচনায় যথেষ্ট দেখিয়েছেন যে রাজতান্ত্রিক, সাংবিধানিক বা রিপাবলিকান, সবারই উদ্দেশ্য হলো জবরদস্তি করে সুবিধা বজায় রাখা শ্রেণী, অভিজাততন্ত্র, যাজকতন্ত্র ও ব্যবসায়ীদের রক্ষা করা। আমাদের আইনের এক উল্লেখযোগ্য অংশ জুড়ে রয়েছে কর, আবগারি শুল্ক, মন্ত্রণালয়ের অধিদপ্তর, সেনাবাহিনী, পুলিশ, চার্চ ইত্যাদি। প্রতি শতাব্দীতেই পাওয়া যাবে এ সংক্রান্ত হাজার হাজার আইন। এসব আইনের উদ্দেশ্যই হলো প্রশাসনিক যন্ত্রকে চালু রাখা, তার দুর্বলতা সারানো ও তার বিকাশ ঘটানো। আর এই যন্ত্র প্রায় সম্পূর্ণরূপে মালিক শ্রেণীর স্বার্থ রক্ষা করে। এসব আইন বিশ্লেষণ করে দিনের পর দিন এসব আইনের প্রয়োগ দেখে আপনি বুঝতে পারবেন এর কোনোটাই টিকিয়ে রাখার যোগ্য নয়।

এ ধরনের আইনের ক্ষেত্রে দ্বিতীয় কোনো মতের অবকাশ নেই। কেবল অ্যানার্কিস্টরাই নন, কম-বেশি সব বিপ্লবী র‌্যাডিকেলরাও একমত যে, সরকার সংগঠন সংক্রান্ত সকল আইন একটাই কাজে লাগতে পারে, আর তা হলো এগুলোকে আগুনে ছুঁড়ে ফেলা।

তৃতীয় আরেক ধরনের আইন সম্পর্কে এখন আলোকপাত করা  বাকি আছে। এ আইনগুলো ব্যক্তির সুরক্ষা, আর ‘অপরাধ’ শনাক্তকরণ ও তা রোধ সংক্রান্ত আইন। এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এর সাথে আমাদের সবচেয়ে বেশি পূর্বসংস্কার জড়িয়ে রয়েছে। কারণ আইন যদি কোনো বিশেষ বিবেচনায় গুরুত্ব পায় তবে তা হলো এই যে, এই শ্রেণীভুক্ত আইন আমাদের সমাজের নিরাপত্তা বজায় রাখতে একেবারে অপরিহার্য। এই ধরনের আইন মানব সম্প্রদায়ের জন্য প্রয়োজনীয় সামাজিক প্রথার কেন্দ্র থেকে বিকশিত হয়েছে। এগুলোর মাধ্যমে শাসকেরা তাদের নিজ আধিপত্যকে মহিমান্বিত করার সুযোগ পায়। গোত্রপ্রধান, নগরের ধনী পরিবার, কিংবা রাজার কর্তৃত্ব টিকে ছিল তাদের বিচারসংক্রান্ত কার্যক্রমের ওপর। এমনকি বর্তমান সময়েও সরকারের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে কথা হলে এর সর্বোচ্চ বিচারক হিসেবে ভূমিকার কথাই আসে। ‘সরকার ছাড়া মানুষ একে অপরকে কেটে টুকরো টুকরো করে ফেলত’ গ্রাম্য বাক্যবাগিশদের এই যুক্তি। বার্ক বলেছিলেন,’সকল ধরনের সরকারের চূড়ান্ত লক্ষ্য হলো প্রতিটি অভিযুক্ত ব্যক্তির জন্য বারো জন সৎ বিচারক নিশ্চিত করা’।

এই বিষয়ে যত পূর্বসংস্কারই থাকুক না কেন, এখনই অ্যানার্কিস্টদের এই কথা দৃঢ়ভাবে ঘোষণা করার যথার্থ সময় যে, এই ধরনের আইন আগের আইনগুলোর মতোই বেহুদা ও ক্ষতিকর।

সর্বপ্রথম কথা, তথাকথিত ‘অপরাধ’— ব্যক্তির উপর হামলার ক্ষেত্রে এ কথা সুবিদিত যে, এ ধরনের ‘অপরাধের’ দুই-তৃতীয়াংশ এবং ক্ষেত্রবিশেষে তিন-চতুর্থাংশের প্ররোচনা আসে অন্য কারো সম্পদ দখলের জন্য। এই ধরনের তথাকথিত ‘লঘু ও গুরুতর অপরাধ’-এর বিশাল অংশটাই উধাও হয়ে যাবে যেদিন ব্যক্তিগত সম্পত্তির বিলোপ হবে। বলা হতে পারে যে, ‘কিন্তু সব সময়ই বর্বর লোকেরা থাকবে যাদের নিবৃত্ত করার জন্য আইন ও শাস্তির ব্যবস্থা না থাকলে তারা সহনাগরিকের জান নিতে চাইবে, প্রতিটি গন্ডগোলেই হাতে ছুরি তুলে নেবে, এবং সামান্য দোষেই খুন করে বদলা নেবে’। সমাজের শাস্তি দেয়ার অধিকার নিয়ে যেদিন হতে প্রশ্ন তোলা হয়েছে সেদিন থেকেই এই জিগির তোলা হচ্ছে।

এ বিষয়ে একটা সত্য পুরোপুরি প্রতিষ্ঠিত হয়েছে যে, শাস্তির কঠোরতা অপরাধের পরিমাণ কমায় না। ইচ্ছে হলে এক-তৃতীয়াংশ খুনিকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে দিন, খুনির সংখ্যা একজনও কমবে না। অপরপক্ষে মৃত্যুদণ্ডর বিধান বিলুপ্ত করলে আজকের থেকে হত্যাকাণ্ড একটিও বাড়বে না; পরিমাণ কমে আসবে। পরিসংখ্যান তাই প্রমাণ করে। কিন্তু যদি ফসল উৎপাদন ভালো হয়, রুটি সস্তা হয় এবং আবহাওয়া ভালো থাকে তা হলে হত্যাকাণ্ডর পরিমাণও তৎক্ষণাৎ কমে যায়। এটাও পরিসংখ্যান দ্বারা প্রমাণিত। রসদের দাম আর আবহাওয়ার অবস্থার সমানুপাতে সব সময় অপরাধের পরিমাণের হ্রাসবৃদ্ধি ঘটে। ক্ষুধার কারণেই সকল হত্যাকাণ্ড ঘটে ব্যাপারটি এমনও নয়। যখন ফসলের উৎপাদন ভালো হয় এবং খাদ্যের মূল্য নাগালের মধ্যে থাকে; পর্যাপ্ত সূর্যের আলো থাকে তখন মানুষ সচরাচরের চাইতে উৎফুল্ল ও কম দুর্দশাগ্রস্ত থাকে। তখন সে বিষণ্ণ মনোভাবের সুযোগ দেয় না, তুচ্ছ ঘটনায় তার মতই কারো বুকে ছুরি চালিয়ে দেয় না।

তদুপরি এটাও সুবিদিত সত্য যে, শাস্তির ভয় কখনও একজন খুনিকেও আটকাতে পারেনি। প্রতিহিংসা বা দুঃখযন্ত্রণার বশবর্তী হয়ে যে তার প্রতিবেশীকে খুন করে, খুনের পরিণাম নিয়ে সে খুব মাথা ঘামায় না। আর এমন খুব কম হত্যাকারীই আছে যারা দৃঢ়ভাবে মনে করে না যে তাদের শাস্তি মওকুফ হওয়া উচিত।

আমাদের সেই সমাজের কথা বলতে হবে যেখানে মানুষ আরো ভালো শিক্ষা গ্রহণ করবে, তার সমস্ত ক্ষমতা বিকাশের আর তা অনুশীলনের সম্ভাবনা উন্মোচিত হবে যা তাকে এত আনন্দ এনে দেবে যে সে এগুলোকে আর বিমর্ষতার বিষে জর্জরিত করবে না। আমাদের ভবিষ্যৎ সমাজের কথা বলতে হবে, আর তা এমনকি আমাদের সমাজেই বড় শহরগুলোর সরাইখানায় দেখা যায় যে দুর্দশার বেদনাদায়ক চিত্র, তার মাঝেও বলতে হবে। এ হচ্ছে সেই ভবিষ্যৎ যেদিন হত্যাকারীদের কোনো শাস্তি প্রদান করা হবে না, তবু হত্যাকাণ্ডর সংখ্যা একটাও বাড়বে না বরং বিপরীতে এই সম্ভাবনাই বেশি যে, কারাগারে যেসব স্বভাব-অপরাধী নির্মমতার শিকার হয়, বর্তমানে তারা যে অপরাধ করে সেই সংখ্যা কমবে।

আইনের সুফল সম্পর্কে আমাদের প্রতিনিয়ত বলা হয়। শাস্তির ফলে যে সুফল পাওয়া যায় তার প্রভাব সম্পর্কেও ক্রমাগত বলা হয়। কিন্তু এইসব বক্তা কী আইন ও শাস্তির আরোপিত সুফল এবং শাস্তির কারণে মানবতার যে অবমাননাকর প্রভাব তার মধ্যে কোন সমন্বয় খোঁজার চেষ্টা করেছেন? ইতিপূর্বে আমাদের রাস্তা-ঘাটে যে সকল নৃশংস শাস্তি প্রদান করা হয়েছে তার ফলে মানবসমাজে যে খারাপ প্রবৃত্তির জন্ম নিয়েছে তা পরিমাপ করে দেখুন! মানুষই দুনিয়ায় হিংস্রতম প্রাণী। এমনকি বানরের মধ্যেও। অজানা অসংখ্য হিংস্র প্রবৃত্তিকে উস্কে দেয় রাজা, বিচারক, যাজক ছাড়া যারা আইনের অস্ত্রে সজ্জিত, যারা শরীরের মাংসকে টুকরো টুকরো করে, উত্তপ্ত আলকাতরা আহতের শরীরে ঢেলে দেয়, শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ ছিন্নভিন্ন করে, হাড় গুঁড়ো করে দেয়, মানুষকে ছিঁড়ে টুকরো করে নিজেদের কর্তৃত্ব টিকিয়ে রাখতে! কেবল হিসেব করুন, অপরাধীদের ব্যাপারে ‘গোপন খবর’ নামক জিনিসটার মাধ্যমে মানবসমাজের উপর দুরাচারের কী জোয়াল বইয়ে দেওয়া হয়েছে, যা বিচারকেরা সমর্থন করেছেন এবং সরকার যার জন্য নগদ অর্থ প্রদান করেছে, যা ঘটেছে ‘অপরাধ’ আবিষ্কারে সহায়তার উসিলায়। কেবল কারাগারগুলোতে যান এবং অনুসন্ধান করে দেখুন স্বাধীনতা থেকে বঞ্চিত হয়ে অন্য বঞ্চিতদের সঙ্গে আটকা পড়ে থাকলে মানুষ কী হয়ে যায়, তারা তখন অসৎ গুণ আর দুর্নীতির মধ্যে নিমজ্জিত হয় যা আমাদের বহাল কারাগারগুলোর দেয়াল থেকে চুইয়ে চুইয়ে পড়ে। কেবল এটা মনে করুন যে, যত এইসব কারাসংস্কার করা হয় তত তা ঘৃণিত হয়ে ওঠে। আমাদের আধুনিক আদর্শ অপরাধ সংশোধনাগারগুলো মধ্যযুগের মাটির নীচের অন্ধকার প্রকোষ্ঠের তুলনায় শতগুণ খারাপ। পরিশেষে বিবেচনা করুন, আইনের অন্যতম নির্যাস সেই আনুগত্যের, শাস্তি প্রদানের, শাসকদের শাস্তি প্রদানের অধিকারের, আমাদের বিবেক আর আমাদের বন্ধুদের মতের তোয়াক্কা না করে বিচার করার, জল্লাদ, কারারক্ষক ও গোপন খবরদাতার প্রয়োজনীয়তার, তথা এক কথায় বললে আইন ও শাসকের সমস্ত গুণের ধারণার মাধ্যমে মানুষের মাঝে মনের কী বিকৃতি আর দুরাচার জিইয়ে রাখা হচ্ছে। এইসব বিবেচনা করে দেখুন, তা হলে আপনিও নিশ্চয় এই কথায় একমত হবেন যে, আইনের চাপিয়ে দেওয়া শাস্তি এমন এক জঘন্য বিষয় যার বিলোপ হওয়া উচিত।

রাজনৈতিক সংগঠনের বাইরের মানুষ আমাদের তুলনায় তাই নৈতিক দিক থেকে কম কলুষিত। তারা পুরোপুরি বুঝতে পেরেছে যে, যে মানুষগুলোকে “অপরাধী” বলা হয় আসলে তারা নিছক দুর্ভাগা। এর প্রতিকার তাকে চাবকানো নয়, শৃঙ্খলিত করা কিংবা তাকে কারাগারে নিক্ষেপ বা ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করা নয় বরং তাকে সর্বোচ্চ ভ্রাতৃত্বের আদরে, সমতার ভিত্তিতে তার সঙ্গে ভালো আচরণ করে, সৎ মানুষদের মাঝে জীবনের রেওয়াজ চালু করে তাকে উপশমিত করতে হবে। পরবর্তী বিপ্লবে আমরা আশা করি, এই ডাক সামনে এগিয়ে যাবে : ‘গিলোটিন জ্বালিয়ে দাও; কারাগার গুঁড়িয়ে দাও; এ দুনিয়ার নিকৃষ্ট প্রাণী পুলিশ, বিচারক ও তথ্য দাতাদের তাড়িয়ে দাও, নিছক আবেগতাড়িত হয়ে যারা সঙ্গের মানুষটার সঙ্গে খারাপ কিছু করে তাদের ভাই হিসেবে দেখ, সর্বোপরি মধ্যবিত্ত আলস্যের কদর্যতাগুলোকে আকর্ষণীয় রঙিন করে দেখানোর সুযোগ কেড়ে নাও, আর নিশ্চিত থাক যে, সামান্য অপরাধই আমাদের সমাজকে কলুষিত করতে পারবে’।‌

অপরাধের প্রধান অবলম্বন হলো আলস্য, আইন ও শাসন; সম্পত্তি সম্পর্কিত আইন, সরকার সম্পর্কিত আইন, দণ্ড ও লঘু অপরাধ বিষয়ক আইন এবং শাসন যা আইনসমূহ প্রণয়ন করে এবং তার প্রয়োগ ঘটায়।

আর কোনো আইন নয়! আর কোনো বিচারক নয়! স্বাধীনতা, কেবল সমতা ও বাস্তব মানবীয় সমবেদনা হলো একমাত্র কার্যকর দেয়াল যা দিয়ে আমাদের মাঝের নির্দিষ্ট কিছু মানুষের সমাজবিরোধী প্রবৃত্তির মোকাবিলা করা সম্ভব।

তথ্যপঞ্জি

১. ফরাসী বিপ্লবের (১৭৮৯) কথা বলা হয়েছে।

২. ম্যাক্সিমিলিয়ন রোবস্পেয়ার (১৭৫৮-১৭৯৪) এবং জ্যাঁ জ্যাক দাঁতো (১৭৫৯-১৭৯৪) দু’জনই ফরাসী বিপ্লবের অন্যতম প্রভাবশালী নেতা ছিলেন।

৩. বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য (৩৩০-১৪৫৩) যা কনস্টানটাইন ঢও-এর পরাজয়ের ফলে অটোমানদের হাতে পতন ঘটে।

৪. সরকারি ব্যবস্থাপনায় কিছুসংখ্যক ক্যাথলিক চার্চের প্রতিষ্ঠান যার কাজ হলো তথাকথিত বাইবেল প্রদত্ত ধর্মীয় অনুশাসন সুরক্ষা করা যা

৫. প্রথমদিকে ফ্রাঙ্কদের বাৎসরিক মিলনমেলা, মার্চ মাসে অনুষ্ঠিত হতো, যা ছিল বছরের প্রথম মাস।

৬. তিন হাজার থেকে ছয় হাজার সৈন্যের ইউনিট

৭ সার্বভৌম একেকটি রাজ্য, বর্তমানে ২৬টির সমন্বয়ে সুইজারল্যান্ড কনফেডারেশন গঠিত।

৮ ফ্রান্সের রাজার অধীন উচ্চ পর্যায়ের আমত্যবর্গ, বিশপ এবং রাষ্ট্রের উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রী ও শাসকদের সমন্বয়ে গঠিত পরিষদ, যারা রাষ্ট্রের বিশেষ কোনো পরিস্থিতিতে পরামর্শ করত।

সম্পাদকীয় নোট: রচনাটি ঢাকা থেকে প্রকাশিত  রাষ্ট্রচিন্তা পত্রিকায় ২০১৭ সালের অক্টোবরে প্রথম প্রকাশিত হয়।

 

মাজহার জীবন

লেখক